kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

সুখবর বাংলাদেশ

আমাদের ভালোবাসা নাও

নজরুল-নাজনীন স্বামী-স্ত্রী। রক্তদানে আগ্রহী মানুষদের খুঁজে খুঁজে বের করেন। তারপর রোগীর স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন। সারা দেশের সব মানুষের জন্যই তাঁদের এ স্বেচ্ছাশ্রম। একটি কল সেন্টারও খুলেছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন শাখাওয়াত উল্লাহ

৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমাদের ভালোবাসা নাও

নজরুল ও নাজনীন

‘তখন নরসিংদী সরকারি কলেজে পড়তাম। রায়পুরা থানার নিলক্ষীয়া গ্রামে একটি ছেলে ছিল। নাম শাহজাহান। ক্লাস এইটে পড়ত। তার ভয়ানক অসুখ। কয়েক মাস পর পর রক্ত দিতে হতো। রক্তের গ্রুপ এ পজেটিভ। প্রথম দিকে ছয় মাস পর রক্ত লাগত, আস্তে আস্তে সেটা পাঁচ মাস, তারপর চার মাসে এসে ঠেকেছিল। এভাবে একসময় অবস্থা এমন হলো যে তাকে প্রতি সপ্তাহে রক্ত দিতে হতো। পরিচিত আত্মীয়-স্বজন সবার কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে থাকি। তখন অনেকেই রক্ত দিতে চাইতেন না। মানুষের হাতে-পায়ে ধরে রক্ত সংগ্রহ করি। একটা সময় প্রায় প্রতিদিন তাকে রক্ত দিতে হতো; কিন্তু বাঁচাতে পারিনি’—বলছিলেন নজরুল ইসলাম। পরিচিত অনেকেই তাঁকে ‘রক্তের নজরুল ভাই’ হিসেবে চেনে।

এইচএসসি পাস করার পর থেকেই নজরুল স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। ৫৩টি জেলায় গিয়েছেন মানুষকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে। এক বন্ধুর সহযোগিতায় স্ত্রীকে নিয়ে খুলেছেন রক্তদানের কল সেন্টার। শাহজাহানের জন্য রক্ত সংগ্রহ করতে মাঠে নেমেছিলেন একাই। এখন নজরুলের সঙ্গে আছে সারা দেশের কয়েক শ স্বেচ্ছাসেবী।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে জন্ম নজরুলের। বয়স যখন চার বছর, তখন বাবা ডা. আবদুল খালেক মারা যান। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে নজরুল সবার ছোট।

১৯৯৮ সালে লেটার মার্ক নিয়ে এসএসসি পাস করেন নজরুল। ২০০০ সালে ফার্স্ট ডিভিশনে এইচএসসি। এরপর নরসিংদী সরকারি কলেজে ইংরেজি বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। তখন রক্তদানসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়েন।

সেই শাহজাহানকে হারানোর পর থেকে অসংখ্য মানুষের বিপদে রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন। ওমানপ্রবাসী নূর আলমের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। অসুখ নিয়ে ওমান থেকে চলে এলেন তিনি। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর জন্য প্রায় ৩০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন নজরুল। সুস্থ হয়ে নূর আলম আবার ওমানে ফিরে গেছেন।

একবার ভৈরবে একজন রোগীর জন্য এবি নেগেটিভ রক্তের দরকার হয়েছিল। ভৈরব, নরসিংদী, ঢাকাসহ সব জায়গায় খোঁজা হলো। কোথাও পাওয়া গেল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর চট্টগ্রামের একজন এবি নেগেটিভ ডোনারের সন্ধান পাওয়া যায়। ইমাম হোসেন নামের সেই ব্যক্তি চট্টগ্রাম থেকে ভৈরবে এলেন রক্ত দিতে। ‘দেখেন মানুষ স্বার্থের জন্য ভাইয়ের রক্ত ঝরায়, আর তিনি রক্ত দেওয়ার জন্য সেই চট্টগ্রাম থেকে ভৈরব আসছেন। আমার ইচ্ছা ছিল তাঁকে ফুলের মালা পরিয়ে পুরো ভৈরব বাজার ঘুরাব।’ বলতে বলতে জল এলো নজরুলের চোখে। জানালেন, পরে ডোনার ইমাম হোসেনকে তিনি পঞ্চগড়, কিশোরগঞ্জ, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত দিতে পাঠিয়েছেন।

বন্ধুদের নিয়ে ২০১৩ সালে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ সাইক্লিং করেছেন মানুষকে রক্তদানে উৎসাহ দেওয়ার জন্য। রক্তদানে সচেতনতার জন্যই ২০১৫ সালে সাইকেলে চড়ে গিয়েছিলেন সাতক্ষীরার ভোমরা থেকে তামাবিল। জানতে চাইলাম কোনো স্পন্সর ছিল কি না? নজরুলের সহজ উত্তর, ‘হিজ হিজ হুজ হুজ’। নিজে টাকা জমিয়ে সে টাকা দিয়ে এই সচেতনতার ভ্রমণ মোটেও সুখকর ছিল না; কিন্তু লাভ হয়েছে অনেক। সারা দেশে অনেকের সঙ্গে তো আগে পরিচয় ছিল; কিন্তু সরাসরি দেখা হয়নি। ‘এসব স্বেচ্ছাসেবক আমাকে রিসিভ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাঁদের মাধ্যমে ওই সব এলাকায় প্রচার চালিয়েছি।’

একবার শ্যামলীতে এক কিডনি রোগীর রক্ত লাগবে। কোথাও রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না। হুট করে মনে এলো ইমু আপা এবং নদী আপা দুজনেই বলেছিলেন রক্ত দেবেন। এই দুজনই হিজড়া। তিনি রোগীর লোকদের খুলে বললেন, রক্তে কোনো সমস্যা থাকলে ডাক্তারই বাদ দিয়ে দেবেন। রোগীর লোকেরা প্রথমে রাজি হননি। পরে কোথাও না পেয়ে ইমু আপাদের রক্ত নিয়েছেন। তাঁরা এখন নিয়মিত রক্তদাতা।

অনেকেই ভেবেছিলেন এসব স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বিয়ের পর উবে যাবে। স্ত্রী-সংসার সামলাতে গিয়ে কাজ অনেক কমিয়ে দিতে হবে। এসব ধরাবাঁধা কথা নজরুলের বেলায় খাটেনি; বরং বিয়ের পর রক্তদানে নতুন গতি পান নজরুল। ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর বিয়ে করেন। স্ত্রী নাজনীন প্রিয়াও একজন রক্তদাতা।

নজরুলের বিয়ের পর বন্ধু সুব্রত দেব একটা দারুণ আইডিয়া দেন। সারা দেশের ডোনারদের তালিকা নিয়ে একটি কল সেন্টার খুলবেন। সেখানে যে কেউ ফোন করে প্রয়োজনীয় রক্তের সন্ধান নিতে পারবে। ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখ থেকে যাত্রা শুরু হয় ‘ডাব্লিউডাব্লিউডাব্লিউ ডট ডোনেট ব্লাড বিডিডটকম’ নামের কল সেন্টারটির। এ জন্য আছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ওয়েবসাইট, যেখানে রক্তদানের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে বলা আছে। রক্তদানের পর দাতার কী করণীয়, গ্রহীতার করণীয়—এসব তথ্য এখানে আছে। কেউ যেন দালাল বা হাসপাতালে অন্য কারো প্রতারণার শিকার না হয়, সে জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে। সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য আছে ০১৭৫৬৯৬৩৩০৮ ও ০১৭৪৮৩০৬০২৭ এই দুটি নম্বর। নাজনীন প্রিয়াসহ তিনজন কল সেন্টারের দায়িত্বে আছেন। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনকে রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া হয় বলে জানালেন নাজনীন। এ পর্যন্ত প্রায় হাজার পাঁচেকের বেশি রোগীকে শুধু এই কল সেন্টারের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে।

সুব্রত দেবের প্রচেষ্টায় ফেসবুকে একটি গ্রুপ খোলা হয়েছে ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ নামে। এখানে কেউ রক্ত চাইতে পারবে না; বরং এখানে রক্তদাতারা জানাবেন যে তিনি রক্তদানে প্রস্তুত আছেন। গ্রুপটির অ্যাডমিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাজনীন প্রিয়া।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর থেকে নজরুল প্রতিবছর জন্মদিনে হেঁটে হেঁটে নুহাশ পল্লীতে গেছেন ক্যান্সার হাসপাতালের দাবিতে। ‘হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন ছিল দেশে বিশ্বমানের ক্যান্সার হাসপাতাল হবে। সরকারের স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ নামের একটি ফান্ডে এক হাজার কোটি টাকা রয়েছে। সেই টাকা দিয়ে সহজেই এই হাসপাতাল করা সম্ভব’, বলে জানান নজরুল।

২০১৭ সালের ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর হিমু পরিবহনের আয়োজনে একটি দল কার্জন হল থেকে সাইকেলে করে গিয়েছিল ময়মনসিংহ। উদ্দেশ্য ছিল ক্যান্সার সচেতনতায় প্রচারাভিযান। সেই দলে এই দম্পতিও ছিলেন। কী রাত, কী দিন নজরুল-নাজনীন দম্পতি রক্তের জন্য ফোন দেওয়ায় কখনোই বিরক্ত হন না। কারো চিকিৎসায় কোনো ক্যাম্পেইনের প্রয়োজনে নজরুল ভাই হাজির। আর কল সেন্টারে বা অনলাইনে আছেন নাজনীন। রক্তের প্রয়োজন কিংবা কারো অন্য কোনো বিপদে নজরুল-নাজনীন সাধ্যমতো মতো পাশে থাকার চেষ্টা করেন।

 

মন্তব্য