kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

খুশিতে আমার চোখ টলমল করে

সুচন্দা। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেত্রী। ‘কাগজের নৌকা’, ‘বেহুলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘আনোয়ারা’, ‘নয়নতারা’সহ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন অংকুর রায়

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে




খুশিতে আমার চোখ টলমল করে

শৈশবের কথা মনে পড়ে?

১৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় আমার জন্ম। সাল কি বলতে হয়? থাক! বাবা এ এইচ এম নিজাম উদ্দিন আতায়্যুব ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। জন্মের ১৫-২০ দিন পর আমাকে পৈতৃকভিটা যশোরে নিয়ে আসা হয়। মা বেগম জাহানারার কাছে শুনেছি, একেবারে ছোটবেলায় আমি নাদুসনুদুস ছিলাম। বাড়িতে একটা শিউলি ফুলের গাছ ছিল। ফুলগুলো সকালবেলা মাটিতে পড়ে থাকত। বেতের ছোট্ট একটা ঝুড়ি ছিল আমার। সেটা হাতে নিয়ে ফুল কুড়াতাম। ফুলের বোঁটাগুলো কেটে, রোদে শুকাতাম। তারপর পানি মিশিয়ে বাটলে সুন্দর রং হতো। মেলা থেকে মাটির হাঁড়ি-পাতিল কিনে আনতাম। বাগান থেকে কোনো ফলের বীজ, কোনো পাতা তুলে এনে, শিউলি বোঁটার রং মিশিয়ে, মাটির হাঁড়িতে ভাঙা প্লেটের টুকরা কিংবা নারিকেলের মালা বসিয়ে রান্নাবান্না খেলতাম। ফুল ও রান্নার প্রতি ভীষণ ভালোবাসা আমার এখনো রয়েছে।

 

পড়াশোনা শুরু কোথায়?

আব্বা বাগেরহাট বদলি হলেন। বাগেরহাট কটন মিলের ম্যানেজার ছিলেন তিনি। সেখানে আমাদের বাড়ির কাছেই একটি স্কুল ছিল। সেই স্কুলে তালপাতায় বাঁশের কলম দিয়ে অক্ষরগুলো লেখা হতো। ক্লাস ওয়ান-টু ওখানেই পড়লাম। আব্বা আবার বদলি হয়ে যশোর এলেন। যশোর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল, যেটার নাম ছিল মোমেন গার্লস হাই স্কুল, ওখানে ভর্তি হলাম। ওখান থেকেই ম্যাট্রিক পাস করলাম, সম্ভবত ১৯৬৪ সালে। তারপর যশোরের এম এম কলেজে ভর্তি হয়ে ফার্স্ট ইয়ার পর্যন্ত পড়লাম। এরপর আব্বা বদলি হলেন বরিশালে। ওখানে অল্প কিছুদিন ছিলাম। ভর্তি হয়েছিলাম বরিশাল উইমেনস কলেজে। তারপর আব্বা ঢাকায় বদলি হলে পড়তে শুরু করলাম সিটি নাইট কলেজে (বর্তমানে সিটি কলেজ)। ঢাকায় আসার পর শুরু হলো আমার চলচ্চিত্রজীবন। আমাদের পরিবার ছিল রক্ষণশীল। এ রকম একটি মুসলিম পরিবারে থেকে তখনকার সময়ে পড়াশোনা করাই ছিল কঠিন ব্যাপার, সেখানে চলচ্চিত্রে নামাটা...।

 

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কথা ভাবলেন কখন?

আমার মা কিন্তু কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে পড়াশোনা করেছেন। খুবই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। আব্বা ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে। তাঁরা দুজনেই সংস্কৃতিমনা ছিলেন। স্কুলে পড়ার সময়ই মায়ের আদেশ ছিল, ‘শুধু লেখাপড়া করলে চলবে না, পাশাপাশি তোমাকে অন্তত কোনো একটা বিষয়ে স্পেশালিস্ট হতে হবে।’ এ কারণে ছোটবেলায় যখন যশোরে ছিলাম, বাড়িতে নাচের মাস্টার, গানের মাস্টার ছিল। মা খুব সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করতেন। এক বোন, এক ভাই—এ রকম পর্যায়ক্রমে আমরা ছয় ভাই-বোন। আমি যেহেতু সবার বড়, আমার ওপরই চাপটা বেশি পড়ত। মোমেন গার্লস স্কুলে পড়ার সময় মা ও শিক্ষকদের কথায় আমাকে সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই অংশ নিতে হতো। এভাবে যশোর শহরে তখন আমি বিখ্যাত। তখন তো ‘সুচন্দা’ নাম ছিল না। নাম ছিল কোহিনূর (কোহিনূর আক্তার)। একবার ‘শকুন্তলা’ নৃত্যনাট্য করে এতই বিখ্যাত হয়ে গেলাম, আমার পারিবারিক নাম বদলে শকুন্তলা হয়ে গেল! তখন মফস্বল শহরে, ছুটি হলে স্কুলের সামনে অনেক ছেলে দাঁড়িয়ে থাকত। সবাই বলাবলি করত, ‘শকুন্তলা আসতেছে!’ আমরা তিন বান্ধবী ছিলাম খুব ঘনিষ্ঠ। একজনের নাম মঞ্জু, আরেকজন লাইলী; আর আমার ডাকনাম আছে একটা—চাটনি। দাদার দেওয়া নাম। সবাই আমাদের ‘এলসিএম’ (লাইলী-চাটনি-মঞ্জু) বলে ডাকত। আমরা একসঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফিরতাম; ছেলেগুলো সাইকেল চালিয়ে পিছু নিত। বান্ধবীরা আমাকে খোঁচা দিয়ে বলত, ‘দেখ!’ আমি অবশ্য পাত্তা দিতাম না। নাচ-গান করলেও চলচ্চিত্রে আসার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। তবে স্কুলে পড়ার দিনগুলো থেকেই আমি সুচিত্রা সেনের অন্ধ ভক্ত। তাঁর অভিনয়, চলা, হাসি, চোখ, ব্যক্তিত্ব—সব কিছুরই। তাঁর ছবি দেখে বাড়ি গিয়ে, পরচুলা দিয়ে খোঁপা বানিয়ে, মায়ের শাড়ি পরে, বিশাল এক আয়নার সামনে দাঁড়াতাম। আর তাঁর সংলাপ ও অভিনয় অনুকরণ করতাম। এ রকম করতে করতেই সম্ভবত মনের অজান্তে একটা বীজ বপন হয়ে গেছে, শিল্পীমন তৈরি হয়ে গেছে।

 

চলচ্চিত্রে কিভাবে এলেন?

চলচ্চিত্রে হঠাত্ করেই আসা। পরিচালক সুভাষ দত্তের হাত ধরে। উনি কখন কোথায় আমাকে দেখেছিলেন, জানি না। ঢাকায় আমাদের বাসা ছিল গেণ্ডারিয়ায়। ১৯৬৬ সালের একদিন লোক পাঠিয়ে, ওনার বাড়িতে আমাকে নিমন্ত্রণ করলেন। বাবা বললেন, ‘কী ব্যাপার? হঠাত্ উনি নিমন্ত্রণ করছেন কেন?’ আম্মা বললেন, ‘এত বড় ডিরেক্টর ডেকেছেন। গিয়ে দেখো। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।’ যাওয়ার পর আমাকে দেখে উনি তক্ষুনি বাবাকে বললেন, “আমি একটি ছবি করব। ‘কাগজের নৌকা’। মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর চরিত্রে আমি ওকে নায়িকা বানাব।” বাবা বললেন, ‘এই মুহূর্তে কথা দিতে পারছি না। আমার পরিবারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।’ অনেক দিন ধরে মিটিং-সিটিং হলো। বাবার বন্ধুবান্ধব বললেন, ‘দেখো, ওর ভেতরে একটা প্রতিভা আছে, এটা নষ্ট করা ঠিক হবে না।’ এরপর মা-বাবা রাজি হলেন। তবে সুভাষ দত্তকে বাবা বললেন, ‘আপনার এই ছবিতেই শুধু কাজ করবে। আর কোনো ছবিতে না।’ সুভাষ দত্ত খুবই খুশি। তবে উনি অফার দিলেন, তাই বলে যে নায়িকা হয়ে গেলাম—তা কিন্তু নয়। নায়িকা হওয়া তখন অনেক কঠিন ব্যাপার ছিল।

 

নায়িকা হওয়ার ব্যাপারটা কেমন ছিল?

আমাকে এক দিন সুভাষ দত্ত বললেন, ছবি তুলতে হবে। তখন ‘কে ফটোগ্রাফার্স’ খুব নামকরা স্টুডিও। সেখানে নিয়ে আমার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি তুললেন। এরপর কণ্ঠস্বরের পরীক্ষা। তখন মধুমিতা সিনেমা হলের ঠিক উল্টোদিকে একটা রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল। ওখানে নিয়ে গিয়ে দত্তকাকু (সুভাষ দত্ত) একটা কাগজে কতগুলো সংলাপ লিখে দিলেন। কোনোটা রোমান্টিক, কোনোটা দুঃখের, কোনোটা নরমাল। বিশাল একটা ঘরে মাইক রাখা। বললেন, ‘লালবাতি জ্বললে তোমার সংলাপগুলো মাইকের সামনে নিজের অনুভূতি দিয়ে বলবে।’ আমার তো হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল! তবু কয়েকবার পড়লাম। আসলে আমার কণ্ঠস্বর কেমন—আমি তো জানি না। পাস করলাম, নাকি ফেল—মনের মধ্যে তোলপাড়। উনি ঘরের দরজাটা খুলতেই, একটা কথা আমার কানে এলো ‘আরে, দত্ত কোথায় যে এত সুন্দর সুন্দর মেয়ে পায়!’ বুঝতে পারলাম, হয়তো ইতিবাচক কিছু। ওনার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখি বেশ খুশি। বললেন, ‘তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে চাও?’ আমি চুপ। উনি রেকর্ডিংরুমে আমাকে নিয়ে গেলেন। ওখানে তখন পরিচালক এহতেশাম, তাঁর ভাই মোস্তাফিজুর রহমান, সংগীত পরিচালক সত্য সাহা—এঁরা কয়েকজন বসে ছিলেন। দত্তকাকু আমার সামনেই বললেন, ‘নাহ! ভারি চমত্কার মেয়েটার গলা!’

 

প্রথম দিনের শুটিংয়ের কথা মনে আছে?

সেটা ছিল ছবির একেবারেই শেষ দৃশ্য। ওই সিকুয়েন্সটায় কোনো সংলাপ ছিল না। অনেক দিন পর যখন অনেক ভুল বোঝাবুঝি, অনেক কিছুর পর নায়ক-নায়িকার মিলন হবে, নায়ক গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দৌড়ে এসে তাঁকে দেখলাম। তারপর দৌড়ে যেতে যেতে, ওর কাছে দাঁড়িয়ে, ওর দিকে তাকিয়ে সেই যে সাইলেন্ট এক্সপ্রেশন, সেই যে চোখ-মুখের অনুভূতিগুলো, আর সবশেষে জড়িয়ে ধরা—এখানেই ছবির দ্য এন্ড। আমার এই প্রথম শটটি এক টেকেই ওকে হয়েছিল। শট দেওয়ার পর ইউনিটের সবাই হাততালি দিলেন। কাকু খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘ভালো হয়েছে তোমার এক্সপ্রেশন।’ তখন তো সুভাষ দত্ত কোনো নতুন নায়িকা আনামাত্রই সেটা চারদিকে রটে যেত। অন্য প্রডিউসার, ডিরেক্টররা এসে শুটিং দেখতেন। তাই প্রথম ছবি মুক্তি পাওয়ার আগেই একের পর এক নতুন ছবির প্রস্তাব পেলাম; কিন্তু সুভাষ দত্তের শর্ত ছিল, প্রথম ছবি মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো ছবি যেন না করি। বলেছিলেন, ‘ছবিটা আগে রিলিজ হোক, তারপর তুমি দেখো, বোঝো তোমার ফিউচার কী?’ মা-বাবাও চাচ্ছিলেন না আমি আর কোনো ছবি করি। নয়তো আমার পড়াশোনার ক্ষতি হবে। আমি জীবনে কখনো মা-বাবার অবাধ্য ছিলাম না। সেই কারণে নীরবই ছিলাম।

 

পর্দায় নিজেকে প্রথম দেখার অনুভূতি?

শুটিংয়ের সময় তো জানি না পর্দায় আমাকে কেমন দেখাবে। এক দিন শুনলাম, এফডিসির পুরনো বিল্ডিংয়ের সাউন্ড রেকর্ডিংরুমটিতে আমার একটা গান দেখবেন দত্তকাকু। শুটিংয়ে ভয় পাইনি; কিন্তু এ খবর পেয়ে খুব নার্ভাস হয়ে গেলাম। সাউন্ডরুমে গিয়ে দেখি প্রডাকশন বয়, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে এফডিসির সবাই হাজির। চেয়ার তো ভর্তিই, মাটিতে কার্পেটের ওপরও বসে আছেন অনেকে। আমি মনে মনে স্রষ্টাকে ডাকলাম। হঠাত্ সব লাইট অফ হয়ে গেল। তারপর বিশাল পর্দায় দেখি আমার চেহারা। রোমান্টিক একটা গান। নায়ক-নায়িকা সেই ছোটবেলায় আলাদা হয়ে গেছে। তারপর বড় হয়ে যখন নায়িকা মেডিক্যালে পড়ে, একদিন দুজনের লেভেলক্রসিংয়ে দেখা। নায়ক বলেছে, ‘তোমার বাসায় আসব।’ এ জন্য নায়িকা ঘরদোর পরিপাটি করেছে। কাচের চুড়ি পরেছে। একটু সাজগোজ করে, চুলায় কেটলিতে পানি গরম দিয়েছে—চা বানাবে। যখন চায়ের কেটলিটা রাখতে গেছে, কাচের চুড়িগুলো ঝুনঝুন করে বাজছে আর মেয়েটা গাইছে ‘অমন করে তুমি আর বেজো না/ এই একটু পরে/ সে আসবে ঘরে/ আমায় করো না আনমনা।’ এই ছিল গানের কথা। সত্যদার সুর। গেয়েছেন সম্ভবত আনজুমান আরা। গান হচ্ছে, হচ্ছে...আমি নিজেও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি পর্দার দিকে। গান শেষ হতেই সবাই হাততালি দিয়ে, চিত্কার করে বলছে, ‘আমরা পেয়েছি আমাদের সুচিত্রা সেনকে!’ শুনে চমকে গেলাম। শয়নে-স্বপনে-আহারে-বিহারে যাঁর কথা আমি ভুলতেই পারতাম না, চোখের সামনে যাঁর অভিনয়টাই ভেসে উঠত, সেই সুচিত্রা সেনের সঙ্গেই কি না এরা আমার তুলনা করছে? খুশিতে আমার চোখ টলমল করে উঠল। এই ছবির পরই শুরু করলাম জহির রায়হানের ‘বেহুলা’। নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের প্রথম ছবি।

 

জহির রায়হানের সঙ্গে পরিচয় কখন?

‘কাগজের নৌকা’ তখনো মুক্তি পায়নি। এরই মধ্যে শুটিং ও ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত আমি। এক দিন দুপুরবেলা একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মা ডেকে তুলে বললেন, ‘পরিচালক জহির রায়হান এসেছেন।’ ওনার নাম শুনেছি। খুব বিখ্যাত পরিচালক। আমি তাড়াহুড়া করে উঠে, ড্রয়িংরুমে এলাম। তাঁর সামনে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ভেবেছিলাম, যেহেতু অনেক নামকরা পরিচালক, নিশ্চয়ই বয়স্ক লোক হবেন। নিজের সহকারীদেরও নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ড্রয়িংরুমে গিয়ে ঠিক বুঝতে পারলাম না, কোনটা জহির রায়হান। হঠাত্ আমাকে বললেন, ‘আপনি বসুন।’ আমি বসলাম। বললেন, ‘আমি একটা ছবি করব। সেই ছবির নায়িকা হিসেবে আপনাকে নিতে চাই।’ তখন বুঝতে পারলাম, এটাই জহির রায়হান। হাতে একটা গাড়ির চাবি নিয়ে উনি ঘোরাচ্ছিলেন। ওখান থেকেই পরিচয়। এভাবেই তাঁর ছবির কাজ করলাম। উনি খুব সুন্দর করে শট নিতেন, স্ক্রিপ্ট ও ডায়ালগ লিখতেন, এডিটিং করতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম ওনার কাজ দেখে। আস্তে আস্তে হয়তো ওনারও আমাকে দেখে ভালো লেগে গেল। দুজনই কাজপাগল ছিলাম। কাজ করতে করতে শ্রদ্ধাবোধ থেকেই ভালোবাসার জন্ম।

 

‘বেহুলা’র শুটিংয়ের কোনো বিশেষ ঘটনা?

বাসরঘরে লখিন্দরকে সাপ দংশন করবে—এ দৃশ্যের শুটিং হবে। বাসরঘরের ভেতরেই শুটিং। আমার মুখ চন্দন দিয়ে সাজানো। আমরা একটানা রাত-দিন শুটিং করে প্রচণ্ড ক্লান্ত। উনি রাজ্জাককে বললেন, ‘আপনি আর ম্যাডাম গিয়ে খাটে বসে বিশ্রাম করুন, গল্প করুন, এই ফাঁকে আমি বাসরঘরটির বাইরের একটা শট নিয়ে আসছি।’ সেই দৃশ্যের অভিনয়ে ছিলেন ফতেহ লোহানী ও রানী সরকার। শটের ফাঁকে রানীদি এসে বললেন, ‘তোরা তো ঘুমে ঢলে পড়ছিস। একটু শুয়ে ১০-১৫ মিনিট রেস্ট নে। শট নেওয়ার সময় তো ডেকে দেবেই।’ সব রেডি ছিল। আমি আর রাজ্জাক দুই বালিশে শুয়ে গল্প করতে করতে কখন যেন অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছি! এর মধ্যে জহির এসে বোধ হয় দেখেছেন, আমরা ঠিক পজিশনেই শুয়ে আছি। সবাইকে নিশ্চুপ থাকার ইশারা দিয়ে, লাইটিং করে ফেললেন তিনি। তখন সাধারণত সব ছবিতেই সাপ সাপ্লাই দিতেন ছোটখাটো এক ভদ্রলোক, তাঁর নামটা এখন আর মনে করতে পারছি না, তিনি জহিরের ইশারা পেয়ে কালনাগিনীকে ছেড়ে দিলেন। সেই অঘোর ঘুমের মধ্যেই হঠাত্ আমার মনে হলো, গলার মধ্যে ঠাণ্ডা ভাব! কিছু একটা নড়ছে। ঘুমের ঘোরেই তাকিয়ে দেখি—সাপ! আমি চিত্কার দিয়ে উঠলাম। তখন পরিচালক ক্যামেরার ওপার থেকে বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনি কোনো কথা বলবেন না। চোখ বন্ধ করে ঘুমান। আমি শট নিচ্ছি।’ আমি বাধ্য হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘রাজ্জাক, সাপ...!’ রাজ্জাকও একইভাবে বললেন, ‘কথা বইলেন না।’ আমরা দুজন চুপচাপ শুয়ে থাকলাম। আলো দেখে সাপটা আমার শরীর বেয়ে ধীরে ধীরে আমাদের দুজনের পায়ের কাছে চলে এলো। যেন সাপও একটা আর্টিস্ট! জহির তখন বললেন, ‘রাজ্জাক, আপনার বাঁ পা একবার ওপরে তুলে আবার নিচে ফেলুন।’ রাজ্জাক পা উঁচু করে তারপর নিচে ফেললেন। সাপটা কই গেল, জানি না!

 

শুটিং করতে গিয়ে মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন!

লখিন্দরের লাশের সঙ্গে বেহুলাকে যখন কলার ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়, সেটির শুটিং হয়েছিল চাঁদপুরের ষাটনলে, তিন নদীর মোহনায়। শুটিংয়ের জন্য বিরাট একটা লঞ্চ ভাড়া করা হলো। বর্ষাকাল। পানি আর পানি। ভয়াবহ ঢেউ। দেখলেই ভয় লাগে। লঞ্চ প্রচণ্ড দুলছে। জহির আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘আপনি এই পানিতে নেমে শট দিতে পারবেন না?’ আমিও চোখ না ফিরিয়েই দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, ‘পারব।’ লঞ্চ বাঁধার মোটা বড় শিকল দিয়ে ভেলাটি বেঁধে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। জহির বলে দিলেন, ‘আমি কখন কোন শট নেব, সেটা তো দূর থেকে আপনি বুঝতে পারবেন না। তাই স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছেন, স্বামীকে জীবিত করে ফিরিয়ে আনার যে চিন্তা—এই এক্সপ্রেশনটা সব সময়ই কন্টিনিউ করবেন।’ সেই বেনারসি শাড়ি পরা, কপালে চন্দনের ফোঁটা...আমি ভাসতে ভাসতে যাচ্ছি। উনি সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় শট নেবেন। এর মধ্যে হঠাত্ আকাশ একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রচণ্ড বাতাস। শুরু হলো ঝড়-বৃষ্টি। পানির ইয়া বড় বড় ঢেউ। ভেলা একবার ওপরে উঠছে, আবার একেবারে নিচে চলে যাচ্ছে। আমার চুল খোলা। ভেলাটি শক্ত করে ধরে বসে আছি। লাশ হিসেবে তো রাজ্জাক ছিলেন না, ছিল ডামি। ডামি হওয়া লোকটি ভয়ে আমার পা ধরে কান্নাকাটি শুরু করলেন ‘দিদি, আমাকে বাঁচান, আমার বউ-ছেলে-মেয়ে...।’ আমি তাঁকে সান্ত্বনা দিলাম। একসময় দেখি, ভেলার একেকটা অংশ খুলে চলে যাচ্ছে। কোথায় লঞ্চ, কোথায় কূল—কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এ রকম আধা ঘণ্টা-পৌনে এক ঘণ্টার মতো চলে, আস্তে আস্তে বাতাসের বেগ কমতে থাকল। কিন্তু ঢেউ উথাল-পাতাল। পরে জেনেছি, লঞ্চে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা আমাদের হদিশ না পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিলেন। ধরেই নিয়েছিলেন, আমরা আর বেঁচে নেই। এভাবে আরো দেড় ঘণ্টা চলে গেল। তারপর আমার মনে হলো, অনেক দূরে লাইটের মতো সাদা কিছু একটা নড়ছে। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো দৃষ্টিভ্রম। আবার মনে হলো, হতে পারে লঞ্চের সার্চলাইট। কিন্তু শিকল তো সব ছিঁড়ে গেছে। আমি চাইলেও লঞ্চের কাছে যেতে পারব না। অনেকক্ষণ পরে ওঁরা আমাদের দেখতে পেলেন। লঞ্চটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। কাছাকাছি এসে ওঁরা বারবার রশি ছুড়ছিলেন। কিন্তু ঢেউয়ের জন্য ধরতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে উদ্ধার পেলাম আমরা। লঞ্চে উঠতেই জহির রায়হান আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই আলিঙ্গনই হয়তো আমাদের আরো কাছাকাছি নিয়ে এলো। ‘বেহুলা’র পর আমি প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে গেলাম। সে সময়ের এমন কোনো পরিচালক নেই, এমন কোনো নায়ক নেই—যাঁদের সঙ্গে ছবি করিনি। সব ধরনের ছবিরই নায়িকা ছিলাম আমি।

 

‘জীবন থেকে নেয়া’...

শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছি। তবু বলব, শিল্পী কখনোই তৃপ্ত হয় না। এত ছবির মধ্যে বিশেষ একটির নাম বলতে হলে বলব ‘জীবন থেকে নেয়া’। কলকাতায় ছবিটা দেখে জহিরের পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন সত্যজিত্ রায়। এখনো একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমি একান্ত বাধ্য না হলে বাসা থেকে বের হই না। যখন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...’ গানটি শুনি, আমি ফিরে যাই সেই শুটিংয়ের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। সেদিন ভোররাতে ফুল নিয়ে আমরা সবাই যেভাবে খালি পায়ে প্রভাতফেরি করে, ফুল দিয়ে শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়েছিলাম—সারাক্ষণই সেই স্মৃতি তাড়া করে আমাকে।

 

বিয়ে, সংসার...

বিয়ের কথা উনি অনেক দিন ধরেই বলছিলেন। কিন্তু আমি জানতাম, পরিবার থেকে মত পাব না। ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে এক দিন উনি বাসায় এসে বললেন, ‘শুটিং আছে, যেতে হবে।’ গাড়িতে উঠলাম। কিসের শুটিং! গাড়ি থামালেন ধানমণ্ডিতে, তাঁর বাসার সামনে। বাসায় নিয়ে বললেন, ‘আর কোনো কথা শুনব না, আজকেই বিয়ে।’ ওখানে ওর বন্ধুবান্ধবরা ছিলেন। এভাবেই বিয়ে হয়ে গেল। মা-বাবাকে তখনো জানাতে পারিনি। বিয়ের পাঁচ-ছয় মাস পর সংসার শুরু করলাম। দাম্পত্যজীবনে দেখেছি, জহির খুব কম কথা বলতেন। যখন চিত্রনাট্য তৈরি করতেন, ওনার সহকর্মীরা সবাই বসতেন কাগজ-কলম নিয়ে। উনি বলতেন, তাঁরা লিখতেন। যখন উনি লিখতেন, বেশির ভাগ সময়ই আমাকে পাশে বসিয়ে রাখতেন। কমপক্ষে এক ঘণ্টা পড়াশোনা না করে রাতে ঘুমাতেন না। পোশাকাদি, টাকা-পয়সা, ঘরসংসার—এসবের প্রতি খুব উদাসীন ছিলেন। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ওনার মাথাব্যথা ছিল না। মানুষের ব্যক্তিগত কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকে; অথচ উনি কাজ ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। এমনিতে অবশ্য খুব রোমান্টিক মানুষ ছিলেন।

 

তাঁর অন্তর্ধানের পর...

জহির কিছুই রেখে যাননি। কোথাও এক কাঠা জমি, কোথাও একটা ঘর, ব্যাংকে ১০টা টাকা—কিছুই না। জহিরকে হারাবার পর আমার মানসিক অবস্থা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন? আমার বয়সও কম তখন। বিয়ে হয়েছিল ১৯-২০ বছর বয়সে। তার মাত্র তিন-চার বছর পরই বিধবা হলাম। আমাদের দুই ছেলে আরাফাত রায়হান অপু ও তপু রায়হান তখন নিতান্তই শিশু। আরো অনেক ছবিই হয়তো করতে পারতাম; কিন্তু সন্তানদের মানুষ করতে ছবিতে কাজ করা বন্ধ করে দিলাম। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুর যে স্নেহ আমি পেয়েছি, তা আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করব। শহীদ পরিবার হিসেবে উনি আমাকে বনানীতে একটা বাড়িও দিয়েছিলেন। তখন বনানী ফাঁকা ছিল, শুধু একটি-দুটি বাড়ি। রাতের বেলা কারা যেন জানালায় ঢিল ছুড়ে বিরক্ত করত। বঙ্গবন্ধুকে জানালাম। তিনি আমার সামনেই পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে লাল টেলিফোনে বলে দিলেন। এরপর কেউ আমাকে জ্বালাতন করার সাহস পায়নি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর, পরবর্তী সরকার বনানীর বাড়িটি আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়। এখনো সেই বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে মন হু-হু করে। এ বাড়িতে আমার কত যে কষ্টের, কত যে সংগ্রামের স্মৃতি!

 

আপনার দুই বোনই বিখ্যাত অভিনেত্রী।

প্রচলিত ধারণা ছিল, চলচ্চিত্র জগত্ খুব একটা ভালো না। আমি কাজ করতে করতে অনুভব করলাম, এর চেয়ে সুন্দর জায়গা বোধ হয় আর কোথাও নেই। তাই নিজের দুই বোনকে এ জগতে নিয়ে এলাম। ববিতা তখন স্কুলে পড়ে, এইটে। এত অল্প বয়সে সে অভিনয়ে আসুক, মা-বাবা চাননি। কিন্তু জহির আমাকে বলেছিল, ওর ‘সংসার’ (জহির রায়হান ছিলেন চিত্রনাট্যকার) ছবির ছোট্ট নায়িকার চরিত্রে ববিতাকেই লাগবে। শুনে বাবা রেগে অস্থির। এদিকে স্বামীর কথাও উপেক্ষা করতে পারছি না। মা-বাবাকে বুঝিয়ে ববিতাকে চলচ্চিত্রে আনলাম। মৃত্যুশয্যায় বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমরা দুই বোন একসঙ্গে কাজ করেছ—দেখেছি। তিন বোন একসঙ্গে কাজ করবা—দেখতে চাই।’ কোনো অনুষ্ঠানে যেতে হলে বেশির ভাগ সময় আমরা তিন বোন একসঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করতাম। বাবা শুয়ে থাকতেন। তাঁকে বলে বের হতাম। বাবা সম্ভবত চেয়েছিলেন, এ রকম কিছু একটা স্মৃতি হয়ে থাক। বাবা চলে যাওয়ার পর এ নিয়ে খারাপ লাগত। পারিবারিকভাবে চম্পার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ওর স্বামীর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘ছবিটবিতে অভিনয় করার দরকার নাই।’ আমি মন খারাপ করে চলে আসছিলাম। গাড়িতে উঠতেই কাজের মেয়ে দৌড়ে এসে বলল, ‘আপনাকে খালু ডাকছেন।’ গেলাম। চম্পার স্বামী বললেন, ‘এই পরিবারে আপনার যা অবদান, ভাই-বোনের প্রতি যে দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন, তাই ভাবলাম, মানা করাটা ঠিক হবে না। ঠিক আছে, এই একটা ছবিই করবে।’ এভাবে চম্পাকে নিয়ে এলাম ‘তিন কন্যা’ ছবির মাধ্যমে।

 

আপনি নিজেও পরিচালনা করেছেন।

চিত্রনাট্য লেখা হলে জহির রাতের বেলা আমাকে দেখাতেন। আমি কখনো কখনো মন্তব্য করতাম। উনি বলতেন, ‘ভালোই তো জ্ঞানবুদ্ধি আছে!’ মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে আমাকে বললেন, ‘তুমি ছবি ডিরেকশন দাও, আমি স্ক্রিপ্ট তৈরি করে দেব। তুমি পারবেই।’ বলেছিলাম, এখনো নিজে পরিচালনা করার মতো অভিজ্ঞতা হয়নি। আরো এক-দুই বছর পর করব। তখন তো জানতাম না, তিনিই আর থাকবেন না! তিনি চলে যাওয়ার পর অনেক স্ট্রাগল শেষে একসময় মনে হলো, এখন আমার ছবি বানানোর সময় হয়েছে। প্রথমে করলাম ‘সবুজ কোট কালো চশমা’। মালয়েশিয়ায় শুটিং করেছিলাম। ছবিটি চলেনি। তারপর চিন্তা করলাম, জহিরের গল্প নিয়ে কাজ করব। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটি আমার খুব পছন্দের। এটি নিয়ে, এ নামেই ছবি বানালাম। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকার দু-একটি সিনেমা হল ছাড়া আমার ছবিটা হল মালিকরা কোথাও চালাননি। যাহোক এই ছবি খুব প্রশংসিত হয়েছে। এই ছবি দিয়ে আমি প্রায় ৩৩-৩৪টি পুরস্কার জিতেছি। এর মধ্যে রয়েছে সেরা পরিচালকসহ সাতটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়।

 

এখন সময় কাটে কিভাবে?

আমি সময় পেলেই গ্রামগঞ্জে ঘুরতে পছন্দ করি। সামাজিক অনেক কাজকর্ম ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আছি। নাতি-নাতনিরা ভীষণভাবে আমার সঙ্গ চায়। আমিও ওদের খুব ভালোবাসি। আমার তিন ভাইয়ের মধ্যে বড়টি সাইদুল ইসলাম চাচ্চি। ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার। অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। দ্বিতীয় ভাইটি বৈমানিক। ইকবাল ইসলাম। ছোট ভাই ফেরদৌস ইসলাম কম্পিউটার স্টাডিজে পড়াশোনা করে ক্যারিয়ার গড়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের বিশাল পরিবার। ফলে পারিবারিক ব্যস্ততা লেগেই আছে। এর মধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও কাজ করছি।

(বনানী, ডিওএইচএস, ঢাকা; ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)

 

মন্তব্য