kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

গণমুখী চিকিৎসা

ইউনিপ্যাথি

যশোরের শেখহাটি এলাকার প্রফেসর নূরুজ্জামান নিজের তৈরি ওধুষ দিয়ে চিকিৎসা করেন। রসুন, সজিনা, সরিষা, মধুসহ ১৬টি উপাদান জ্বালিয়ে তৈরি করেন ২৮ ধরনের ওষুধ। তিনি জানান এসব ওষুধে মানুষসহ পশু-পাখির রোগ সারে। এ চিকিৎসা পদ্ধতির নাম ইউনিপ্যাথি। জানাচ্ছেন ফখরে আলম, ছবি তুলেছেন ফিরোজ গাজী

২৮ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইউনিপ্যাথি

প্রফেসর নূরুজ্জামান

‘রসুন, সজিনা, সরিষা, আমলকী, হেলেঞ্চা, দূর্বাঘাস, নিমপাতা, মাশকলাই, মধু, ধনিয়া, জামপাতা, হলুদ, মানকচু, কাগজি লেবু, আনারস এগুলোকে আমরা খাদ্য ও ওষুধের উপাদান হিসেবে আবহমান কাল ধরে ব্যবহার করে আসছি। এসব থেকেই ইউনিপ্যাথি ওষুধের উপাদান সংগ্রহ করা হয়, তৈরি হয় ২৮টি ওষুধ। ওষুধগুলো মানুষের রোগ সারায়। পাশাপাশি গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, হাঁস, মুরগিসহ জীবজন্তুর ক্ষেত্রেও কার্যকর।

বিজ্ঞাপন

অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির চেয়ে দ্রুত, নিরাপদ, নিশ্চিত ও স্থায়ী ফলপ্রদ। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ’ জানালেন প্রফেসর নূরুজ্জামান। এটিকে তিনি বলেন গরিবের ওষুধ। কেননা এক ফাইলের দাম ২০ টাকা।

 

ইউনিপ্যাথির ওষুধ


বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন এই ওষুধ তৈরির শিক্ষা। তাঁর বাবা আব্দুর রউফ কলকাতায় ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস পড়তেন। সেটা ১৯২২ সালের কথা। আব্দুর রউফের শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর বিপিন বিহারী। তিনি ইউনিপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতেন। বিপিন বিহারীর প্রিয় ছাত্র ছিলেন আব্দুর রউফ। ইউনিপ্যাথি চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি আব্দুর রউফকে ধারণা দেন। কী কী দিয়ে ওষুধ তৈরি করতে হয়, জানতে পারেন রউফ। তবে কিভাবে ওষুধ তৈরি করতে হয়, সে বিষয়টি নিজের কব্জায় রাখেন বিপিন বাবু। এমবিবিএসের পাট চুকিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন আব্দুর রউফ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৫০ সালের দিকে যশোর জিলা স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তখন ইউনিপ্যাথি চিকিৎসা নিয়ে একটি বই লেখেন, ‘সরল গৃহচিকিৎসা’। নূরুজ্জামান তখন ছাত্র। বইটি পড়ে ফেলেন। পাশাপাশি বাবার কাছ থেকে এই চিকিৎসা পদ্ধতির সাধারণ ধারণা নেন। আব্দুর রউফ বিপিন বিহারীর কাছ থেকে এ বিষয়ের কিছু বইপত্র এনেছিলেন। সেগুলো পড়ে নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে বাবার সঙ্গে ইউনিপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন নূরুজ্জামান। বাবার সঙ্গে নিমপাতা, জামপাতা, কাগজি লেবু, সজিনা জ্বালিয়ে বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরি করতে থাকেন। ১৯৬৮ সালে নূরুজ্জামান স্নাতকোত্তর করেন। এরপর চাকরি খোঁজার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে ইউনিপ্যাথি চিকিৎসাচর্চা চালিয়ে যান। সে সময় আব্দুর রউফ একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি ছাপার জন্য নূরুজ্জামানকে দেন।

নূরুজ্জামানের বাবা আব্দুর রউফ


 

বইটির নাম, ‘হ্যাপি আর হিউম্যানিটি উইথ অ্যা ডিসপেনসারি ইন এভরি হোম’। নূরুজ্জামান বইটি থেকে অনেক কিছু জানতে পারেন। ১৯৭১ সালে শহীদ হন আব্দুর রউফ। এরপর নূরুজ্জামান একাই বাবার দেখানো চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে শত শত মানুষের চিকিৎসাসেবা দিতে থাকেন। ১৯৭৫ সালে এ বিষয়ে একটি বইও লিখেন, ‘রোগ নিরাময়ের মডার্ন মেডিক্যাল মিশন’। দাম তিন টাকা। কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি ইউনিপ্যাথি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকেন। বৃহত্তর যশোর, খুলনার গ্রামে গ্রামে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসাসেবা ছড়িয়ে দিতে শতাধিক চিকিৎসক নিয়োগ করেন। যশোরের নিজ বাড়িতে ইউনিপ্যাথি ওষুধ তৈরি করে সেগুলো সুলভ মূল্যে তাঁর নিযুক্ত চিকিৎসকদের হাতে তুলে দেন। ১৯৮২ সালে ওষুধনীতি চালু হওয়ার পর তাঁর এই চিকিৎসা পদ্ধতি এক রকম বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে নূরুজ্জামান বলেন, ‘ওষুধনীতি চালুর পর রেজিস্ট্রেশনের দরকার হয়। ড্রাগ কন্ট্রোল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও ইউনিপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির অনুমোদন পাইনি। আমাকে বলা হয়েছে, এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদি ও ইউনানি-এই চারটি চিকিৎসা পদ্ধতির বাইরে নতুন এ পদ্ধতির অনুমোদন দেওয়া হবে না। ’ এরপর তাঁর কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ে। ২০০৪ সালে নূরুজ্জামান যশোর এমএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর হিসেবে অবসর নেন। এরপর এই চিকিৎসা পদ্ধতির অনুমোদনের জন্য ফের সোচ্চার হন। এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতার জন্য ধরনা দিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি গণমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থার আবিষ্কার ও অনুমোদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাছে আবেদন করেন। কিন্তু চিঠির জবাব মেলেনি। নূরুজ্জামান বললেন, ‘ওই চার চিকিৎসা পদ্ধতির বাইরে অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করা কি অপরাধ? একসময় টেলিফোন ছিল না। টেলিফোন আবিষ্কার হয়েছে। এখন আমরা মোবাইলে কথা বলছি। মোবাইল যিনি আবিষ্কার করেছেন তিনি কি কোনো অপরাধ করেছেন?’ কিছু দেশেও এখন ইউনিপ্যাথি ওষুধে চিকিৎসা হয়। http://unipathicmedicine.org/ এই ওয়েবসাইটি ইউনিপ্যাথি নিয়ে।

নূরুজ্জামানের কাছ থেকে জানা যায় ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সালে ওষুধনীতি ঘোষণার আগ পর্যন্ত ৫৫ জন চিকিৎসক এক লাখ ৫৯ হাজার ৩৩৮ জন রোগীকে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসায় সারিয়ে তুলেছেন। তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার অ্যাডভোকেট আব্দুল আলী সর্দি ও জ্বরে নূরুজ্জামানের ওষুধ খেয়ে ভালো হন। জ্বরে বেশ কিছু ওষুধ খেয়ে কাজ না হওয়ায় তিনি নূরুজ্জামানের ওষুধ খান। এক দিনেই জ্বর সেরে যায়। বেজপাড়া এলাকার প্রফেসর আব্দুল আজিজ কাশির জন্য ‘অমিয়-২’ খেয়ে উপকৃত হয়েছেন। মণিরামপুর উপজেলার চণ্ডীপুরের গোলাম রসুল নূরুজ্জামানের ওষুধ খেয়ে অ্যাজমা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ফুলবাড়ীর মনোহরপুর গ্রামের চিকিৎসক ইসাহক জানান, অনেক দিন আগে খাজুরা এলাকার এক মহিলার ডায়রিয়া হয়। তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে। মৃতপ্রায় ওই মহিলাকে তিনি ‘চপলা’ খেতে দেন। অল্প সময়ের মধ্যে ওই মহিলা সেরে উঠেছেন। নূরুজ্জামান বললেন, ‘আমার ওষুধ শত শত শিশুর কাশি সারিয়েছে, অনেকের হাঁপানি ও হুপিং কাশি দূর হয়েছে। অনেক মহিলা আমার ওষুধ খেয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান প্রসব করেছে। ’

নূরুজ্জামান যশোরে বসে ইউনিপ্যাথি চিকিৎসাচর্চা করেছেন। তাঁর নূরুজ্জামানের ইউনিপ্যাথির খবর ১৯৮০ সালের ৫ জুলাই ম্যানিলা, ফিলিপাইন থেকে প্রকাশিত ‘সাই-টেক এশিয়া’ পত্রিকায় ‘ইউনিপ্যাথি হট?’ শিরোনামে ছাপা হয়েছে। এর আগে পাকিস্তানের করাচির গভর্নমেন্ট রিসার্চ কাউন্সিলের প্রধান ডা. এস মেহেদী হাসান ইউনিপ্যাথি সম্পর্কে জেনে করাচি থেকে প্রকাশিত ‘দ্য মেডিক্যাস’ পত্রিকায় ১৯৬২ সালের মে মাসের সংখ্যায় আব্দুর রউফের প্রশংসা করে প্রবন্ধ লিখেন।

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কুয়োদা হাট এলাকার চিকিৎসক রমজান আলী ১৯৭৭ সালের ৩০ জুলাই নূরুজ্জামানকে এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমি একজন এলোপ্যাথি ডাক্তার। আমি এই ওষুধ দুই বছর ধরে ব্যবহার করিয়া আসিতেছি এবং আশাতীত ফল লাভ করিয়াছি। ’ যশোর জেলা বোর্ডের  চেয়ারম্যান খান বাহাদুর লুৎফর রহমান ১৯৭৫ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি এক প্রত্যয়নপত্রে লেখেন, ‘নূরুজ্জামানের ওষুধ আমি নিজে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের জন্য ব্যবহার করিয়া চমৎকার ফল লাভ করিয়াছি। ’ এ ছাড়া ১৯৮২ সালের ১৮ আগস্ট জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম নূরুজ্জামানকে চিঠি দিয়ে ইউনিপ্যাথির প্রশংসা করেছেন।

প্রফেসর নূরুজ্জামানের মেয়ে ডা. রেবেকা সুলতানা গাইনি কনসালট্যান্ট। তিনি মণিরামপুর স্বাস্থ্য কমপেক্সে কাজ করেন। ছেলেবেলায় ইউনিপ্যাথি ওষুধ অমিয়-১ ও অমিয়-২ খেয়েছেন। সর্দি, কাশি, জ্বর সেরেছে। বাবার ওষুধ সম্পর্কে

 

তিনি ইতিবাচক মত দিয়েছেন। নূরুজ্জামানের জামাতা শরীফুজ্জামান রঞ্জু ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার। তিনিও ইউনিপ্যাথির ওষুধ খেয়েছেন। বললেন, ‘হারবাল অরিজিন থেকে ইউনিপ্যাথির উপাদান সংগ্রহ করা হয়। যে কারণে এ ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। সীমিত পর্যায়ে এই ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। ’

এখন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে এই চিকিৎসা পদ্ধতির স্বীকৃতি চাচ্ছেন প্রফেসর নূরুজ্জামান।

 

 

ইউনিপ্যাথির বৈশিষ্ট্য

রোগী দ্রুত সেরে ওঠে।

ওষুধের সংখ্যা মাত্র ২৮টি।  

দেশীয় খাদ্য জাতীয় উপাদান থেকে এই ওষুধ তৈরি।

দাম কম।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

ওষুধ নির্বাচনে ভুল হলেও কোনো ক্ষতি হয় না।

যে কেউ চিকিৎসক হতে পারেন। উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই।

এই পদ্ধতির চিকিৎসা পশু-পাখির ক্ষেত্রেও কার্যকর।

কোন রোগের কী ওষুধ

শীতলা : কয়েক মিনিটে জ্বর কমে।

সরলা : বদ হজম দূর করে। পাঁচ মিনিটে পেট ফাঁপা দূর হয়।

চপলা : শরীরের উত্তাপ কমে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে উত্তাপ স্বাভাবিক করে। সন্তান প্রসবে সহয়তা করে।

ভৈরবী : পুরনো ও কঠিন শ্লেষা থেকে মুক্তি দেয়।

অমিয়-১ : সর্দিজ্বর, মাথা ধরা, হাম, বসন্ত, বাত, অম্ল, পেটব্যথাসহ কয়েকটি রোগ থেকে মুক্তি দেয়।

অমিয়-২ : হুপিং কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, যক্ষা দূর করে।

অমিয়-৩ : মৃগী, মূর্ছা, পক্ষাঘাতসহ স্নায়বিক রোগে কাজ করে।

অমিয়-৪ : কলেরা, ডায়রিয়া, পাতলা পায়খানায় কার্যকর।

অ্যান্টিফিভার-১ : ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, টাইফয়েড সারায়।

অ্যান্টিফিভার-২ : সব ধরনের জ্বরে কার্যকর।

মলিনা : শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য, যকৃতের রোগ, কৃমিনাশ করে।

নবীনা : কান্তি বৃদ্ধি, কণ্ঠস্বর পরিষ্কার ও দৃষ্টিশক্তি প্রখর করে।

কমলা : পাতলা পায়খানা দূর করে।

ইউনিপ্যাথির বৈশিষ্ট্য এবং কোন রোগের কী ওধুষ-প্রফেসর নুরুজ্জামানের মত অনুসারে এখানে দেয়া হলো।