kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

ব্যাংকের হিসাবের খাতায় গান লেখায় আমার চাকরি চলে যায়

খ্যাতিমান শিল্পী ও গীতিকার সাইদুর রহমান বয়াতি। ৮৮ বছর বয়সেও তাঁর কণ্ঠে তারুণ্যের ছাপ। জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, মারফতি, কবিগান, রাখালিয়া, গাজির গানসহ প্রায় ৫০ রকমের গান জানেন তিনি। গান লিখেছেন দুই হাজারের বেশি। গবেষকদের কাছে তিনি একজন রিসোর্স পারসন। সংগীতে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি পদকসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেছেন। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন শেখ মেহেদী হাসান

১৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে




ব্যাংকের হিসাবের খাতায় গান লেখায় আমার চাকরি চলে যায়

ছেলেবেলার দিনগুলো কেমন ছিল?

আমার জন্ম ১৯৩১ সালে, বৃহত্তর ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের পশ্চিম হাসলি গ্রামে। পাঁচ পুরুষ ধরে আমরা এই গ্রামে বসবাস করছি। আমার আব্বা জিকের আলী ও মা কুসুমি বিবি। মা-বাবা দুজনই সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ মানুষ ছিলেন তাঁরা। ছেলেবেলা থেকে আমার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিল গান-বাজনা করা। স্কুলে যেতে মন চাইত না। মন পড়ে থাকত খেলাধুলায়। খুব ছোটবেলায় আমি মেয়েলি গান, সারিগান, মুর্শিদিগান শিখেছিলাম। মেয়েদের সঙ্গে মিশতে আমার ভালো লাগত। তাদের সঙ্গে পুতুল খেলতে, ডাঙ্গুলি খেলতে ভালো লাগত। এ নিয়ে বন্ধু-বান্ধব ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত। কেউ কেউ বলত, ‘তুই কি একটা মেয়েমানুষ? সারাক্ষণ মেয়েদের সঙ্গে খেলিস!’ তখনকার দিনে চৈত্র-বৈশাখ মাসে বৃষ্টির আশায় মানিকগঞ্জে মেয়েদের কণ্ঠে সারিগান গাওয়ার প্রচলন ছিল। একবার পরিবারের সবাই মিলে বৃষ্টির প্রত্যাশায় গান করছিলাম। সেই দলে আমার মা, চাচি, প্রতিবেশী অনেকেই ছিলেন। আমি বুক চাপড়িয়ে সারিগান করছিলাম। গান গাওয়ার একপর্যায়ে আচমকা একজন আমাকে কান ধরে টেনে তুললেন। তাকিয়ে দেখি তিনি আমার ভগ্নিপতি, ইয়াসিন আলী। পশ্চিম হাসলি স্কুলের মাস্টার। তিনি আমাকে স্কুলে নিয়ে ভর্তি করে দিলেন।

 

গানের আসর থেকে সরাসরি স্কুলে ভর্তি হলেন?

হ্যাঁ, গানের আসর থেকে সরাসরি পশ্চিম হাসলি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম। স্কুলের নিয়ম-শৃঙ্খলা আমার ভালো লাগত না। মন পড়ে থাকত গানের মধ্যে। এ জন্য স্কুলের বইয়ের পড়া, লেখালেখি শেষ করে নিজেই সুর সাধনা করতাম। আমার প্রথম গানের গুরু বাবা। তিনি নানা রকমের গান জানতেন। তাঁর কাছে জারিগান, সারিগান, মারফতিগান, মুর্শিদিগান, কবিগান, মাদার পীরর গান ইত্যাদি শিখেছি। মনে পড়ে, ছোটবেলায় আমি গান গাইতাম আর মা পাশে বসে শুনতেন। বাবা যেহেতু গান গাইতেন, এ জন্য মা কিছু বলতেন না। তবে মা চাইতেন গান শেখার পাশাপাশি আমি যেন স্কুলের লেখাপড়া ঠিকমতো করি। কিন্তু পড়াশোনায় আমার মন বসত না। প্রাইমারি স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হলাম নবগ্রাম হাই স্কুলে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি লজিং থাকতাম নবগ্রামের জহির বয়াতির বাড়ি। জহির বয়াতি একজন গুরুশিল্পী। আমাকে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর কাছে গানের পাশাপাশি সারিন্দা, দোতারা, বায়া, খঞ্জনি বাজাতে শিখেছিলাম। প্রতিদিন তালিম নিতাম। এর মধ্যে দেশে ভাষা আন্দোলন শুরু হলো।

 

আপনি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত কিভাবে হয়েছিলেন?

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামে নতুন দেশ হলো। এর আগে আমরা ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক ছিলাম। পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার পর আমাদের মনে বেশ প্রভাব পড়েছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে এলে আমি মানিকগঞ্জ থেকে হেঁটে তাঁকে দেখতে এসেছিলাম। সেদিন তিনি ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররা তাঁর ভাষণের প্রতিবাদ করে। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন। এই আন্দোলন আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল। তখন আমি একটি গান লিখি, ‘আমার ভাষায় বলব কথা/তোদের কেন মাথাব্যথা?/এই ভাষাতে জুড়ায় প্রাণ,/তোদের কি তাতে যায় রে মান?’ এই গান আমি বিভিন্ন আসরে, বাজারে গেয়ে বেড়াতাম। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখনো আমি গান গেয়েছি। মানুষকে নায্য আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছি।

 

ভাষাসংগ্রামী রফিককে নিয়ে গান লিখেছিলেন।

ভাষাসংগ্রামী রফিক শহীদ হওয়ার পর আমি তাঁকে নিয়ে একটি গান রচনা করি। গানটির কথা ছিল, ‘মারিস না মারিস না ওরে, মারিস না বাঙ্গাল/এ দেশ ছেড়ে পালাবি তোরা, পালাবে না এই বাঙ্গাল।’ 

 

আপনি তো শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী—এঁদেরও গান শুনিয়েছেন?

১৯৫৪ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের এক জনসভায় তাঁকে গান গেয়ে শুনিয়েছি। একবার মানিকগঞ্জের এক জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর উপস্থিতিতেও গান গাওয়ার সুযোগ হয়। মওলানা সাহেব আবেগ-আপ্লুত হয়ে আমার জন্য দোয়া করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে ভোটের গান গেয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছি।

 

একপর্যায়ে আপনি তন্ত্রমন্ত্র চর্চা করতেন। এসব শিখলেন কার কাছ থেকে?

নবগ্রাম স্কুল থেকে ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে অঙ্কে ফেল করলাম। পাস করতে না পারায় আমার মন আরো উতলা হলো। এরপর ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেলাম পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেখানে এক চাকমা সন্ন্যাসীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তাঁর নাম রামানন্দ চাকমা। তিনি তন্ত্রমন্ত্র সাধনা করতেন। আমি তাঁর আশ্রয়ে তিন মাস ছিলাম। এই মানুষটা আমাকে বেশ কিছু তন্ত্রমন্ত্র শিখিয়েছিলেন। এদিকে আমার মা-বাবা আমাকে খুঁজে হয়রান। একসময় বাড়ি ফিরে এলাম। তখন কী করব, নিজেই তন্ত্রমন্ত্র মানুষের ওপর প্রয়োগ করতে শুরু করলাম। আমার কাছে তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা ধরনের মানুষ আসত।

 

তন্ত্রমন্ত্র কি জীবনে কাজে লাগে?

জীবনে সত্য ও সাধুতার চর্চা করলে তন্ত্রমন্ত্র কাজে লাগে। গভীর বিশ্বাস ও ভক্তি থেকে তন্ত্রমন্ত্র প্রয়োগ করলে মানুষ উপকৃত হয়। এটা এক রকমের লোকচিকিত্সা।

 

ছেলেবেলায় আপনি যাত্রাদলে যুক্ত হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আমার বাবা সারিন্দা ও দোতারা বাজিয়ে বৈঠকি গান গাইতেন। আমিও অংশ নিতাম, মন দিয়ে দেখতাম, শুনতাম। আমার গানের কণ্ঠ ভালোই ছিল। চাচা অধর আলী আমাকে সব সময় উত্সাহিত করতেন। তাই কিশোর বয়সে চাচার সঙ্গে আসমান সিংয়ের যাত্রাদলে যোগ দিয়েছিলাম। এই দলের পালায় রামদুর্গার ভূমিকায় অভিনয় করেছি। পরে যোগ দিয়েছি মানিকগঞ্জের ‘বাসুদেব অপেরা’য়। সেখানে গানের পাশাপাশি নাচ করতাম। নাচের গুরু ছিলেন শরত্ চন্দ বিশ্বাস। যাত্রাদলে আমার নাম ছিল মাখন। এই নামে তখন বেশ পরিচিতি ছিল আমার। তখনকার দিনে অভিনয়ের জন্য মেয়ের অভাব ছিল। শিক্ষিত, ভদ্রঘরের মেয়েরা অভিনয়ে আসত না। আমি মেয়ে সেজে পাঠ গাইতাম। তখন আমার নাম দেওয়া হয় ছবি রানী। আমি মেয়েদের মতোই চুল বড় রেখেছিলাম। মেয়ে সেজে অভিনয় করতে আমার খারাপ লাগেনি।

 

ঢাকার বাইরে কোথাও যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন?

আব্বার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতাম। তখন একাধিক লোকশিল্পী ও বয়াতির সাহচর্যে আসার সুযোগ হয় আমার। সে সময়ে আসাম, কলকাতায় গিয়ে ‘কমলা সুন্দরী’ যাত্রাপালায় অভিনয় করেছি।

 

রেডিওতে গাইতে শুরু করলেন কবে?

স্বাধীনতার বেশ আগে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বড়ই দিলখোলা মানুষ তিনি। উচ্চ শিক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার। মানুষটা শিল্পীদের খুব ভালোবাসতেন। তিনি আমার গান শুনে খুব পছন্দ করলেন। একদিন আমাকে নিয়ে গেলেন নাজিমউদ্দিন রোডে, রেডিও সেন্টারে। আমার গান গাওয়ার ব্যবস্থা হলো। তখন থেকে নিয়মিত রেডিওতে গান করছি। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খান আমার রচিত গানের একটি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলেন ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমার ছেলেকে নিয়ে একদিন টেলিভিশন সেন্টারে গেলাম। সে শিশুশিল্পী হিসেবে টেলিভিশনে গান গাইবে। কিন্তু তাঁরা আমাকেও গান গাইতে বললেন। এরপর মুস্তাফা জামান আব্বাসীর উপস্থাপনায় ‘ভরা নদীর বাঁকে’ ও ‘হিজল তমাল’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত গান করেছি।  

 

মুক্তিযুদ্ধে আপনি অংশ নিয়েছিলেন?

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে জন্ম নেয় এই দেশ। আমি বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গান শুনিয়ে চাঙ্গা রাখতাম। একজন সংগঠক হিসেবে অনেক কাজ করেছি তখন।

 

গানের জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বিডিআর দরবার হলে এক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে তাঁকে আমি নিজের লেখা একটি গান শোনাই। গানটি ছিল ‘বঙ্গবন্ধু মুজিবর বাংলার দুগ্ধের সর/সে বিনে বাঁচে না বাংলার প্রাণ আর।’ তিনি খুশি হয়ে আমাকে একটি ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন।

 

আপনার পেশাগত জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

লেখাপড়ায় বেশি দূর এগোতে পারিনি। ম্যাট্রিক ফেল করার পর তাই পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম। কিছুদিন চাকরি করার পর মুরব্বিদের চাপে চাকরি ইস্তফা দিই। তারপর মানিকগঞ্জ কো-অপারেটিভ ব্যাংকে কাজ নিই। কিন্তু ব্যাংকের হিসাবের খাতায় গান লেখায় আমার চাকরি চলে যায়। এরপর গান গেয়ে, মুদি দোকান দিয়ে সংসার চালিয়েছি। গান-বাজনা করার কারণে আমার আব্বাকে গ্রামের মাতবর একঘরে করে রেখেছিল। তখন আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। একসময় আমাদের বাজারের ব্যবসায়ী আদম পাগলা, দুদু পরামাণিক, কসিমুদ্দিন মাতবর মিলে বাজারেই আমাকে একটি দোকান বানিয়ে দেন। সেখানে আমি দোকানদারি করতে শুরু করি। ১৯ বছর দোকানদারি করেছি। দোকানদারি বন্ধ করার মূল কারণ আমি পীরগিরি করতাম। আমার কিছু শিষ্য ছিল। শিষ্যরা বাড়িতে গিয়ে বসে থাকত। কখনো আবার দোকানে এসেও ভিড় করত। মা তখনো বেঁচে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘তুই থাকস দোকানে আর ভক্তরা এসে বাড়ি বসে থাকে। তোর দোকান চালানোর দরকার নাই। বাড়ি চলে আয়।’ তাঁর নির্দেশে আমি বাড়ি চলে গেলাম। এভাবে আমার লোকচিকিত্সা ও আধ্যাত্ম সাধনা চলতে থাকল।

 

চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

আমি গানপাগল মানুষ। আজীবন গান আমার রক্তে মিশে আছে। গান গাইতে গাইতে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছি। ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘লালসালু’, ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’, ‘লালন’, ‘লিলিপুটেরা বড় হবে’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। ‘নদীর নাম মধুমতি’তে গান গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। আসলে শিল্পীদের কোনো নির্দিষ্ট পেশা হয় না। তাঁরা তো অন্য জগতের মানুষ। জগতের মোহ তাঁদের স্পর্শ করে না।

 

আপনার দাম্পত্যজীবন?

১৯৬৭ সালে সালেহা বেগমের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। আমাদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তারা আমাকে সংগীত সাধনায় উত্সাহিত করে। আসলে আমার স্ত্রীই পরিবারটি সচল রেখেছে। সংসারে তার অবদান অনেক। তার কাছে আমি ঋণ স্বীকার করি।

 

একজন সংগীত সাধক হিসেবে মানুষের কাছে কোন বার্তা প্রচার করেন?

আমি একজন সাধারণ মানুষ। ক্ষুদ্র শিল্পী। গান লিখি। গান গাই। খুব ছোটবেলা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে গান শিখেছি। বাবার পাশাপাশি জহির বয়াতি, রাধাবল্লভ সরকার ও মানিক বয়াতির কাছ থেকে তালিম পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, গান শেখার শেষ নেই। দীক্ষার শেষ নেই। গুরুর আশীর্বাদে ৫০ রকমের গানের পরিবেশনা আয়ত্ত করেছি। আমরা একটা সত্যবাদী পথে জীবনযাপন করি। গানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পবিত্র অনুভূতি জাগাতে চেয়েছি। মানুষ স্বার্থপরতা ছেড়ে সাম্যবাদী হোক, কলুষতা ছেড়ে কল্যাণের পথ বেছে নিক—এতেই আমার আনন্দ। 

 

একজন শিল্পী ও গীতিকার হিসেবে দেশ-বিদেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির সান্নিধ্য পেয়েছেন?

শিল্পী ও গীতিকার হিসেবে দেশের মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি। আজীবন আমি হাসলি গ্রামে বসবাস করছি। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এই গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে অনেক মহত্ মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। বিখ্যাত ফোকলোরবিদ অধ্যাপক হেনরি গ্লাসি, লাউরো হংকো, সাইমন ড্রিং, জওহরলাল হাণ্ডুসহ অনেক বিখ্যাত লোকের সাক্ষাত্ লাভ করেছি। তাঁরা আমাকে উত্সাহিত করেছেন। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন। আমার ওপর বই লিখেছেন। এক জীবনে আর কিছু চাই না। আল্লাহর দরবারে অনেক শুকরিয়া আদায় করি।

 

বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির দাপট। এর কোনো প্রভাব আপনার সাধনায় পড়ে কি না?

আকাশ সংস্কৃতি, প্রযুক্তি দিন দিন আরো বিকশিত হবে। একজন লোকসংস্কৃতি সাধক হিসেবে আমার চর্চায় এর কোনো প্রভাব পড়ে না। তবে খেয়াল করেছি, তরুণদের ওপর প্রভাব পড়ছে। আমি বলব, ভালো জিনিস গ্রহণ করতে হবে। বাংলার শিকড়ের সংস্কৃতি ভীষণ শক্তিশালী, এর শক্তি জেগে থাকবে আপন মহিমায়।

 

গান নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো ভাবনা আছে?

গান আমাদের গভীর জীবনবোধের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। গান শুনে মানুষের আত্মা পবিত্র হয়। দেহ পবিত্র হয়। গান জীবনের সত্যবোধকে শাণিত করে। আমরা সত্যবোধ ও আত্মার শান্তির জন্য গান করি। মানুষের মধ্যে প্রেম, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। হিংসা নয়, পরস্পরের প্রতি প্রীতি ও সামাজিক সমতা চাই। চাই দেশপ্রেমী মানুষ। 

 

আপনার এখন সময় কাটে কিভাবে?

বর্তমানে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত আছি। সৃষ্টিতত্ত্ব, বাউল, মারফতি, জারি, সারিসহ দুই হাজারের বেশি গান লিখেছি। এখনো বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে গবেষণা করছি। তা ছাড়া বয়সও তো হয়েছে!

মন্তব্য