kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

মা তোমায় সালাম

সাইফের মা

ফেনী শহরের ট্রাংক রোড লাগোয়া উকিল নুরুজ্জামান সড়কের আল রাহা ম্যানশনের পাঁচতলায় থাকেন জোহরা বেগম। তিনি সাইফের মা। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার সাইফ উদ্দিনকেই আদর করে মা ডাকেন সাইফ। তিনি আসাদুজ্জামান দারার কাছে বলেছেন ছেলের বেড়ে ওঠার গল্প

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সাইফের মা

ফুলগাজীর জিএম হাট ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামে আমার (জোহরা বেগম) বাবার বাড়ি। আমার বিয়ে হয় ১৯৭৯ সালে। স্বামী আব্দুল খালেক ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। ফেনী সদরের ফাজিলপুর ইউনিয়নের পূর্ব শিবপুরে তাঁদের বাড়ি। পুলিশ বিভাগের চাকরির সুবাদে আব্দুল খালেক বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেমন—ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কুমিল্লা। চাকরিজীবন তাঁর শুরু হয়েছিল বাহাত্তর সালে। তবে চাকরিরত অবস্থায়ই তিনি ক্যান্সারে মারা যান ২০০৮ সালে। আমার বড় মেয়ে আসমা আক্তার ও ছোট মেয়ে দিল আফরোজের বিয়ে দিয়েছি। বড় ছেলে কফিল উদ্দিন ও ছোট ছেলে আজহার উদ্দিন পড়াশোনা করছে। তিন ভাইয়ের মধ্যে সাইফ উদ্দিন মেজো।

 

বাবা তখন বাড়ি ছিলেন না

সাইফের জন্ম তাদের গ্রাম ফাজিলপুরের শিবপুরে। তখন তার বাবা বাড়িতে ছিলেন না। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। সাইফের জন্মের কয়েক দিন পর ছুটি নিয়ে নবজাতককে দেখতে আসেন। সাইফের প্রথম স্কুল বটতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাইমারি পাস করে ভর্তি হয় করৈয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে ফেনীর শাহীন একাডেমি স্কুলেও পড়েছে। তখন আমাদের বাসা ছিল শহরের কদলগাজী সড়কে। সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করত সাইফ। খুব ডানপিটে ছিল। ক্রিকেট খেলতে কোথায় কোথায় চলে যেত। ফুটবলও খেলত ভালো। খেলার নেশা ছিল খুব। অনেক দিন মাগরিবের আজান পড়ে গেলে আমার টেনশন হতো। এদিক-সেদিক খুঁজতে যেতাম। পরে আবার দেখতাম ৭টা-৮টার দিকে ঠিকই ফিরে এসেছে। 

 

খেলা দেখতে বাজারে

সাইফদের গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। সাইফ খেলা দেখতে পাশের বটতলী বাজারে যেত। এক দিন বটতলী বাজারে খেলতে গিয়ে সে আর আসে না। আমি তো টেনশনে শেষ। পরে রাত ৮টার দিকে বাড়ি ফিরে এসেছিল। ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা দেখতে সে অনেক ভালোবাসত। স্থানীয় টুর্নামেন্টে সাইফের ডাক পড়তই। এদিক-ওদিক খেলে অল্পস্বল্প টাকাও পেত। খুশি খুশি বাড়িতে এসে ডাকত—মা, ওমা। আমি রান্নাঘরে থাকলে দৌড়ে এসে টাকাগুলো দিত আমার হাতে। একবার একটা ১০ টাকার নোট তুলে দিয়ে বলল, এক বড় ভাই খেলা দেখে খুশি হয়ে এই টাকাটা দিয়েছে। একসময় বড় ভাই কফিল ছিল তার খেলার সাথি। কফিলের সঙ্গে অনেক ঝগড়াও করেছে খেলা নিয়ে। আমিই বেশি শাসন করতাম, ওর বাবা তো দূরে দূরে থাকত। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে আদরই করত বেশি। সাইফ বেশি আবদারও করত বাবার কাছে। আমাকে সাইফ একটু ভয়ই পেত।

 

ফেনী সদরে এসে

২০০৫ সালে আমরা বাসা নিয়ে ফেনী সদরে আসি। সাইফ ফ্রেন্ডশিপ ক্রিকেট ক্লাবে ভর্তি হয়। ওই ক্লাবের ক্রীড়া সম্পাদকের নাম কামরুল হাসান রানা। সে সাইফকে অনেক বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়েছে। ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব ১৪ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ডাক পায় সাইফ। অনূর্ধ্ব ১৯ টুর্নামেন্টেও খেলেছে। বেশি ভালো খেলেছে যুব বিশ্বকাপে। রানা এসে অনেক দিন বলেছে, সাইফ খুব পরিশ্রমী ছেলে। সে কখনোই অনুশীলনে ফাঁকি দিত না। ক্লাবের সবাই ওকে ভালোবাসত। এটা-সেটা উপহার দিত।

সাইফ নিজের চেষ্টায় এত দূর গেছে। আমরা তো ওকে সে রকম সাহায্য করিনি। ভালো কিছু খাওয়াতেও পারিনি। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। ছেলেটা কখনোই কিছু চায়নি। নিজের মতো চেষ্টা করে গেছে। আল্লাহর কাছে শোকরিয়া। আমার ছেলেটার জন্য আপনারা দোয়া করবেন। আফসোস, ওর বাবা এসব দেখে যেতে পারল না।

মন্তব্য