kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

হবিগঞ্জ

সৈয়দ আফরোজ বখত

বায়ান্ন তাঁর কাছে ফিরে ফিরে আসে। সেদিনের মতো আজও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ৮৫ বছর বয়স বুঝি কিছুই নয়। তিনি সৈয়দ আফরোজ বখত। কথা বলে এসেছেন শাহ ফখরুজ্জামান

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সৈয়দ আফরোজ বখত

পেশায় তিনি একজন আইনজীবী। বায়ান্ন সালে ছিলেন ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। মাতৃভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের ছিলেন সংগঠক। হেঁটে হবিগঞ্জের গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করতেন। রাতের বেলায় পালিয়ে থাকতেন আর দিনে রাজপথে মিছিল করতেন। এতে পড়াশোনার কিছু ক্ষতি হয়েছে; কিন্তু মায়ের ভাষা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পেরেছেন বলে গর্ববোধ করেন। তিনি কর্মক্ষেত্রে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহার করেন না। মামলার আর্জি, জবাব—সবই লেখেন বাংলায়।

 

সুযোগ পেলেই মিছিল করতাম

বখত বললেন, মাহবুবুল বারী নামে একজন ছিলেন। তিনি তখন কলেজের ছাত্র। তাঁকে আহ্বায়ক করে আমরা ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ নামের একটি কমিটি গঠন করি। পুলিশের বাধা ছিল। টিচাররা অসহযোগিতা করতেন। তখন মুসলিম লীগ সরকার। আন্দোলনে সেভাবে লোক পাওয়া যেত না। কেউ কেউ সমর্থন দিলেও প্রকাশ্যে বলতে চাইত না। পুলিশ তৎপর ছিল খুব। আমরা যাঁরা সংগঠক ছিলাম, তাঁদের ধরার চেষ্টা করত। আমরা পালিয়ে যেতাম, লুকিয়ে থাকতাম। আবার একটু সুযোগ পেলেই মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামতাম। হবিগঞ্জে এখন আমরা দুজন ভাষাসৈনিক জীবিত আছি। আমি ছাড়া অন্যজন হলেন সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট চৌধুরী আব্দুল হাই। আমরা স্লোগান দিতাম ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই। নুরুল আমিনের ফাঁসি চাই।’

তিনি চান

বাংলা ভাষার জন্য গবেষণা প্রয়োজন। সে জন্য প্রতিবছর বাজেটে বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। আইনের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় এখন পর্যন্ত কোনো বস্তুনিষ্ঠ বই বের হয়নি। সবই ইংরেজি ভাষায়। আইন বা চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়েও বাংলায় বই নেই। প্রকৌশলবিদ্যায়ও বাংলা ভাষার বইয়ের খুব অভাব। আমি বলি না, ইংরেজি ভাষা উঠিয়ে দাও। ইংরেজি ভাষা থাকবে; কিন্তু বাংলা ভাষার যাতে উন্নতি হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এখন দেখি কিছু লোক বিয়ের সময় ইংরেজিতে নিমন্ত্রণপত্র ছাপায়। এভাবে চলতে থাকলে কিভাবে নিজের ভাষার চর্চা হবে। আমি মনে করি, বাংলা ইংরেজির চেয়েও সমৃদ্ধ। যেমন ইংরেজিতে মামা, ফুফা, চাচা—সবই আংকল দিয়ে বলতে হয়। অথচ আমাদের সবার জন্য আলাদা আলাদা শব্দ আছে। পৃথিবীতে আর কোনো ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

 

নীতি ছাড়েননি

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে বলা হয়েছিল। হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনে তাঁকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করতেও বলা হয়েছিল। বলেন, আমি বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। নীতি ও আদর্শের সঙ্গে মিল হয়নি বলে নির্বাচনে যাইনি। আর এ নিয়ে কোনো আফসোস বা অনুশোচনাও নেই।

 

একজন আফরোজ বখত

অ্যাডভোকেট সৈয়দ আফরোজ বখত ১৯৩৫ সালের ৩১ মার্চ বানিয়াচং উপজেলার করচা গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সৈয়দ খুরশেদ আলী ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। তিনি প্রাইমারিতে লেখাপড়া করেন মথুরাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে সরকারি বৃন্দাবন কলেজে ভর্তি হয়ে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে যান। ১৯৫৩ সালে এইচএসসি পাস করার পর সেখানেই স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৫-১৯৫৬ সেশনে কলেজের ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা সিটি ল কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ন্যাপের (ওয়ালি-মোজাফফর) হবিগঞ্জ মহকুমার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতের ত্রিপুরায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৪ সালের ২৮ জুলাই তিনি হুসনে আরা কোরেশির সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮৩ সালে সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে রাশিয়া ভ্রমণ করেন। সৈয়দ আফরোজ বখতের তিন ছেলে ও এক মেয়ে।

মন্তব্য