kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্ল্যানিং তো মেয়র করেন না করেন আর্কিটেক্টরা

শামসুল ওয়ারেস। প্রখ্যাত স্থপতি, স্থাপত্যের শিক্ষক ও শিল্প সমালোচক। বাংলাদেশ আর্কিটেক্ট ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রেসিডেন্ট। প্রথিতযশা স্থপতি লুই কান ও মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে সরাসরি কাজ করা বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের এই অগ্রজ ব্যক্তিত্বের জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



প্ল্যানিং তো মেয়র করেন না করেন আর্কিটেক্টরা

স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনার ভাবনা কখন এলো?

 

পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নাম ছিল ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (ইপিইউইটি)। তারও আগে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ছিল আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ১৯৬২ সালে এই কলেজকে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউনিভার্সিটিতে পরিণত করা হয়। ইউনিভার্সিটি করার শর্ত ছিল, কমপক্ষে দুটি ফ্যাকাল্টি থাকতে হবে। তখন এখানে ছিল শুধু একটি—ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি। আর্কিটেকচার অ্যান্ড প্ল্যানিং নামে নতুন একটি ফ্যাকাল্টি চালু করার পর সরকার এটিকে ইউনিভার্সিটির মর্যাদা দেয়। ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে দেখি, আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টও খোলা হয়েছে, যেখানে বিল্ডিং ডিজাইন করা হয়। জানলাম, আর্কিটেকচার পড়তে গেলে আর্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং—দুটি বিদ্যাই লাগে। একটি বিল্ডিংয়ের স্ট্রাকচার তৈরি করতে ইঞ্জিনিয়ারিং লাগে; তবে এটাকে সুন্দর করে তুলতে এর যে কম্পোজিশন, যে রং, যে উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে এটাকে শিল্প বলা হয়, তার জন্য দরকার স্থাপত্যকলা। মনে হলো, নিজের ভাবনার কাছাকাছি একটা সাবজেক্ট পেয়েছি। কেননা ছোটবেলায় পেইন্টার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তাই আর্কিটেকচারেই ভর্তি হয়ে গেলাম।

 

 

শিক্ষাজীবন কেমন ছিল?

আর্কিটেকচার অ্যান্ড প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্টটা পুরোপুরি আমেরিকান শিক্ষকরা পরিচালনা করতেন। ডিপার্টমেন্টটি খোলা হয় ইউএসএইডের মাধ্যমে, টেক্সাসের এএনএন ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতায়। আমি দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। অবশ্য তারও আগে, ১৯৬১ সালে যখন আমেরিকানরা এসেছিলেন প্রাথমিক আলাপ করতে, তখন পাঁচজন ছাত্র নিয়ে তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে একটা ব্যাচ খুলেছিলেন। ওটাকে খুব একটা সময় দেওয়া হয়নি। যা হোক,  পড়তে পড়তে আর্কিটেকচার সাবজেক্টটাকে আমি ভালোবেসে ফেলি। পাঁচ বছর যে পড়াশোনা করলাম, সেটি আমার জীবনের খুব সুন্দর একটি সময়। রবিউল হুসাইনসহ আমার যাঁরা ক্লাসমেট ছিলেন, আমাদের সবার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল। জানতাম, লেখাপড়া করে দেশের প্রথম আর্কিটেক্ট আমরাই হব। দেশ গঠন করার দায়িত্ব আমাদেরই    নিতে হবে।

 

সে সময় নিজেদের কিভাবে গড়ে তুলেছেন?

আমরা যখন ছাত্র, তখন একদিকে আমেরিকা-রাশিয়ার মধ্যে কোল্ড ওয়ার, কিউবা ক্রাইসিস, ভিয়েতনাম যুদ্ধ—এসব চলছে। আমরা বেশির ভাগ ছাত্রই তখন বাম ঘরানার হয়ে গেলাম। শোষণমুক্ত সমাজ গড়াটাকে আমাদের কাছে খুব প্রয়োজনীয় মনে হলো। ওদিকে আমি ফ্রেঞ্চ সিনেমা দেখতে, ফ্রেঞ্চ সাহিত্য পড়তে শুরু করলাম।  ইউনিভার্সিটিতে যখন আর্ট পড়লাম, তখন সুররিয়ালিজম, ইমপ্রেশনিজম, কিউবিজমসহ আর্টের নানা ইজম নিয়ে পড়াশোনা করলাম। এর মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক—এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে আমরা ম্যাচিউর হয়েছি। সেই সময়ে রুশরা অনেক বই তরজমা করে পাঠাচ্ছিল। সেগুলো আমাদের লাইব্রেরিতে আসতে শুরু করল। ফলে রুশ সাহিত্য ও কমিউনিজম সম্পর্কিত নানা বই আমরা পড়েছি। ব্যক্তিগত কোনো ঘটনার চেয়ে বরং সামগ্রিকভাবে এই আবহে বেড়ে ওঠাকেই আমি অগ্রগণ্য করি। সব মিলিয়ে একটা সুস্থ সমাজ, সুস্থ বাংলাদেশ, সচেতন ও মননের বাংলাদেশ তৈরি করার স্বপ্ন নিয়েই আমরা ছাত্রজীবনটি কাটিয়েছিলাম।

 

ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে?

১৯৬৮ সালে পাস করার পর স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে কাজ শুরু করি। তিনি ১৯৪৬ সালে কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। পরের বছর দেশ ভাগ হলে বাংলাদেশে চলে আসেন। সরকারি চাকরি নেন পিডাব্লিউডিতে; তখন এটার নাম ছিল সিবি অ্যান্ড আই। এরপর একটা স্কলারশিপ পেয়ে তিনি আর্কিটেকচার পড়তে যান। ১৯৫৩ সালে আমেরিকার অরেগন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ে এসে আর্ট কলেজ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট) ও আর্ট কলেজ সংলগ্ন লাইব্রেরি বিল্ডিংটি ডিজাইন করেন। এ দুটি বিল্ডিংই স্থাপত্যে আমাদের পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের একেবারেই প্রথম দিকের অতি সুন্দর কাজ। সে সময় ভারত ও শ্রীলঙ্কায় কিছু কাজ শুরু হলেও মাজহারুল ইসলামের মতো এত শক্তিশালী কাজ কেউ করতে পারেননি। ফলে শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা ভারতবর্ষেই তাঁকে আধুনিক স্থাপত্যের সূচনাকারী হিসেবে ধরা হয়। তাঁকে আমরা ‘স্থাপত্যগুরু’ বলি। তাঁর অফিসে আমি, বন্ধু রবিউল হুসাইন ও রশীদ চাকরি নিই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নিপা বিল্ডিং, মতিঝিলের কয়েকটি বিল্ডিংয়ের ডিজাইন আমরা মাজহারুল ইসলামের সহায়তায় করেছি।

 

সেখান থেকে চাকরিচ্যুত হলেন কী কারণে?

১৯৭১ সাল পর্যন্ত তাঁর অফিসেই কাজ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় চলে গেলে পুরো ৯ মাস আমরাই অফিসটি চালিয়েছি। স্বাধীনতার পর তিনি ফিরে এসে দেখেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো অনেক স্থাপনার কাজ, যেগুলো বাকি ছিল, সেগুলো আর তাঁকে দেওয়া হয়নি। তখন তিনি আমাদের বললেন, ‘আমার তো কাজ নাই। তোমরা তাহলে যেতে পারো।’ সুতরাং চাকরিচ্যুত হলাম আমরা। সে বছরই, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি বুয়েটে লেকচারার হিসেবে জয়েন করি। সে-ই আমার শিক্ষকতা জীবন শুরু।

 

স্থপতি মাজহারুল ইসলামের কাছ থেকে প্রাপ্তি?

মাজহারুল ইসলাম ছিলেন একেবারেই একজন খাঁটি মানুষ। তাঁর মধ্যে অসাধারণ ক্রিয়েটিভিটি ছিল। তিনি একাধারে ইঞ্জিনিয়ার ও স্থপতি। তাই তাঁর কাজের কোয়ালিটি দারুণ ছিল। তিনি মূল জিনিসটি বুঝতে পেরেছিলেন। অনেকেই লেখাপড়া করে, কিন্তু মূল বিষয়টি জীবনে কখনোই ধরতে পারে না। তিনি ও রকম লোক ছিলেন না। ছিলেন অত্যন্ত গভীর মনন ও চিন্তার মানুষ। আর্কিটেকচার বলতে কী বোঝায়, সেটি আমরা ছাত্র হিসেবে যা শিখেছিলাম, কিছু কিছু জিনিস তাঁর কাছ থেকে আবার নতুন করে শিখতে হয়েছে। কারণ বইয়ের লেখাপড়া আর কাজের ক্ষেত্র তো আলাদা জিনিস। সেই কারণে আমরা তাঁর কাছে বেশ ঋণী। তাঁর কাছ থেকেই পেশাদারি শিখেছি। স্থাপত্যকে দেখার যে চোখ, সেটাও তাঁর কাছ থেকেই অনেকটা পেয়েছি।

 

শিক্ষকতার জীবন?

শিক্ষক হতে হলে যে বিষয়টি পড়ান, সেটি সম্পর্কে সামগ্রিক জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষকতায় এসে আধুনিক স্থাপত্য কী, এটা আমি নতুন করে বোঝার চেষ্টা করি। আধুনিক স্থাপত্য শেখাতে গিয়ে ছাত্রদের আমি ট্র্যাডিশন এবং ট্র্যাডিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রোমান্টিকতাগুলো পরিহার করতে বলতাম। বাঙালিদের একটা ব্যাপার আছে, সব কিছুতেই বাঙালি হতে হবে। আমি মনে করি, আধুনিক স্থাপত্যে বাঙালিত্ব বলে যদি কিছু থাকে, সেটাকে ফিল্টার করে আনতে হবে। কারণ পৃথিবী তো অনেক এগিয়ে গেছে। ধরুন, আমরা খুব আবেগপ্রবণ মানুষ। জানি, কবিতায় এ ধরনের মানুষের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সম্পূর্ণই আবেগ দিয়ে কাজ করলে তো সেটা একটা সেন্টিমেন্টাল জিনিস হয়; তার কোনো মূল্য থাকে না। আবেগকে যুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যুক্তি ও আবেগের এই ভারসাম্যটি আমি ছাত্রদের আমার সাবজেক্টের ভেতর দিয়েই বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। যেন তারা আবেগপ্রবণ বাঙালি না হয়ে যুক্তিনির্ভর বাঙালি হয়, এটা আমার শিক্ষকতার একটা উদ্দেশ্য ছিল। ক্লাসের বাইরেও আমি রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত ওদের সঙ্গে গল্প করতাম। তাই খুব জনপ্রিয় শিক্ষক হয়ে যাই। এত রাত পর্যন্ত গল্প করলেও আমি কোনো দিন নিজের গল্প করিনি। আধুনিক সিনেমা কী, আর্ট কী, কোনটা উচিত, কোনটা উচিত নয়, কোনটা বালখিল্য হচ্ছে, কোনটা গভীর হচ্ছে—এসবই ছিল আলাপের বিষয়। শিল্প কিন্তু একটা সেন্সরিয়াল ব্যাপার। যেকোনো শিল্পের কাজ কিন্তু যুক্তিহীন হতে পারে না। যুক্তিহীন জিনিস অগ্রহণযোগ্য। যুক্তির ওপর নির্ভর করেই শিল্প হবে; কিন্তু শিল্প যখন হয়ে যাবে, তখন যুক্তিকে অতিক্রম করে যদি দাঁড়াতে না পারে, তাহলে সেটা শিল্প থাকবে না। শিল্পকে বোধের জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। সেটা আর্কিটেকচার, পেইন্টিং, সিনেমা, কবিতা...যা-ই হোক। সেটাই আমি বোঝানোর চেষ্টা করতাম।

 

বুয়েটে আন্দোলন করেছিলেন কেন?

বুয়েটের আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হতে যা যা লাগে, তার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমরা বললাম, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে অ্যাপটিচ্যুড, আর আর্কিটেকচারে পড়ার যে অ্যাপটিচ্যুড—এ দুটি তো আলাদা জিনিস। আমরা যে ভর্তি পরীক্ষা দেব, তাতে দেখব একজন ছাত্রের আর্টিচেকচারে পড়ার ব্যাপারে স্পৃহা আছে কি না। তার ড্রয়িং দেখব আমরা। কিন্তু অঙ্ক, ফিজিকস—এসব নিয়ে বেশি প্রশ্ন দেওয়া হলে তো সে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ভালো হবে। আর্কিটেকচারে কিছু শৈল্পিক চেতনা লাগে। সে জন্য ভর্তি পরীক্ষায় আমরা এসব বিষয়ে কিছু জোর দিতাম। হঠাৎ করে কর্তৃপক্ষ বলল, আমাদের একেকটি ডিপার্টমেন্টের জন্য একেক রকম প্রশ্ন করার সুযোগ নাই। ফলে দেখলাম, আমরা আসলে ভালো ছেলে-মেয়ে পাব না। কারণ পরীক্ষার সিস্টেমটা এমন হবে যে আর্কিটেকচারে পড়ার উপযুক্ত, তাকে বাদ দিয়ে দেব; যে অনুপযুক্ত, তাকে নিয়ে নেব। কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তারা বুঝতে নারাজ। তখন আমরা আন্দোলন শুরু করলাম। এটা ১৯৯০-এর দশকের ঘটনা।

 

আন্দোলনের ফল কী হলো?

কর্তৃপক্ষ আমাদের নানা রকম ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল। আমরা আমাদের ডিপার্টমেন্টের ২৬ জন শিক্ষকের প্রত্যেকেই একসঙ্গে রিজাইন দিলাম। কর্তৃপক্ষ তখন জুনিয়র শিক্ষকদের একেকজনকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে খুব ধমকিয়েছে। চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে বলেছে : ‘ওয়ারেস স্যারের পেছনে গিয়ে তোমার কী লাভ? নিজের জীবন নষ্ট করছ!’ কিছুদিন পর দেখলাম আমাদের মধ্যে ১৩ জন রিজাইন লেটার উইথড্র করে ফেলেছেন। তাঁরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ যেভাবে চায়, সেভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হোক। আমরা, বাকি ১৩ জন বললাম—না, কিছুতেই না! শেষ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন সফল হয়নি। কর্তৃপক্ষ আসলে ব্রিটিশদের মতো পলিটিকস করে আমাদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছিল; আমাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। শিক্ষকতা অবশ্য ছাড়িনি; এখনো পড়াচ্ছি, তবে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে।

 

আর্কিটেকচার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত ছিলেন...

ইনস্টিটিউটকে একটি সিট অব লার্নিং, সিট অব এক্সিলেন্স হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিলাম আমি। পেশা হিসেবে যাঁরা আর্কিটেক্ট অনুশীলন করবেন বাংলাদেশে, তাঁদের জন্য একটা নিয়মনীতি করা, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া, তাঁরা যেন আজেবাজে কাজ করতে না পারেন—তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা, পথ প্রদর্শন করা—এসব কাজ ইনস্টিটিউট থেকে করতে চেয়েছিলাম। ইনস্টিটিউট কোনো ক্লাব নয়, ফুর্তি করার জায়গা নয়; সেটা হবে একটা লার্নেড বডির প্রতিষ্ঠান। ওখানে সেমিনার হবে। আমরা আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরব। প্রয়োজনে প্রতিবাদ করব, সরকারের সঙ্গে বসব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একত্রে কাজ করার চেষ্টা করব, স্থপতিদের জন্য রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস তৈরি করব, আর্কিটেক্ট অ্যাক্ট তৈরি করব, যাঁরা ভালো কাজ করেন তাঁদের অ্যাওয়ার্ড দেব—পরিকল্পনাগুলো আমরা করেছিলাম। ইনস্টিটিউটের সদস্য না হলে প্রফেশন প্র্যাকটিস করতে পারবে না—এ রকম একটা নিয়ম কিন্তু আইন ও চিকিৎসাক্ষেত্রে আছে। আমরা এটা আগেই করেছিলাম। ইনস্টিটিউটটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রথমে ট্রেজারার ছিলাম। এরপর সেক্রেটারিও ছিলাম। দুইবার প্রেসিডেন্ট হয়েছি। এর পর থেকে আর এক্সিকিউটিভ কমিটির সঙ্গে নাই। তবে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কাজে জড়িত হই। ইনস্টিটিউটটি এখন কিছুটা ক্লাব ওরিয়েন্টেড হয়ে গেছে।

 

সংগঠক হিসেবে আপনার ভূমিকা কী ছিল?

আমরা আর্কিটেক্ট অ্যাক্টের ল করতে চেয়েছিলাম। এ জন্য পার্লামেন্টে প্রস্তাব তুলে বিল পাস করতে হয়। আমরা কয়েকবারই তুলেছি, কিন্তু সরকার পাস করেনি। সরকার কখনোই চায় না আমরা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে আর্কিটেক্টদের সংগঠিত করি। অনেক বুঝিয়েছি, ইনস্টিটিউট যদি সেই ক্ষমতা পায়, তাহলে বাজে কাজ করে কোনো সদস্য জবাবদিহির বাইরে থাকবে না। ল পাস না হওয়ায় এই দুর্বলতা আমাদের রয়ে গেছে। তার পরও ইনস্টিটিউটের সদস্য না হলে কোথাও কাজ করা যায় না—এটা অন্তত আমরা করেছি ল ছাড়াই। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট ও আর্কিটেক্ট ইনস্টিটিউট মিলে বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়েছে। এসব কাজে আমি জড়িত ছিলাম। ইনস্টিটিউশনের গঠনতন্ত্রের ড্রাফটটি আমারই লেখা; পরে সবাই অনুমোদন দিয়েছে।

 

সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে, মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এখনো করছেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন?

ভালো না! কারণ আমরা এত আর্কিটেক্ট কাজ করছি, কিন্তু সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। আমাদের ঢাকা শহরে যে দুজন মেয়র হচ্ছেন, এঁরা কিছু করতে পারবেন না! এর জন্য তো প্ল্যানিং লাগবে। প্ল্যানিং তো মেয়র করেন না; করেন আর্কিটেক্টরা। এখানে অন্তত ৬০০ আর্কিটেক্ট এবং এক হাজার ইঞ্জিনিয়ার দরকার; ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার, স্যানিটেশন ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার...। শহর তো একটা ম্যাটেরিয়াল জিনিস; একটা অবজেক্ট। এই অবজেক্টের মধ্যে সব জিনিস জোড়া লাগাতে হবে। ঢাকা শহর নিয়ে প্ল্যান করতে, সব কিছু সমন্বয়ের জন্য বিশাল একটা অর্গানাইজেশন লাগবে। চট্টগ্রাম, খুলনা—প্রতিটি শহরের ক্ষেত্রেই লাগবে। সে জিনিস তো নেই। পুরো ঢাকা শহরকে ঠিক করার মতো বড় একটা অর্গানাইজেশনে কাজ করার যদি সুযোগ পেতাম! প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা ধরে ধরে ঠিক করা সম্ভব। আমরা যখন একটা বিল্ডিং করি, প্রতিটি ইঞ্চি কিন্তু ডিজাইনের মধ্যে থাকে। সুন্দর সুন্দর অনেক বিল্ডিং হচ্ছে ঢাকায়। ভারতে গিয়ে তুলনা করে দেখবেন, সেখানকার চেয়ে অনেক ভালো বিল্ডিং এখানে হচ্ছে। আমরা এই উপমহাদেশে আর্কিটেকচারে খুবই ভালো। কিন্তু আমাদের নিয়ে এমন কোনো অর্গানাইজেশন দাঁড় করানো হয়নি, যেটির ওপর নির্ভর করবে সব কিছু।

 

ঢাকার পুনর্বিন্যাস করতে এফ আর খানের সাহায্য নিয়েছিলেন

ফজলুর রহমান খান (এফ আর খান) একজন বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলী। তিনি ও মাজহারুল ইসলাম একই কলেজ থেকে, একই ডিপার্টমেন্ট থেকে পড়াশোনা করেছেন। তিনি জুনিয়র ছিলেন। দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ায় শেষটা করেছেন আমাদের আহসানউল্লাহ কলেজ (বুয়েট) থেকে। এরপর আমেরিকার শিকাগোতে যান পিএইচডি করতে। সেখানেই ক্যারিয়ার গড়েছেন। তিনি টল বিল্ডিংয়ের (৫০ থেকে ১০০ তলা) এক্সপার্টই শুধু ছিলেন না, বরং এর ইঞ্জিনিয়ারিংটাই পরিবর্তন করে দিয়েছেন। টিউব অ্যান্ড টিউব, বান্ডেল সিস্টেম—এ রকম কতগুলো সিস্টেম তাঁরই তৈরি। এফ আর খানের থিওরিতেই সারা দুনিয়ায় এখন টল বিল্ডিং করা হয়। সেই ভদ্রলোক বাংলাদেশের মানুষ; ফরিদপুরে জন্ম—এটা তো আমাদের জন্য বিরাট গর্বের বিষয়। তিনি বাংলাদেশে এলেই আমরা যোগাযোগ করতাম। আমি যখন আর্কিটেক্ট ইনস্টিটিউটের সেক্রেটারি ছিলাম, তাঁকে দুইবার এনেছি লেকচার দেওয়ার জন্য। লেকচারের পর গল্প করার ভেতর দিয়ে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আমরা কিছু কাজও করেছিলাম। বাংলাদেশের দুটি গ্রামে (সাভারের পার্শ্ববর্তী) কিছু ডেভেলপমেন্টের জন্য সার্ভে করে তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি আমাদের সে ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন। তা ছাড়া পুরো ঢাকা সিটির প্ল্যান করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম আমরা। তিনি একটা পোর্টফোলিও পাঠিয়েছিলেন। এটা ১৯৭৯-৮০ সালের কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ জিনিসটা করে দেব। আমার ফার্ম কাজ করবে।’ তাঁর ফার্ম এসওএম (স্কিডমোর, ওইংস অ্যান্ড মেরিল) পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর্কিটেকচার ফার্ম। তিনি এটির অন্যতম স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই ফার্মের মাধ্যমে অলমোস্ট বিনা পয়সায় কাজটি করে দেবেন।

 

কাজটি হলো না কেন?

আমরা সেই প্রপোজাল নিয়ে রাজউকের সঙ্গে আলাপ করেছি; কিন্তু রাজউক পাত্তাই দেয়নি। তবু তাঁর কাছ থেকে পাওয়ার পর উত্তেজনায় তাড়াতাড়ি রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিয়েছি প্রপোজাল। কিছুদিন পর খোঁজ নিয়ে জানলাম, রাজউক নাকি সেটি হারিয়ে ফেলেছে! লজ্জায় আমরা এফ আর খানের সঙ্গে কথাই বলতে পারছিলাম না। দুর্ভাগ্যক্রমে প্রপোজালটির কোনো কপিই আমরা রাখিনি। আমাদেরও দোষ আছে। ওটাকে নিয়ে আরো তদবির করার দরকার ছিল। তখনো তো আমাদের তত বয়স হয়নি। বুঝতে পারিনি, কী করব। তার পরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা যখন ভাবছিলাম, তখন হঠাৎ করেই ৫২ বছর বয়সে তিনি মারা গেলেন। তাঁর মৃত্যুর কারণে বিষয়টি স্থগিত হয়ে গেল।

 

লুই কানের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন...

লুই কান আমাদের পুরো শেরেবাংলানগরের স্থপতি। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ ভবনটি সারা পৃথিবীতেই নামকরা। অনেকের মতে, এটিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিল্ডিং। কারণ পৃথিবীতে যত নামকরা বিল্ডিং আছে, তার সব ভালো জিনিসই এটিতে রয়েছে। এটির ফর্ম অসাধারণ। লুই কান বুয়েটে দু-তিনবার লেকচার দিয়েছেন। আমরা পাস করে যাওয়ার পরও এসেছেন। তবু আমরা তাঁর লেকচার শুনতে ক্লাসে গিয়েছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই লেকচারগুলো রেকর্ড করে রাখার ভাবনা তখন মাথায় আসেনি। তাঁর ঢাকা অফিসে ছাত্রাবস্থায় আমিও কিছুদিন কাজ করেছি। মূলত শিক্ষানবিশ হিসেবেই শর্ট ড্রয়িং করতাম। লুই কান খুবই উঁচুমাপের মানুষ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে তেমন কথাবার্তা হয়নি। একবার একটি সরকারি অফিসে এক সচিব তাঁকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছিলেন। আমি আর রশিদ তাঁর সঙ্গে ছিলাম। খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম আমরা। একসময় বললাম, ‘এতক্ষণ ধরে বসিয়ে রেখেছে আপনাকে! আপনি এত বিখ্যাত একজন আর্কিটেক্ট। কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না!’ তিনি বললেন, ‘পৃথিবীর বেশির ভাগ আমলাই এ রকম হন, আমি জানি। আমার কথা ভেবে তুমি লজ্জা পেয়ো না।’

 

নিজের কাজ সম্পর্কে আপনার ভাবনা?

শিক্ষকতাও করেছি, কাজও করেছি। আমার মনে হয়েছে, কাজ না করলে শিক্ষকতাও ঠিকমতো করতে পারব না। কারণ কাজের ভেতর দিয়ে অভিজ্ঞতা বাড়বে, শিক্ষকতা আরো বেশি ফলপ্রসূ হবে। এ জন্য সব সময়ই কাজের মধ্যে থাকার চেষ্টা করেছি। কাজের মধ্যে বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্য তৈরি করার চেষ্টা করেছি। আধুনিক বলতে আমি আধুনিক বাঙালিকে বোঝাচ্ছি। তার মানে, যে মানুষ একই সঙ্গে বাঙালি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মানুষ। আমাদের প্রাচীনকালের অনেক ডেকোরেশন ছিল। ইসলামী, হিন্দু, বৌদ্ধ অনেকের আর্কিটেকচার ছিল। আমি সে ধরনের কাজ একেবারে পরিহার করতে বলতাম। আধুনিক জিনিসটা হচ্ছে অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্ম, লাইনস, প্লেনস, কালারস। আজকাল আমরা ফুল, লতা-পাতা দিয়ে ডেকোরেশন করি না। আমরা একটা টেক্সচারে চলে গেছি। ম্যাটেরিয়ালের নিজস্ব যে টেক্সচার থাকে, সেটাকেই আমরা সুন্দর মনে করি। প্লাস্টার করে ফুল আঁকার ও গাছ আঁকার বিষয়টিকে আমরা অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর মনে করি। আগে সিমেন্ট দিয়ে গাছ আঁকত না? আমরা ওটাকে দরকারি মনে করি না।

 

শিশু পার্কের ডিজাইন করার সময় কোন ভাবনা মাথায় ছিল?

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মধ্যে একটা শিশু পার্ক হবে। এটির সিদ্ধান্ত সরকারই নিয়েছে; আমি শুধু ডিজাইনটি করেছি। বেশ অনেক বছর এটিই ছিল এ শহরে শিশুদের একমাত্র জায়গা। এখনো অনেক শিশু ওখানে যায়। ওটাতে তো বড় কোনো স্থাপত্য নেই। শিশুদের খেলার জায়গা আর কিছু স্ট্রাকচার শুধু। কখনো যদি সরাতে হয়, সে জন্য এটাকে একতলাই করা হয়েছে। আমার ধারণা ছিল, শিশু পার্কটি তৈরি করা হলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ওপেননেসটা কিছুটা ব্যাহত হবে। তবু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মধ্যে শিশুদের জন্য একটা জায়গা ছেড়ে দেওয়া খারাপ নয়। বেসিক কিছু ট্রায়াঙ্গল সার্কেল নিয়ে আমি কাজটি করেছিলাম। প্রবেশপথে ট্রায়াঙ্গলের একটা গেট আছে। আমার ইচ্ছা ছিল শিশুদের জিওমেট্রির ফর্ম শেখানো। সার্কল ছিল, ওখানে একটা ট্রেন ছিল। ওই সব জিনিস তো তখন আমাদের দেশে ছিল না। একটা ট্রেনে চড়ে শিশুরা যাচ্ছে। হুইহুই করে আওয়াজ হচ্ছে। এক ধরনের মেরিগো রাউন্ড। অনেক কিছু ছিল। শিশুরা যেন প্রতিটি স্ট্রাকচারে পরোক্ষভাবে জিওমেট্রি শিখে ফেলে। শিশুদের প্রভাবিত করার মতো কিছু করার চেষ্টা ছিল আমার।

 

বোটানিক্যাল গার্ডেন?

বোটানিক্যাল গার্ডেনে কিছু গ্রিনহাউসের দরকার ছিল। ওখানে আমি কিছু গ্রিনহাউসের ডিজাইন করেছি। এই হাউসগুলো না হলে গার্ডেনটি মেইনটেইন করতে সমস্যা হচ্ছিল। সেখানে একটা অবজারভেশন টাওয়ার করা হয়েছে পরিবেশকে কোনো রকম ডিস্টার্ব না করে। এ রকম ছোট ছোট কিছু কাজ করেছি।

 

জীবনকে কিভাবে দেখেন?

জীবনকে তো ইতিবাচকভাবেই দেখতে হবে! দেশপ্রেম একটা বেসিক ব্যাপার। দেশপ্রেমকে যদি আমরা সংস্কৃতির মধ্যে লালন না করি, তাহলে সেটা চলেও যেতে পারে। আর সেটা চলে গেলে দেশের কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকবে না। অতএব এটাকে রক্ষা করতে হবে। শিক্ষায় এগিয়ে গেলে ওই জাতিকে  পেছনে ফেলা যায় না। দারিদ্র্য কিন্তু কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা শিক্ষায়। মানুষ দারিদ্র্যকে এড়িয়ে যেতে পারে। কত নামকরা লোক তো অভাবে জীবন কাটিয়েছেন; সেটা তো সমস্যা হয়নি। কিছু মানুষ প্রচুর বড়লোক হয়ে যাচ্ছে, এটাই সমস্যা!

 

(১ জানুয়ারি ২০২০, ধানমণ্ডি, ঢাকা)

শ্রুতলিখন : রুদ্র আরিফ ও আবদুর রাজ্জাক

মন্তব্য