kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ংও আমার দেশ

যুদ্ধ করতে চেয়েই জনমত

উত্তাল উনসত্তর। ব্রিটেনের প্রবাসীরাও দেশের মানচিত্র আঁকছিল। চাইছিল মুক্তি। সে চেতনা নিয়েই প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা ‘জনমত’। এবার তার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হলো। লন্ডন থেকে বলছেন জুয়েল রাজ

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যুদ্ধ করতে চেয়েই জনমত

লন্ডনের হাউস অব কমন্সে জনমতের সুবর্ণ জয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ থেকে এসে যোগ দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চার সদস্যের একমাত্র জীবিত সদস্য আনিস আহামদ । বললেন, আমরা তখন ছাত্র। ভাবিনি ৫০ বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারবে ‘জনমত’। আজ তাই অবাক লাগছে। ব্রিটেনে তখন পূর্ব পাকিস্তানের একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর বসবাস; কিন্তু জানতে পারছিলাম না সেখানে কী ঘটছে। যেসব খবর আসত সেগুলো ছিল একতরফা। আমরা ধারণা করেছিলাম একটা কঠিন সময় আসছে। ভাবছিলাম লড়তে হবে। আর তার হাতিয়ার হলো জনমত।

জনমতের প্রথম সংখ্যা

দিনটি ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারি

১৯৬৯ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। ১৮ গ্যালভেস্টন রোড পূর্ব পাটনি থেকে ‘আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে’ শিরোনাম দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘জনমত’। এ টি এম ওয়ালী আশরাফ ও আনিস আহমদ উদ্যোগটা নিয়েছিলেন। তাঁদের সহযোদ্ধা হয়েছিলেন ফজলে রাব্বি মাহমুদ হাসান। তাসাদ্দুক হোসেন বাংলা টাইপরাইটার দিয়ে জনমতের যাত্রা সহজ করেছিলেন। আরো উদার সহায়তা দিয়েছেন ফিজির এক নাগরিক নাম এস জেড শাহ্।

 

সেটা একাত্তর

২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মে পর্যন্ত জনমতের সম্পাদক আনিস আহামদ বাংলাদেশে ছিলেন। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিজে শুনে লিখে পাঠিয়েছিলেন লন্ডনে। এমনকি ২৫ মার্চ কালরাতেও ঢাকার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে খবর পাঠিয়েছেন লন্ডনে। তারপর পালিয়ে ভারত চলে যান। লন্ডনে ফেরার পথে তিনি জাতীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১২ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের আমন্ত্রণে জনমত পত্রিকার প্রধান সম্পাদক এ টি এম ওয়ালী আশরাফ মুজিবনগর যান এবং ১৯ ডিসেম্বর তিনি স্বাধীন দেশে পা রাখেন। ১৯৭২ সালের ৮ মে লন্ডনে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তিনি জনমতে সংবাদ পাঠিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সরেজমিনে অনেক খবর ছাপাত বলে ব্রিটেনের বাংলাদেশিরা জনমতের জন্য অপেক্ষা করত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই কলকাতার যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক তুষারকান্তি জনমত অফিসে এসে বলেছিলেন, ‘ওয়ালী আশরাফ ও আনিস আহমদ যেভাবে পত্রিকাটি আগলে রেখেছেন, আমার মনে হয় এর মৃত্যু হবে না।’

আরো কথা

লেখক কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী জনমতের গৌরবের ৪২ বছর নামক সংকলনে বলেন, ‘‘১৯৬৯ সালের সেই প্রতিকূল পরিবেশে লন্ডনে একটি বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশ এবং একে টিকিয়ে রাখা ছিল এভারেস্ট বিজয়ের মতোই দুঃসাধ্য প্রয়াস। ‘জনমত’ সেই দুঃসাধ্য সাধন করে এগিয়ে চলছে আজও। বাংলা সাংবাদিকতার সামগ্রিক ইতিহাসে ‘জনমত’ যে এক দিন একটি গৌরবময় আসন দখল করতে পারবে সে সম্পর্কে আমার কোনো সন্দেহ নেই।’’

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ওয়ালী আশরাফ সম্পাদিত সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ অবদান রেখেছে। বাঙালি মহলে পত্রিকাটি ছিল বহুল প্রচারিত। ব্রিটেনের বাহিরে ও প্রবাসীগণের অনেকে পত্রিকাটির গ্রাহক ছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তারা নিজেরাই পাকিস্তান দূতাবাস থেকে যেসব বিজ্ঞাপন নিয়মিত পেতেন সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেন।’

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধ পর্বের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে জনমত পত্রিকার আর্কাইভ থেকে। এ ছাড়া গবেষক ফারুক আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে জনমত নামে একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছেন।

 

জনমত বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে

প্রায় ৩০ বছর ধরে জনমতের সঙ্গে জড়িত আছেন সৈয়দ নাহাশ পাশা ও নবাব উদ্দিন। নাহাশ পাশা এখন পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক আর নবাব উদ্দিন সম্পাদক।

হাউস অব কমন্সে জনমতের সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কূটনৈতিক আনোয়ার চৌধুরী অতিথি হয়ে এসেছিলেন। বলেছেন, ‘যখন আমি বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাই, আমার বাবা ঠিক বিশ্বাস করছিলেন না। তিনি বারবার জিজ্ঞেস করেছিলেন জনমত সংবাদটি প্রকাশ করেছে কি না? যেদিন জনমতে আমার নিয়োগের সংবাদটি প্রকাশ হয়েছিল, সেই দিন তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলেন যে আমি বাংলাদেশে হাইকমিশনার হয়ে যাচ্ছি।’

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এম পি রুশনারা আলী ওই অনুষ্ঠানেই বলেছেন, ‘আমি প্রথম যখন নির্বাচন করি, বাংলা সংবাদপত্রগুলো সে সময় জোরালোভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। এদের মধ্যে জনমত ছিল সবার আগে।’

জনমত ৫০ বছরের দীর্ঘ সময়ে জনতার পক্ষেই থেকেছে সব সময়। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের (গণজাগরণ মঞ্চ) পক্ষে যুক্তরাজ্যে যে আন্দোলন হয়েছে তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জনমত। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার জনমত। নীতি পাল্টায়নি বলেই বুঝি ৫০ বছর পাড়ি দিতে পারল জনমত।

ছবি : লেখক

মন্তব্য