kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বড় কাজ করতে গেলে খুবই শান্ত থাকতে হয়

১১ ডিসেম্বর ৪০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিআরপি’র (সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড)। এটির পরিকল্পক ও প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি অ্যান টেইলর। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্যের এই নাগরিক বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০০৪ সালে তিনি ‘স্বাধীনতা পদক’ পেয়েছেন। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এমপায়ার’ পদকে ভূষিত করে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শেখ হাসান রুহানি। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



বড় কাজ করতে গেলে খুবই শান্ত থাকতে হয়

ছোটবেলা কেমন ছিল? 

১৯৪৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের কেন্ট কাউন্টির বাগানঘেরা ব্রমলি শহরে আমার জন্ম। বাবা উইলিয়াম টেইলর ও মা মেরি টেইলর। তিন বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। বড় বোন মারগারেট ও ছোট বোন ম্যাজ। আমার যখন দুই বছর বয়স, তখন বাবা সপরিবারে আর্জেন্টিনায় চলে যান। ছোট বোন ম্যাজের জন্ম সেখানেই। আর্জেন্টিনায় বাবা ধর্মযাজক হিসেবে কাজ করতেন। সে দেশের লস কোকোসে বাবা ও মা মিলে অসহায়, পরিত্যাজ্য শিশুদের জন্য একটি এতিমখানা তৈরি করেছিলেন। ওই সময় আমাদের গৃহপরিচারিকা গ্যাবিনা আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে মানুষের জন্য কিছু করার প্রেরণা পেয়েছিলাম মা-বাবার কাছ থেকে। শৈশবে আমার বড় বোন আর আমি আর্জেন্টিনার একটি স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। স্প্যানিশ ভাষা তখনই শিখেছি। শৈশবে আমি ছিলাম দুরন্ত। সারা দিন গাছে ওঠা, স্থানীয় ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা, মারামারি এবং আশপাশের ফলের বাগান থেকে ফল চুরি করে খাওয়া...কত মজাই না করতাম! ১৯৪৯ সালে আমাদের পরিবার আবার যুক্তরাজ্যে ফিরে আসে। ফিরেছিলাম জাহাজে। জীবনের প্রথম সেই দীর্ঘতম সমুদ্রযাত্রা, বিষুবরেখা অতিক্রম করার স্মৃতি আজও মনে আছে। দেশে ফিরে আমরা যুক্তরাজ্যের গ্রেভসেন্ড শহরে বসবাস করতাম। দুই বছর পর বাকিংহামশায়ারের হাডেনহাম গ্রামে স্থায়ী হই।

 

পড়াশোনা কোথায় করেছেন?

যুক্তরাজ্যের ক্লিভডনে গির্জার যাজকদের মেয়েদের জন্য একটি আবাসিক স্কুল ছিল—সেইন্ট ব্যান্ডন। আট বছর বয়সে ওই স্কুলে আমার শিক্ষাজীবনের প্রকৃত শুরু। ছোট বোন ম্যাজও একই স্কুলে ভর্তি হয়। এই স্কুলে আমি দশ বছর লেখাপড়া করেছি। শৈশব থেকেই আমি দায়িত্ব সচেতন ছিলাম। স্কুলে খেলাধুলায় অংশ নিতাম। দৌড় প্রতিযোগিতা, সাঁতার ও টেনিস খেলা—এসব খুব প্রিয় ছিল। আমি ছিলাম স্কুলের হেড গার্ল। স্কুল আমার খুব ভালো লাগত। অন্যদিকে আমাদের পারিবারিক বন্ধন ছিল সুনিবিড়। এ-লেভেল পরীক্ষার পর ইচ্ছা ছিল ডাক্তারি পড়ব। কিন্তু দুবারের চেষ্টায়ও ডাক্তারিতে ভর্তি হতে পারিনি। পরে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। ১৮ বছর বয়সে সেইন্ট থমাস হসপিটাল স্কুল অব ফিজিওথেরাপিতে ভর্তি হই। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার জীবন শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য উৎসর্গ করব।

 

সে সময় বিশেষ কেউ প্রেরণা জুগিয়েছে?

ডরোথি উইলসনের লেখা তিনটি বই আমার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছিল। বই তিনটি ভারতের ভেলোরে অবস্থিত খ্রিস্টিয়ান মেডিক্যাল কলেজ হসপিটালের তিনজন খ্যাতিমান ব্যক্তির কাজের ওপরে লেখা জীবনালেখ্য। প্রথম বইটি ছিল একটি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. সাডার, দ্বিতীয়টি প্যারাপ্লেজিক অ্যানেসথিটিস্ট মেরি ভারগিজ আর তৃতীয়টি কুষ্ঠরোগীদের নিয়ে ডা. পল ব্র্যান্ডের কাজের ওপর। বই পড়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, পড়াশোনা শেষে ভারতীয় উপমহাদেশেই কাজ করব। এ জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভলান্টারি সার্ভিস ওভারসিজে (ভিএসও) আবেদন করেছিলাম। ভিএসও আমাকে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনের পরামর্শ দিল। দুই বছর ওয়েকসহ্যাম পার্ক হসপিটালে কাজ করেছি। এ সময় আমি হাসপাতালটির সঙ্গে সংযুক্ত ফ্যামহ্যাম রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করি।

 

বাংলাদেশে এলেন কবে?

১৯৬৯ সালে ভিএসওর মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) প্রথম আসি। এখানে এসে চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটি পরিচালিত খ্রিস্টান হাসপাতালে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে যোগ দিই। হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স এবং সব রোগী ছিল বাংলাভাষী। কাজের সুবিধার্থে বাংলা শিখে নিলাম। মনে পড়ে, বাংলা শেখার জন্য দুই মাস বরিশালে ছিলাম। চন্দ্রঘোনা খ্রিস্টান হাসপাতালে প্রথমে চারজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীকে ফিজিওথেরাপি সেবা দেওয়ার মাধ্যমে আমার পেশাগত কাজ শুরু হয়। ওই চার রোগী কোমরে আঘাত পেয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছিলেন। ওই রোগীদের জন্য অর্থনৈতিক কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। তাঁদের পরিবার সমাজের গলগ্রহ হয়ে পড়েছিল। বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল।

 

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে আপনার অভিজ্ঞতা?

যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনার মিশনারি সোসাইটির সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সব স্বেচ্ছাসেবককে মালামাল পরিবহনকারী বিমানযোগে ঢাকা থেকে ব্যাংকক হয়ে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমি দেশে ফিরে পুরনো কর্মস্থলে যোগ দিই। তখন ভারতে বাংলাদেশি শরণার্থী শিবিরে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। আসার চেষ্টাও করেছিলাম; কিন্তু অনুমতি পাইনি। অবশেষে ১৯৭১ সালের নভেম্বরে, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আসি। তখন পুরোদমে যুদ্ধ চলছিল। ঢাকা এবং চট্টগ্রাম—দুই জায়গাই ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখলে। এয়ারপোর্ট, রেডিও স্টেশন এবং রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা লুকিয়ে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। ১৬ই ডিসেম্বর হঠাৎ শুনতে পেলাম ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। জানলাম, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে সে সময় বিদেশি সাহায্য আসতে শুরু করে। আর সেটি দেশের সেই সংকটকালে উপকারে লেগেছিল। প্রচুর যুদ্ধাহত পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির সেবা করার সুযোগ পেয়েছি তখন।

 

সিআরপি প্রতিষ্ঠার চিন্তা কিভাবে এলো?

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল গরিব, অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কাজ করব। তাদের পাশে দাঁড়াব। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশে এসে দেখেছিলাম, এখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি তাদের ঘিরে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কুসংস্কারও ছিল। তাদের জীবনযাপন, চলাফেরা, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, চিকিৎসা শেষে সমাজে ফিরে গিয়ে তারা কী করবে—তেমন কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এসব সমস্যা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। ১৯৭৩ সালে ভিএসওর সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার পর আমি যুক্তরাজ্যে ফিরে যাই। ওই সময় বাংলাদেশে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য জোগানোর চেষ্টা করি। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আমি স্টানমোরের রয়াল অর্থোপেডিক হাসপাতালে কাজ করেছি। সেখানে মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করি। এরপর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসি।

 

শুরুতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কাজ করেছেন।

ওই বছর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের রিট্রেইনিং অ্যান্ড জব রিপ্লেসমেন্ট প্রজেক্ট শুরু করে। হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন মার্কিন নাগরিক ডা. আর জে গার্স্ট। হাসপাতালে প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। ১৯৭৫ সালে এই হাসপাতালেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ফিজিওথেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপির প্রশিক্ষণ কোর্স চালু হয়। ১৯৭৬ সালে প্রথম ব্যাচের কোর্স সম্পন্ন হয়। ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে সাহেদ, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হিসেবে শওকত এবং সমাজকর্মী হিসেবে অন্য একজনকে আমি বেছে নিই। মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত ৪০-৫০ জন রোগীর চিকিৎসা শুরু করি হাসপাতালের ‘সি’ ওয়ার্ডে। সিআরপির প্রাথমিক সূচনা কিন্তু সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিত্যক্ত দুটি গুদামঘরে। সরকারি হাসপাতালে কাজ করা ছিল কঠিন। তখন ডেভিড ন্যাওয়েল ছিলেন ঢাকার অক্সফামের (আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা) পরিচালক। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেন। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিত্যক্ত গুদামঘরে আমাদের কাজের অনুমোদন পেতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই বছর। আরো এক বছর লেগেছিল তহবিল সংগ্রহ করতে। এরপর গুদামঘর সংস্কারের কাজে সহযোগিতা করেছিলেন ডেভিড সোরিল। অক্সফাম ও ডাচ কম্পানি ‘আইসিসি’ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়েছিলাম।

 

সাভারে কার্যক্রম শুরু করলেন কখন?

আমাদের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ১১ ডিসেম্বর। প্রথমে ধানমণ্ডি সেন্টার চালু করি। ১৯৮৫ সালে চলে আসি ফার্মগেটে। নতুন সেন্টারে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সেবা কার্যক্রমের দিন দিন উন্নতি হচ্ছিল। নথিপত্র অনুযায়ী ১৯৮৬-৮৭ সালে এখানে মোট ৫০০ রোগী সেবা নিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে ঢাকার অদূরে সাভারে মো. শাহাবুদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে পাঁচ একর জমি কিনে আমরা বড় পরিসরে কাজ শুরু করি। এটাই ছিল সিআরপির মালিকানাধীন প্রথম জমি। পরে এখানে আরো জমি কেনা হয়। মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ একর। জমি কেনার জন্য ফ্রেন্ডস অব সিআরপি, বিদেশি সংস্থাসহ অনেক ব্যক্তির আর্থিক সহায়তা পেয়েছি। প্রথম দিকে সিআরপি খুব সাধারণ অবস্থায় ছিল এবং সেবাগুলো গোছানো ছিল না। একটি লম্বা টিনের ঘরে রোগীরা থাকত। অপর পাশে কয়েকটা পাকা ঘর ছিল, যেখানে থেরাপি সেবা চলত। একই ঘরে বিভিন্ন ধরনের রোগীকে সেবা দেওয়া হতো। মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের সেবাদানের জন্য প্রথম দিকে দুই মাসের বিশেষ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে নার্সদের তৈরি করা হতো। এক সময় আমরা উপলব্ধি করলাম, পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের পুনর্বাসন সেবার জন্য দক্ষ রিহ্যাবকর্মী দরকার। এ লক্ষ্যে স্টেট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টির আওতায় চার বছরের ফিজিওথেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপির অ্যাসিস্ট্যান্ট কোর্স চালু করা হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিদেশি ভলান্টিয়ার ক্লাস নিতেন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের প্রয়োজনীয় বইপত্র বিনা মূল্যে প্রদান করতেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট থেরাপিস্টদের শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য সিআরপিতে বিএইচপিআই-এর (বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট) জন্ম। ১৯৯৪ সাল থেকে এখানে শুরু হয় ডিপ্লোমা কোর্স।

 

১৯৭৬ সালে প্রথম ব্যাচের কোর্স সম্পন্ন হয়। ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে সাহেদ, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হিসেবে শওকত এবং সমাজকর্মী হিসেবে অন্য একজনকে আমি বেছে নিই। মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত ৪০-৫০ জন রোগীর চিকিৎসা শুরু করি হাসপাতালের ‘সি’ ওয়ার্ডে। সিআরপির প্রাথমিক সূচনা কিন্তু সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিত্যক্ত দুটি গুদামঘরে। সরকারি হাসপাতালে কাজ করা ছিল কঠিন। তখন ডেভিড ন্যাওয়েল ছিলেন ঢাকার অক্সফামের (আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা) পরিচালক। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেন। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিত্যক্ত গুদামঘরে আমাদের কাজের অনুমোদন পেতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই বছর। আরো এক বছর লেগেছিল তহবিল সংগ্রহ করতে। এরপর গুদামঘর সংস্কারের কাজে সহযোগিতা করেছিলেন ডেভিড সোরিল। অক্সফাম ও ডাচ কম্পানি ‘আইসিসি’ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়েছিলাম।

 

সিআরপির কার্যক্রম...

শুরুতে সিআরপি মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের সেবা দিত। পরে বিভিন্ন রকমের রোগী আসতে শুরু করে। ১৯৯১ সালে বহির্বিভাগে থেরাপি সেবা কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপি সেবা দেওয়া হচ্ছে। ১৯৯৫ সাল থেকে ইনডোর সার্ভিসের আওতায় শিশু রোগীদের ফিমেল ওয়ার্ডে দেখা হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম বিএসসি কোর্স (ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপি) চালু হয়। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি কোর্স চালু হয় ২০০৪ সালে। ২০০৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি বিভাগ। আমাদের কাজের ধরন বহুমাত্রিক। শুধু রোগীর সেবা নয়, তাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও আমরা ভূমিকা রাখছি। বর্তমান সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় দেশের ৮টি জেলার ৬১টি উপজেলায় সিআরপির সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি (সিবিআর) চালু আছে। আমরা মনে করি, একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার হলে তার পক্ষে আগের পেশায় ফিরে যাওয়াটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সিআরপি পুনর্বাসন সেবার অংশ হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করে। তাদের কর্মক্ষম করার উদ্দেশ্যে সিআরপির সাভার ও গণকবাড়ী কেন্দ্রে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে বিনা মূল্যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার ব্যক্তিদের নিজ নিজ শিক্ষা, দক্ষতা ও আগ্রহ অনুযায়ী সেলাই, ইলেকট্রনিকস মেরামত, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, দোকান ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যাপারেও তাদের সহায়তা করা হয়।

মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের পুনর্বাসন সেবা দিতে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সহায়ক সামগ্রীর প্রয়োজন পড়ে। সিআরপিতে এখন হুইলচেয়ার, ট্রাইসাইকেল, স্ট্যান্ডিং ফ্রেম, এলবো ক্র্যাচ, লাম্বার করসেট, টেইলর ব্রেসসহ প্রায় ২৬ ধরনের স্বাস্থ্য সহায়ক সামগ্রী উৎপাদন করা হয়। ১৫০ ধরনের কাঠের স্বাস্থ্য সহায়ক সামগ্রী এবং থেরাপিউটিক ডিভাইসও তৈরি করা হয় রোগীদের চলাচলে সহায়তা করার জন্য।

 

উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি টেইলর স্কুল গড়ার গল্পটা বলেন

আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা অর্জনে সমান সুযোগের অভাব রয়েছে। বৈষম্য প্রথা সব সময়ই তাদের পেছনে ফেলে দেয়। কারণ আমাদের দেশে শিক্ষা কার্যক্রমে বরাবরই স্বাভাবিক শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হলেও বেশির ভাগ স্কুলে যাতায়াতের সুবিধা থাকে না। আবার কোনো কোনো স্কুলের দূরত্ব বেশি। বেশির ভাগ প্রতিবন্ধীর জন্য বিশেষ স্কুলের প্রয়োজন পড়ে। যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করা প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশুর মৌলিক অধিকার। এই বিশ্বাস থেকেই ১৯৯৬ সালে সিআরপিতে উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি টেইলর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি।

 

উপকেন্দ্র ও বিভাগীয় কেন্দ্র চালুর ভাবনা

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সিআরপির সেবাকর্মকে আমরা সারা দেশে পৌঁছে দিতে চাই। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আন্তরিক সহযোগিতায় প্রধান কার্যালয় সাভার সিআরপি ছাড়াও ১২টি সাব-সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এগুলো রয়েছে সাভারের গণকবাড়ী; সিআরপি-মিরপুর, ঢাকা, সিআরপি-নবাবগঞ্জ, সিআরপি-মানিকগঞ্জ, সিআরপি-গোবিন্দপুর, সিআরপি-মৌলভীবাজার, কারসা ফাউন্ডেশন সিআরপি-বরিশাল, এ কে খান সিআরপি-চট্টগ্রাম, আফসার হোসেন সিআরপি-রাজশাহী, সিআরপি পাবনা ডায়াবেটিক সমিতি, বাউবি শাখা সিআরপি-ময়মনসিংহ, ইসকন্দর সিতার সিআরপি-সিলেট। সম্প্রতি দেশের প্রতিটি বিভাগে বিভাগীয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে রংপুর বিভাগ ও খুলনা বিভাগে সেবাকার্য সমপ্রসারণ করেছে সিআরপি।

 

এত বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে গিয়ে কোনো বাধা পেয়েছেন?

সিআরপি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমাদের অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এটির জন্মলগ্নে আমার নামে এনএসআইতে (জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল—আমি নাকি স্টাফদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করি, প্রতিবন্ধী শিশুদের অপহরণ করে বিদেশে পাচার করি! স্টাফদের জোর করে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগও উঠেছিল। সময়ের আবর্তে সেগুলোর কোনোটাই টিকতে পারেনি। কারণ আমরা পেশার প্রতি সৎ থেকেছি। অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। মানুষের জন্য কল্যাণমুখী চিন্তা এবং আমার সহকর্মীদের আন্তরিকতায় গড়ে উঠেছে আজকের সিআরপি।

 

আপনার ব্যক্তিগত জীবন?

পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের সেবা ও কল্যাণের কাজেই আমার জীবনের অধিকাংশ সময় পার করে ফেলেছি। সংসার করিনি। আমার জীবনে কোনো বিলাসিতা নেই। আমি স্বল্পাহারী। সব সময় মানুষের কল্যাণ করতে চেয়েছি। সুদূর ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসেছি বিপন্ন, হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী মানুষের সেবা দিতে। ইংল্যান্ডে ফিজিওথেরাপির বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না; আমি ট্রেনিং নিয়েছিলাম ফিজিওথেরাপির স্কুল থেকে। ১৯৮৩ সালে সেরেব্রাল পালসি এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত জ্যোতিকে দত্তক নিয়েছি। দত্তক নেওয়ার আগে তার কোনো মা ছিল না। এতিমখানায় জ্যোতি নিজের বিছানায় প্রিয় আয়া মায়ার সঙ্গে থাকত। সবার সঙ্গে ওর একটি ভালো সম্পর্ক ছিল। সব এতিম শিশুর মধ্যে ওকে আমার বিশেষ ভালো লেগে যায়। আমার বন্ধু ক্যারলও মার্টিন ও জুলিয়া নামের দুটি বাচ্চাকে দত্তক নিয়েছে। আমি যখন কাজে ডুবে থাকতাম, জ্যোতি ওদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। জ্যোতিকে ইংল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছিলাম ওর পরিবারের সঙ্গে দেখা করানোর জন্য। স্কুলে ভর্তির বয়স হলে সে হলিক্রস স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল। ফ্রেমের সাহায্যে পায়ে হেঁটে প্রতিদিন স্কুলে যেত। ওর ফ্রেমের মধ্যে একটি রিংগিং বেল দেওয়া হয়েছিল, যেন যাতায়াতে সুবিধা হয়। ফার্মগেটে থাকার সময় কানাডিয়ান সমাজকর্মী বেট্টি স্টেইন ক্রাস পরিচালিত সহায়-সম্বলহীন নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রটি দেখতে গিয়েছিলাম। ওখানেই পপির সঙ্গে প্রথম দেখা। সে সেরেব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। ওকে আমি আমার দ্বিতীয় মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছি। দুই মেয়েকেই কাজ শিখিয়েছি। দুজনই সিআরপিতে চাকরি করছে।

 

১১ ডিসেম্বর সিআরপির ৪০ বছর পূর্তি হচ্ছে...

সিআরপির ৪০ বছর পূর্তি আমাদের জন্য অনেক গর্বের, সম্মানের। পেছনে ফিরে তাকালে অনেক দুঃখ-কষ্ট, সংগ্রামের কথা মনে পড়বে। বড় কাজ করতে গেলে খুবই শান্ত থাকতে হয়। স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে আমরা যে আস্থা অর্জন করতে পেরেছি, সেটিই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। বহু মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে এ প্রতিষ্ঠান। আমরা সেবা নিশ্চিত করেছি ঠিকই, পাশাপাশি দায়িত্ব বেড়েছে বহু গুণ। এ জন্য সিআরপির প্রতিটি কর্মীকে কৃতিত্ব দিতে চাই। সিআরপি ট্রাস্টকে ধন্যবাদ দিতে চাই। তারাই এ প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মূলত তাদের যোগ্য নেতৃত্ব, পরিশ্রমে সিআরপি মানুষের নির্ভরতা অর্জন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে নাগরিকত্ব দিয়েছেন। এ জন্য আমি গর্বিত। আমৃত্যু বাংলাদেশের মানুষকে সেবা দিতে চাই। সেবাই আমার আনন্দ।

 

(সাভার, ঢাকা; ৩ ডিসেম্বর ২০১৯)

 

মন্তব্য