kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

অমূল্য রতন

চাচার ছবি

১৯৭১ সালের ২২ জুলাই। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের ডাঁশার চাষী ক্লাব যুদ্ধে শহীদ হন পাঁচজন। শহীদদের একজনের নাম ইকবাল। তাঁর ভাতিজা আনোয়ার হোসেনের কাছে চাচার একটি ছবি আছে। ইমাম মেহেদী ছবিটি তুলে এনেছেন

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



চাচার ছবি

সারা দিন পাঁচ শহীদের লাশ অবহেলায় পড়ে ছিল। পরে রাজাকাররা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে মাটিচাপা দেয়। জানাজাও হয়নি। এলাকার মানুষ মুখ বুজে সহ্য করেছে। ওই দিন অপারেশনের দায়িত্ব ইকবালের ওপরই ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ডাঁশা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জাহিদ হোসেন চৌধুরী নিজে উদ্যোগী হয়ে গণকবরটি পাকা করেন।

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর গণকবর থেকে শহীদদের লাশ উত্তোলন করা হয়। জাতির পাঁচ শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই সর্বসম্মতভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উদ্যোগটা নিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কুষ্টিয়া জেলা শাখা। সহযোগিতা দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর এলাকার শত শত মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ, শহীদ ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী জানাজা শেষে নতুন করে সমাহিত করা হয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের। জেলার সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় শহীদ স্মরণে। নাম রাখা হয় ‘ডাঁশা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ—রক্তঋণ-২’। ৪৪তম স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবসে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ফলক উন্মোচিত হয়।

 

বাড়ির ঠিকানা

কমান্ডার লুৎফর রহমান এবং আহত মুক্তিযোদ্ধা মালেক ও ছাত্তারের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা ইকবালের বাড়ির ঠিকানা দেন। একটা মোবাইল নম্বরও দেন। সেটি শহীদ ইকবালের বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম খানের ছেলে আনোয়ার হোসেনের। ২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট বিকেলে গ্রামের ছোট ভাই রাজীব হোসেনকে নিয়ে পৌঁছাই ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দেবতলা গ্রামে শহীদ ইকবালের বাড়িতে। দেখা হয় আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তাঁর পিতার নাম আতোয়ার রহমান খান। মা সাফিউন নেছা। দুজনেই মারা গেছেন। যুদ্ধের সময় আনোয়ারের বয়স ছিল দশ বছরের মতো। চাচার কিছু স্মৃতি তাঁর মনে আছে। পরে বাবা-চাচাদের মুখেও গল্প শুনেছেন।

 

ইকবাল যেমন ছিলেন

যুদ্ধের সময় ইকবালের বয়স ছিল ২৫ বছর। পড়ালেখা জানতেন। তবে কত দূর জানতেন বলতে পারেননি আনোয়ার। দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন। সব সময় নায়কের মতো ফিটফাট থাকতেন। গোঁফ ছিল। গলায় সোনার চেইন, হাতে ঘড়ি, আংটি ব্যবহার করতেন। অবিবাহিত। তবে বিয়ের কথা চলছিল। সাহস ছিল তাঁর। এলাকায় ইকবালরা অভিজাত পরিবার। একাত্তর সালে ইকবাল সেনাবাহিনীতে চাকরিরত ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। চাকরি ছেড়ে আসার সময় কিছু অস্ত্র নিয়ে এসেছিলেন। সেই অস্ত্র দিয়ে এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে দল গঠন করেছিলেন। একই কথা জেনেছিলাম, শহীদ ইকবালের সহযোদ্ধা ও ডাঁশা যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধা সুলতান, ছাত্তার ও মালেকের কাছে। ইকবালের বড় ভাইয়ের স্ত্রী আনোয়ারা খাতুন এখনো বেঁচে আছেন। তিনি বললেন, ‘আমি রান্না করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক খাইয়েছি। এখনো ইকবালের মুখটা চোখের সামনে ভাসে।’ আনোয়ার হোসেন আরো বললেন, ‘চাচার একটা ছবি আমরা যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আপনি চাইলে মোবাইলে ছবি করে নিতে পারেন; কিন্তু দেওয়া যাবে না। কারণ এটা আমাদের পরিবারের একমাত্র স্মৃতি। চাচাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। চাচার নাম ইতিহাসে লেখা হয়ে গেছে। চাচা নিজের রক্ত দিয়ে দেশের নাম লিখে গেছেন। চাচার স্মৃতিই আমার পরিবারের বড় সম্পদ।’

মন্তব্য