kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১         

এখানে জীবন যেমন

বাগানপাড়া

চা বাগানের শ্রমিকরা যেখানে থাকে সেটাকে বলে লেবার লাইন। সরু রাস্তার দুই ধারে মাটির সব ঘর। ৩০-৩৫টি। শ্রীমঙ্গলের আমরাইল চা বাগানের লেবার লাইন দেখতে গিয়েছিলেন বিশ্বজ্যোতি চৌধুরী

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাগানপাড়া

শুকুরমণি দাস

সব ঘরই ৮ বাই ১২ ফুট। লাইনের নাম ঘটিটিলা। মাটির রাস্তায় কয়েকটি ছেলে-মেয়েকে খেলতে দেখলাম। বছরকয় পরে ওরা মা-বাবার কাজ বুঝে নেবে। মায়ের কাজ মেয়ে, আর বাবার কাজ পাবে ছেলে। তখন তারা হবে চা শ্রমিক। বহুকাল ধরে বাগানে এমনটিই চলে আসছে।

 

স্বপ্নার কথা বলি

১২-১৩ বছর বয়স হবে। স্বপ্নার মা আমরাইল চা বাগানে কাজ করেন। বাবার বাগানে কাজ নেই। বাবা কাজের সন্ধানে সাতসকালেই বেরিয়ে পড়েন।

মা কখন কাজে যায়?

স্বপ্না বলল, ‘যখন আপিসঘরে ঘণ্টি পড়ে।’ ঘণ্টাটি টাঙানো থাকে অফিসঘরে। ঘণ্টা বাজায় চৌকিদার। সকাল ৭টায়। শ্রমিকদের দিন শুরু হয় ঘণ্টার ঢং ঢং আওয়াজে। মা-বাবা বেরিয়ে পড়ার পর স্বপ্নাকে ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নিতে হয়। স্বপ্না বলে, ‘মা কাজ থেকে ফেরে বিকেল ৫টায়। আর বাবা সেই রাত করে।’ দিনের ৯-১০ ঘণ্টা স্বপ্না দুই ভাইয়ের দেখভাল করে।

ভাইয়েরা কাঁদে না? জানতে চাইলাম।

স্বপ্না বলল, ‘ক্ষিধা পেলে হাল্লা (কান্না) করে। তখন ভাত কচলানো পানি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখি।’

দুপুরে কী খাও? প্রশ্নের জবাবে স্বপ্না চুপ করে থাকে।

পাশ থেকে শোভা উত্তর দেয়, ‘আটার রুটি।’ শোভা স্বপ্নাদের প্রতিবেশী। স্বপ্নার মা কাজ থেকে আসার পথে গাছের শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে ঘরে ফেরেন। ভাত চাপিয়ে দেন চুলায়। সঙ্গে বেশির ভাগ দিন আলুর ঝোল। এ দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে স্বপ্না ভাইদের নিয়ে ঘরের এক পাশে মেঝেতে মাদুর-কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে।

তোমরা ডিম, মাছ, মাংস—খাও না?

স্বপ্না নীরব থাকে। স্বপ্নার খেলার সাথি শিবু দাস। তার বয়স ১৩-১৪ হবে। আমরাইল চা বাগানে প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বলল, ‘হামরা তলববারে রাতে ডিম, মাংস বা মাছ দিয়ে ভাত খাই।’ তার কথায় সায় দেয় বিদ্যা, শোভা, রেবতি, নির্মলসহ পাশে দাঁড়ানো আরো কয়েকটি শিশু। বাগানের শ্রমিকরা সপ্তাহে এক দিন মজুরি পান। ওই দিনটিকে শ্রমিকরা বলেন ‘তলববার’। আমরাইল চা বাগানে বুধবার সেই তলববার। চা বাগানের শিশুরা এই দিনটির অপেক্ষায় থাকে। ওই দিন তারা কিছু একটা ভালো খাবার খায়।

খোকন দাসের স্ত্রী

শিশুদের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, তখন পাশেই একটি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিলেন শুকুরমণি দাস। তাঁর বয়স ১৯। তিনি খোকন দাসের স্ত্রী। সন্তানসম্ভাবনা। বললেন, ‘শাশুড়ি নির্মলা দাসের বদলি শ্রমিক হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে চার বছর ধরে আমরাইল চা বাগানে কাজ করি।’ সিলেটের দলদলি চা বাগানে তাঁর বাবার ঘর। ২০১৪ সালে তাঁর বিয়ে হয়। তখন তিনি সিলেটে কাজী জালালউদ্দিন বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। শুকুরমণির ঘর থেকে কাজের জায়গা প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। এ অবস্থায়ও এক ঘণ্টা ২০ মিনিট হেঁটে কাজে যান।

এ অবস্থায় কাজে যাচ্ছেন, ছুটি নেই? এ প্রশ্নের জবাবে শুকুরমণি বলেন, ‘হামার ইকার রোজগারে চারজনের পেট চলে। চা বাগানে স্বামীর কাজ নেই। স্বামী প্রতিদিন কাজের সন্ধানে বাগানের বাইরে যায়। কোনো দিন কাজ পায়, কোনো দিন পায় না। ছুটি লিয়ে খাব কী?’

কথা হয় রিনা রিকিয়াসনের সঙ্গেও। তাঁর বয়স ২৩। ছয় বছর আগে বিয়ে হয়েছে। স্বামীর নাম কার্তিক রিকিয়াসন। শিউলী নামের আড়াই বছর বয়সী তাঁর একটি কন্যাসন্তান আছে। দিনকয় আগে রিনার একটি পুত্রসন্তানও হয়েছে। শিশুপুত্রটিকে নিয়ে তিনি ঘরের মেঝেতে শুয়ে ছিলেন। রিনা বললেন, ‘স্বামী-স্ত্রী দুজনই বাগানে কাজ করি। আমি পাশের সাতগাঁও চা বাগানের অস্থায়ী শ্রমিক। মজুরি দৈনিক ১০২ টাকা।’

কথা হলো ইসুরী দাসের সঙ্গেও। ১৮ বছর বয়স তাঁর। স্বামী আপন দাস সাতগাঁও রাবার বাগানের শ্রমিক। ইসুরী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কাজ না থাকায় তিনি বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। লেবার লাইনে সুখের খবর বেশি পাওয়া যায় না কখনোই। প্রতিবারের মতো এবারও ভাবতে ভাবতে ফেরার পথ ধরলাম। ফিলিপদার সঙ্গে একটু আলাপ করার কথাও ভাবলাম।  

এভাবেই যুগ যুগ

প্রায় দেড় যুগ ধরে চা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছেন সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পরিচালক ফিলিপ গাইন। এখন তিনি এখানে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করছেন। বললেন, ‘চা বাগান দেখে আমরা মুগ্ধ হই; কিন্তু যাঁরা তিলে তিলে এটা গড়ে তোলেন, তাঁদের কষ্টেই দিন কাটে। প্রায় দেড় শ বছর ধরে বংশপরম্পরায় তাঁরা এখানে বাস করছেন। বলার মতো পরিবর্তন ঘটেনি তাঁদের জীবনে। তবে এখন গর্ভবতী নারীরা আগের তুলনায় স্বাস্থ্যসচেতন। তাঁরা কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। এ সময় ভালো খেতে হয় সেটাও জানেন। পরিবর্তন বলতে এটুকুই হয়তো।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য