kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

মনের মানুষ

হরিপদ বড়াই

৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হরিপদ বড়াই

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ভরতপুর গ্রাম। জিয়েলধার বিলের ধারে মাটির ঘরের বারান্দায় বসে গান লেখেন পণ্ডিত হরষ হরিপদ বড়াই সরকার। প্রায় পাঁচ হাজার গান লিখে ফেলেছেন এ পর্যন্ত। দেখতে গিয়েছিলেন বাবুল আকতার

 

হরিপদ সরকারের কয়েকটি গান

►    ভক্তিমূলক গান

     ‘পড়ি আল্লাহ নামের তাজ,

     রোজ কিয়ামত পার হতে তুই

     এখনো মন সাজ।’

 

►    বিচ্ছেদগান

     ‘আমার হাওয়ার পাখি

     হাওয়ায় উড়ে গেছে

     পাখি পুষেছিলাম বুকের মাঝে

     রেখেছিলাম কাছে।’

 

► প্রেমসংগীত

     ‘পরান বন্ধুরে!

     শুধু কেন পরান পোড়ালে?

     শুধু কেন পরান পোড়ালে?’

 

► মরমিসংগীত

     ‘একদিন আমি যাবো বাড়ি,

     ছাড়ি আমার বসতবাড়ি।’

 

► আঞ্চলিক গান

     ‘গরু বান্ধে কে?

     ধানের পাশে রে

     ধান খাওয়ালি

     তোরে আমি দেহাই দিবানে?’

 

► আধুনিক গান

     ‘ও সোনালি, তোমায় কিছু আমি দিতে পারিনি

     আমায় তুমি তাই ভুলে যেয়ো না।’

 

► বাউলগান

     ‘মন তোর মতো মন

     কেউ হবে না

     জীবনে মোর কথা শুনলি না।’

শুক্রবার ছিল। বিকেল ৪টা হবে। উঠানে দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়লাম, ‘দাদা আছেন?’ হরিপদ বাবু নিজেই এগিয়ে এসে বললেন, ‘বাহ, এই তো এসে পড়েছেন। চিনতে কষ্ট হয়নি তো?’ টেনে নিয়ে একটা মোড়ায় বসতে দিলেন। খুব আন্তরিক মানুষ। বললেন, ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আমার জন্ম। গরিব কৃষক পরিবারের ছেলে। ফুলচাঁদ সরকার ও ফুলকুমারী সরকারের চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে আমি বড়। পিসিমা হিরা দেবী আমাকে বড়াই বলে ডাকতেন। লোকেরাও পরে ওই নামে ডাকল। সরকার আমার বংশের উপাধি। হরষ নামটি আমার নিজেরই দেওয়া। খুব পছন্দ এটি। আর স্কুলে আমি পণ্ডিত মশাই।

 

লেখাপড়া ও গান

১৯৬৬ সালে উপজেলার পাঁচবাড়িয়া-পাঁচকাটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৮ সালে যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করেছেন হরিপদ। শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। সংসারে টাকারও দরকার ছিল। তাই ১৯৬৯ সালেই শ্যামকুড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। পরে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের রজনীকান্ত সংস্কৃত কলেজ থেকে কাব্যতীর্থ বিষয়ে ডিগ্রি নেন। মণিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দেন ১৯৮৩ সালে। অবসর নেন ২০০৪ সালে। ১০০টির বেশি গানের খাতা আছে তাঁর। কোনোটায় লিখেছেন বাউলগান, কোনোটায় পল্লীগীতি, কোনোটি আবার বিচ্ছেদগানের। বললেন, আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। মামাবাড়ি পাঁচকাটিয়ায় থাকি। দুর্গাপূজার সময় এক অনুষ্ঠানে কবিয়াল বিজয় সরকারের গান শুনে খুব ভালো লাগল। আমি দিনকয়েকের মাথায় ‘হে ভগবান—তুমি মোরে দয়া করো, দাও হে দেখা’ গানটি লিখে ফেললাম। সুর করে গেয়ে শোনালাম স্কুলের শিক্ষকদের। সবাই খুশি হলেন। সেই থেকে শুরু। গান লিখি, সুরও করি। আমার প্রিয় শিক্ষক অখিল উদ্দীন পণ্ডিত মামাদের বললেন, আমাকে যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীতে ভর্তি করিয়ে দিতে। সেখানেও অনেক দিন যাতায়াত করেছি। এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার গান লিখেছি।

শুনতে শুনতে দাদার (হরিপদ বাবুর) ৩৫ নম্বর গানের খাতাটি উল্টে দেখছিলাম। এ সময় দাদার বড় ছেলের মেয়ে এলো নাশতা নিয়ে। নাম বলল, শ্রেষ্ঠা। এইচএসসি দেবে। বলল, ‘আমার জন্য বাবা যে খাতা কিনে আনেন দাদু তাতেও গান লিখতে বসে যান। গানই দাদুর ধ্যান-জ্ঞান, গানই তাঁর সাধনা। দাদুর কিন্তু কিছু বই বের হয়েছে। উপন্যাস লেখেন তিনি। একটির নাম অনিন্দিতা। শিশুদের জন্য একটি ছড়ার বই লিখেছেন নাম—হরষ ছড়া। ঠাকুমার কাছে শুনেছি, ছাত্র অবস্থায় দাদু যাত্রাপালাও করতেন। রক্তের ফসল, একটি পয়সা দাও, মা ও ছেলে—এমন অনেক যাত্রায় অভিনয় করে সুনাম কুড়িয়েছেন।’

 

ঘর-সংসার

১৩৭৬ বাংলা সালের ২৫ বৈশাখ বৃহস্পতিবার আশাননগর গ্রামের হরিদাসী সরকারকে বিয়ে করেন হরিপদ। তাঁর তিন ছেলে—প্রভাকর সরকার, তাপস সরকার ও মনোজিত সরকার। মেয়ে দুজন—সম্বিতা রানী সরকার ও অনিন্দিতা সরকার। বড় ছেলে কৃষিজীবী। মেজো ছেলে গানের শিক্ষক। আর ছোটটি মাস্টার্স শেষ করে চাকরি খুঁজছেন। মেয়েদের দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। তবে দুঃখের ব্যাপার হলো, ছোট মেয়েটি বছরখানেক হলো আকস্মিক মারা গেছেন। আর সেই শোকে স্ত্রী হরিদাসী বাকহারা। গল্পে গল্পে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ভক্তরা কয়েকজন এসে জড়ো হলো। একজন যেমন রফিকুল ইসলাম। বললেন, ‘তাঁর কাছে আমরা ঋণী। তাঁর লেখা গান আমরা সুর করে গাই। তাঁর গান শুনে মানুষ তৃপ্তি পায়।’ হরিপদ সরকারের বড় ছেলে প্রভাকর বলেন, ‘জন্মের পর বুঝতি শিখলি বাবাকে দেখছি লেখালিখি করতে। আর এর জন্য মা-ও বকাবকি করেছেন তাঁকে।’

 

মন্তব্য