kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

আপেলপুর

শামীম আল আমিন   

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আপেলপুর

ঘন বনের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তাটি। কোথাও অনেক উঁচু, কোথাও আবার নেমে গেছে নিচে। কখনো রাস্তার ধারে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা। দুই পাশে মানুষের বাড়িঘর, কিছু কিছু খাবারের দোকান। তবে বেশির ভাগজুড়ে চোখে পড়ল দিগন্ত বিস্তৃত ফসলি মাঠ। কোথাও পাহাড় মিশেছে লেকে। টলটলে স্বচ্ছ তার জল। গাছ থেকে সবুজ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবে হলদে, তামাটে রং লেগেছে। বদলে যেতে শুরু করেছে প্রকৃতি। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আমরা যাচ্ছি নিউ ইয়র্কের আপস্টেটে। গন্তব্য ফিসকিল ফার্ম। নিউ ইয়র্ক থেকে ৭১ মাইল দূরের এই ফার্মটি যুক্তরাষ্ট্রের সেরা ১০টি ফার্মের একটি। নিজ হাতে আপেল পেরে খাব, এই হচ্ছে মনের বাসনা। সে কারণে পারিবারিক এই ভ্রমণ।

আমেরিকায় আপেল পিকিং বা আপেল তোলার মৌসুম শুরু হয় আগস্টের শেষের দিকে। চলে নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত। তবে ওই যে বলেছি, কিছুটা সময় পেরিয়ে গেছে; তার মানে সেপ্টেম্বর মাস হচ্ছে আপেল পিকিংয়ের শ্রেষ্ঠ সময়। ফলে অক্টোবরের শেষ নাগাদ অনেক ফার্মেই আপেল শেষ হয়ে যায়। হ্যালোইন আর থ্যাংকস গিভিং ডেকে সামনে রেখে চলে পামকিন পিকিং (কুমড়া তোলা) উৎসব।

আগস্ট থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফার্মে রীতিমতো উৎসব শুরু হয়ে যায়। মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। বোঝা যায় যান্ত্রিক জীবনেও এখানকার মানুষের ভেতরে আবেগ কতটা কাজ করে। এখানকার জীবন থেকে গ্রামীণ আবহ ও মাটির টান হারিয়ে যায়নি।

ঘণ্টা দেড়েক পর আমরা পৌঁছে গেলাম ফিসকিল ফার্মে। এক পাশে কাঠ দিয়ে বানানো অভ্যর্থনা রুম। তার পাশে কাঠের বেঞ্চি আর টেবিলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বসার জায়গা। চারদিকে সাজ সাজ ভাবটা এখনো আছে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে। চারদিকে কেমন যেন মেলা বসে গেছে। অনেক খাবারের দোকান। তাত্ক্ষণিকভাবে খাবার তৈরি করে দিচ্ছে। সেসব দোকানের সামনে মানুষের লম্বা লাইন। সেই সঙ্গে আপেল, মিষ্টি কুমড়া, মরিচসহ বিভিন্ন সবজির বিকিকিনিও চলছে সমানে। শিশুদের জন্য মিষ্টি কুমড়ায় রং করাসহ নানা আয়োজন চোখে পড়ার মতো।

আমরা সবাই ক্ষুধার্ত; তাই সবার আগে চলল আমাদের পেটপুজো। এরপর বাইরের দিকটা একটু ঘুরে দেখলাম। এবার ফার্মের ভেতরে ঢোকার পালা। গাড়ি নিয়েই ফার্মের ভেতরে ঢুকে পড়া যায়। তবে তার জন্য ফি গুনতে হয়। টিকিট কেনার সময় আমাদের বড় বড় ব্যাগ দেওয়া হলো, যাতে গাছ থেকে ফল কিংবা সবজি নিলে এগুলোতে রাখা যায়। ফিরতি পথে ওজন করে দাম মিটিয়ে দিতে হবে।

ফার্মটা এত বড় যে গাড়ি নিয়ে পুরোটা ঘুরতেও অনেক সময় লেগে যায়। গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। ফার্মের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ট্রাক্টরের মতো যন্ত্রচালিত বড় খোলা গাড়িতেও ভেতরে ঘুরে দেখা যায়। অনেককে দেখলাম সেই গাড়িতে ঘুরছে। চারপাশ খোলা সেই গাড়িতে নিশ্চয়ই অন্য ধরনের রোমাঞ্চ রয়েছে।

আধুনিক কৃষকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ল। নারী-পুরুষ সমানতালে কাজ করছেন। একরের পর একর জমি। কোথাও সমতল, কোথাও পাহাড়ি-উঁচু-নিচু।

চারদিকে সবুজের সমারোহ। ছবির মতো সাজানো-গোছানো। তার মধ্যে অনেক পরিকল্পনা করে লাগানো হয়ে আপেলগাছ। ভুট্টা আর মরিচ ক্ষেত দেখেও মন জুড়িয়ে গেল। আর মিষ্টি কুমড়ার আকার আর রং যেন চারদিক রাঙিয়ে তুলেছে।

হঠাৎ করেই কনকনে ঠাণ্ডা পড়ে গেছে নিউ ইয়র্কে। আপস্টেটে ঠাণ্ডা একটু বেশিই লাগে। পাহাড়ি জনপদ বলেই হয়তো। তার ওপর সেদিন আকাশটা মেঘলা ছিল। কখনো কখনো মেঘেদের দল একেবারে হাতের কাছে নেমে আসে। গালে আলতো আদর বুলিয়ে দেয়। ভালো লাগে।

মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত থেকে আমরা ছুটলাম আপেল বাগানে। নিজ হাতে আপেল সংগ্রহ করার এই উৎসবে যোগ দিতে এসেছে অনেক মানুষ। শুধু গাছ থেকে আপেল ছিঁড়ে খাওয়া নয়, ইচ্ছামতো ব্যাগে ভরে নিয়ে যাওয়া যায় বাড়িতে। গাছ থেকে পেড়ে খেতে কোনো খরচ নেই। তবে বাড়ি নিয়ে যেতে হলে গুনতে হবে ডলার।

চোখের সামনে সারি সারি আপেলগাছ। আর তাতে থোকায় থোকায় আপেল ধরে আছে। এক পাশে সবুজ আপেল, অন্য পাশে লাল। গাছের নিচে পড়ে আছে অনেক আপেল। এগিয়ে চলেছি। ছুঁয়ে দেখছি। অদ্ভুত অনুভূতি। মেঘের দল ছুটে বেড়াচ্ছে। কখনো হারিয়ে যাচ্ছে আপেল বাগানের ভেতরে। গাছ থেকে একটা আপেল ছিঁড়ে নিলাম। মুখে দিতেই এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করল—আহা কী রসালো! কি স্বাদ!

ইচ্ছামতো ছবি তুললাম। সেই সঙ্গে গাছ থেকে ছিঁড়ে ইচ্ছামতো খাওয়াও চলল। ব্যাগ ভরে আপেল নিলাম।  সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি ছেড়ে যেতে মন চাইছে না; কিন্তু সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার আগেই বেরিয়ে পড়তে হলো। বাইরের গেটে আপেল, মিষ্টি কুমড়ার দাম মিটিয়ে দিলাম। পেছনে ফিসকিল ফার্মটাকে রেখে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি।

 

                                  ছবি: লেখক ও সংগ্রহ

মন্তব্য