kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

ইসমাইল তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইসমাইল তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র

ইসমাইল হোসেন। বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান মেহেরপুরের নিজ বাড়ির বারান্দায়। শরীরের শক্তি হারালেও মনের শক্তি তাঁর অটুট। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাও তিনি। ইয়াদুল মোমিন এক সকালে দেখা করতে গিয়েছিলেন

এখন শেষ বয়সে ইসমাইল হোসেনের একটাই দাবি—মুক্তিযোদ্ধাদের মতো ভাষাসৈনিকদেরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৪ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও ভাষাসৈনিকদের কোনো তালিকা করেনি সরকার। অথচ ভাষা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে ছাত্রত্ব হারিয়েছিলেন। জেলে গিয়েছিলেন। তাঁর আরো দুঃখ, দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা আজও চালু হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে লেখা দেখলে কষ্ট পান ইসমাইল হোসেন। বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এখন তাকিয়ে থাকি ঢাকার দিকে। আমরা যাঁরা মফস্বল এলাকায় থাকি, আমাদের কেউ খবরও নেয় না।’

 

পরদিন খবর আসে

২১শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে পুলিশের গুলির খবর মেহেরপুরে পৌঁছায় পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি। ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রতিবাদ-সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। আবুল কালামের সভাপতিত্বে কালাচাঁদ মেমোরিয়ালের সামনে সমাবেশ হয়। ওই দিন মেহেরপুর উচ্চ ইংরেজি মডেল বিদ্যালয়ের মুসলিম হোস্টেলের ছাত্ররা পোস্টারিং, পিকেটিংসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। মুন্সী সাখাওয়াত হোসেন, বঙ্কা ঘোষ, শান্তি নারায়ণ চক্রবর্তী, গোলাম কবির, মহর আলী, আবুল কাশেম, ইসমাইল হোসেন, নজির হোসেনসহ প্রায় ১০-১১ জন ছাত্র শহরে মিছিল বের করেন। তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে ব্যবসায়ীরাও দোকান বন্ধ করে দেন। শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা ছিল। ভাষার দাবিতে পুরো ফেব্রুয়ারিজুড়ে আন্দোলন চলতে থাকে। ইসমাইল তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

পরের বছর ১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালন উপলক্ষে মিছিল ও সমাবেশ করেন ভাষাসংগ্রামীরা। পুলিশ তাঁদের মিছিলে লাঠিপেটা করে এবং ইসমাইল হোসেনসহ সাতজনকে আটক করে। পরে সন্ধ্যার দিকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালেও ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন করেন। ১৯৫৫ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন পাকিস্তান সরকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। ইসমাইল হোসেনরা সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ভাষার দাবিতে পোস্টারিং, মিছিল ও মিটিং করে। পুলিশ তাঁদের মিছিলে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে অনেক ছাত্র আহত হন। ওই দিন রাতে ইসমাইল হোসেনসহ সাতজনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়। বাকিরা হলেন—নজির হোসেন, সামসুল হুদা, কদম রসুল, আবুল কাশেম, গোলাম কবীর ও মোশারফ হোসেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁরা আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি স্কুল কমিটি মিটিং করে তাঁদের সাতজনকে ফোর্সড টিসি দেয়। সেই থেকে লেখাপড়ার পাট চুকে যায় ইসমাইল হোসেনসহ ওই সাতজনের।

মেহেরপুরের প্রবীণ সাংবাদিক ও মেহেরপুর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য বইয়ের লেখক তোজাম্মেল আযম জানান, ভাষাসংগ্রামের পথ ধরেই আমরা বাঙালিরা বিশ্বে একটি ইতিহাস তৈরি করেছি। কিন্তু ইতিহাস সৃষ্টিকারীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।

 

স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয়

ভাষাসংগ্রাম থেকে স্বাধিকার আন্দোলনের সব কয়টি পর্বে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন ইসমাইল হোসেন। মুক্তিযুদ্ধও করেছেন। ১৯৬৮ সালে মরহুম ছহিউদ্দিন বিশ্বাস মেহেরপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ইসমাইল হোসেন দায়িত্ব পান সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০১৫ সাল পর্যন্ত। এখন তিনি মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য।

 

এখন যেমন আছেন

মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল সড়কের টিঅ্যান্ডটি অফিসের পাশে নিজের তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করেন ভাষাসৈনিক ইসমাইল হোসেন। স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও চার নাতনি নিয়ে তাঁর সংসার। মেয়ে স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। ছেলে মেহেরপুর বড় বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান বাড়ির বারান্দায়।

 

শেষ কথা

প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি এলে মেহেরপুরের জীবিত দুই ভাষাসৈনিককে (নজির হোসেনও জীবিত আছেন) সংবর্ধনা দেওয়া হয় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। উপহারসামগ্রী, ফুল আর ক্রেস্ট দিয়ে তাঁদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়; কিন্তু তাঁদের দাবি, মৃত্যুর আগে তাঁরা ভাষাসৈনিকদের স্বীকৃতি দেখে যেতে চান।

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য