kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

মাশরুম বাবুল

৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাশরুম বাবুল

৯ ভাই-বোনের বিশাল পরিবার। বাবুল ৮ নম্বর। বাবা হাশেম আলী ছিলেন গ্রাম প্রতিরক্ষাদলের দলনেতা (চৌকিদার)। ভাইদের মধ্যে কেউ ভ্যানচালক। কেউবা দিনমজুর। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তা ছাড়া জন্মের পর থেকেই বাঁ পা অকেজো। এক পায়ে ভর দিয়ে চলতে হয়। অভাবের সংসারে তাই বাবুল যেন বাড়তি ‘বোঝা’ হয়েই ছিলেন। ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করবেন; কিন্তু অভাবের কারণে অষ্টম শ্রেণি পাসের পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। এরপর কখনো চায়ের দোকানে, কখনো কাঠমিস্ত্রি কিংবা পিয়ন হিসেবে কাজ করেছেন।

 

১০টি মাশরুম দিয়ে শুরু

তখন ২০০৬ সাল। এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলেন, অল্প পুঁজিতে মাশরুম চাষ করে বাড়তি আয় করা যায়। আইডিয়াটা মনে ধরে বাবুলের। মাগুরা যুব উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে মাশরুম চাষে প্রশিক্ষণ নেন। পরের বছর যশোরের হর্টিকালচার সেন্টার থেকে জানলেন মাশরুম খামার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের কলাকৌশল। সেখানেই পরিচয় হয় যশোরের তৎকালীন উদ্যানতত্ত্ববিদ ড. আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বাবুলকে বিনা মূল্যে ১০টি মাশরুম বীজ দেন। এই ১০টি বীজ দিয়েই নিজ বাড়িতে মাশরুম চাষ শুরু করেন বাবুল। সেটা এখন ড্রিম মাশরুম সেন্টারে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় একাধিক পুরস্কারের পাশাপাশি বাবুল ২০১৮ সালে পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক। সর্বশেষ ১ নভেম্বর তাঁর হাতে উঠেছে জাতীয় যুব পুরস্কার।

বাবুলের খামার

২৫ অক্টোবর সকালে গিয়ে দেখলাম, বেশ কর্মচঞ্চল ড্রিম মাশরুম সেন্টার। মোট পাঁচ বিঘা জমিতে এই সেন্টার। থাকার ঘর ছাড়াও গোটা বাড়িতে আছে আরো সাতটি কক্ষ। প্রতিটি কক্ষেই চাষ হচ্ছে মাশরুম। পাশেই প্রায় ২০০ বর্গফুটের একটি টিনের ঘর। বাবুল জানালেন, এটা মাশরুমবীজ উৎপাদনের গবেষণাগার। ছোট পরিসরের একটা প্রশিক্ষণকেন্দ্রও আছে। আছে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে মাশরুমকে সুষম খাদ্যে রূপান্তর করার একটি কারখানাও। মাশরুম বিক্রি করে এখন মাসে প্রায় দুই লাখ টাকার মতো আয় হয় বাবুলের। তাঁর অধীনে কাজ করছেন প্রায় ৩০০ কর্মী। মূলত মাশরুম পাউডার ও মাশরুম শুঁটকি বিক্রি করেন তিনি। প্রতি কেজি কাঁচা মাশরুম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, শুকনো এক হাজার ৫০০ টাকা, পাউডার এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা। গ্যানোডর্মা নামে এক ধরনের মাশরুম আছে বাদামি। ওষুধ কম্পানিগুলোর কাছে বেশ কদর এটির। মানভেদে এগুলো বিক্রি হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা কেজি। বাবুল জানান, তাঁর কারখানায় উৎপাদিত মাশরুম পাউডার ও মাশরুম শুঁটকি সারা দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে চীন ও সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও কথা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় কিছু ওষুধ কম্পানি তাঁর কাছ থেকে মাশরুমের পণ্য নিচ্ছে।

তমা সাহা। কৃষিতে ডিপ্লোমাধারী এই তরুণী এখন মাশরুম সেন্টারের বিপণন কর্মকর্তা। বললেন, ‘আমার মতো উচ্চশিক্ষিত আরো ২০ জন তরুণী এখানে কাজ করেন। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে মাশরুমের নানা উপকারিতা তুলে ধরেন তাঁরা। স্থানীয় একজন পল্লী চিকিৎসক এই কাজে মধ্যস্থতা করেন। যাঁরা মাশরুম খেতে আগ্রহী, তাঁরা ওই চিকিৎসকের কাছ থেকে মাশরুম কিংবা মাশরুমের পাউডার কেনেন। এভাবে সারা দেশে আমাদের মাশরুম ছড়িয়ে পড়ছে।’ আরেক কর্মী স্বপ্না খাতুন বলেন, ‘আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ মাশরুম সম্পর্কে জানে না। এটি একটি সুষম খাদ্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এ কারণে এর ব্যাপক চাষাবাদ ও প্রচার প্রয়োজন। যে কাজটি বাবুল আখতার করেছেন এবং সফল হয়েছেন।’

 

মাশরুম গ্রাম

বাবুল শুধু নিজে খামার দেননি, অন্যদেরও উৎসাহিত করেছেন। বাবুলের হাত ধরে বড়খড়ি এখন পরিচিতি পেয়েছে মাশরুম গ্রাম হিসেবে। এ গ্রামের অন্তত ৫০ জন গৃহবধূ এখন সফল মাশরুম খামারি। রান্নাবান্না ও গৃহস্থালি কাজ ছাড়া যাঁদের সারা দিনের দীর্ঘ সময় কাটত অলসভাবে। তাঁরা এখন অলস সময়টাকেই ব্যয় করছেন মাশরুম চাষে। তাঁদেরই একজন সুচিত্রা বিশ্বাস। একসময় বাবুলের মাশরুমকেন্দ্রে কাজ করতেন। পরে বাবুল বীজ ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে সুচিত্রাকে নিজ বাড়িতে মাশরুম খামার তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এখন মাশরুম বিক্রি করে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হয়। তিনি বলেন, ‘বাবুল ভাই শুধু আমাদের মাশরুম চাষ শেখাননি, বিক্রিরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এ কারণে লোকসানে পড়তে হয়নি।’ এ প্রসঙ্গে বাবুল আখতার বলেন, ‘গ্রামের যে ৫০ জন নারী এখন বাড়িতে বাড়িতে মাশরুম চাষ করছেন, তাঁরা আমার খামারে মাসিক চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন। আমি কখনোই চাই না, কেউ আমার কারখানায় আজীবন কাজ করুক। আমার লক্ষ্য—প্রতিটি কর্মীকে দক্ষ মাশরুমচাষি হিসেবে গড়ে তোলা।’

মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক পার্থপ্রতিম সাহা বলেন, ‘আমি একাধিকবার বাবুলের মাশরুমকেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। তার কাজ দেখে অভিভূত হয়েছি। সে শুধু নিজে উন্নতি করেনি, গ্রামের অন্যদের কথাও ভেবেছে। আমরা তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছি।’

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ব্যক্তিগত জীবনে বাবুল এক সন্তানের জনক। স্ত্রী টগর বানু বাবুলকে নানাভাবে সাহায্য করেন। বাবুল চান নিজ এলাকায় মাশরুমনির্ভর একটি ওষুধ কারখানা গড়তে। এ ছাড়া বড়খড়ি গ্রামে একটি উচ্চতর মাশরুম প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার ইচ্ছা আছে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।

ছবি : লেখক

মন্তব্য