kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

পরদেশী বন্ধু মোর

বাংলাদেশের যুদ্ধ : যে লেখা ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশের যুদ্ধ : যে লেখা ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

ইয়ভনে মাসকারেনহাস

‘আব্দুল বারির কপাল মন্দ। পূর্ববঙ্গের আরো হাজার মানুষের মতো একই ভুল তিনিও করলেন। ছোটখাটো নয়, বিরাট এক ভুল। পাকিস্তানি বাহিনীর একটি গাড়ির সামনে পড়ে গেলেন। তাঁর বয়স মোটে চব্বিশ। তিনি ভয়ে কাঁপতে থাকলেন; কারণ এই বুঝি একটি গুলি এসে তাঁর বুকে বিঁধে।’

১৯৭১ সালের ১৩ জুন যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায় একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। আব্দুল বারির কথা বলা হয়েছিল ওখানেই। লিখেছিলেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। লেখাটি ইন্দিরা গান্ধীর মনেও রেখাপাত করেছিল। এই লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি রাশিয়া ও ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধানদের বোঝাতে পেরেছিলেন পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালিদের ওপর কী নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে। ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিবিসির মার্ক ডামেট আবার লেখাটিকে সামনে নিয়ে আসেন। শিরোনাম দিয়েছিলেন

 

অ্যান্থনি যদি না লিখতেন

পাকিস্তান বাঙালিদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে কথাটি পৃথিবীকে বলেন মাসকারেনহাস। যদি তিনি না বলতেন তাহলে কি আরো রক্ত ঝরত? অথবা বাঙালির স্বাধীন হতে আরো সময় লাগত? নাকি পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধামাচাপা দিত? ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন এ পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়। তখনকার সানডে টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভানসকে ইন্দিরা গান্ধী কিন্তু বলেছেন, ‘লেখাটি আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমি পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো আর রাশিয়াকে বোঝাতে পেরেছিলাম পূর্ব পাকিস্তানে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। লেখাটি না হলে বোঝানো আমার জন্য কঠিন হতো।’ তবে মাসকারেনহাসের উদ্দেশ্য বেশি কিছু ছিল না, যেমনটি হ্যারল্ড ইভানস তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘তিনি একজন খুব ভালো প্রতিবেদক, সততার সঙ্গে কাজ করে গেছেন।’

অ্যান্থনি অনেক সাহসী লোকও বটে। ওই সময় পাকিস্তানে চলছিল সামরিক শাসন এবং তিনি জানতেন লেখাটি প্রকাশ হওয়ার আগে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে পাকিস্তানের বাইরে চলে যেতে হবে। ওই সময় কাজটি বেশ কঠিন ছিল বলতে হবে।

মা তাঁকে সব সময় বলতেন সাহস করে দাঁড়াও এবং সত্য বলো। অ্যান্থনির স্ত্রী ইয়ভনে মাসকারেনহাস স্মৃতিচারণায় বলছেন, ‘তিনি আমাকে বলতেন আমার সামনে একটি পাহাড় রাখো, দেখবে আমি তাতেও চড়ে বসব। মানুষটা অদম্য ছিলেন। তাঁকে হতাশ হতে দেখিনি।’

 

যখন যুদ্ধ লাগল

একাত্তরে যখন বাঙালির ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলো, তত দিনে অ্যান্থনি করাচিতে একজন নামকরা সাংবাদিক। করাচি তখনকার পাকিস্তানের প্রধান শহর। অ্যান্থনি সে শহরের গুটিকয় গোয়ানিজ খ্রিস্টানদের একজন। তাঁর ও ইয়ভনের ছিল পাঁচ সন্তান। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে যখন পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝে যায় তাদের ঠকানোই পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য। এ পরিস্থিতিতে বাঙালি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরে তারা সারা দেশেই তাণ্ডব চালাতে থাকে। বিদেশি সাংবাদিকদের আগেই পূর্ব পাকিস্তান ছাড়তে বলা হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনী বিদেশিদের দেখাতে চাইছিল যে যারা সরকারের অনুগত, তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সে ফন্দি থেকেই তারা আটজন সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তান ঘুরে দেখাতে নিয়ে যায়। মাসকারেনহাস ছিলেন তাঁদেরই একজন। ১০ দিন তাঁদের নানা জায়গা ঘুরিয়ে দেখানো হয়। দেখা শেষ করে ফিরে ওই আটজনের সাতজনই পাকিস্তান সরকারের পক্ষে লিখেছেন, মানে তাঁদের যা বোঝানো হয়েছিল তা-ই লিখেছেন। মাসকারেনহাস শুধু ব্যতিক্রম।       

ইয়ভনে মাসকারেনহাস মনে করতে পারেন, অ্যান্থনিকে অস্থির দেখাচ্ছিল। আমি তাঁকে এতটা অস্থির আগে কখনো দেখিনি। তিনি খুব বিমর্ষ ও আবেগতাড়িত ছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘যদি আমি সত্য না প্রকাশ করি তবে আর কখনোই একটি শব্দও লিখতে পারব না।’ কিন্তু পাকিস্তানে তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। সামরিক সরকার সব লেখার ওপরই নজর রাখছিল। অ্যান্থনি বলেছিলেন, ‘যদি আমি তার চেষ্টাও করি বেশিদিন বেঁচে থাকব না।’ তারপর অ্যান্থনি একটা বুদ্ধি বের করলেন। অসুস্থ বোনকে দেখতে লন্ডন চলে গেলেন। গিয়ে সোজা দেখা করলেন সানডে টাইমসের সম্পাদকের সঙ্গে। হ্যারল্ড ইভানস সে দিনের সেই মানুষটার কথা মনে করতে পারলেন, মানুষটা দেখতে অনেকটা সেনা সদস্যের মতো। নাকের নিচে দস্তুরমতো পুরো গোঁফ। তবে চাহনি নরম ছিল আর মনে হচ্ছিল বুকে অনেক ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছেন। বাঙালির ব্যথা তাঁর বুকে বাজছিল। অ্যান্থনি আমাকে বলেছিল, সুপরিকল্পিতভাবেই পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধন করছে। পাকিস্তানি সেনাদের বলতেও তিনি শুনেছেন, ‘ওদেরকে মেরেই ঠাণ্ডা করতে হবে।’

পরিবারকে লন্ডনে আনতে হবে

ইভানস হ্যারল্ড লেখাটি ছাপানোর ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু তার আগে ইয়ভনে ও সন্তানদের করাচির বাইরে নিয়ে আসতে হবে। অ্যান্থনি সাংকেতিক বার্তা পাঠালেন, অ্যানের অপারেশন সফল হয়েছে।

ইয়ভনে টেলিগ্রাম পাওয়ার দিনের সকালের কথা মনে করতে পেরেছেন, ‘জানালায় টেলিগ্রাম বহনকারী লোকটির টোকা শুনতে পেয়ে ছেলেদের ডেকে তুললাম। তারপর বললাম, আমাদের তাড়াতাড়ি লন্ডন পৌঁছাতে হবে।’

রওনা হওয়ার দিন ইয়ভনে মাত্র একটি স্যুটকেস বহন করতে পেরেছিলেন আর এমনভাবে কাঁদছিলেন যেন অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন। পরিবারটি লন্ডনে পৌঁছানোর পরদিনই ছাপা হয়েছিল লেখাটি। শিরোনাম ছিল ‘জেনোসাইড’।

গ্রন্থনা : আহনাফ সালেহীন (অভিযোজিত ও সংক্ষেপিত)

মন্তব্য