kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

আনন্দ বাংলা

বইছবি

ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন পার্কে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। হাতের ব্যাগ পাশে রেখে একটা বই বগলদাবা করে সুযোগের অপেক্ষা করছেন সাদিক খান। সঙ্গে নিত্যসঙ্গী স্মার্টফোন তো আছেই। হঠাৎই চোখে পড়ল দৃশ্যটা। গল্পটা শেষ করছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বইছবি

একটা ঝিনুক ধীরে ধীরে মুখ খুলছে। সাদিকের কাজের সময় এসে গেছে। ফ্রেমটা ঠিক করে নেমে পড়লেন। বইয়ের প্রচ্ছদের সঙ্গে বাস্তবের দৃশ্য মিলিয়ে তুলে ফেললেন ছবিটা। বইয়ের ছবি তোলাই সাদিকের নেশা। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা দিয়েই তোলেন। বই হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান এখানে-সেখানে। প্রকৃতির মাঝে আচমকাই দৃশ্যগুলো ধরা পড়ে। নিজের মতো গোছগাছ করে খুব বেশি ছবি তোলেননি। এই যেমন ধরুন, ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার জন্য কমলাপুর রেলস্টেশনে বসেছিলেন সাদিক। পাশেই বয়স্ক এক ভদ্রলোকও বসেছিলেন অনেকক্ষণ ধরে। কিছু আলাপের পরই সাদিক জানতে পারলেন ভদ্রলোক তাঁর ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। তারপরই রেদোয়ান মাসুদের লেখা ‘অপেক্ষা’ বইটি রাখলেন কাছে। তুলে ফেললেন ছবিটি। এই শিল্প ধরনটিকে তিনি বলেন থিমোগ্রাফি, মানে থিম নিয়ে ফটোগ্রাফি।

কিছু বইয়ের ছবি নিজেই সাজিয়ে-গুছিয়ে বা মডেল দিয়ে তুলেছেন। এই করে করে ক্যাম্পাসে একজন পরিচিত মুখ তিনি। পড়ছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বইয়ের প্রচ্ছদ দেখার পর থেকেই মাথায় তাঁর ঘুরতে থাকে এ রকম ফ্রেম কোথায় মিলতে পারে?

 

যেভাবে এ রকম ছবি

ছবি তিনি অনেক বছর ধরেই তোলেন; কিন্তু বইয়ের ছবি তুলছেন গেল ফেব্রুয়ারির বইমেলা থেকে। মাত্র দুই-আড়াই মাসেই তিনি প্রায় শখানেক বইয়ের ছবি তুলে ফেলেছেন। ‘দেখবেন সব কিছুর বিজ্ঞাপন হয়। তবে বইয়ের বিজ্ঞাপন এখনো সেভাবে হয় না। মানে বড় বিলবোর্ডে দেখবেন না বা টিভিতেও বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার হয় না। কারণ একটা ধারণা তো এই যে ভালো বইয়ের প্রচার লাগে না। আমাদের দেশে পৃথিবীর দীর্ঘতম বইমেলা হয়। প্রতিবছরই হাজার হাজার নতুন বই আসে। তাই সব ভালো বইয়ের খবর জানা সহজ নয়। আমি ভাবলাম, যেহেতু ছবি তোলার কাজই করি, বইকে কেন বিষয় করি না। আমার ছবি দেখে কোটি মানুষ বইয়ের কাছে ফিরবে তা ভাবিনি; কিন্তু কিছু মানুষ ফিরতেও পারে।

 

ছবিগুলো ধরা দেয়

কিছু ছবি সাদিক খান তুলেছেন তাঁর নিজের ক্যাম্পাসে। তাঁর এখন ছবি তোলার মডেল পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না; বরং অনেক সহপাঠী ও জুনিয়ররা নিজেরাই আগ্রহ করে ছবি তুলতে আসে। এই যেমন সোহেল নওরোজের লেখা ‘গল্পটি শুনতে চেওনা’ বইটির ছবি তোলা হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝে। আগ্রহ করে মডেল হয়েছে তাঁরই এক সহপাঠী। সাদিক খান বইয়ের ছবি তোলা উপভোগ করেন। বলছিলেন, ‘লেখকরা গল্প লেখে আর আমি সেসব বইয়ের ছবি তুলে নতুন গল্প বুনি। ব্যাপারটা অনেক আনন্দের।’ ছবি তোলার কিছু গল্প আবারও বলা যাক। জাফর ইকবালের কিশোরতোষ বই ‘রাশা’। বইয়ের ছবিটি তুলতে গিয়ে বেশ মজা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে বইটা বাচ্চা মেয়ের হাতে। প্রচ্ছদের মেয়েটির ছবি রংতুলিতে আঁকা। এই মেয়েটির সঙ্গে ছবির মেয়েটির চেহারার অনেক মিল। মনে হয় যেন প্রচ্ছদশিল্পী ছবির মডেলকে দেখেই প্রচ্ছদ এঁকেছেন। এ রকম অবাক করা ঘটনা নাকি তাঁর ক্ষেত্রে প্রায়ই ঘটে।

 

ছবি থেকে বই

বই থেকে যেমন ছবির কথা ভাবেন। আবার ছবি দেখার পর সে রকম বই খুঁজতে থাকেন। যেমন—একবার একটা দেয়াল দেখলেন, যেখানে একটি নারীচিত্র আঁকা। সঙ্গে একটা পাখি। এটি দেখার পর থেকেই মনে হচ্ছিল এমন একটা বই পেলে বেশ ছবি হতো। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যান রাফিউজ্জামান সিফাতের লেখা ‘মনোপাখি’। বইটির প্রচ্ছদ ও দেয়ালের ছবির মিল অনেকটাই। পরে সময়মতো ছবিটাও তুলে ফেলেন।

একটা মজার ঘটনা

বই কিনতে কয়েকবারই তিনি বইমেলায় গিয়েছেন। এক দিন বই নিয়ে ফেরার পথে হঠাৎই রেলের একটি বগিতে চোখ আটকে যায়। এর গায়ে নম্বর লেখা-জ। তাঁর ব্যাগে তখন সদ্য কেনা লুৎফর হাসানের লেখা বই ‘বগি নম্বর জ’ আছে। ভুল করেননি সাদিক খান। ছবি তুলতে। সব সময় অবশ্য এত সহজে পাওয়া যায় না। একটা ছবি তুলতে যেমন কয়েকটা পূর্ণিমা অপেক্ষা করতে হয়েছে।

 

প্রকৃতিই তাঁর প্রাণ

ফেসবুকে তাঁর ব্যক্তিগত প্রফাইল ঘাঁটলে দেখা যায় একাধিক ছবির অ্যালবাম। একটির নাম ছবি-প্রতিচ্ছবি। সেখানে বৃষ্টির পর পর তোলা প্রায় সব ছবিতেই প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। আরেকটি অ্যালবামের নাম আমার ক্যামেরায় ব্রহ্মপুত্র নদ। এখানে নদের একের পর এক অনেক ছবি। সাদিক খান প্রকৃতির মধ্যেই থাকতে ভালোবাসেন। বলছিলেন, ‘প্রকৃতির মাঝেই বেড়ে উঠেছি। কখনোই বদ্ধ ঘরে বসে থাকার পাত্র ছিলাম না। ছোটবেলায় নদীর ধারে বসার জায়গা বানিয়ে সেখানে পড়তাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার পর শুধু ভেবেছি ক্যাম্পাসটা যেন প্রকৃতিঘেরা হয়। তাই টার্গেট করেছিলাম জাহাঙ্গীরনগর, নয়তো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ভাগ্য ভালো বাকৃবিতে ভর্তি হতে পেরেছি।’

 

বই বাছাই

কোনো নিয়ম মেনে বই বাছাই করেন না তিনি। তবে প্রথম প্রথম পাঠকপ্রিয় বইগুলো দিয়ে শুরু করেছিলেন। এবারের বইমেলায় যেসব বই নিয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছিল, সেসব নিয়েই প্রথম ছবি তোলা শুরু করেন। পরে আস্তে আস্তে যেসব বই ভালো লাগত তা দিয়েই তুলতে থাকেন। শেষে এখন অনেক চেনা-অচেনা লেখক নিজেই তাঁকে অনুরোধ করেন তাঁদের বই নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে। এখন পর্যন্ত সাদিক খান এর বিনিময়ে কোনো প্রকার অর্থ দাবি করেননি। বলছিলেন, ‘ছবি তোলাটা আমার কাজ বা পড়ালেখার মধ্যেও পড়ে না। ছবি তুলি শখে। আর ভালোবাসি বই। সুতরাং এত তাড়াতাড়ি এটাকে বাণিজ্যিক করে তুলতে চাইছি না।’

মন্তব্য