kalerkantho

মঞ্চনাটক নিয়ে আমি ভীষণ আশাবাদী

একুশে পদকপ্রাপ্ত গুণী অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক ও শিক্ষক। স্বাধীন বাংলাদেশের টিভিতে প্রচারিত প্রথম নাটকটি তাঁর লেখা। ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম নাটকও তাঁর। প্রতিষ্ঠা করেছেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, নাগরিক নাট্যাঙ্গনের মতো নামকরা সব প্রতিষ্ঠান। আজকের কথায় কথায় বৈচিত্র্যে ভরা জীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরেছেন ড. ইনামুল হক। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন গাজী খায়রুল আলম, ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



মঞ্চনাটক নিয়ে আমি ভীষণ আশাবাদী

শৈশবের গল্প দিয়ে শুরু করা যাক

৭ মার্চ ১৯৪৩ সালে ফেনী জেলার মোটবী গ্রামে আমার জন্ম। শুনেছি আমার তখন দেড় বছর বয়স। মা তাঁর পিত্রালয়ে বেড়াতে গিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মায়ের মারা যাওয়ার খবরটা আমাকে কেউ বলেনি। আমি যাঁদের কাছে বড় হয়েছি, আমার ফুফা-ফুফু তাঁদেরই বাবা-মা বলে জানতাম। মায়ের কোনো স্মৃতি আমার নেই। তাঁর কোনো ছবিও দেখিনি। আমার ফুফা ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) কর্মকর্তা। মায়ের মৃত্যুর পরই ফুফা তাঁর কর্মস্থলে (এখন মুর্শিদাবাদ) আমাকে নিয়ে যান। সেখানেই কাটে ছেলেবেলার কয়েকটি বছর। আমার ছোট ফুফাতো বোন আমাকে মানুষ করেছেন। মায়ের মতো আদর-স্নেহ সবই পেয়েছি তাঁর কাছে।

বয়স যখন চার-পাঁচ বছর, তখন টাঙ্গাইলে ফুফা বদলি হন। ১৯৪৮ সালে টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী কিন্ডারগার্টেনই আমার প্রথম স্কুল। পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। আদর-যত্নও পেয়েছি সবার কাছে। হয়তো মা মারা যাওয়ার কারণে সবাই একটু বেশি আদর করতেন। তিন ফুফাতো ভাই ও চার বোন আমাকে কোলে কোলে রাখতেন। রক্ষণশীল অভিজাত পরিবারে বড় হয়েছি। সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও আভিজাত্যে ভরপুর ছিল ওটা। অশালীন আচরণ তো দূরে থাক, কোনো অশ্লীল শব্দও জানতাম না। খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চায় কেটেছে দিন। সিনেমা দেখতাম খুব। ভাই-ভাবি ও বোনরা মিলে দেখতাম। পরে টাঙ্গাইল থেকে ফুফা চাঁদপুরে বদলি হন। সেখানেই তাঁর চাকরিজীবন শেষ হয়। আমরা ফিরে যাই ফেনীতে। আমি ভর্তি হই ফেনী পাইলট স্কুলে। ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ভর্তি হই ঢাকার নটর ডেম কলেজে।

 

শৈশবের কোনো ঘটনা, যা আজও মনে পড়ে?

এক দিন বাসায় বসে আছি। বাবার কাছে একজন লোক এলেন। লোকটি বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। কারণ তিনি আগে কখনো আমাকে দেখেননি। লোকটি বাবাকে জিজ্ঞেস করে বসেন, ‘ছেলেটি কে?’ বাবা বলে ফেললেন, ‘ও আমার শালার ছেলে।’ শালার ছেলে শব্দটাকে গালি হিসেবেই জানতাম। বাবার মুখে এ কথা শুনে তো আমি রেগে কাই হয়ে যাই। বাবা আমাকে গালি দিলেন কেন! ভেতরে গিয়ে মা’কে বললাম, ‘বাবা আমাকে শালার ছেলে বলেছেন। মা বুঝতে পেরে মুচকি হাসলেন। আমাকে সান্ত্বনাও দিলেন। পরে বুঝতে পারলাম, আমি যাকে বাবা বলি তিনি আসলে আমার ফুফা। হিসেবে তো আমি তাঁর শালার ছেলেই হই।’

 

প্রথম মঞ্চের অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

১৯৫৫ সালে প্রথম আমি নটর ডেম কলেজে পড়া অবস্থায় ফাদার গাঙ্গুলির পরিচালনায় ‘ভাড়াটে চাই’ নাটকে মঞ্চে অভিনয় করি। চরিত্রটি ছিল খুবই মজার। নটর ডেম কলেজে মেয়ে নেই, তাই একটি মেয়ের চরিত্র করার জন্য আমাকে বলা হলো। আমি আবার দেখতে একটু নাদুসনুদুস ছিলাম। তারপর যখন ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ভর্তি হই। তখন থেকেও ডাকসুতে যত নাটক করা হতো, প্রতিটিতে আমি থাকতাম। নাট্যাঙ্গনের ছেলে হিসেবে আমার পরিচিতি দাঁড়িয়ে যায়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রথম সারিতে থাকতাম। মঞ্চে নূরলদীনের সারা জীবন, অচলায়তন, শাজাহান, দেওয়ান গাজীর কিসসা নাটকে নিয়মিত অভিনয় করেছি।

 

টিভি নাটক ও সিনেমায় এলেন কবে?

যেহেতু মঞ্চে অভিনয় করতাম, অভিনয়ের সব কিছু জানা ছিল। মুস্তাফা মনোয়ার পরিচালিত ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ আমার প্রথম টিভি নাটক। তারপর একে একে অনেক নাটক ও ছবিতে অভিনয় করলাম। আবু সাঈদের পরিচালনায় ‘আবর্তন’, আক্তারুজ্জামানের শর্টফিল্ম ‘দুরন্ত’, ‘এমিলির গোয়েন্দা বাহিনী’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘প্রিয়তমেষু’, ‘অর্পিতা’সহ আরো বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেছি। কেমন করেছি এটি দর্শকই ভালো বলতে পারবে। আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘ মঞ্চনাটকের জীবনে যা শিখেছি তা টেলিভিশন নাটক ও ছবিতে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

 

অভিনয়ে আপনার একটি নিজস্ব ধারা আছে, রপ্ত করেছেন কিভাবে?

ছোটবেলা থেকে মিশুক ছিলাম। বোনদের সঙ্গে নাটক নাটক খেলতাম। এক্কা-দোক্কা খেলতাম। যেহেতু আমার বোন বেশি ছিল, তাদের সঙ্গেই বেশি সময় কেটেছে। তাদের আচরণই আমার ওপর বেশি প্রভাব ফেলেছে। নরম টাইপের চরিত্র আমার। আবার যখন ফেনীতে স্কুলে ভর্তি হই, আলম নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। খুব সুন্দর করে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন। আমি সব সময় তাঁকে অনুসরণ করতাম। বাসায় পড়ার সময় হেঁটে হেঁটে জোরে জোরে পড়তাম। এ অভ্যাসটা মঞ্চনাটকে খুব কাজে লেগেছিল। কারণ মঞ্চে শেষ সারি পর্যন্ত দর্শকের কানে ডায়ালগ পৌঁছাতে হতো। আমার ভোকাল স্টাইলটা এভাবেই তৈরি হয়েছে। এর পরও চেষ্টা করি পরিচালক যেভাবে বলেন সেভাবে কাজ করার।

 

আপনি তো ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আবাসিক ছাত্র ছিলাম। মঞ্চনাটক করে একটু ফেমাস হয়ে গিয়েছিলাম। ওই সময়কার ছাত্রলীগের রাজনীতি করতাম। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন বেশি প্রভাব ছিল মোনেম সরকারের অনুসারী এনএসএফের। ১৯৬৪ সালে যখন ডাকসু নির্বাচন হয়, আমি হলের কালচারাল সেক্রেটারি পদে দাঁড়ালাম। আমার বিপক্ষে দাঁড়াল এনএসএফের একজন। যদিও শেষ পর্যন্ত একমাত্র ভিপি পদটি এনএসএফ পেয়েছিল। বাকি পদগুলো ছাত্রলীগ পেয়েছিল। নির্বাচনের আগে একটি নাটক হয়েছিল। সেই নাটকে আমি দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলাম। ওই অভিনয়ের জোরেই সাংস্কৃতিক সম্পাদক হতে পেরেছিলাম।

 

১৯৭১ সালে ট্রাকে করে পথনাটক করেছিলেন, তখনকার সরকারের বিপক্ষে এমন পথনাটক করতে ভয় লাগেনি?

আমি বুয়েটে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রথমে তিতুমীর হলে একটি রুমে ছিলাম। পরে একটি বাসা পাই। একটি সাদা বিল্ডিংয়ে ১২/এল নম্বর বাসা। এই বাসার অনেক ইতিহাস আছে। স্বাধীনতার আগে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পীঠস্থান ছিল বাসাটি। সেখানে জহির রায়হান, শহীদুল্লা কায়সার, মতিউর রহমান, আবুল হাসনাতের আড্ডা ছিল। ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ প্রতিষ্ঠানটির যাত্রাও আমার বাসা থেকে শুরু। জিয়াউর, আতাউরসহ আমার বাসায় আরো অনেকে কাজ করত। সেখান থেকে সৈয়দ হাসান ইমামের পরিচালনায় ‘রক্তকরবী’ নাটকটি করেছি। ‘তাসের দেশ’ ‘আবর্ত’, ‘মা’, ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ নাটকগুলোতে অভিনয় করেছি। সৃজনীর ব্যানারেও ২৩ মার্চ ১৯৭১ সালে পথে পথে ট্রাকে করে নাটক করেছি; বিশেষ করে সদরঘাট, নিউ মার্কেট, মৌচাক এই অঞ্চলগুলোতে।

নাটকের আলাদা একটি শক্তি আছে। পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে নাটক করতে ভয় লাগত না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় আমরা আন্দোলনমুখী নাটক করা শুরু করি দায়বদ্ধতা থেকেই। আমাদের স্বাধীন দেশ পেতে হবে, এ অনুভূতি থেকেই পথনাটকের পথ ধরি। সবাই যাতে ভাবে আমরা বাঙালি, দেশটা আমাদের, যদিও ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকেই এ অনুভূতিটা দেশের মানুষের ভেতরে জেগে ছিল। তবু আমরা তাদের আরো উত্সাহিত করার জন্য সাংস্কৃতিক কাজকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ি। দেখলাম জনগণ আমাদের নাটকে সাড়া দিচ্ছে। নাটক করতে গিয়ে খাওয়াদাওয়ার কথাও ভুলে যেতাম। অল্পতেই সন্তুষ্ট ছিলাম তখন। মুড়ি-চানাচুর, শিঙাড়া খেয়ে দিন পার করে দিয়েছি।

 

‘১৯৭১ সেই সব দিন’ আপনার লেখা গল্প নিয়ে সরকারি অনুদানে ছবি তৈরি করা হবে। যেটি পরিচালনা করবেন হূদি হক ও প্রযোজনা করবেন লাকী ইনাম। এটা নিয়ে জানতে চাই।

আমি যতগুলো নাটক, গল্প লিখেছি সবগুলোর থিম কিন্তু বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। বাস্তবতার মধ্যে নান্দনিকতা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন আমাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। এ বিভাজন তখনো ছিল। উচ্চ মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মুক্তিযুদ্ধকে তেমন আহ্বান করেনি। যারা ভালো অবস্থানে ছিল তারা চাইতো না যুদ্ধের কারণে তাদের অবস্থান ছুটে যাক। এমন কিছু গল্প নিয়ে ‘১৯৭১ সেই সব দিন’ লিখেছিলাম। এ গল্পে একটি সংলাপ আছে, একজন বাবা বলছে, ‘যখন সবাই এক হতে চাচ্ছে, তখন আমার ছেলেরা আলাদা হয়ে যাচ্ছে।’ গল্পটিতে অপ্রয়োজনীয় কিছু নেই। জোর করে কোনো চরিত্র ঢোকানো হয়নি। আমার মেয়ে হূদি দেশপ্রেম নিয়ে অনেক কাজ করেছে। আশা করি ছবিটিতে সে বাস্তবতাকে ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারবে। সেই গুণ তার আছে। ভালো লাগছে সরকার থেকে মুক্তিযুদ্ধের একটি বাস্তব গল্পকে ছবি তৈরি করার জন্য সহযোগিতা করা হচ্ছে দেখে।

 

আপনার স্ত্রী লাকী ইনামও একজন গুণী শিল্পী, তাঁর সঙ্গে পরিচয় কিভাবে?

লাকীর সঙ্গে বিয়ের আগে পরিচয় ছিল না। তার বাবা কুমিল্লায় চাকরি করতেন। সেখানে আমার মামাও একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। আমার মামাই লাকীকে দেখে আমাকে বিয়ে করার জন্য বলেন। আমি লাকীকে দেখতে কুমিল্লায় যাই। দেখেই মনে হলো আমি যেমন মেয়ে চাচ্ছিলাম লাকী তেমনই হবে। সংস্কৃতিমনা নারীর সঙ্গে সংসার গড়ার ইচ্ছা ছিল। নাচ, গান ও আবৃত্তিতে পারদর্শী লাকী। ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ে হওয়ার পরেই আমাদের নাট্যদলে লাকীকে যুক্ত করা হয়। আমরা এ পর্যন্ত কখনো বিয়েবার্ষিকী পালন করিনি। কারণ ১৪ ডিসেম্বর আমাদের বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস। আমার দুই মেয়ে, হূদি ও প্রৈতি হকও সাংস্কৃতিক কাজকর্মে জড়িত।

শিক্ষকতা কেমন উপভোগ করেছেন?

শিক্ষকতার জীবনটি খুবই আনন্দঘন ছিল। ১৯৬৫ সালের ৭ মার্চ, বুয়েটে (তত্কালীন ইপুয়েট) প্রভাষক হিসেবে যোগ দিই। প্রথম দিন একটু নার্ভাস থাকলেও পরে ছাত্রদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলাম। ছাত্ররাও আমাকে খুব পছন্দ করত। এখনো করে। যেখানেই যাই আমার ছাত্রদের সঙ্গে দেখা হয়। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক ও রাশেদ খান মেনন আমার ছাত্র ছিল। আনিসুল হক আমাকে নিয়ে বলেছিল, মরুভূমিতে আমি এক মরূদ্যান। তা ছাড়া আমি যখন বুয়েটে নতুন শিক্ষকতা শুরু করি, আমার নটর ডেমের এক শিক্ষক বলেছিলেন তাঁর বদলি নটর ডেমে এক দিন ক্লাস নিতে। আমি স্যারের কথা মতো যাই। সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্ররা নতুন শিক্ষক দেখে আমাকে বিরক্ত করতে শুরু করল। যখনই আমি বোর্ডে কিছু লিখতে যাই সবাই মিলে পায়ে আওয়াজ করে। আমি তাকালেই আওয়াজ বন্ধ করে দেয়। আমি রেগে গিয়ে ক্লাস থেকে চলে আসি। কিছুদিন পরই নটর ডেমের কয়েকজন ছাত্র এসে বুয়েটে ভর্তি হয়। আমাকে ক্লাসে দেখে তারা ভয় পেয়ে যায়। তারা ভেবে ছিল আমি তাদের সাজা দেব। তাই ক্ষমা চাইতে এসেছিল। আমি বললাম, ‘কবেই এসব ভুলে গেছি। তোমরা এখন আমার ছাত্র। ভালোমতো ক্লাস করো।’ বুয়েটে শিক্ষক থাকা অবস্থায় ছাত্রদের নিয়ে মঞ্চনাটকও করেছি। আবার আমি যখন বুয়েটে শিক্ষক হিসেবে ঢুকি, তখন জেনারেল শিক্ষকদের প্রাথমিক বেতন ধরা হয় ৪০০ টাকা। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষকদের ৫০০ টাকা। আমিসহ কয়েকজন মিলে প্রথম শিক্ষকদের সমান বেতন করার জন্য দাবি জানাই। আমাদের দাবি মেনেও নেওয়া হয়।

১৯৭২ সালে ম্যানচেস্টারে যাই পিএইচডির জন্য। সেখানে পিএইচডি, পোস্ট ডক্টরাল ফেলো—এসব শেষ করে ১৯৭৭ সালে দেশে ফিরে আবার বুয়েটে যোগ দিই। ১৯৮০ সালে রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান হই। টানা ১৩ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করি। পরে আরো দুই বছর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন হিসেবে থাকি। শিক্ষামূলক অনেক অনুষ্ঠানে আমি অংশগ্রহণ করেছি। এ নিয়ে একটি বইও বের করেছি। রসায়নের ওপর আমার প্রায় ১০০টি আন্তর্জাতিক মানের লেকচার আছে।

 

আপনার লেখা নাটক ও প্রকাশিত বই কয়টি?

নাটক অনেক লিখেছি। সবচেয়ে ভালো লাগে স্বাধীন বাংলাদেশের টেলিভিশনে ১০ জানুয়ারি প্রচারিত প্রথম নাটক ‘বাংলা আমার বাংলা’। এর নাট্যকার আমি। তা ছাড়া, গৃহবাসী, ঝড়, মহাকালের ঘোড়সাওয়ার, দেয়াল, কিছুতো বলুন, সৈকতে সরসা, নায়লা ও নূপুর, অনুভবে অনুভূতিসহ বেশ কিছু নাটক লিখেছি। আমার প্রকাশিত মৌলিক নাটক ২৫টি। প্রকাশিত অনুবাদ নাটক ১৮টি। প্রকাশিত নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধ ২০টি। বিজ্ঞানবিষয়ক নাটক পাঁচটি। তা ছাড়া আমার বিজ্ঞানধর্মী কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে।

 

আপনার গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে জানতে চাই।

১৯৬৮ সালে যখন বুয়েটে পড়াই, তখন ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ প্রতিষ্ঠাতাদের সদস্য ছিলাম। অনেক দিন এটির সঙ্গে ছিলাম। যখন আমি পিএইচডি করার জন্য ম্যানচেস্টারে চলে যাই, তখন একটি দূরত্ব তৈরি হয়। দেশে ফিরে তাদের সঙ্গে কাজ করা শুরু করি। কিন্তু তত দিনে এই প্রতিষ্ঠানে অনেক গুণীজন ঢুকে পড়ে। যার ফলে আমাদের জায়গা পাওয়া কষ্ট হয়ে দাঁড়াল। তখন লাকী বলল, একটি নতুন প্রতিষ্ঠান করব। তার সিদ্ধান্ত মতো ১৯৯৫ সালে ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠা করি। দলটির সভাপতি হিসেবে এখনো আমি আছি। তবে এটি দেখাশোনা করে হূদি ও লাকী। ২০০০ সালে ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অব ড্রামা’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান করি। এটিও লাকী দেখাশোনা করছে।

 

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার বিশেষ কোনো স্মৃতি আছে?

হুমায়ূন যখন ভার্সিটিতে ভর্তি হলো তখন আমি ম্যানচেস্টারে। তার ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশ হওয়ার পর তার সম্পর্কে জানতে পারি; কিন্তু পরিচয় ছিল না। দেশে আসার পরের ঘটনা। আমি এক দিন বাসায় বসে আছি। এমন সময় লিকলিকে একটি ছেলে এসে বলল, ‘মে আই কাম ইন স্যার?’ আমি বললাম, ‘আসো।’ ভাবলাম আমার কোনো ছাত্র হয়তো; কিন্তু তার নাম জিজ্ঞেস করে আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। কারণ হুমায়ূন তখন অনেক ফেমাস। আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘তোমার জন্য কী করতে পারি।’ সে বলল, ‘প্রযোজকরা চায় আমি যেন নাটক লিখি; কিন্তু আমার নাটক লেখা সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। বাসায় মাকে বললাম, তিনি আপনার কথা বললেন। আপনি যদি আপনার প্রচারিত দু-একটি নাটকের স্ক্রিপ্ট দেন তাহলে ধারণা নিতে পারব। আমি দিয়ে দিলাম।’ তার প্রথম নাটক ‘প্রথম প্রহর’-এর নায়িকা ছিল লাকী। প্রথম দিকে আমাদের বাসায় তার বেশির ভাগ কাজ হতো। আড্ডা হতো। সে তার নাটকে আমাকে ও লাকীকে নিয়ে কাজ শুরু করে। তারপর তার সঙ্গে যারা কাজ করেছে বেশির ভাগই আমার ও লাকীর মাধ্যমে পরিচয়। হুমায়ূনের সঙ্গে অভিনয় জগতের লোকজনদের বেশি পরিচয় ছিল। একটা সময় আমাদের দূরত্বটা বেড়ে যায়। তেমন একটা যোগাযোগ হতো না।

 

শিক্ষকতা ও অভিনয়—কোনটাতে বেশি আনন্দ পেয়েছেন?

আমি দুটির মধ্যে পার্থক্য করিনি। শিক্ষকতা ও অভিনয় দুটিকে মেলবন্ধন করেছি। অনেক শিক্ষক আছে, যারা শিক্ষকতা জীবনের বাইরে কিছু করতে চান না। আমি ব্যতিক্রম। ছাত্রদের প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল। নাটক, ছবিতে আমি অনেক খলচরিত্র করেছি। যেগুলোর কারণে মানুষের মনে হয়তো নেতিবাচক প্রভাব পড়ত; কিন্তু আমার ছাত্ররা কোনো দিন আমাকে এমনটা ভাবেনি। একজন শিক্ষক হয়ে অভিনয় করেছি, আবার একজন অভিনেতা হয়ে শিক্ষকতা করেছি। দুটিই বড় অর্জন।

 

একুশে পদক পাওয়ার পর কেমন লেগেছিল?

জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে সূর্যমুখী সম্মাননা পদক, ২০০৫-০৬ এ-ওয়ান টেলিমিডিয়া, ২০০৯ সালে মেজাব আজীবন সম্মাননা পদকসহ আরো অনেক পদক পেয়েছি; কিন্তু একুশে পদক পাওয়ার আনন্দটি ছিল অন্য রকম। আমি তখন বাসায় বসে টিভি দেখছিলাম। মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে বলা হলো ২০১২ সালে একুশে পদকের জন্য আমার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আমি অনেক খুশি হলাম। বাসার সবাই খুশিতে মিষ্টি খেতে শুরু করে। তবে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল আমি একসময় এ পদক পাব। সেই কলেজজীবন থেকে এখন পর্যন্ত সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি শেষ জীবন পর্যন্ত কাজ করে যাব।

 

এখনকার বাংলা নাটক নিয়ে কী ভাবছেন?

দেশের টিভি নাটক নিয়ে আশাবাদী নই। কিছু অদক্ষ অভিনেতা, পরিচালকের কারণে দেশের মানুষ বিদেশি সিরিজ ও সিনেমায় আগ্রহী হচ্ছে। কলকাতার নাটক দেখলে বুঝতে পারবে তাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কতটা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত। তাদের কথা বলার ধরন, বাংলা উচ্চারণ অনেক সুন্দর। মানুষ তাদের নাটক দেখে মজা পায়। কিন্তু দেশের মঞ্চনাটক নিয়ে আমি ভীষণ আশাবাদী। বাংলাদেশে যতগুলো মঞ্চনাটকের দল আছে, সবাই প্রতিযোগিতামূলকভাবে ভালো করার চেষ্টা করছে। এটি শুভ লক্ষণ। যারা নাটকে জড়াচ্ছে তারা বুঝতে পারছে থিয়েটারই স্থায়ী হবে। থিয়েটারে ভালো করলেই নিজেকে তৈরি করা যাবে। আর মঞ্চনাটকের মাধ্যমেই সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করা যায়। তবে যেদিন প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা টিভি নাটকে প্রবেশ করবে, সেদিন বাংলা নাটকেরও সুদিন ফিরবে।

 

জীবনের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিগুলো কী?

প্রাপ্তি বলে শেষ করা যাবে না। সব কিছুই আশানুরূপ পেয়েছি। অপ্রাপ্তি তেমন নেই; কিন্তু দেশকে ভালোবেসে যে সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেছি সেটা এখন তেমন নেই। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, সেটিও কিছু মানুষ গ্রহণ করতে চায় না। এসব দেখলে কষ্ট লাগে। আমাদের নাটকগুলো দেখলেও কষ্ট লাগে। কী তৈরি করছে, কারা অভিনয় করছে, কেমন করে কথা বলছে। দেখলে খুব দুঃখ লাগে। এত বছর কাজ করেও নাটকটাকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারিনি, এটি অপ্রাপ্তির খাতায় জমা পড়েছে।

মন্তব্য