kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

পোড়াবাড়ির চমচম

পোড়া ইটের মতো রং হয় পোড়াবাড়ির চমচমের। ২০০ বছর বয়স এই মিষ্টির। কারিগররা দিনে দিনে খাবারটাকে লোভনীয় করে তুলেছেন। এর গুপ্তকথা জানতে গিয়েছিলেন অরণ্য ইমতিয়াজ

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পোড়াবাড়ির চমচম

টাঙ্গাইল সদর থেকে চার কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে পোড়াবাড়ি গ্রাম। এর কাছের একটি গ্রাম চারাবাড়ি। চারাবাড়ির ধার দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী। একসময় এখানে স্টিমারঘাট ছিল।  ঘাটে লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা ভিড়ত। ব্রিটিশ আমলে এখান দিয়ে আসাম, কলকাতার স্টিমার চলাচল করত। পোড়াবাড়ির কারিগররা সে সময় এই ঘাটেই তৈরি করতেন চমচম। একসময় নদীতে চর পড়ে। নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। লোকে আর ভিড় করে না ঘাটে। তখন থেকে পোড়াবাড়ি গ্রামেই চমচম তৈরি হতে থাকে।

 

আসল রহস্য

পোড়াবাড়ির দক্ষ কারিগরদেরও টাঙ্গাইলের বাইরে গিয়ে এমন সুস্বাদু ও নরম চমচম তৈরি সম্ভব নয়। কেন নয়? তার উত্তর আছে ধলেশ্বরী নদীর কাছে। এর পানি স্বচ্ছ আর এর পারে জন্মায় সবুজ ঘাস। দেশি গরুর দল ধলেশ্বরীর চরের ঘাস খেয়ে খাঁটি দুধ সরবরাহ করে। চমচম তৈরির উপকরণ বলতে তো দুধ আর চিনি। প্রবীণ কারিগরদের অনেকেই বলেন, ধলেশ্বরীর পানি ছাড়া এমন চমচম তৈরি সম্ভব নয়। টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত ‘পূর্বাকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক খান মোহাম্মদ খালেদ। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছ থেকে একটি ঘটনা শুনেছিলেন। ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষে থাকতেন। এক আড্ডায় বলেছিলেন গল্পটি। তখন ব্রিটিশ আমল। সন্তোষের জমিদারদের এক মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল কলকাতায়। সেই অনুষ্ঠানের অতিথিদের পোড়াবাড়ির চমচম খাওয়ানোর কথা ভাবলেন জমিদার। তিনি পোড়াবাড়ি থেকে কয়েকজন নামি কারিগর নিয়ে গেলেন কলকাতায়। কয়েক দিন চেষ্টা করেও তাঁরা সুস্বাদু চমচম তৈরি করতে পারলেন না। কারণ খুঁজতে গিয়ে ধলেশ্বরীর পানির কথাই এলো আগে।

 

পাকিস্তান আমল

পোড়াবাড়ি এলাকার দেবনারায়ণ গৌড় ও বাঙালি গৌড় (বাঙালি হালুই নামে বেশি পরিচিত) পঞ্চাশ-ষাটের দশকে খুব নাম করেছিলেন চমচম বানিয়ে। তাঁদের বলা হতো মিষ্টির জাদুকর, বিশেষ করে বাঙালি হালুইয়ের কাছে অনেকেই এই মিষ্টি বানানো শিখেছিলেন। ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের সন্তোষে যে কাগমারী সম্মেলন হয়েছিল, তাতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই মিষ্টি খেয়ে প্রশংসা করেন।

 

পোড়াবাড়ির দুধের বাজার

ব্রিটিশ আমল থেকে পোড়াবাড়িতে দুধের বাজার বসে। এখনো সে বাজার আছে। প্রতিদিন দুপুর ১২টায় বসে। পোড়াবাড়িসহ আশপাশের এলাকার মানুষ তাদের গাভির দুধ নিয়ে আসে। এক ঘণ্টার মধ্যেই সব দুধ বিক্রি হয়ে যায়। মঙ্গলবার সাপ্তাহিক হাট। স্বাধীনতাযুদ্ধের পরপরই দুধ বিক্রি হতো ২৫ পয়সা সের। এখন বিক্রি হয় গড়ে ৬০ টাকা কেজি। ঘোষেরাই প্রধান ক্রেতা।

১৯৭২ সালের দিকে পোড়াবাড়িতে চমচম বিক্রি হতো প্রতি সের দুই টাকা। এখন মানভেদে ১৪০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে চমচম বিক্রি হয়। দামের সঙ্গে মিল রেখে স্বাদও কমবেশি হয়।

 

পোড়াবাড়ি এখন

ধলেশ্বরী নদী এখন বলতে গেলে একটি খাল। বর্ষা মৌসুম ছাড়া নাব্যতা থাকে না। সেই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীরা ছানার বদলে ময়দাও ব্যবহার করছেন। তাই খাঁটি পোড়াবাড়ির চমচম খুঁজে নিতে জহুরি বনতে হয়। পোড়াবাড়ি ও চারাবাড়ি বাজারে চমচমের দোকান এখন হাতে গোনা কয়েকটি। তবে চমচম তৈরির কারখানা আছে এক ডজনের বেশি। এসব কারখানায় যে চমচম তৈরি হয় তার প্রায় সবই যায় ঢাকায়। টাঙ্গাইল শহরে মিষ্টিপট্টি বলে একটি জায়গা আছে। এখানে মিষ্টির দোকান আছে ২৫টি। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আরো ২৫টি দোকান রয়েছে। এসব দোকানের নিজস্ব কারখানা আছে। কয়েক শ কারিগর এসব কারখানায় চমচম তৈরি করেন।

     ছবি : লেখক

 

মন্তব্য