kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

খুলনা

মাজেদা আলী

ভাষাসৈনিক মাজেদা আলী লেখক, সংগঠকও বটে। এখন ঠিকমতো চোখে দেখতে পান না। তবে চেনা জায়গায় চলাচলে অসুবিধা নেই। লেখালেখিও বাদ দেননি। খুলনার ফরাজীপাড়ার বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন গৌরাঙ্গ নন্দী। শুনে এসেছেন সংগ্রামের দিনগুলোর কথা

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাজেদা আলী

ব্যক্তিজীবন

১৯৫৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলীর (তখন তিনি সাংবাদিকতা করতেন) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বেগম মাজেদা আলী চলে যান ঢাকায়। বাবা শেখ আব্দুল জব্বার, মাতা দৌলতুন্নেসা। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালে আর কে কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৭ সালে এমএ পাস করেন। ১৯৬৯ সালে বিনা বেতনে সুন্দরবন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। সংসারজীবনে তিনি পাঁচ কন্যাসন্তানের মাতা। তাঁর লেখা কয়েকটি বইয়ের নাম—গৌধূলির স্বপ্ন, ছোটদের ছড়ার বই, হাসি খুশির মেলা, হাসি খুশির খেলা, হাসি খুশির দোলা ইত্যাদি। তিনি খুলনা মহিলা সমিতি ও লেখিকা সংঘের প্রতিষ্ঠাতা।

 

দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন মাজেদা আলী। বললেন, ঘরের সব বাতি জ্বালিয়ে দিতে। বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি বয়সজনিত চোখের রোগে আক্রান্ত। ২০১৬ থেকে দৃষ্টিহীন।

তবে তিনি এখনো সজাগ। তাঁকে নিত্য পেপার পড়ে শোনানো হয়। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘ভাষা আন্দোলনের কথা বলে কি আর হবে! এখন এসব কেউ পড়তে চায় না, শুনতেও চায় না। এখন সবাই মোবাইল ফোনে গেম খেলে, টেলিভিশনে বিদেশি সিরিয়াল দেখে সময় কাটায়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা পর্যন্ত ভুল উচ্চারণে কথা বলেন। বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে দেন। একজন ভাষাসৈনিক হিসেবে এগুলো আমার মেনে নিতে কষ্ট হয়।’

 

বিদ্যালয়ের দিন সুখের ছিল না

সে আমলে মেয়েদের পড়াশোনা করাটা কষ্টের ব্যাপার ছিল। খুলনার কাশিপুর মসজিদবাড়িতে ছিল আমাদের বাড়ি। বিদ্যালয়ে যেতাম বলে গাঁয়ের লোকেরা বাবাকে মন্দ কথা বলত। একদিন সমাজপতিরা বলেই ফেললেন, আমাদের একঘরে করা হবে। বাবা মন খারাপ করে ফিরলেন। কারোর সঙ্গেই কথা বললেন না। ছাতা মাথায় দিয়ে বয়রায় বড় মামার বাসায় যান। বড় মামা নারী শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ধৈর্য ও সাহস রাখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

বাড়ি ফিরে বাবা পরের দিন যান করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিস সুফিয়া আলীর কাছে। তিনি সমাধান দিলেন, প্রতিদিন স্কুলে আসতে হবে না। ও (মাজেদা) মাসে একবার আসবে। আর নিয়মিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করবে ও। এভাবেই মাসে একবার ক্লাস করে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিই। বলছিলেন, মাজেদা আলী।

 

বায়ান্নর দিন

মাধ্যমিক শেষ করার পর আর কে কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলেন মাজেদা। প্রতিদিন ক্লাস করার সুবিধার্থে করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের নারী হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হয়। কমরেড শচীন বসুর স্ত্রী অনুপমা বসুর সহযোগিতায় রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করারও সুযোগ পান। অনুপমার মাধ্যমেই রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ড. সন্জীদা খাতুন (ছায়ানটের সভাপতি) ঢাকা থেকে চিঠি দিলেন খুলনায় ছাত্রীসংসদ গঠনের। ১১ সদস্যের একটি ছাত্রীসংসদ গঠিত হয়।

মাজেদা আলী বলেন, ‘বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে দেখি গাজী শহীদুল্লাহ, মিজানুর রহিম, মালিক আতাহারসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা কলেজ গেটে দাঁড়ানো। তখনো আমি জানি না ঢাকায় ২১শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে গুলি হয়েছে। রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে শহীদ হয়েছেন। ঁতাঁদের কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। তাঁরা বললেন, ‘আপনারা ছাত্রীসংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করবেন। আমরা সব রকম সহযোগিতা করব। আর শনিবার করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়, রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়, আর কে কলেজ ও হামিদ আলী বালিকা বিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হবে।’

তাঁদের নির্দেশনামতো শুক্রবার দিন-রাত ছাত্রীদের বাড়ি গিয়ে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করি। সবাই একসঙ্গে হওয়ার পরিকল্পনা করি। বিদ্যালয় গেটে তালা মারার উপায়ও খুঁজতে থাকি। করোনেশন বিদ্যালয়ের চাবি থাকত দেবলা মাসির কাছে। দারোয়ান ছিল বচন মিয়া। করোনেশন বিদ্যালয়ের পেছনেই থাকতেন দেবলা মাসি। মেয়েরা সবাই মিলে দেবলা মাসির বাসায় গিয়ে বললেন, ‘মাসি, তুমি কাল স্কুলে যাবে না। তোমার খুব জ্বর হয়েছে, বাসায় শুয়ে থাকবে। আর বচন মিয়া চাবি চাইলে বলবে, চাবি খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা কালকে স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখব। ঢাকায় ছাত্রদের গুলি করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে এই আমাদের কর্মসূচি।’ দেবলা মাসিকে বুঝিয়ে চাবি নিয়ে আসি। ছাত্রনেতারা লাঠিসোঁটা, কাগজ, কালি ও চাটাই সরবরাহ করলেন। সারা রাত বসে আমরা ফেস্টুন ও পোস্টার বানালাম। ভোরে হোস্টেলের একটি ছোট গেট দিয়ে মেয়েরা বাইরে বের হলো। অন্যান্য বিদ্যালয়ের মেয়েরাও এলো। আমরা মিছিল শুরু করলাম। প্রায় দেড় শ মেয়ে সেদিন মিছিলে ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডা. অতুলেন্দ্রনাথ দাসের তিন মেয়ে—রত্না, খুকু ও ঝরনা এবং রোকেয়া বেগম শিরী। মিছিলটি করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে নীলা হলের (বর্তমান পিকচার প্যালেস সিনেমা হল) সামনে থেকে থানার মোড় হয়ে ডিসি অফিসের সামনে দিয়ে সার্কিট হাউস ঘুরে লেডিস পার্কের মহেন্দ্র হিলে (বর্তমানে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমানার মধ্যে, ব্যাংকের পেছনের অংশ) এসে শেষ হয়। এটিই ছিল খুলনায় ভাষা আন্দোলনে নারীদের প্রথম মিছিল।

 

কয়েক দিন গাঢাকা

রবিবার সকালে কলেজের প্রিন্সিপাল অমূল্য ধন সিংহ তাঁকে রুমে ডেকে পাঠান। ভয়ে ভয়ে অধ্যক্ষের ঘরে গেলে স্যার তাঁকে দেখে বলেন, ‘তোমাকে আমি বকাঝকা করতে ডাকিনি। তুমি একটি সাহসী কাজ করেছ। আমি তোমার প্রশংসা করছি; কিন্তু তোমাকে কয়েক দিন গাঢাকা দিয়ে থাকতে হবে।’ তখন আসলে আমি গাঢাকা বলতে কী বোঝায়, তা বুঝিনি। এ কারণে বোকার মতো স্যারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

স্যার কিছুক্ষণ পরে বলেন, ‘গাঢাকা মানে হচ্ছে, তুমি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারবে না। হোস্টেলে বা বাড়িতেও থাকতে পারবে না। কলেজেও ক্লাস করতে পারবে না। কয়েক দিন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসো।’ তখন অল্প বয়স, কে তাঁকে থাকতে দেবে। পরে মুন্সীপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন।

মন্তব্য