kalerkantho

চাকরির মোহের কাছে আমি পরাজিত হয়েছি

সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



চাকরির মোহের কাছে আমি পরাজিত হয়েছি

শৈশব কেমন ছিল আপনার?

আমার জন্ম ১৯৪৬ সালের ২৬ আগস্ট, টাঙ্গাইলের করোটিয়ায়। বাবা অধ্যাপক সৈয়দ রফিক উদ্দিন আহমেদ ছিলেন করোটিয়া কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি চট্টগ্রামের মানুষ। মা কবি নূরুন্নাহার ছিলেন টাঙ্গাইলের মেয়ে। কলকাতার লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে পড়াশোনা করেছেন। মা-বাবার কারণে সাংস্কৃতিক একটি পরিবেশ আমি জন্মগতভাবেই পেয়েছি। ছোটবেলায় বাড়িতে ‘মহুয়া মজলিস’ নামে সাংস্কৃতিক আসর বসত। ১৯৪৮ সালে বাবা চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে বদলি হন। চট্টগ্রামের স্মৃতি আমার বেশ ভালোই মনে আছে। পটুয়া কামরুল হাসানের সঙ্গে আমার মায়ের পত্র যোগাযোগ ছিল। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় মা লিখতেন। কামরুল হাসান সেগুলোতে স্কেচ করতেন। গল্প-কবিতা লেখার পাশাপাশি মা ছবিও আঁকতেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর ছবির একটি এক্সিবিশন হয়েছিল।

 

ছোটবেলা থেকেই অনেক বিখ্যাত মানুষের স্নেহ পেয়েছেন।

আমাদের বাড়িতে একটা বিশাল বারান্দা ছিল। সেখান থেকে পাহাড় দেখা যেত। পেছনে চট্টগ্রাম কলেজ। একেবারে শান্ত-সৌম্য প্রাকৃতিক পরিবেশ। মা একবার বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করে কামরুল হাসানকে চিঠি লিখলেন প্রচ্ছদের জন্য। চিঠি পেয়ে তিনি কলকাতা থেকে আমাদের বাসায় এলেন। সুন্দর একটি মানুষ। সুঠামদেহী। কাঁধে ঝোলা। বারান্দায় বসে কথা বলছেন। একসময় আমাকে কাছে ডাকলেন, ‘মামা, এদিকে আসো। ছবি আঁকো।’ চক ছিল না। কয়লা দিয়ে ছবি আঁকালেন। তাঁর সংস্পর্শেই আমার সাংস্কৃতিক জীবনের সূত্রপাত। তারপর তাঁর সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। তিনি বলতেন, ‘যা দেখছ, যা ভাবছ—আঁকো। দেখবে ব্যাঙ হয়ে যাচ্ছে সাপ; সাপ হয়ে যাচ্ছে ব্যাঙ। কিন্তু একসময় দেখবে, সাপটা সাপই হচ্ছে।’ বহুকাল পরে, যখন আমি বিটিভিতে কাজ করি, এক সাক্ষাত্কার নেওয়ার সময় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মানুষ আঁকার উপায় কী?’ বলেছিলেন, ‘মানুষ আঁকা খুব কঠিন। তুমি যে মানুষকে আঁকছ, সেটি সেই মানুষ না-ও হতে পারে।’ কাঁধে একটা ঝোলা ঝুলিয়ে শওকত ওসমানও আমাদের বাড়িতে আসতেন। বাবার সহকর্মী ছিলেন। মা-বাবার সঙ্গে অনর্গল কথা বলতেন। সেসব কথার অর্থ উদ্ধার করার মতো বয়স তখনো আমার হয়নি। পরবর্তীকালে কলেজে তাঁকে আমি সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। তিনি আমার জীবনের পথ দেখানোর একজন মানুষ। তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছি। তিনিও অদ্ভুত ছিলেন। খুব কাছে টানতে পারতেন। তাই জীবনের সুসময়ে তাঁকে যেমন পেয়েছি, দুঃসময়েও আমাকে আগলে রেখেছেন। ক্লাসে বলতেন, ‘যে পালায়, সে বাঁচে।’ সেই কথার মানে বুঝতে পারিনি। তিনি যখন মুমূর্ষু, হাসপাতালে দেখতে গিয়ে বলেছিলাম, ‘স্যার, এখনো আপনার কথাটার মানে খুঁজে পাইনি।’ তিনিও হেঁয়ালি করে জবাব দিয়েছিলেন, ‘শোনো, ভেবেছিলাম মহাসমুদ্রে যাব; কিন্তু পালাতে পারলাম না। পাগাড়েই আটকে রইলাম!’

 

ঢাকায় এলেন কখন?

১৯৫১ সালের শেষ দিকে ঢাকায় এলাম। প্রথমে ছিলাম কমলাপুরে। খুব সুন্দর জায়গা। ফুলকপির ক্ষেত। বাবা সারি সারি ফুলকপির ভেতর দিয়ে তাঁর কর্মস্থল ঢাকা কলেজে যেতেন। ঢাকা কলেজ তখন ফুলবাড়িয়ায়, যেখানে রেলস্টেশন ছিল। বাবা কমলাপুর থেকে পল্টনে, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুদের বাসা ভাড়া নিলেন। সেই সূত্রে বাচ্চুকে আমি জন্মাতে দেখেছি। এ সময়ে পল্টনের সঙ্গে আমার জীবনের একটা সংযোগ হলো। পল্টনের বাসায় বাবার সঙ্গে আড্ডা দিতে অনেক বিখ্যাত মানুষই আসতেন। কবি গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দীন, শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। জসীমউদ্দীন আমাকে একটা গান শিখিয়েছিলেন ‘সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি/বোম ফেলেছে জাপানি/বোমের ভেতর কেউটে সাপ/ব্রিটিশ বলে বাপরে বাপ।’ জীবনে প্রথম এই গানটিই হারমোনিয়ামে আমি তুলেছিলাম। এরপর ১৯৫৩ সালে আমরা আজিমপুর কলোনিতে চলে আসি। তারপর ওয়েস্টার্ন হাই স্কুলে ক্লাস টুতে শুরু হয় আমার ফরমাল স্কুলজীবন। এর আগে মা-বাবার কাছেই পড়ালেখা শিখেছি।

 

মাঝখানে রাজশাহীতেও ছিলেন...

১৯৫৭ সালে বাবা রাজশাহী কলেজে বদলি হলে সেখানে চলে যাই। সে সময় মায়ের অনুপ্রেরণায় ইত্তেফাকের ‘কচি-কাঁচার আসর’-এর পরিচালক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইকে একটা চিঠি লিখেছিলাম। এক সপ্তাহ পরই দেখি, সেই চিঠিটি তিনি ছেপে দিয়েছেন। এভাবে চিঠি লেখার মধ্য দিয়েই আমার লেখালেখি শুরু। রাজশাহীতে তখন দারুণ সাংস্কৃতিক বলয় ছিল। পদ্মাপারের কলেজিয়েট স্কুলে পড়তাম। হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা করতাম। উত্তাল পদ্মা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। মতিহারে, এখন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে—সেখানে নীলকুঠি ছিল। ওই বয়সে কাঁচা হাতে একটি গল্প লিখেছিলাম, ‘নীলকুঠির ভূত’। ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের একটি শাখা অফিস ছিল ওখানে। একদিন মা-বাবা সেখানে সিনেমা দেখাতে নিয়ে গেলেন। ‘পথের পাঁচালী’। ঢাকায় থাকাকালে বেশ কিছু সিনেমা দেখলেও ‘পথের পাঁচালী’ আমার সামনে একটা নতুন দিগন্ত খুলে দিল। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসটি আগে থেকেই পড়া ছিল। আমিও মনে মনে নিজেকে অপু ভাবতাম; কিন্তু সত্যজিত্ রায়ের অপুকে আমি নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। নতুন এক ঘোর নিয়ে ১৯৬১ সালে ঢাকায় ফিরে এলাম। আগের স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক পাস করলাম পরের বছর। তখন সময় পেলেই টেবিল টেনিস খেলতাম। আর প্রচুর ছড়া-গল্প লিখেছি নানা পত্রিকায়। আমার বাবা এ সময়ে ধানমণ্ডিতে একটা বাড়ি করলেন। বিশাল এক রুমের বাড়ি। সাধারণ বেড়া, টিনের চালা। পেছনে ধানক্ষেত।

 

কলেজে সক্রিয় সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন।

ঢাকা কলেজের ইংরেজি পত্রিকা ‘স্পটলাইট’-এর সম্পাদক ছিলাম। তখন কলেজ-পর্যায়ে বিশেষ একটি প্রতিযোগিতা হতো। আবৃত্তিসহ ১১টি বিষয়ে আমি প্রথম হয়েছিলাম। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন তখন দানা বাঁধছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সেগুলোতেও সক্রিয় ছিলাম। কলেজে সিনিয়র হিসেবে সাংবাদিক মতিউর রহমান, তৌফিক এলাহী চৌধুরী, আকবর আলি খান—এঁদের পেয়েছি। দারুণ মেধাবী ও রাজনীতিসচেতন ছিলেন তাঁরা। হুমায়ুন আজাদ ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ সহপাঠী।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চলচ্চিত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন?

সাহিত্য করার বাসনায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে ভর্তি হয়েছিলাম ইংরেজিতে; মাসখানেক পর চলে গেলাম পদার্থবিজ্ঞানে। এসএম হলে অ্যাটাচ ছিলাম। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, আমি যে রুমটিতে থাকতাম, আমার বাবাও ছাত্রাবস্থায় ১৯৩৭ সালে ঠিক সেই রুমেরই বাসিন্দা ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করেছি। হলের সাহিত্য সম্পাদক হয়েছিলাম। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন সংস্কৃতি সম্পাদক। মিডিয়ায় আমার জীবন শুরু হয় ১৯৬৫ সালে। তখনকার পাকিস্তান টেলিভিশনে উপস্থাপনা করতাম। অনেক সাক্ষাত্কার আমি নিয়েছি তখন।

 

চাকরি নিয়ে পাকিস্তান গিয়েছিলেন?

পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা হলেও চলচ্চিত্র আন্দোলন তখনো খুব একটা দানা বাঁধেনি। খুব কষ্ট করে সিনেমা দেখতে হতো। পল্টনের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে নাসির উদ্দীন ইউসুফ, রাইসুল ইসলাম আসাদ—এঁরা আমাদের কর্মকাণ্ড ফলো করতেন। আমার বন্ধু শফিকুর রহমান ছিলেন টেলিভিশনের প্রডিউসার। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমাদের একটি সাহিত্য ফোরাম ছিল ‘কৌণিক’। আমরা কবিতার সংকলন বের করতাম। প্রতি মাসে গানের আসর বসাতাম। অনেক কষ্ট করে ছবি জোগাড় করে দেখাতাম। তখনো দেশ স্বাধীন হয়নি, বইমেলা শুরু হয়নি। আমরা ছালা বিছিয়ে বই নিয়ে বসতাম। বিক্রি হলো কি হলো না—ভাবতাম না। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের পর আমি সিভিল সার্ভিসে পরীক্ষা দিয়ে পাকিস্তান চলে গেলাম। আমার বড় ভাইও তখন পাকিস্তানে চাকরি করেন। একাত্তরের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ভেতর থেকে একটা তাড়া বোধ করলাম। দুই ভাই ঠিক করলাম, দেশে চলে আসব। তখন ভারতের ওপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কা হয়ে আসতে হতো। এক পাকিস্তানি বান্ধবীর সহযোগিতায় দুটি টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারলাম। দেশে ফিরে টেলিভিশনে কাজ শুরু করলাম।

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য গান লিখেছেন।

এক দিন লাকী আখন্দ আমাকে ধরলেন একটা গান লিখে দেওয়ার জন্য। ‘ওই চেয়ে দেখ/পুব আকাশ ফিকে হলো।’ লেখার পরে এক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সুর করে ফেললেন। ২৩ মার্চ রাতে টেলিভিশনে প্রচার হলো গানটি। আবিদা সুলতানা গেয়েছিলেন। পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও প্রচার হলো। যুদ্ধের সময় বাচ্চুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। আমাদের ধানমণ্ডির বাড়িতে তিনি প্রায়ই আসতেন। বাড়িটি ছিল ওঁদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা। হাফপ্যান্ট পরে চলে আসতেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, শফিকুল ইসলাম স্বপন—এঁরা। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মা ওষুধ সংগ্রহ করতেন। আমাদের এক প্রতিবেশী ছিলেন কমিশনার। শান্তি বাহিনীর সদস্য হলেও তিনি আমাদের সাহায্য করতেন। বাচ্চু তত দিনে কমান্ডার হয়ে গেছেন। তবু প্রায় সময়ই ফিসফিস করে বলতেন, ‘জাকী ভাই, আমরা কবে নাটক করব?’ যুদ্ধের পর ম. হামিদের তত্ত্বাবধানে ‘নাট্যচক্র’র জন্ম হলো আমাদের বাড়িতেই। শেখ কামাল তাতে যোগ দিলেন। সেলিম আল দীনের ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ নাটকটি নিয়ে এলেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। আমার লেখা নাটক ‘অস্থির সুস্থিতি’র জন্ম হলো। আজকের দিনে ওটাকে আর নাটক বলব না; ওটা একটা যন্ত্রণা ছিল। চার-পাঁচ বছর ধরে লিখেছি। নাটকে বঙ্গবন্ধুর একটা সংলাপ ছিল। একটু সমালোচনামূলক। মহড়ার সময়ে এক দিন শেখ কামাল ফিসফিস করে বললেন, ‘জাকী ভাই, হচ্ছে না!’ আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো সংশোধন করতে বলবেন। আসলে তা নয়; বরং আরো জোরালভাবে করার তাগিদই তিনি দিয়েছিলেন। তাঁর সেই সহনশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

 

চলচ্চিত্র নির্মাণে ঝুঁকলেন কবে?

একই এলাকায় থাকি, কামালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। ১৯৭২ সালের শেষ দিকে চলচ্চিত্রকার হওয়ার পাঠ নিতে, বাংলাদেশ থেকে প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে গেলাম আমি ও বাদল রহমান। যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি অত বুঝি না ফিল্ম ইনস্টিটিউট কী? তোদের ফাইল সই করে দিয়েছি। দেশের মান রাখবি।’ পুনে থেকে ছুটিতে আসার পর তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি করবি।’ ওনার নির্দেশেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমি ও বাদল রহমান ‘প্রত্যাশার সূর্য’ ডকুমেন্টারিটি নির্মাণে হাত দিয়েছিলাম; কিন্তু শেষ করতে পারিনি। তার আগেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন।

 

পুনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ওখানে যাওয়ার পর চলচ্চিত্রের ব্যাপারে আমার চোখটা পুরোপুরি খুলল। প্রিন্সিপাল হিসেবে ঋত্বিক ঘটককে পেলাম। উনি ঝড়ের মতো আসতেন। উনি আমাদের চলচ্চিত্রের পথ প্রদর্শক; আমরা শিষ্য। শিক্ষক হিসেবে সত্যজিত্ রায়কে পেয়েছি। পেয়েছি মৃণাল সেনকেও। খুবই গোছানো ও প্রেরণাদায়ী মানুষ ছিলেন তিনি। অভিনয় বিভাগে শাবানা আজমীকে পেয়েছি সিনিয়র হিসেবে। তাঁর সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হলো। পরবর্তীকালে নানা সময়ে বাংলাদেশে তাঁকে আনতে পেরেছি, বিশেষ করে নার্গিস আক্তারের ‘মেঘলা আকাশ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য। যাহোক, পুনেতে জয়া ভাদুরি ও নাসিরউদ্দিন শাহকেও পেয়েছি। নাসিরউদ্দিন আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যাচমেট। আমার বানানো এক্সারসাইজ ফিল্ম ‘চেনা বাদাম, প্রেম, মানিব্যাগ’-এ অভিনয় করেছিলেন। শুটিংয়ের আগের দিন আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললেন, ‘তুমি যে আমাকে বাদাম বিক্রেতার চরিত্রে অভিনয় করতে বলছ, কোন অঞ্চলের বাদাম বিক্রেতা? কলকাতার? বোম্বের? নাকি দিল্লির?’ সেই ছাত্রজীবন থেকেই অভিনয়ের ব্যাপারে এত সিরিয়াস ছিলেন তিনি।

পুনেতে আমি ‘জয় বাংলা’ নামে একটা মঞ্চ নাটক করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। পুনে থেকে ফিরলাম ১৯৭৭ সালে। তখন ফিল্ম আর্কাইভ নামে একটি ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেছিল। আলমগীর কবির সেটিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘ছবি করার চেয়ে একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে জরুরি কাজ।’ ওনার সহকারী হিসেবে আমি প্রথম ফিল্ম কোর্স করালাম। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিক্ষাদানের প্রথম দিকের কোর্সগুলোতে আমিই ছিলাম কো-অর্ডিনেটর। তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, নার্গিস আক্তার—এঁরা আমার সরাসরি ছাত্র। তাঁদের নিয়ে আমি গর্ব করি।

 

পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে আপনি একটু দেরি করেই এসেছেন।

সেলিম আল দীনের ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’ অবলম্বনে ছবি করার কথা ছিল। সেলিম নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখে দিয়েছিলেন। মালিবাগে শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রীর বাসার গ্যারেজে আমি অফিস নিয়েছিলাম। সেখান থেকে শুটিংয়ের ঠিক আগের দিন স্ক্রিপ্টটা চুরি হয়ে গেল। সেলিম বলেছিলেন, আবার লিখে দেবেন। কিন্তু আমার জেদ চাপল। অপেক্ষা না করে নির্দিষ্ট দিনেই শুটিং শুরু করলাম। একেবারে নতুন কাহিনি। তাত্ক্ষণিকভাবে ভাবা, তাত্ক্ষণিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া। আসলে ‘ঘুড্ডি’ নির্মাণ হয়েছে কোনো স্ক্রিপ্ট ছাড়াই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগ্রামের প্রেরণা, পুনের সৃজনশীল প্রেরণা আর জেদ মিলিয়েই এই চলচ্চিত্রের সৃষ্টি। আসাদকে বললাম, ‘তুই একজন মুক্তিযোদ্ধা। অস্ত্র জমা দিয়ে এখন খালি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। তুই তোর নিজের চরিত্রেই অভিনয় করবি।’ সুবর্ণা মোস্তফাকে বললাম, ‘ভাবো, তুমি আর্কিটেকচারের ছাত্রী।’ যাঁরা একসময় বাম রাজনীতি করে আমাদের পথ দেখিয়েছেন, পরবর্তীকালে তাঁরা বিত্তবান হয়ে পথ হারিয়েছেন—এমন চরিত্রে অভিনয় করলেন সৈয়দ হাসান ইমাম। তাঁর মেয়ের চরিত্রে সুবর্ণা। মেয়েটি দ্বন্দ্বে ভোগে। ফুরফুরে হাওয়ায় ঘুড্ডির মতো ওড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা শিকড়ের সন্ধান করে সে। সেই শিকড়ের পথ দেখায় আসাদ। নৌকায় শেষ হয় ওদের গল্প। যদি এর সিকুয়েল বানাতে পারি, এখান থেকেই গল্প শুরু করা যাবে।

 

বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও ‘ঘুড্ডি’কে সময়ের চেয়ে আগুয়ান চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ঘুড্ডি’র বিষয়ে এক দল বলে, এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছবি। আরেক দল ঠিক উল্টো কথা বলে। যাহোক, আমি সমালোচনা সহ্য করতে পারি। সমালোচনা একটা শিল্প। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প তখনো পাকা হয়নি। ‘ঘুড্ডি’ তার শিকার। ১৯৬৫ সালে নির্মিত সাদিক খানের ‘নদী ও নারী’ নিয়েও একই কথা বলতে পারি। ‘ঘুড্ডি’র পর চলচ্চিত্র নির্মাণে নিয়মিত হতে পারিনি। এটি বানাতে গিয়ে স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখেছিলাম। এত বছরেও সেগুলো পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারিনি। ফলে চাকরির মোহের কাছে আমি পরাজিত হয়েছি।

 

কোন চাকরি?

এফডিসিতে অপারেশন ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ পেলাম। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত চাকরিটি করেছি। সেখানে তথাকথিত মূলধারা ও বিকল্পধারার মধ্যে একটা মিলন ঘটানোর চেষ্টা করেছি। তানভীর মোকাম্মেলকে ‘স্মৃতি একাত্তর’ ডকুমেন্টারিটি বানাতে দিয়ে বিভাগীয় মামলার আসামি হয়েছি। শাবানা আজমীকে এনেছিলাম বলে ভারতীয় শিল্পীকে সম্পৃক্ত করার অভিযোগে মাঝখানে আমাকে সাসপেন্ড করা হলো। ৯ মাস সাসপেন্ড থাকার পর আবার জয়েন করেছি। এফডিসিতে আমার রুমটি তখন হয়ে গিয়েছিল এক অসাধারণ জায়গা। রুচিশীল সব শিল্পীই আসতেন। আড্ডা দিতেন। শুটিংয়ের ফাঁকে হুমায়ুন ফরীদি এসে প্রায় সময়ই বিশ্রাম নিতেন। আসলে নানা বাধা-বিপত্তির মুখে পড়া, সংসার চালানোর জন্য চাকরির দ্বারস্থ হওয়া, ‘ঘুড্ডি’র বাণিজ্যিক ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে সেভাবে নিয়মিত হতে পারিনি।

 

পরে আরো দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানালেও সেগুলোতে আপনাকে ব্যর্থ ভাবা যায়!

‘ঘুড্ডি’র মতোই খুব উত্সাহ নিয়ে ‘আয়না বিবির পালা’ শুরু করেছিলাম। শেষ করতে পারিনি। প্রযোজক বিট্রে করলেন। অঞ্জু ঘোষের শিল্পীসত্তা ব্যবহার করে, তাঁকে মেকআপ ছাড়া অভিনয় করতে রাজি করিয়েছিলাম। ‘বেদের মেয়ে জোত্স্না’র কারণে ইলিয়াস কাঞ্চন ও অঞ্জুর জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। তাঁদের কিন্তু আমার ছবি করার কথা না। তবু তাঁরা রাজি হলেন, সহযোগিতা করলেন। তারপর বিবাদ বাধল। নির্মাতার স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ এলো। আমি ছেড়ে দিলাম। এটির কাহিনিকার সৈয়দ শামসুল হক তখন আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘ছেড়ে দিয়ে ভালোই করেছ। ওরা তোমাকে তোমার মতো করতে দেবে না।’ তবে এটি আমার ব্যর্থতা। অন্যদিকে ‘লাল বেনারসি’ স্রেফ একটি স্টুডিও ফিল্ম ছিল। আলমগীর ও রোজিনাকে নিয়ে একটি পিওর, সিম্পল স্টোরিটেলিং। এটা নিয়ে আমার কোনো দুঃখবোধ নেই।

 

বড় পর্দায় ধাক্কা খেয়ে ছোট পর্দায় এলেন?

টেলিফিল্ম বলতে আসলে যা বোঝায়, আমি তা বানাইনি; বরং টেলিভিশনের জন্য চলচ্চিত্র বানিয়েছি। প্রথমে আফজাল হোসেন ও শাবনাজকে নিয়ে বানালাম ‘আকাশ কুসুম’। সে সময়ে আমার বাংলাদেশ টেলিভিশনের চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা চলছে। আমি বলেছিলাম, ‘যোগ দিলে এটি চালাতে দেব না!’ সে কারণে তাড়াহুড়া করে, আমি যোগ দেওয়ার আগের দিনই ‘আকাশ কুসুম’ সম্প্রচারিত হয়েছিল। এটি কোনো রকম তথাকথিত প্রেমের গল্প না, একটি মোটরসাইকেলে দুটি চরিত্রের জার্নি নিয়ে পুরো গল্প। এর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ বানিয়েছি আসাদকে নিয়ে। আর ৩০ বছর পর আফজাল, মিতা চৌধুরী ও আসাদ—তিনজনকে এক করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘দধীচি যখন শিউলিফুল’ বানিয়েছি। রাবেয়া খাতুনের গল্প। ধর্ষিতা ও খুন হয়ে যাওয়া এক শিশুর কাহিনি। মেয়েটির হাড়গোড় উদ্ধার করে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে আফজাল। গ্রামের শত শত লোক পেছনে। ওভারলেপে আসাদের কণ্ঠে আমার লেখা একটি কবিতা।...সম্প্রতি আফজাল ও তারিনকে নিয়ে ‘হারানো পাতায় প্রেম’ বানিয়েছি। একটি সংগ্রামী মেয়ের গল্প। দুটি চরিত্র। আফজাল শহর থেকে এসেছে। তারিন শিক্ষকতা করে গ্রামে। আরো কিছু গল্প নিয়ে টেলিভিশনের জন্য ছবি বানানোর পরিকল্পনা আছে। আমি কিন্তু সব সময় নিজের স্ক্রিপ্টেই কাজ করি।

 

টেলিভিশনে চাকরির দিনগুলো কেমন ছিল?

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল—এই পাঁচ বছর বিটিভিতে মহাপরিচালক পদে চাকরি করেছি। তত্কালীন সরকারের পক্ষ থেকে যখন আমাকে আহ্বান করা হয়, প্রথমে রাজি ছিলাম না। আমাকে বলা হয়েছিল, কাজ করতে ভালো না লাগলে ছেড়ে দিতে পারব। তখন একটা চ্যালেঞ্জিং সময় ছিল। দীর্ঘকাল ধরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব বিকৃত ইতিহাস প্রচারিত হচ্ছিল, সেগুলো সংশোধনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার চ্যালেঞ্জ। সহকর্মীদের সহযোগিতা পাওয়ায় কাজ করতে তেমন অসুবিধা হয়নি। এর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে মেয়েকে নিয়ে কানাডায় চলে গিয়েছিলাম।

 

আপনার ব্যক্তিগত জীবনের কথা জানতে চাই।

আমরা চার ভাই, এক বোন। আমি দ্বিতীয়। ভাই-বোনেরা কানাডায় থাকেন। ১৯৬৯ সালে অল্প বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পারিবারিক জীবন একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বাবার বন্ধুদের সহযোগিতা এবং মায়ের সাহস আমাদের রক্ষা করেছে। আমি বিয়ে করেছি ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে। স্ত্রী শাহানা বেগম লেখালেখি করেন। আমাদের এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে অন্তরা শবনম ‘নতুন কুঁড়ি’তে অভিনয় করত। ছেলে শামস আদনার আনান থাকে কানাডায়।

 

আপনি এখন কী করছেন?

এসএ টিভিতে চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে কাজ করছি। শরীর খুব একটা ভালো যায় না! সিসিইউ-আইসিইউ—এই শব্দগুলো খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছি। ‘বোবামাটি’। শরীরের সাপোর্ট পেলে ছবিটা বানাতে পারব। রৌমারী থেকে বাদামতলী পর্যন্ত নৌকার এক দীর্ঘ যাত্রার ওপর এর কাহিনি। এটি ‘ঘুড্ডি’র ঠিক সিকুয়েল নয়। আবার সেটির যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু—এভাবেও ভাবা যেতে পারে। আরেকটি স্ক্রিপ্ট ‘গাধা’। প্রথম সিকোয়েন্সটিতে দেখা যাবে, প্রধান চরিত্রটি গাধার পিঠে চড়ে গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসছে। দীর্ঘ যানজট। ৫০-৬০ কিলোমিটার জ্যাম পাশ কাটিয়ে সে এগিয়ে আসছে। এটি একটু হালকা মেজাজের। তবু আমার মনে হয়, একটু কৌতুক, একটু চাবুক মারার ব্যাপার আছে! স্ক্রিপ্ট মোটামুটি রেডি। এটা আগে করব। কারণ, ‘বোবামাটি’ করতে হলে নিজের শারীরিক অবস্থার আরো উন্নতি করতে হবে আমাকে। দুঃখের বিষয়, এই ছবিতে নৌকার মাঝি চরিত্রে ওমপুরির অভিনয় করার কথা ছিল।  স্ক্রিপ্ট রেডি থাকলেও সহায়-সংগতি ছিল না এবং কেন্দ্রীয় মেয়েটির চরিত্রের অভিনেত্রীকে খুঁজতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। এরই মধ্যে ওমপুরি পরপারে চলে গেছেন। হুমায়ুন ফরীদিও তো বেঁচে নেই। মেয়ে চরিত্রটির অভিনেত্রী হিসেবে পুরনো কাউকে নিতে চাইনি; আবার ভারতের কোনো শিল্পীকেও চাইনি। এত দিনে তাঁকে খুঁজে পেয়েছি। আশা করছি সুবর্ণা ও আসাদকে এই ছবিতে পাব।

 

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

(গুলশান, ঢাকা; ৬ মার্চ ২০১৯)

মন্তব্য