kalerkantho

বুধবার । ২৮ বৈশাখ ১৪২৮। ১১ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

ঝন্টু তাঁহার নাম

দেলোয়ার জাহান ঝন্টু। আগে-পিছে আর কিছু লাগে না। সাড়ে তিন শর বেশি চিত্রনাট্য লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন ৭৩টি চলচ্চিত্র। ভালো ছিলেন অঙ্কে

২ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঝন্টু তাঁহার নাম

ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় তাঁদের বাড়ি। বাবা কৃষি অফিসার ছিলেন। শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। পড়েছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। অঙ্কে ভালো ছিলেন বলে কমার্স নিয়েছিলেন। পাক-জার্মান টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটেও পড়েছিলেন।

সিনেমার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় ছোটবেলাতেই। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই গিয়েছিলেন সিনেমা হলে ছবি দেখতে। ১৯৫৮ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত  বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও ইংরেজি যত ছবি এ দেশে এসেছে, প্রায় সবই দেখেছেন তিনি। বড় ভাই সারোয়ার জাহানের হাতে এ নিয়ে অনেক মারও খেয়েছেন। কিন্তু তাঁকে ঠেকানো যায়নি।  উত্তম-সুচিত্রার ‘হারানো সুর’ দেখে তিনি সুচিত্রার প্রেমে পড়েন, উত্তমকেও ভুলতে পারেন না। মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন ঝন্টু। দেশ স্বাধীন হলে ‘বাংলাদেশ জাতীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংস্থা’য় যুক্ত হন। এর মধ্যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা গল্প ছাপা হতে থাকে। সেলিম রেজাকে তিনি চিনতেন কুমিল্লা থাকতেই। রেজা সাহেব কুমিল্লার হলগুলোতে ছবি ডিস্ট্রিবিউট করতেন। ঝন্টু বললেন, “আমার আগ্রহ দেখে  এক অবাঙালি পরিচালক নিয়াজ ইকবালের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন সেলিম ভাই। সেলিম সাহেব আমাকে পরিচালনা শেখাতে রাজি হন। বন্ধুরা অনেক টাকা জোগাড় করে ফেলে। আমার লেখা একটি গল্প দিয়ে শুরু করি। নাম ‘আমি কাঁদব না’। নিয়াজ সাহেব ধরে ধরে সেবার আমাকে ছবি নির্মাণ শিখিয়েছিলেন।  শাবানা, আনিস হায়দার, প্রবীর মিত্র আর গোলাম মোস্তাফা ছিলেন পাত্র-পাত্রী। ছবিটি অবশ্য শেষ করতে পারিনি। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছিল।”

প্রথম ছবিতে হোঁচট খাওয়া পরে ঝন্টু গল্প লেখায়ই বেশি মনোযোগ দেন। এরপর আচম্বিত একদিন ডাক পান যমুনা প্রোডাকশন থেকে। তখনকার দিনে ওটি নামি প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান ছিল। তারা সাড়া জাগানো হিন্দি ছবি ‘সাকি’ অবলম্বনে একটি ছবি করতে চাইল। আমি এক দিনে পুরো চিত্রনাট্য হাতে লিখে ফেললাম। আমাকে দিয়ে ছবিটি বানাতে তারা রাজি হলো। কিন্তু সাকিও আর নির্মিত হয়নি। কারণ প্রযোজক শফি বিক্রমপুরী আমার আরেকটি মৌলিক গল্প শুনেছিলেন। তিনি সেটি নিয়ে আমাকে ‘বন্দুক’ বানাতে বললেন। ওই বন্দুকই আমার জীবনের প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি। এরপর ঝন্টু নির্মাণ করেন ওমর শরীফ। এই ছবিটি সুপার ডুপার হিট হয়। জসীম এই ছবির মাধ্যমেই ভিলেন থেকে নায়ক হয়ে ওঠে। শাবানা-জসীম জুটির সূচনাও এই ছবি দিয়ে। জসীম মজার লোক ছিলেন। শ্রুতি স্টুডিওতে গান রেকর্ড করছিলাম—‘রাজ দুলারি পারবা না, মিছে কেন ছলনা’, জসীমের ঠোঁটেই বাজবে। জসীম হঠাৎ এসে স্টুডিওতে হাজির। আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে হাত ধরে বলল, ওস্তাদ, আর যা করেন আমাকে দিয়ে গান করায়েন না। ভিলেনকে গাইতে দেখলে মানুষ জুতা মারবে। সেদিন বলেকয়ে শান্ত করেছিলাম। আবার ঝামেলা হয়েছিল শুটিংয়ের দিন। জসীম এসে বলল, ওস্তাদ, শুটিং প্যাক করেন। আমি বললাম, কেন? জসীম বলে, পাশের ফ্লোরে রাজ্জাক ভাই শুটিং করছেন, তিনি যদি দেখেন আমি গান গাচ্ছি, তাহলে লজ্জায় মরে যাব। তার চেয়ে কাল ওনার শুটিং নাই, কালকেই শুটিং করি। সত্যি সত্যি আমি সেদিন প্যাকআপ করে দিয়েছিলাম।’

ঝন্টু অনেক জনপ্রিয় ছবি পরিচালনা করেছেন যেমন—‘জজ ব্যারিস্টার’,  ‘মুজাহিদ’, ‘হাতি আমার সাথী’, ‘রূপসী নাগিন’, ‘নাচে নাগিন’, ‘রূপের রানী গানের রাজা’, ‘বিষে ভরা নাগিন’, ‘হেডমাস্টার’ প্রভৃতি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ‘গরীবের রাজা’ ছবির চিত্রনাট্য লিখে। অনেক সম্মান পেয়েছেন ছবির জগতে এসে। একটা ঘটনা শোনালেন—১৯৮৫ সাল। ‘অমর’ নামে একটি ছবি করছিলাম। প্রধান দুই চরিত্রে ছিলেন শাবানা ও আলমগীর। শুটিং শুরু হওয়ার কথা জুনের ১৩ তারিখ থেকে। শুটিং হবে কক্সবাজার। আমরা পুরো ইউনিট এক দিন আগে চলে গেলাম। শাবানা আসবেন দুই দিন পর। প্রথম দিনের শুটিং চলছে। প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে বললেন, স্যার, সব শেষ। শাবানা ম্যাডাম আমেরিকা চলে গেছেন। আমার মাথায় হাত। টেলিফোনে শাবানাকে ধরলাম। তিনি জানালেন, চোখে বেশি সমস্যা হওয়ায় তিনি এক দিনের নোটিশে আমেরিকা চলে গেছেন। এরপর তো আর কিছু বলা যায় না। ওদিকে প্রযোজক আমাকে পারলে খেয়ে ফেলে। কী করব বুঝতে পারছি না। শুটিং বন্ধ করে বসে রইলাম। সাত দিনের মাথায় কিন্তু শাবানা এসে হাজির এবং সোজা শুটিং স্পটে। বলল, ‘আমার কারণে আপনি সমস্যায় পড়বেন—এ তো হয় না ঝন্টু ভাই।’ কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন!

পরিচালনায় জাতীয় পুরস্কার না পেলেও দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর মনে কোনো কষ্ট নেই। দেশের কোটি মানুষ তাঁকে চেনে—এটিই তাঁর পরম পাওয়া।

প্রিয় লোকেশন : কক্সবাজার

আমার সব ছবিতে কক্সবাজার আছে। একটি দৃশ্যের জন্য হলেও আমি কক্সবাজার যাবই। কক্সবাজারই আমার পছন্দের লোকেশন। আরো নির্দিষ্ট করে বললে কক্সবাজারের কলাতলি সৈকত। সেখানে একটা টিলার মতো জায়গায় অনেক শুট করেছি। এত বেশি করেছি যে এফডিসির লোকজন বলে ঝন্টু পাহাড় (হা হা হা)। দুই পাশে দুই টিলার মাঝখান দিয়ে ঝিরি আছে। আর ঝিরিটি শুরু হয় কাছেরই একটি ঝরনা থেকে। আকাশ পাওয়া যায় চমৎকার। গানের দৃশ্যের শুটিংয়ের জন্য দারুণ ভালো।

দেলোয়ার জাহান ঝন্টু