kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এখানে ৭১ কাঁদে

বধ্যভূমি ২০১৯

খুলনার জাদুঘরটি আলাদা। এখানে কান্নার ইতিহাস রাখা আছে। দেশ রক্ষায় রক্ত দিয়ে সে ইতিহাস লিখেছিল বাঙালি। খুলনার জাদুঘরটির নাম তাই ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। শিল্পী হামিদুজ্জামান খান এখানে যোগ করলেন একটি বধ্যভূমি। মোহাম্মদ আসাদ শিল্পীর সঙ্গী ছিলেন

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বধ্যভূমি ২০১৯

জাদুঘর ভবনের পেছনে ভাঙা ইটের একটি স্তূপ ছিল। হামিদ স্যার (হামিদুজ্জামান খান) দেখে বললেন, এটা তো বধ্যভূমি হয়েই আছে। এখন বডিগুলো বসালেই হবে। ৭ই মার্চ সকাল থেকেই স্যার বধ্যভূমি তৈরির কাজ শুরু করলেন। স্যার পুরান ঢাকার এক দোকান থেকে কিছু প্লাস্টিক রেজিন, ফাইবার আর প্লাস্টার অব প্যারিস কিনেছিলেন মাসখানেক আগে। তারপর সেগুলো দিয়ে মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (দুই সেট) গড়েছেন। হাত-পা, শরীর আলাদা আলাদা। স্যার প্রথমে পিতলের পাত ও নাট-বল্টু দিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জোড়া দিলেন। হাত-পা ও শরীরের ভেতর বালু ও রড ঢুকিয়ে দিলেন। যাতে কেউ তুলে না নিয়ে যেতে পারে। তারপর ইটের স্তূপ এদিক-ওদিক সরিয়ে নিয়ে মানবদেহ দুটিকে স্থাপন করলেন। শরীরের সবটুকু নয়, বেরিয়ে রইল হাত-পা বা শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ। শেষ হওয়ার পর পরিবেশটা সত্যি সত্যি বদলে গেল। একটা ভয়াবহ পরিবেশ। প্রকাশিত হলো পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা। খুলনার গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরে একাত্তরের বধ্যভূমি তৈরি হলো এভাবেই। হামিদ স্যার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছেন অনেক দিন ধরেই। তার ইতিহাস দীর্ঘ।

কিছুটা জেনে নেওয়া যাক।

তখন তিনি বরোদায়

শিল্পী হামিদুজ্জামান ১৯৬৭ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ) থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বৃত্তি নিয়ে ভারতের বরোদার মহারাজা সয়াজি রাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান ১৯৭৪ সালে। দুই বছর পর যখন ফিরে এলেন তখন সঙ্গে নিজের গড়া ছোট ছোট ভাস্কর্য নিয়ে আসেন। সেগুলো মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করেই গড়া। তারপর দেশে এসে আরো কিছু ভাস্কর্য গড়েন। সব মিলিয়ে ১৯৮২ সালে বড় একটি প্রদর্শনী করেন। প্রদর্শনীতে একটি বধ্যভূমিও স্থান পেয়েছিল। সেখানে কোথাও দেহ পড়েছিল, কোথাও হাত-পা। প্রদর্শনী দেখতে দেখতে এক নারী মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন।  পরে জানা গেল, ওই নারীর স্বামী একাত্তরে শহীদ হয়েছেন। সেই ভাস্কর্যগুলোর কয়েকটি পরে জাতীয় জাদুঘরে দিয়েছিলেন স্যার। সেই প্রদর্শনীটি দেখেছিলেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। তাঁর অনুরোধে স্যার বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে একটি মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য গড়েন। এর পর পরই স্যার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশপ্তক, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়বাংলা, মিরপুরে কিংবদন্তিসহ মুক্তিযুদ্ধের অনেক ভাস্কর্য গড়েছেন। ২০১৭ সালের শেষের দিকে হামিদুজ্জামান খানের একটি প্রদর্শনী হয় জাতীয় জাদুঘরে। তাতে জাদুঘরে দেওয়া পুরনো সেই ভাস্কর্যগুলোও ছিল। তারই একটি হলো একটি রিকশা। রিকশাটি মাত্রই তিন-চার ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের। রিকশাটির ওপর কয়েকটি লাশ পড়েছিল। সামিট গ্রুপের আজিজ খান প্রদর্শনীতে অতিথি ছিলেন। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনও ছিলেন। মুনতাসীর মামুন রিকশাটি গণহত্যা জাদুঘরে দিতে বলেন। স্যার বললেন, এই ছোট ভাস্কর্য দিয়ে কিছুই বোঝা যাবে না। তার চেয়ে নতুন করে বড় একটি দিলে ভালো হবে। আজিজ খান সেটির অর্থায়নে রাজি হলেন। ব্রোঞ্জে তৈরি রিকশাটি ২০১৮ সালে বসানো হয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে।

দেখা হলে হামিদ স্যারকে মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘হামিদ ভাই, আপনার ৮২ সালের বধ্যভূমিটি এখনো আমার চোখে লেগে আছে।’ হামিদ স্যার খুলনায় সেই বধ্যভূমি আবার ফিরিয়ে আনলেন গেল ৭ই মার্চ।

ছবি : লেখক

 

মন্তব্য