kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

ইঞ্জিনিয়ার থেকে কমেডিয়ান

প্রবাসে চাকরিজীবনের একঘেয়েমি কাটাতে বিভিন্ন কমেডি    

২৩ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইঞ্জিনিয়ার থেকে কমেডিয়ান

সালটা ২০০৭। যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসে বসেছিল স্ট্যান্ড আপ কমেডি প্রতিযোগিতা 'কমেডি ফেস্টিভাল'। নাম লেখান ১৫০ প্রতিযোগী। তাঁদের মধ্যে একজন মাত্র বাঙালি।

বিজ্ঞাপন

বাদবাকি আমেরিকান, ডাকসাইটে কমেডিয়ান। বাঙালিটি মঞ্চে ওঠার পর দর্শকদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। কালো চামড়ার 'বাঙালিবাবু' আবার ইংরেজিতে কমেডি করবে-অনেকের কথায় এমন তাচ্ছিল্যের সুর! কিন্তু যে ছয় মিনিট সময় পেলেন, সেটুকুতেই কৌতুক পরিবেশন করে মঞ্চ কাঁপালেন 'বাঙালিবাবু'। মঞ্চে ওঠার সময় যাঁরা কানাঘুষা করছিল, মঞ্চ থেকে নামার সময় তারাই দাঁড়িয়ে দিল করতালি! সবচেয়ে বড় চমকটা এলো বিজয়ীদের নাম ঘোষণার সময়। ১৪৯ জন আমেরিকানকে পেছনে ফেলে 'সেরা পুরুষ কমেডিয়ান' নির্বাচিত হলেন সেই কালো চামড়ার 'বাঙালিবাবু'। নাম নাভিদ মাহবুব। স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান। দর্শকের সামনে সমাজের নানা বিষয়-আশয় নিয়ে কৌতুক উপস্থাপন করেন। কৌতুকের মধ্যে থাকে চারপাশের নানা অসংগতি নিয়ে গভীর ইঙ্গিত। সেবার নাভিদকে সেরা হিসেবে বেছে নেওয়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন বিচারক-'ওর (নাভিদের) কৌতুক ছিল অশ্লীলতামুক্ত, হাস্যরসাত্মক এবং বুদ্ধিদীপ্ত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ওর কৌতুকে ছিল দারুণ সব চিন্তার খোরাক। '

একঘেয়েমির দাওয়াই

আমেরিকার প্রায় প্রতিটি শহরে একাধিক কমেডি ক্লাব আছে। প্রবাসে চাকরিজীবনের একঘেয়েমি কাটাতে সময়-সুযোগ পেলেই সেসব ক্লাবে ঢুঁ মারতেন নাভিদ। কমেডির প্রতি ভালোবাসার শুরুটা সেখান থেকেই। দেখতেন-শুনতেন আর বাসায় এসে প্র্যাকটিস করতেন। একসময় ঠিক করলেন, নিজেও কমেডি করবেন। ২০০৪ সাল। আমেরিকার স্যান্ডিয়াগো শহরের 'দ্য কমেডি স্টোর'-এর কর্ণধার বিখ্যাত কমেডিয়ান স্যান্ডি শোর। তাঁর কাছ থেকেই কমেডির ওপর তালিম নিলেন দুই মাস। এরপর নিয়মিত বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে কমেডি উপস্থাপন করতে লাগলেন। তখন কমেডির নেশা যেন পেয়ে বসেছিল নাভিদকে। স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় শো করতে করতে একসময় মাথায় আসে, দেশে ফিরে একটা কমেডি ক্লাব করলে কেমন হয়। যেখানে লোকজন আসবে এবং কৌতুক শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। চাকরিবাকরি সব ছেড়েছুড়ে দেশে ফিরে আসেন ২০০৯ সালে।

যেন মুক্তির এক বিশাল প্রান্তর

২০১০ সালের মাঝামাঝি বারিধারায় ছোট্ট পরিসরে খুলে বসলেন 'নাভিদস কমেডি ক্লাব'। এখন ঠিকানা বদলে গুলশানের আরএম সেন্টারে। ধীরে ধীরে একান-ওকান হয়ে লোকজন জেনে যায় কমেডি ক্লাবের খবর। একজন-দুজন করতে করতে এখন বেশ ভালোই লোক জমে। নগরের এই একটা জায়গায় সবাই আসে হাসতে আর হাসাতে। তেমনই একজন শাখাওয়াত উল্লাহ। পেশায় চাকুরে। নিয়মিত কমেডি ক্লাবে আসেন 'জীবনটাকে আরেকটু কাছ থেকে দেখতে। আরেকটু ভালোবাসার এক দুর্দান্ত সুযোগ খুঁজতে এখানে আসি। অসুখের এই শহরে কমেডি ক্লাবটাকে মনে হয় যেন মুক্তির এক বিশাল প্রান্তর। ' বললেন তিনি।

শুধু অপেশাদাররাই নয়, পেশাদারদেরও আসা-যাওয়া আছে নাভিদ কমেডি ক্লাবে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ডাকসাইটে স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান ববি কলিনস, এডি ব্রিল, ইয়ান ব্যাগ, আজহার ওসমানও এসেছিলেন নাভিদের আমন্ত্রণে। ক্লাবে এখন পেশাদার কৌতুকাভিনেতা আছেন ১৪ জন। প্রতিনিয়ত অপেশাদাররাও এসে যুক্ত হচ্ছেন।

হাসির মাঝে গভীর ইঙ্গিত

কমেডির মধ্য দিয়ে মানুষকে একটা মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করেন নাভিদ। কমেডির একটা বিশেষ শক্তি আছে বলেও মনে করেন তিনি। সেটা কেমন? জানতে চাইলে স্মৃতির পাতা হাতড়ালেন-'২০০৮ সালে আমেরিকার মিশিগানে কৌতুক পরিবেশন করছিলাম। বরাদ্দ ছিল মাত্র ১০ মিনিট। দর্শকদের মধ্যে আমেরিকান সেনাসদস্যরাও ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চ থেকে নামছি, এ সময় এক সেনাসদস্য এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হ্যান্ডশেক করে হাসিমুখে বললেন, আজ ১০ মিনিটে তোমার ধর্ম সম্পর্কে যে তথ্য পেলাম, ইরাকে দুই বছর যুদ্ধ করেও তা জানতে পারিনি। '

স্ট্যান্ড আপ কমেডির একটা বিশেষত্ব-মানুষের সামনে অনর্গল কথা বলে যেতে হয়। যাতে লোক হাসে। কিন্তু কাজটা বেশ কঠিন। মানুষকে হাসানো তো আরো বেশি কঠিন বলে মনে করেন নাভিদ। কৌতুক বলার পরও কেউ যদি না হাসে তখন কী করেন? জবাবে নাভিদ বললেন, 'মানুষ হিসেবে তো কিছুটা অপ্রস্তুত হতেই হয়। তবে ওই অপ্রস্তুত অবস্থাকেই মজার কিছুতে রূপান্তরের চেষ্টা করি। তবে আমি কৌতুক পরিবেশন করি অভিজ্ঞতা থেকে। ফলে এমন সমস্যা হয় না বললেই চলে। '

কচু কাটতে গিয়ে ডাকাত বনে যাওয়া

নাভিদের কৌতুকের এই আসর বসে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, গুলশানের আরএম সেন্টারে। শুরুর আধা ঘণ্টা 'ওপেন মাইক'। অর্থাৎ তখন দর্শকরাই কৌতুক বলেন, তাঁরাই শোনেন। এমন এক আসরে কৌতুক শুনতে এসে এখন রীতিমতো কৌতুকাভিনেতা হয়ে উঠেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র হৃদয়। দিন দিন এ দলে যুক্ত হচ্ছে কেউ না কেউ। অনেকটা কচু কাটতে কাটতে ডাকাত বনে যাওয়ার মতো অবস্থা। হৃদয় জানালেন, 'টিভিতে নাভিদ ভাইয়ের শো দেখে ভালো লাগত। এক বৃহস্পতিবার সরাসরি শো দেখতে এলাম। মুগ্ধ হয়ে দেখছি, হঠাৎ তিনি বললেন, যাঁরা বলতে চান এখন এসে বলতে পারেন। ভয়ে ভয়ে মঞ্চে ওঠলাম। সেটাই ছিল জীবনে প্রথম মঞ্চে ওঠা। বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছিল। কিন্তু এখন আর কোনো সমস্যা হয় না। '

এক মেধাবীর গল্প

এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১৩তম, এইচএসসিতে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন নাভিদ মাহবুব। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় হয়েছেন দ্বিতীয়। সেখান থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক। উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯৯২ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। স্নাতকোত্তর মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে। চাকরি করেছেন ফোর্ড মোটর কম্পানি, কোয়ালকম, কিয়োশেরার মতো প্রতিষ্ঠানে।

দেশে ফিরে নকিয়া সিমেন্স নেটওয়ার্ক এবং পরে আইবিএমের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন কিছুদিন। একসময় সব ছেড়ে দেন মানুষকে হাসাবেন বলে।

পুরোদস্তুর কমেডিয়ান

এখন চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর কমেডিয়ান তিনি। বললেন, 'এখানে সবাই কেবল পরীক্ষায় ভালো করতে, ভালো বেতনের চাকরি চায়। আমার কাছে মনে হয়, জীবনটা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা বড় বড় চাকরি করার জন্যই না। জীবনের মানে আরো বিশেষ কিছু। মানুষকে হাসানোর মাঝে নির্মল সুখ আছে। সেই সুখ পেতেই চাকরি ছেড়েছি। ' তাই বলে কাঠখোট্টা ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার থেকে রসিক কমেডিয়ান? জবাবে নাভিদ মাহবুব বললেন, 'এটা একটা খুব মজার জিনিস যে মিস্টার বিনখ্যাত রোয়ান অ্যাটকিনসন কিন্তু ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার। মানুষ সব সময় ভালো লাগার জিনিসটিই করতে চায়। '

প্রকৌশলী হয়ে কৌতুক মেলান কিভাবে? নাভিদের জবাব-'আসলে সব কিছুই অঙ্ক দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। জীবন, কৌতুক সবই। আর মানুষকে হাসানোতে এক ধরনের তৃপ্তি রয়েছে, সেটাই পেতে চাই সব সময়। ' যাঁরা লোক হাসাতে পারদর্শী, তাঁরা কি সব সময় হাসাহাসির মধ্যে থাকেন? উত্তরটা আগেই আঁচ করা গেল তাঁর গম্ভীর চেহারায়, 'না, বিষয়টি সে রকম নয়। একটা গান তৈরি হয়ে গেলে বারবার শোনা যায়। কিন্তু কৌতুক একবার পরিবেশনের পর দ্বিতীয়বার একঘেয়ে লাগতে পারে। কৌতুকের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে শিল্পীকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ' আমেরিকার ডাকসাইটে কমেডিয়ান জর্জ চার্লি কার্লিনকে আদর্শ মানেন তিনি।

ব্যক্তিজীবন

নাভিদের বাবা মাহবুবুর রহমান সচিব ছিলেন। মা অধ্যাপক আরিফা রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। হাসি ও বিনোদনের মিলমিশের নিরেট একজন মানুষ নাভিদ। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক। স্ত্রী জারা মাহবুব একটি বেসরকারি ব্যাংকের হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশনের দায়িত্বে আছেন।

সীমানা পেরিয়ে

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং মিয়ানমারে কমেডি শো করেছেন। ২০১২ সালে ভারতের জি বাংলা চ্যানেলের কৌতুকের অনুষ্ঠান 'মীরাক্কেল আক্কেল চ্যালেঞ্জার্স সিক্স : অসম শালা'য় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে হাসিয়েছেন ওপার বাংলার মানুষদেরও। এখন টিভি অনুষ্ঠান ও বেশ কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন নাভিদ। একসময় টিভিতে 'হা শো' নামের কমেডি শো করতেন। এনটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'দ্য নাভিদ মাহমুদ শো'র উপস্থাপক, লেখক ও সহপরিচালক তিনি। একই চ্যানেলে 'বিজিদের ইজি শো' অনুষ্ঠানেরও উপস্থাপক। তাঁর সৃজনশীল উপস্থাপনার ধরনটা অনেকে পছন্দ করেছেন। একবার ঈদে বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'আনন্দ মেলা'র উপস্থাপক ছিলেন নাভিদ। কৌতুক নিয়ে তাঁর লেখা বইও বেরিয়েছে গেল বছর। নাম 'হিউমারাসলি ইউরস'। বিজ্ঞাপনও করেছেন বেশ কিছু। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কৌতুক বলিয়েদের খুঁজে বের করে এক ফ্ল্যাটফর্মে আনতে চান। সে জন্য কিছুদিনের মধ্যে 'ট্যালেন্ট হান্ট' কার্যক্রম শুরু করবেন বলেও জানালেন নাভিদ।