আমি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ বছর কাজ করেছি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শুধু কারিগরি জ্ঞান নিয়ে এই সেক্টরে বিশ্ববাজারে বড় ভূমিকা রাখা অসম্ভব। গ্লোবাল ফ্যাশন ব্যবসা কিভাবে চলে, ব্র্যান্ড কিভাবে দাঁড় করাতে হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য নিয়ে সিদ্ধান্তগুলো কিভাবে নেওয়া হয়—এসব না জানলে বেশিদূর এগোনো কঠিন। এরপর থেকেই বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্যবসা সংক্রান্ত ভালো কোর্স খুঁজছিলাম।
ফ্যাশন দুনিয়ায় এফআইটিকে অনেকেই ফ্যাশনের এমআইটি বলে ডাকেন। বিশ্বজুড়ে এই স্কুলের সুনাম। আমাদের তিনজনের পরিচয় এফআইটির গ্লোবাল ফ্যাশন ম্যানেজমেন্ট কোর্সে। আমাদের দলে আছেন ভারতের সমদত্তা দাস আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মোহাম্মদ আশিকুর রহমান আসিফ।
‘তাঁতি স্টুডিও’ আমাদের দুই বছরের একটি লম্বা আর কঠিন পরিশ্রমের ফল। আমাদের কোর্সে বিজনেস আইডিয়া চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া ভীষণ প্রতিযোগিতামূলক। ২৪ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকে প্রথমে তিনটি করে মোট ৭২টি আইডিয়া জমা দেন। শিক্ষকরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রকল্পের জন্য ১২টি আইডিয়া বেছে নেন। মজার ব্যাপাার হলো, পুরস্কার জেতা তাঁতি স্টুডিও কিন্তু শুরুতে ৭২টি আইডিয়ার মধ্যে ছিল না!
প্রথম সেমিস্টারে আমরা ‘সোর্সক্ল্যাফট’ নামে অন্য একটি আইডিয়া নিয়ে কাজ করছিলাম। এটি ছিল একটি সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম। কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম, আমাদের ইউনিক ভ্যালু প্রপোজিশন দুর্বল। ফলে একটি বড় প্রেজেন্টেশনের পর একরকম আটকে গেলাম। দ্বিতীয় সেমিস্টারে নতুন করে কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নিলাম। তখনই মাথায় এলো বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, অথচ বিশ্ববাজারে আমাদের নিজেদের কোনো ব্র্যান্ড নেই! আমরা কেবল অন্যের ব্র্যান্ডের কাপড় সেলাই করে দিই, পণ্যের গায়ে লেখা থাকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেবেল। অথচ আমাদের দেশে ইউনেসকো স্বীকৃত জামদানি বা নকশিকাঁথার মতো শত বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আছে। কিন্তু সঠিক সুযোগ আর মূল্যায়নের অভাবে এই শিল্পের কারিগররা হারিয়ে যাচ্ছেন। মনে হলো, এখানেই কিছু করা দরকার। সেই ভাবনার ফসল তাঁতি স্টুডিও। পোশাক নয়, আমরা মূলত একটি হোম টেক্সটাইল ব্র্যান্ড। আমাদের প্রাথমিক পণ্যের তালিকায় থাকছে বেড কাভার, কুশন কাভার এবং টেবিল রানার। এগুলো তৈরি হবে বাংলাদেশের স্থানীয় তাঁতিদের হাতে, ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা ও জামদানির নকশায়। আমাদের দুটি মূল কালেকশন লাইন থাকবে— রেগুলার লাইন সাধারণ বা মধ্যম আয়ের ভোক্তাদের জন্য, ‘অ্যাটেলিয়ার লাইন’ হবে আমাদের প্রিমিয়াম বা লাক্সারি কালেকশন। এটি মূলত ‘মেড টু অর্ডার’ অর্থাৎ ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজ করে সম্পূর্ণ হাতে বুনে সীমিত সংখ্যায় তৈরি করা হবে।
আমেরিকা বা ইউরোপের ক্রেতারা আমাদের দেশীয় হস্তশিল্প কেন কিনবেন? প্রশ্নটি আমাদের মনেও ছিল। তাই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ৬১ জন ভোক্তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকার এবং বাজার জরিপ চালাই। জরিপে দেখা গেছে ৯৭ শতাংশ আমেরিকান ক্রেতা Ethically sourced এবং হস্তশিল্পজাত পণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। ৯০ শতাংশ ক্রেতা পণ্যের কারুকাজ ও উচ্চমানের ফিনিশিংকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। ৬৫ শতাংশ ক্রেতা পণ্য কেনার সময় দেখেন এর পেছনে কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে কি না। আর ৬০ শতাংশ ক্রেতা পণ্যের গুণগত মান ও মৌলিকত্বের জন্য যেকোনো প্রিমিয়াম বা বাড়তি মূল্য দিতে সানন্দে প্রস্তুত। একজন ক্রেতা বলেছিলেন, ‘যদি পণ্যটি একজন প্রকৃত কারিগরের হাতে তৈরি হয়, তবে এক হাজার ডলার দিতেও দ্বিধা করব না।’
আমেরিকার হোম বেডিং মার্কেট প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২৩ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। এর মধ্যে আমাদের লক্ষ্য যে বাজার—অর্থাৎ প্রিমিয়াম, আর্টিজানাল (কারুশিল্পজাত) এবং এথিক্যালি সোর্সড পণ্য, সেই সেগমেন্টটাই প্রায় ১.৪৪ বিলিয়ন ডলারের। পশ্চিমারা এখন ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব পণ্য খোঁজেন। বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের শক্তি ঠিক এই জায়গায়ই।
আমাদের তিনজনের কাজের অভিজ্ঞতা আলাদা। এই প্রকল্পে সমদত্তা দাস সামলান প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন ডিরেকশন, ম্যাটেরিয়াল সিলেকশন এবং পোশাকের কারিগরি দিকগুলো। মোহাম্মদ আশিকুর রহমান আসিফ বুঁদ হয়ে আছেন ফিন্যান্সে—বাজেটিং, কস্টিং, ফিন্যানশিয়াল মডেলিং, পুরো বিজনেসের আর্থিক কাঠামো তৈরি করা তাঁর কাজ। আমি মার্কেট রিসার্চ ও মার্কেটিংয়ে—আমেরিকান হোম টেক্সটাইল বাজার বিশ্লেষণ, কাস্টমার সেগমেন্টেশন পজিশনিং স্ট্র্যাটেজি এবং ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনের দায়িত্বে। দিনশেষে আমরা একটি টিম হিসেবেই কাজ করেছি।
বব ফিশ অ্যাওয়ার্ডের বিচারকদের মূল্যায়ন আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সম্পূর্ণ ডেটাচালিত এবং বিস্তারিত মার্কেটিং প্ল্যানের বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে আসিফের তৈরি করা ফিন্যানশিয়াল মডেলটির স্পষ্টতা তাঁদের মুগ্ধ করেছে। পুরস্কার প্রদানের সময় গ্লোবাল ফ্যাশন ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের চেয়ারপারসন অ্যারন ডানকান বলেছিলেন, ‘একটি স্টার্টআপ কম্পানির জন্য এত গভীর ও নিখুঁত মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি এবং ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিস আগে দেখিনি।’ ২০২৭ সালের প্রথম দিকে তাঁতি স্টুডিওর পপ-আপ ইভেন্টের (অস্থায়ী প্রদর্শনী) মাধ্যমে নিউইয়র্কের বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা আছে আমাদের।