kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

বাঙালির বিশ্বদর্শন

সোলানে কেউ নেই

সৈয়দ আখতারুজ্জামান   

৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সোলানে কেউ নেই

হিমাচলের একটি ছোট্ট পাহাড়ি স্টেশন। সোলান নাম। শহরটির নামও সোলান। চণ্ডীগড় আর সিমলার মাঝামাঝি। স্টেশনটি নামকরা নয়। ভিড় নেই কিছু। পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। বয়স কম হবে না। ব্রিটিশ আমলের স্টেশন। আমি কাছেই ধরমপুরের একটি কটেজে উঠেছি। সকালের নাশতা সেরে গিয়েছিলাম ধরমপুর স্টেশনে। দেখি একটি টয় ট্রেন ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকল। কিছু না ভেবেই একটি টিকিট কেটে উঠে বসলাম। ছোট ছোট ছয়টি বগি। কু-উ-উ-উ আওয়াজ তুলে হেলেদুলে ২০-৩৫ জন যাত্রী নিয়ে চলতে শুরু করল। তারপর মাঝেমধ্যে ঢুকে পড়ছিল ছোট ছোট অন্ধকার টানেলের ভেতর। আধা ঘণ্টা চলে থামল নির্জন এক স্টেশনে। কেউ নামল না। শুধু এক বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে এক কাঁদি কলা নিয়ে সামনের বগিতে উঠল। এমন নির্জন স্টেশন আমি দেখিনি। নেমে গেলাম। নিঃসঙ্গ স্টেশনটাকে একটু সঙ্গ দিতে। ট্রেনটি চলে যাওয়া পর হলুদ সাইনবোর্ডের কালো হরফে স্টেশনের নাম পড়লাম—সোলান।

চুপচাপ লোহার কালো বেঞ্চিতে বসে আছি। নির্জন, নিরিবিলি, একা। স্টেশন মাস্টার আছেন কি না জানি না। টিকিট কাউন্টারেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। হকার নেই, চাওয়ালা নেই, পত্রিকা স্টল নেই। শুধু একটি বাদামি লোমশ কুকুর ও তার দুরন্ত বালকবন্ধুকে দেখলাম একটি বাহারি প্রজাপতির পিছু নিয়ে ছুটতে ছুটতে রেললাইন ধরে চলে গেল।

পর্যটকরা কালেভদ্রে এখানে আসেন। যাঁরা আসেন, তাঁরা বুঝি নির্জনতায় কিছু সময় কাটাতেই আসেন। সারা বছরই হিম হিম শীতল বাতাস বয়ে বেড়ায় সোলানে। সূর্য ডুবে গেলে সোলানও ঘুমিয়ে পড়ে। এখানে পাহাড়ের গায়ে ছোপ ছোপ গ্রাম। কোলাহল নেই। মাঝে মাঝে পাখির ডাক। সোলান শহরটি অবশ্য বাজার-ঘাট, দালান, দপ্তরে সেজে উঠেছে। তবু শান্তই লাগে। এখানে কথা তেমন হয় না। পাইনের ঘন বন বাতাসে অল্পবিস্তর যা কিছু শব্দ তোলে। চায়ের দোকানের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে আরেকটা স্টেশনে হাজির হই। রেললাইন পার হয়ে ঢালু সরু রাস্তায় নামি। একটি ছোট্ট সাজানো পার্ক দেখি। তারপর ছোট লোকালয়। কয়েকটি একতলা, দোতলা বাড়ি। বাংলো বাড়ি ঝুলবারান্দাসহ।

চা খেতে খেতে সূর্যোদয় দেখতে এমন বারান্দাই তো চাই। বারান্দার রেলিংজুড়ে অনেক ফুলের টব। তাতে নানা রঙের ফুল। ঢাল বেয়ে আরো নেমে যাই। ১০ মিনিট পরে পিচঢালা বড় রাস্তা দেখি। টুকটাক বাস-গাড়ি চলছে। একটি চায়ের দোকান কাছেই। বিস্কুট, কলাও পেলাম। একটি মিষ্টির দোকানও দেখলাম একটু দূরে। চা খেতে খেতে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুনলাম। তারপর মন্দির পানে চললাম। মন্দিরের খোলা চত্বরে একটি কুকুরকে দেখলাম ঘুমিয়ে থাকতে। দূরের গ্রামগুলোয় সূর্যের আলো চমকাচ্ছে। ইচ্ছা হলো ছুটে যাই। মন্দিরটি বেশ বড়। পাশে বড় বড় পাইনগাছ। নিচে পড়ে আছে পাকা পাইন ফল। ফেরার পথ ধরতে গিয়ে মন্দিরের ঘণ্টা বাজাই। কুকুরটি জেগে উঠে ঘেউ করল। মানে মানে কেটে পড়লাম। রাস্তায় নেমে আগের দোকানটিতে আরেক কাপ চা খেলাম। আবার সেসব লোকালয়, সবুজ পার্ক, পাখির ডাক পেরিয়ে চলে এলাম সোলান স্টেশনে।

বিকেলের হলুদ আলোয় স্টেশনটিকে এখন আলাদা লাগছে। ছাদের টালিগুলোর লাল রঙে লজ্জার আভা। পাহাড়ে হঠাৎ করেই সন্ধ্যা নামে। তখন একটু ভয় ধরে। তবু আমার মনে হলো সূর্য ডুবে যাক মহাসমুদ্রে। আমি অন্ধকারের সোলান দেখব বলে বসে থাকি।

 

টয় ট্রেন

 

১৯১১। সোলান রেলস্টেশন

 

পথে টানেল পড়ে মাঝেমধ্যেই

 

 

মন্তব্য