kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

লাংলোক থেকে বলছি

থানছির লাংলোক জলপ্রপাতের উচ্চতা মাপতে গিয়েছিলেন ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশের একটি দল। সে অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন সালেহীন আরশাদী

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লাংলোক থেকে বলছি

পানিশূন্য ঝিরি ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৌঁছে গেলাম জলপ্রপাতটির মাথায়। মুহূর্তের মধ্যেই শরীরের সব পেশি শক্ত হয়ে গেল। বিপদের আশঙ্কায় মস্তিষ্ক অতিরিক্ত সচেতন হয়ে গেল। তবু রোমাঞ্চের নেশা সব ভয় ঠেলে সরিয়ে দিল। খাদের একেবারে কিনারে এসে পা দুটি আপনা-আপনি থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর তখন ধড়াস ধড়াস করে চরম উত্তেজনা লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। বিশাল বিশাল পাথরের বোল্ডারকে ওপর থেকে খুব ছোট দেখাচ্ছে। এর মধ্যে সাঁই করে ছোট পাখির ঝাঁক যুদ্ধবিমানের মতো আমাকে পাশ কাটিয়ে উড়ে গেল। বাতাসও এলো হঠাৎই। কি ভয়ানক সুন্দর সব কিছু। আমার চোখের সামনে থমকে আছে এক বিশাল শূন্যতা।

 

উদ্দেশ্য ভালো

ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ (টিওবি) শুরু থেকেই দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে অনুসন্ধানী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এবার টিওবির এক্সপ্লোরেশন প্রজেক্ট থেকে বাংলাদেশের জলপ্রপাতগুলোর একটি তথ্যভিত্তিক ডাটা বেইস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় থানচি উপজেলার একটি জলপ্রপাতের উচ্চতা, আকার, উৎস, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে আমাদের বান্দরবান যাওয়া। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অনুমতি নিয়ে পথচলা শুরু হলো। তিন ঘণ্টা ট্রেক করে যখন তিন্দু ঝিরিতে এসে পৌঁছালাম, তখনো সূর্যের তাপ একটুও কমেনি। তিন্দু ঝিরিতে বিশ্রাম নিয়ে শেষ বিকেলে আবার রওনা হলাম পাও-অ পাড়ার পথে, ছোট্ট এই খুমি পাড়াটিই আমাদের আজকের গন্তব্য। এ পাড়া থেকেই জলপ্রপাতে যাওয়ার রাস্তা চলে গেছে। উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় পথ চলে পাড়ায় গিয়ে যখন পৌঁছালাম, ঘড়িতে তখন রাত ৮টা বেজে গেছে। পাড়া থেকে জলপ্রপাতটি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল। প্রপাতটি যেখানে নিচে পড়েছে, সেখানে ছোট একটি বাদুড় গুহা আছে। মারমা ভাষায় বাদুড়ের নাম অনুসারে প্রপাতটি লাংলোক নামেই পরিচিত।

 

প্রপাতের মাথায় গিয়ে

পরদিন সকাল থেকেই আমাদের কাজ শুরু হলো। জলপ্রপাতটি পানির অভাবে একেবারে খটমট হয়ে আছে।  উচ্চতার প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার জন্য ওপর থেকে বড় একটি পাথর ফেলে দিলাম। ১২ সেকেন্ড পর পতনের শব্দ পাওয়া গেল। অভিকর্ষ ও পতনকাল থেকে উচ্চতার মোটামুটি একটি ধারণা পেলাম। এরপর লম্বা একটি রশিতে পাথর বেঁধে প্রপাতের ওপর থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে দিলাম। ফল লাইন যেন সমান থাকে আর দড়ি যেন কোথাও আটকে না যায় এবং পানি ঠিক যেখানে স্পর্শ করে সেখান পর্যন্তই যেন দড়িটি পৌঁছায়—তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা পাশ দিয়ে একটি রেপেল লাইন (ওপর থেকে নিচে নেমে আসার উপায় দড়ির পথ) সেট করে ফেলি।

অ্যাংকর সেট করে, সব সাজসরঞ্জাম নিয়ে ইন্তিয়াজ প্রথমে নামা শুরু করল রেপেল করে। আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যেই ছিলাম—সব কিছু ঠিক আছে তো, কোথাও কোনো ভুল হয়ে যায়নি তো? বেশ অনেকক্ষণ পর ইন্তিয়াজকে নিরাপদে নিচে নামতে দেখে আমাদের খুশি বাঁধ মানল না। এরপর একে একে মুনীম, অনিক, সন্দীপ, শামীম, আমি ও শুভ রেপেল করে নিচে নেমে গেলাম। বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই সফলভাবে শেষ হলো আমাদের অনুসন্ধানী অভিযান।

 

অভিযানের ফলাফল

এই অভিযান থেকে লাংলোক জলপ্রপাতটির উচ্চতা পাওয়া গেল ৩৯৩ ফুট, যা আমাদের প্রাথমিক ধারণা থেকে অনেক বেশি। প্রপাতটি একেবারে খাড়া হয়ে নিচে নামেনি। ২০ ফুটের মতো খাড়া নামার পর প্রপাতটির দেয়াল ভেতর দিকে ঢুকে গেছে। এই খাজে বাসা বানিয়ে বাস করে ছোট ছোট অনেক পাখি। কাছ থেকে পাখির বাসাগুলোকে মনে হয় মৌমাছির চাক। প্রপাতটির পতনের স্থানে কোনো ধরনের পুল বা জলাশয় তৈরি করেনি। পুরো জায়গাটি ঢালু বলে পানি গড়িয়ে নিচে নেমে যায়। নিচে বিশাল পাথরের বোল্ডারের মধ্য দিয়ে লাংলোক ঝিরি দেড় কিলোমিটার দূরের সাঙ্গুতে গিয়ে মিশে তার যাত্রা শেষ করে।

 

ছবি : মাহমুদুল হাসান অনিক

মন্তব্য