kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

‘গ্রাম-শহরের জন্য আলাদা প্রশ্ন থাকা প্রয়োজন’

ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেও প্রকৌশলী হলেন না। আরো ভালো কিছু করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৮ বছর বয়সে চলে এলেন বাংলাদেশে। ১৯৬২ সাল থেকে বিখ্যাত নটর ডেম কলেজে অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন। ২৫ বছর কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন ফাদার জোসেফ পিশোতো। তাঁর বর্ণময় জীবন জেনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১ জুন, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৪ মিনিটে



‘গ্রাম-শহরের জন্য আলাদা প্রশ্ন থাকা প্রয়োজন’

যাজকের জীবন কেন বেছে নিলেন?

আমি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ, ‘ইউনিভার্সিটি অব পোর্টল্যান্ড’ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছি। আমাদের দেশের রীতি অনুযায়ী, অন্যসব ছাত্র-ছাত্রীর মতো পড়ালেখা করতে করতে প্রতি বছর ছুটিতে কাজ করতাম। ‘ব্যুরো অব পাবলিক রোডস’-এর কর্মী হয়ে পাহাড় কেটে রাস্তা বানাতাম। একদিন কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে এলো, পাস করে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে তো রাস্তাঘাট, ভবন বানাব। লোকের উপকার হবে, আমারও অনেক পয়সা হবে, কিন্তু জীবন আরো মূল্যবান কিছু করার জন্য। দুই খালা ‘নান’ হয়েছেন, পরিবারটিও আমাদের ধর্মপ্রাণ, নিজেও ধর্মভীরু মানুষ; ঈশ্বর আমার কাছে কী চান—এই বলে খুব একমনে তাঁকে ডাকলাম। পরে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। চলে গেলাম হলিক্রস সম্প্রদায়ে। তাঁদের মাধ্যমে ফাদারের প্রশিক্ষণ জীবন শুরু হলো। সেমিনারিতে টানা সাত বছর বিশেষ ‘মূল্যবোধ’ ও ‘সাধনা’ প্রশিক্ষণ লাভের পর ‘ফাদার’ হয়েছি। এ প্রশিক্ষণকালই আমার জীবনের গঠনকাল। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটন ডিসির ‘ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকা’ থেকে ‘পদার্থবিদ্যা’ ও ধর্মতত্ব’ বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি নিলাম। এর মাঝেই ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে হলিক্রসের ‘ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেম’-এ দুই বছর পড়ালেখা ও এক বছরের বিশেষ প্রার্থনাজীবন সম্পন্ন হলো। পদার্থবিদ্যা পড়ার কারণ, পূর্ব পাকিস্তানে হলিক্রস সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত ‘নটর ডেম কলেজ’-এ যাতে ছাত্রদের পদার্থবিদ্যা শেখাতে পারি। সবশেষে ‘সিএসসি (কংগ্রেশন অব হলিক্রস)’ হয়ে ‘ফাদার’ বা ‘যাজক’ হলাম।

 

পূর্ব বাংলায় কবে এলেন?

১৯৬২ সালে ঢাকা বিমানবন্দরে নামলাম। হলিক্রস সংঘের ব্রাদার, ফাদার ও সিস্টাররা সেন্ট জোসেফ, সেন্ট গ্রেগরি, নটর ডেম ইত্যাদি স্কুলে শিক্ষাদান করেন। নটর ডেমে গেলাম। তখনই এই কলেজের ফলাফল সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। ১৯৪৯ সালে ‘সেন্ট গ্রেগরিজ কলেজ’ নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম আট বছরের সাত বছরই এইচএসসিতে প্রথম স্থানটি অধিকার করেছে। ফলে পাঁচ বছরের মধ্যে ১৯৫৪ সালে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ঢাকার মতিঝিলে ‘নটর ডেম কলেজ’ নামে পূর্ণাঙ্গ কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মৌলিক শিক্ষা প্রদান ও অসাধারণ ফলাফলের শিক্ষাদানের কারণে নটর ডেম তখন থেকে আজও বাংলাদেশের খুব অভিজাত, খুব উচ্চমানের কলেজ। শিক্ষকরা এখনকার মতো তখনও খুব ভালো ছিলেন। কিছুদিন কলেজে থেকে, সেই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বাংলা শিখব বলে সুদূর বরিশাল চলে গেলাম। সাগরদীর সাগরদী মেডিক্যাল হাসপাতালের উল্টোদিকে থাকতাম, ‘ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট’-এ বাংলা শিখতাম। বয়স তখন ২৮। নয়টি মাস থাকা হলো। খুব সুন্দর শহরটি আট বছর আগে যেমন দেখেছি, ৫০ বছর আগেও একই ছিল। গত কয়েক বছরে বরিশালের অনেক উন্নতি ঘটেছে। খুব ঘুরতাম, কোনো অসুবিধা হতো না। ১৯৬৩ সালের মাঝামাঝিতে নটর ডেমে যোগ দিলাম। সেই থেকে ছাত্র পড়াই, বিনিময়ে হাতখরচ, থাকা-খাওয়া বাদে কিছুই লাগে না। আমাদের বেতনও নেই। তখন আমরা বোধ হয় ১০ জন বিদেশি ফাদার, বাঙালি ৩৩ জন শিক্ষক ছিলেন। ছাত্র প্রায় ৬০০। এইচএসসিতে ‘বিজ্ঞান’ ও ‘কলা’ বিভাগ; উচ্চতর শিক্ষার জন্য ‘বিএ’ ও ‘বিএসসি’ ছিল।

 

কলেজের মান তখন কেমন ছিল?

সারা দেশের সব ভালো ছাত্ররা এই কলেজে পড়তে চাইত বলে নটর ডেমের মান তখনই খুব ভালো। সবচেয়ে ভালো ছাত্ররা পড়ে। ছাত্রসংখ্যা অনেক ছিল না বলে তখন আরো ভালো শিক্ষা দিতে পারতাম। ডিবেটিং, সায়েন্স, অ্যাডভেঞ্চারসহ আরো কটি ক্লাব ছিল। অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের ছাত্ররা এখানে-সেখানে নানা কিছু দেখতে যেত, আমাদের মাসিক পত্রিকা ছিল। আমি এসেই সায়েন্স ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। ছাত্রদের প্রজেক্ট সম্পন্ন করার নেতৃত্ব দিয়েছি, পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের জন্য উপকরণের ব্যবস্থা করেছি, ফিল্ড সার্ভে চালু করেছি। পরিকল্পনা করে কাজ করার নিয়ম তৈরি করেছি। বিজ্ঞানের উন্নয়নে অনেক অবদান রেখেছি। নানা প্রয়োজনে হলিক্রস ব্রাদার ও নটর ডেম ইউনিভার্সিটির সাহায্য নিতে হয়েছে। ব্রাদার ও ফাদাররা অনেক থাকায় ষাট দশকেই নটর ডেমের উন্নয়ন বেশি হয়েছে। আমি কিন্তু সায়েন্স ক্লাবের দায়িত্বে ছিলাম না, ছিলেন ফাদার টিম।

 

তিনি তো বিখ্যাত বিজ্ঞানী?

হ্যাঁ, তিনি খুব মেধাবী মানুষও। এত মেধাবী ছিলেন যে কয়েক বছর লেখাপড়া করেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচডি লাভ করেছেন। ১৯৫৩ সালে ফাদার টিম পূর্ব বাংলায় এসে ‘সেন্ট গ্রেগরিজ কলেজ’-এ তিনি সায়েন্স ক্লাব স্থাপন করলেন। ‘নটর ডেম কলেজ’ প্রতিষ্ঠার বছরই তিনি তাতে বিজ্ঞান বিভাগ স্থাপন করলেন, বিজ্ঞানের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সবই করেছেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার বছরই তাঁর হাতে ‘সায়েন্স ক্লাব’ ও ‘ডিবেটিং ক্লাব’-এর জন্ম হলো। এই বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কিছুদিন ক্লাস নিয়েছেন। অনেক গবেষণা করেছেন। ১৫০টি জাতের কৃমি আবিষ্কার ও সেগুলোর নাম দিয়ে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে প্রভূত সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৬৮ সালে এন্টার্কটিকায় অভিযান করে বরফের একেবারে নিচ থেকে জন্তুর শরীরের ধ্বংসাবশেষে বিশেষ ধরনের ‘কৃমি’ আবিষ্কার করেছেন। তবে গবেষণার কারণে বেশি দিন তিনি এ দেশে থাকতেন পারতেন না। আসতেন, কিছুদিন পড়িয়ে আবার গবেষণার জন্য চলে যেতেন। তিনি আমার পাশের ঘরেই থাকতেন। আমি কলেজে যোগদানের পর তাঁকে নানাভাবে সাহায্য করতে শুরু করলাম।

 

তখন তো উত্তাল সময়?

আমরা ভালো ছাত্র, জ্ঞানী, গুণী শিক্ষক নিয়ে ভালোভাবে শিক্ষাদান করলেও দেশ তো তখন আগুনে। ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন আন্দোলন হলো। ষাটের দশক তো সরকার বিরোধী আন্দোলন আর সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে গেছে। তবে বাইরে অনেক সমস্যা থাকলেও কলেজ ক্যাম্পাসে কিন্তু আমরা ভালোভাবেই পড়িয়েছি। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭০ সাল কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছি। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার বলল, প্রতিটি কলেজে ‘ছাত্র সংসদ’ প্রয়োজন। আমরা বললাম, আমরা রাজনীতি ‘র’ও কলেজে রাখব না। তবে ঠেকাতে পারলাম না। চাপের মুখে বাধ্য হয়ে যতটুকু সম্ভব ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করলাম। সেটিও ছাত্রদের উন্নয়নে আমরা ভালোভাবে চালাতে চেয়েছি, কিন্তু বাইরে থেকে বিভিন্ন সংস্থা ছাত্রদের প্রভাবিত করতে লাগল। ফলে কলেজের নিয়ম, শৃংখলা ধরে রাখতে অনেক কষ্ট হলো। তখন নিশ্চয়ই আমরা দেশের প্রয়োজনে ছাত্রদের এই সংগ্রামের সমর্থক ছিলাম, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভালোভাবে শিক্ষাদান করতে চেয়েছি। সংগ্রাম পরিচালনা ও অংশগ্রহণের জন্য ভালো নেতা-কর্মীর প্রয়োজন। ভালোভাবে লেখাপড়া না করলে, মানুষ হিসেবে উন্নত চরিত্রের না হলে কীভাবে ভালো নেতা-কর্মী তৈরি হবে? তারপর তো একাত্তর এলো। স্বাধীনতার বছরের শুরুর দিতে কলেজে মাত্র কয়েকজন ছাত্র আছে। পাকিস্তানীরা যখন বললো, সব কিছু ভালো চলছে; আমরা বললাম এ কেমন ভালো? কোনো ছাত্রই তো কলেজে নেই। থাকলে ক্লাস হয় না, রাস্তায় কারফিউ চলে, বসে আছি বলে ১০ মার্চ রূপগঞ্জের মঠববাড়ির উলুখোলা গ্রামে চলে গেলাম। তাঁরা সাহায্য চেয়েছিলেন।

 

মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ে জীবন?

সেখানে প্যারিস আছে, ফাদার নেই বলে চলে গেলাম। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রার্থনাসভা ফাদার পরিচালনা করেন। গির্জায় এক ভবনে সব কাজ পরিচালনা করা হয়, প্যারিসের পুরো প্রশাসনিক কাঠামো আছে। সেখানে লোকের নানা সমস্যার সমাধানদান, জন্ম-মৃত্যু-বিয়েতে প্রার্থনা পরিচালনা, আশীর্বাদ দান ইত্যাদি সম্পন্ন করতাম। তিন মাস সেখানে ছিলাম। এরপর কালীগঞ্জের কাছে তেমুলিয়া গ্রামের প্যারিসে গেলাম। ফাদার নেফ সেখানে ছিলেন। তারপরও অনেক সমস্যা ছিল বলে সাহায্য করতে যেতে হলো। তেমুলিয়ার উত্তরে রাঙামাটিয়া প্যারিসে ফাদার হাউজর ছিলেন। মিলিটারিরা তাঁকে গুলি করেছে, তবে পাশ কেটে যাওয়ায় তিনি বেঁচে গিয়েছেন। এরপর জয়দেবপুরের বয়রা গ্রামে গিয়ে গেলাম। সেখানে রাজাকাররা মিলিটারি নিয়ে এসে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালালো, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিলো। জীবন বাঁচাতে ১০ হাজার শরণার্থী তিন-চার মাইল দূরের কালীগঞ্জের কাছে নাগরিতে বড় প্যারিসে আশ্রয় নিলেন। তাঁদের খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া, গুলিবিদ্ধদের চিকিত্সা—সব করতে হলো। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে জলোচ্ছ্বাসের সময় হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের জন্য বিদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী আমরা সংগ্রহ করেছিলাম, বিতরণের পরও অনেক রক্ষিত ছিল, সেগুলো বিতরণ করা হলো। ফাদার গ্যারেটকে লক্ষ করে মিলিটারি গুলিও করল। এমন বর্বরতা আমাদের ওপর অনেক হয়েছে। দেশের ভয়ংকর পরিস্থিতিতে আর থাকতে না পেরে একাত্তরের আগষ্টে আমার বাড়ি সান ফ্রান্সিসকো চলে গেলাম। বাহাত্তরে আবার ফিরে এলাম।

 

নতুন দেশকে কীভাবে গড়ে তোলার কাজে অংশ নিলেন?

ফাদার টিম শিক্ষকতা বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ শুরু করলেন। নতুন ও বিধ্বস্ত দেশে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, কৃষি উন্নয়ন, মানবাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি কাজ করেছেন। আমাকেও তখন ছাত্রদের নিয়ে অনেক পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। গ্রামগুলোতে যেতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালে বন্যা হয়েছে, কলেজ বন্ধ ছিল, নিজেরাই টাকা, কাপড় সংগ্রহ করে গ্রামে গেছি। হাজার হাজার লোক জামালপুরসহ নানা জেলা থেকে ঢাকায় এসে কমলাপুর রেলস্টেশনে ছিলেন। দিনে পনেরো শ লোককে তখন আমরা কলেজ ক্যাম্পাসে খাওয়াতাম। ১৯৭৪ সালের বন্যায়ও জামালপুরের ইসলামপুরে গিয়েছি। সেখানে দেওয়ানগঞ্জ, দমদম নদী পর্যন্ত গিয়েছি; মুন্সীগঞ্জের হরিরামপুর গিয়েছি। লৌহজংয়ে আমরা রিলিফ ক্যাম্পসহ অনেক কিছু করেছি।

 

‘কাজের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি’সহ ভিন্নধর্মী কর্মসূচি কী ছিল তখন?

এসব সামাজিক প্রকল্পের বেশির ভাগই ১৯৭২ সালে শুরু করেছি। বিশেষত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যেসব এলাকায় থাকে, সেখানে ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্যারিসগুলোতে ফাদাররা দেখেন, কোন ছেলে খুব বুদ্ধিমান, চরিত্রও খুব ভালো, কিন্তু গরিব, এলাকায় কলেজ নেই ইত্যাদি নানা কারণে পড়ার সুযোগ পায় না। তাঁরা নির্বাচন করে দেন। ছাত্ররা কলেজে আসে। আমরা তাদের নয় দিনের শ্রমসাধ্য কাজ দেই। তাতে তাদের মনোভাব দেখি। তারা কী হাত ময়লা করতে প্রস্তুত? পরিশ্রম করতে পারবে? এর পর আমরা ‘ওয়ার্ক স্টাডি প্রগ্রাম’-এর জন্য তাদের নির্বাচন করি। এই কার্যক্রম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান রয়েছে। আগে তারা মাটি কাটত, কিন্তু এখন পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ইত্যাদি গবেষণাগারে সহকারীর কাজ করে, অফিসের হিসাবপত্র রাখে। দারোয়ানের অনুপস্থিতিতে দারোয়ান, টেলিফোন অপারেটর, বাগানের মালি, মাঠেও কাজ করে। আমাদের ব্যবস্থাপনায় কারিতাসসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থায় গিয়ে তারা প্রতি সপ্তাহে তাঁদের কাজেও সাহায্য করে। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অন্য ছাত্রদের চেয়ে তাদেরই বেশি উন্নতি হয়েছে। প্রগ্রামটির মাধ্যমে ছেলেরা দেশের সবচেয়ে ভালো কলেজে, ভালো পরিবেশে পড়ার সুযোগ যেমন পায়, তেমনি তারা নিবেদিতপ্রাণ কর্মচারীর মতো কাজ করে। পরে আর কোনো কাজেই লজ্জা পায় না। আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ কর্মচারী তো এই প্রগ্রামের মাধ্যমে নেওয়া। প্রগ্রামটি আমি চালু করেছি, সঙ্গে ফাদার জিম ব্যানাস, ফাদার স্টিভ গোমেজ ছিলেন। আমাদের ফাদার জর্জ পোপ গরীব রোগীদের জন্য ‘সিক শেল্টার’ তৈরি করেছেন। গ্রাম থেকে এসে তাঁরা দুই-তিন দিন কলেজে এই বেডে থাকেন, জানেন না কিভাবে হাসপাতালে ভর্তি হবেন। হাসপাতালে দালালরা তাঁদের প্রতারিত করে, তাঁদের জিনিসপত্র চুরি হয়। অসহায় এই মানুষগুলোকে সাহায্য করতে শেল্টারটি এখনো চালু আছে। দেশের প্রয়োজনে আমরাই প্রথম ‘ইংলিশ স্পোকেন’ কোর্স চালু করেছি। মুক্তিযুদ্ধের পর সরকার ইংরেজি শিক্ষা বন্ধ করে দিয়ে বলেছিল, এখন থেকে পড়ালেখার মাধ্যম হবে ‘বাংলা’। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের ইংরেজি শিক্ষার মান খুব কমে গিয়েছিল। এ কারণে জিম ব্যানাস ও ফাদার স্টিভ গোমেজের উদ্যোগে উদ্যোগে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু হলো। কোর্সের আরো পরিমার্জন, সংশোধন করে উন্নত করা হয়েছে। তিনি চলে যাওয়ার পর কোনো কোনো বছর এটি চালু ছিল, কোনোবার বন্ধ ছিল। এখন আর কোর্সটি নেই। কিন্তু পথেঘাটে বেরুলেই তো দেখি—দেশের সব জায়গায় ইংরেজি শেখার কোর্স চালু আছে। ওষুধের জন্য ‘ডিসপেনসারি’ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে এটি ছোট হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, সবাইকে অক্ষরজ্ঞান, হিসাবপত্র রাখা শিখতে হবে, বুড়োবুড়িদেরও পড়তে হবে। সে জন্য আমরা ‘প্রাথমিক শিক্ষা স্কুল’ শুরু করেছিলাম। স্কুলে সব মিলে প্রায় বারো শ ছাত্র-ছাত্রী ছিল। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি দিবা, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নৈশ বিভাগ ছিল। এই স্কুলের শিক্ষকদের আমরা নিয়োগ করেছি। রাস্তার ছেলেদের মোটর মেকানিক, ইলেকট্রিক ও সেলাইয়ের কাজ শিখিয়েছি, মেয়েদের সেলাইয়ের কাজ শেখাতে আমরা ‘ট্রেড স্কুল’ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির জন্য স্কুলটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। স্কুলটি আমরা ৪৫ বছর চালিয়েছি। পথের ছেলে-মেয়েরা তাতে কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়েছে, চাকরি পেয়েছে। প্রতিবছর ৩০-৪০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতাম। এক বছরের কোর্সে প্রায় প্রতিদিন ক্লাস হতো।

 

১৯৬৩ থেকে ২০০৪-৪১ বছরের শিক্ষকতার জীবন?

আমি প্রতিদিন ক্লাসের পড়া প্রস্তুত করে তবেই ক্লাস নিয়েছি। শিক্ষকতার পাশাপাশি শুরু থেকে প্রিন্সিপাল হওয়ার আগ পর্যন্ত ‘ডিরেক্টর অব স্টাডিজ’ ও ‘ডিরেক্টর অব স্পোর্টস’র দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। ‘ডিরেক্টর অব স্টাডিজ’ হিসেবে কাজ ছিল, সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে প্রস্তুত করা—পরীক্ষা কখন হবে, শিক্ষকরা কত ক্লাস নেবেন, কে কোন সময় ক্লাস নেবেন, তাঁদের রুটিন তৈরি করা ইত্যাদি। এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। শিক্ষকদের মনিটরিং করাও আমার কাজ ছিল। বেশির ভাগ সময় আমাকে কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে হতো। অভিভাবকদের সঙ্গে প্রয়োজনে কথা বলেছি, কিন্তু আমাদের ডাইরেক্টর অব গাইডেন্সই বেশির ভাগ সময় ছাত্রদের ক্লাসে অনুপস্থিতি, বাড়িতে সমস্যা কী ইত্যাদি বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলাপ করেছেন। এই দেশের শিক্ষকরা কম পড়াতে চাইলেও কলেজে আমরা তাঁদের মাধ্যমে রীতিমতো, অনেক ক্লাস নিয়েছি। তবে ফাদাররা আগে থেকেই ভালো ক্লাস নিয়েছেন। ডিরেক্টর অব স্পোর্টস হিসেবে বাস্কেটবল, ভলিবল, ক্রিকেট, ফুটবল খেলার আয়োজন করেছি, ছাত্রদের খেলাগুলোতে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে খেলার মাঠের অনেক উন্নয়ন করেছি।

 

সুদীর্ঘকাল নটর ডেমের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজের মাধ্যমে তো অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন।

কলেজে উপাধ্যক্ষ; ফাদার টিম বৈজ্ঞানিক অভিযানে যাওয়ায় তাঁর পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ফাদার উইলার্ড ছুটিতে ছিলেন বলে ১৯৭৪ সালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলাম। পরে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত টানা ২৩ বছর নটর ডেমের ‘প্রিন্সিপাল’ ছিলাম। জীবনের ২৫টি বছরই আমাকে এই কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। আমি দেখেছি, এ দেশের ছাত্ররা খুব বুদ্ধিমান, তারা খুব ভালো প্রশ্ন করে, কিন্তু একটু দুষ্টু। তবে খারাপ অর্থে নয়। স্বাধীনতার পরে আমাদের ক্লাসগুলো বড় হয়েছে, ফাদারদের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে ছাত্রদের সঙ্গে আগের চেয়ে আমাদের যোগাযোগ কম ছিল। তাই আগে যেমন ভালো পড়ালেখা দিতে পারতাম, সেই সুযোগ একটু কমে গেল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে অটোমেটিক প্রমোশনের সিদ্ধান্তের ফলে এই দেশের পড়ালেখার অনেক, অনেক ক্ষতি হয়েছে। যে বছর সংগ্রাম হয়েছে, ছাত্ররা নিশ্চয়ই সে বছর ক্লাসে আসেনি, কিন্তু যুদ্ধ শেষে তারা পড়ালেখা না করে পরের ক্লাসে প্রমোশন পেয়েছে। তাদের পরীক্ষা খুব সহজ ছিল, দুই বছরের পরীক্ষা এক বছরে করে দিয়েছে। এর ফলে ছাত্রদের মান খুব খারাপ হয়ে গেল। তারা প্রাইভেট টিচার, নোটবই পেল, নকল হলো। সবই তখন হলো। তখন থেকে এখনো একই রকম, পুরোপুরি অন্য রকমভাবে এ দেশে লেখাপড়া হচ্ছে। এ খুব খারাপ সিদ্ধান্ত ছিল। তার পরও আমরা কলেজে যুদ্ধের আগে যে মান ছিল, তা ধরে রাখতে যতদূর সম্ভব চেষ্টা করেছি। পুরো সিলেবাস পড়তে ছাত্রদের বাধ্য করেছি, পরীক্ষার হলে সিলেবাস ধরে প্রশ্ন করেছি। ফলে যারা তখন এতে ভর্তির যোগ্য ছিল, তারা অন্য কলেজে যেতে চেয়েছে। কারণ তারা জানত, নটর ডেমে পড়ালেখা করা খুব কঠিন হবে। তখনো আমরা দাবি করেছি, ৮৫ শতাংশ শ্রেণি উপস্থিতি না হলে পরীক্ষা দিতে পারবে না। প্রতি সপ্তাহে দুটি কুইজ পরীক্ষা দিতে হবে। ক্লাসে শিক্ষক যা পড়ান, না পড়লে কুইজে পাস করতে পারবে না। পরীক্ষার মধ্যে দেখাদেখি, নকল করা শাস্তি দিয়ে, পরীক্ষা বাতিল করে বন্ধ করেছি। এসব বিষয়ে আমরা সবসময় খুবই কঠোর। নিয়ম-কানুনে আমরা খুব কড়া। এ কৌশল ভালো কাজে দিয়েছে। এভাবে সে সময়টি পার করেছি। এক-দুই বছর ছাত্রদের কষ্ট করতে হয়েছে। পরে কিন্তু তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটে পড়তে পেরেছে। এরপর থেকে আবার ভালো ছাত্ররা নটর ডেমে ভর্তি হতে শুরু করল।

 

কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা কিভাবে তৈরি করেছেন?

১৯৬৩ সাল থেকে আইএসসি ও বিএসসিতে আমাকে পদার্থবিদ্যা পড়াতে হতো। প্রথম থেকেই কলেজে ‘ডিরেক্টর অব স্টাডিজ’ ও ‘ডিরেক্টর অব স্পোর্টস’র দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এ দেশের কোনো কলেজেই পদ দুটি নেই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে যে ধরনের শিক্ষা আমরা লাভ করেছি, সেটিই প্রথম থেকে ছাত্রদের দিতে চেয়েছি। এ দেশে তো ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ালেখা হয়, তারা এক-দুই-তিন বছর এক শ্রেণিতে থাকে, কিন্তু পরীক্ষার আগে দিন-রাত পড়ে পাস করে। তখন তারা আসল পড়া পড়ে। এ ব্যবস্থা আমরা মোটেও সহ্য করতে পারি না। ফলে কলেজে নিয়মিত পড়ার ব্যবস্থা করেছি। প্রতি সপ্তাহে ছাত্রদের দুই বিষয়ে কুইজ (ছোট পরীক্ষা) দিতে হয়। রীতিমতো পরীক্ষা, ফাইনাল আছে। এভাবে সব সময় ছাত্রদের ব্যস্ত রাখি। ক্লাবগুলোর মাধ্যমে তারা বই পড়ে যা শেখে, সেগুলো নতুন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারে। এভাবে আমরা তাদের শিক্ষা ও বাস্তব জীবন গঠন ভালো করার চেষ্টা করি। প্রথম থেকেই আমরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের পড়াতে চেয়েছি। কলেজের পড়ালেখা ভালো হয়েছে, ছাত্ররা খুব ভালো ফল করেছে, কিন্তু সেটি আমাদের মূল উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। আমাদের মূল উদ্দেশ্য, শুধু আমাদের কলেজ নয়, সারা দেশের সব ছাত্র যেন ভালো মানুষ হয়। কোনো কলেজের সঙ্গে আমরা প্রতিযোগিতা করতে চাই না। আমরা চাই, আমাদের সঙ্গে কাজ করে, আমাদের নীতি-আদর্শ অনুসারে জীবনবোধ তৈরি করে, আমাদের প্রদান করা শিক্ষালাভ করে তারা আমাদের মতো একই রকম সৎ মনোভাব নিয়ে সারা জীবন যাপন করবে। এটিই আমাদের চাওয়া ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

 

গবেষণাগারগুলোর উন্নয়নেও তো আপনার ভূমিকা ছিল?

আগে থেকেই ছিল। আগে এই গবেষণাগারগুলো আরো ভালো ছিল, কিন্তু এখন সরকার নিজেই প্র্যাকটিক্যালের সিলেবাস কমাচ্ছে। সেটির সঙ্গে তাল মেলাতে আমাদের হচ্ছে। আগে থেকেই সরকারী সিলেবাস অনুসারে আমরা নিজেরা বই লিখে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণাগারে গবেষণা করাই। নটর ডেম কলেজের প্রতিটি গবেষণাগারে আলাদা ‘ল্যাব বই’ আছে। ১৯৮৮ সালে বিদেশ থেকে আমি কলেজের জন্য প্রথম কম্পিউটারটি কিনে এনেছিলাম। এটি কলেজ প্রশাসনে ছাত্রদের মার্কশিট তৈরির জন্য ব্যবহার করা হত। এরপর থেকে কলেজ কম্পিউটার কেনা শুরু করলো। কয়েক বছর পর আমরা ছাত্রদের কম্পিউটার শিক্ষা দান শুরু করেছি। এভাবে নটর ডেম আধুনিক শিক্ষার দিকে পুরোপুরি অগ্রসর হলো। আমরা কর্মচারীদের কম্পিউটার শেখার জন্য উত্সাহ ভাতা দিয়েছি।

 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখেননি?

আমাদের দেশের ছাত্ররা দুর্বল নয়, যদিও পাকিস্তান আমলে পড়াশোনার মান আরো ভালো ছিল। ব্রিটিশ সিস্টেমে পড়ে বলে তাদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে গিয়ে প্রশ্নে নয়টি পাঁচটির উত্তর দেওয়ার কথা বলা হয়। এভাবে তাদের কম যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এই সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থা আমরা সহ্য করতে পারিনি। কেউ যদি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়, তাহলে তাকে সবই পড়তে হবে, কিছুই তাকে বাদ দেওয়া যাবে না। আমি ক্লাসে ছাত্রদের একথা বলে উদারহণ দিতাম—ডাক্তার হয়ে যখন মানুষ কেটে খুলে ফেলবে, তখন কী বলবে কিডনি পড়িনি বলে এটি পরীক্ষা করব না? তোমার সামনে তো সেই মরনাপন্ন রোগীর দেহ খোলা আছে। তাই তোমাকে সবকিছু জানতে হবে। সে জন্য যারা বিশেষ করে এইচএসসি শ্রেণীতে ‘বিজ্ঞান’ নিয়ে পড়বে তাদের সবই শিখতে হবে। বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের পুরো সিলেবাস পড়তে বাধ্য করতে আমরা পরীক্ষা ব্যবস্থায় অবজেকটিভ (নৈর্ব্যক্তিক) প্রশ্ন দেওয়া শুরু করেছিলাম। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে বলে ছাত্র-ছাত্রীদের পুরো সিলেবাসই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হয়েছে। আমাদের মাধ্যমেই অবজেকটিভের শুরু, কিন্তু আমরা একে যেমন চেয়েছি, তেমনটি হয়নি। যখন শুরু করেছি, ছাত্ররা রাস্তায় গিয়ে হৈচৈ করেছে, আমরা এত প্রশ্ন মুখস্ত করতে পারি না। মুখস্ত করা কোনো ছাত্রের কাজ নয় কিন্তু। তবে তারপর সরকার প্রত্যেক বিষয়ের ৫০০ মার্কের আলাদা প্রশ্নব্যাংক করে দিল। এটা কখনো হতে পারে না, এটি এর উদ্দেশ্যের একেবারেই বিরুদ্ধে। অবজেকটিভ মানে তো নমুনা প্রশ্ন নয়, অবজেকটিভ মানে ছাত্র-ছাত্রীরা জেনে, বুঝে লেখাপড়া করে পাঠ্যপুস্তকের আসল তথ্যগুলো জানবে। এরপর বুদ্ধি দিয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর করবে, কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীরা ৫০০ মার্কের প্রশ্নব্যাংক পাওয়ার পর প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করে সেগুলোর উত্তর দিতে শুরু করল। এখন তাঁরা ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’তে মূল্যায়ন করেন। এটি ভালো, কিন্তু শিক্ষকদেরও যেন প্রস্তুত করা হয়। যাতে তাঁরা ভালোভাবে এগুলো শ্রেণীকক্ষে ছাত্রদের বোঝাতে পারেন।

 

১৯৯৮ সালে কেন প্রিন্সিপাল পদ ছেড়ে দিলেন?

আমি বিদেশি লোক। নটর ডেম কলেজকে ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে সাহায্য করতে এ দেশে এসেছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একে দায়িত্ব নিয়ে পরিচালনা করা আমার কাজ নয়। ফলে ফাদার বেনজামিন ডি কস্তা আরো অনেক বিষয়ে আমার চেয়ে ভালো করতে পারবেন বলে যত শিগগির সম্ভব তাঁর কাছে দায়িত্ব তুলে দিয়েছি। ১৯৯৮ পর্যন্ত প্রিন্সিপাল থাকার সময়ও কিন্তু সারা বছর আমি ক্লাস করেছি। প্রিন্সিপাল পদে রিজাইন করে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে ২০০৪ সাল পর্যন্ত পদার্থবিদ্যার ক্লাস নিয়েছি। সব সময় ক্লাসে আমি ডেমনেস্ট্রেশন দিতাম, যাতে তারা চোখের সামনে বিষয়গুলো দেখে শিখতে পারে। সে জন্য পেন্ডুলামসহ সবকিছু নিয়ে যেতাম। তারা এভাবে ভালো শিখেছে। তবে শিক্ষকতা জীবন শেষেও এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছুটি মেলেনি। ব্রাদার রবি ফিউরিফিকেশন সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাবেন, তাঁর সবকিছু প্রস্তুত করে দিয়ে আমি বলেছি, আপনি যান, লেখাপড়া শেষ করে ফিরে না আসা পর্যন্ত আপনার বদলে কাজ করব। ফলে দুই বছর সেন্ট গ্রেগরিতে হেডমাস্টার ছিলাম। ক্লাস নেইনি, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছি। ব্রাদার লিও পেরেইরা, সিএসসি সব সামলেছেন। সেন্ট জোসেফের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলাম। আসলে স্কুল-কলেজের লেখাপড়ার মধ্যে পদ্ধতিগত কোনো পার্থক্য নেই, একইভাবে পড়ালেখা শেখাতে হয়। সেন্ট গ্রেগরি, সেন্ট জোসেফের ছাত্ররা কলেজে উঠলে অনেক বিষয়ে প্রশ্ন করার পর উত্তর দিয়ে বলেছে, আমরা তো এগুলো স্কুলেই পড়ে এসেছি।

 

তাহলে সেন্ট গ্রেগরির মান কমে গেল কেন?

আগে তো এই স্কুলই আমাদের পরিচালিত সবচেয়ে ভালো স্কুল ছিল। ঢাকার সব ধনী, ভালো পরিবার আগে পুরনো ঢাকায় থাকত। তাঁদের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়েছে। এটির কলেজ শাখাই তো নটর ডেম, কিন্তু পরে তাঁরা অভিজাত ধানমণ্ডি, গুলশান, উত্তরা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর সেসব জায়গায় চলে গেছেন। ফলে ভালো ছাত্ররা কেউ আর উত্তরা থেকে সেন্ট গ্রেগরিতে পড়তে আসতে পারে না। ফলে শিক্ষকরা এর মান ধরে রাখলেও এটি আগের মতো নেই, মান সামান্য কমে গেছে। আর কোনো স্কুলকে সবচেয়ে ভালো স্কুল হিসেবে তৈরি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য, যাদের ছাত্র হিসেবে পেয়েছি, আমাদের সাহায্য যাদের প্রয়োজন, তাদের সবচেয়ে ভালো পড়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। ফলে নটর ডেম থেকে তৃতীয় বিভাগ বা গড়পড়তা ছাত্র যখন প্রথম বিভাগ, খুব ভালো ফল করে তখনই আমাদের সবচেয়ে আনন্দ হয়। 

   

দিনাজপুরের সেন্ট ফিলিপসে যেতে হলো কেন? 

এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সমস্যা, সেটিই সেখানে ছিল—স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সমস্যা ছিল। দুইজন অভিভাবক প্রতিনিধি রাজনীতি করে ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ঢুকে পড়ল। ঁতারা স্কুল দখলের চেষ্টা করল। আমাকে বিষয়টি সমাধানের জন্য ও এই স্কুলকে আগের মানে নিয়ে আসার জন্য কাজ করতে অনুরোধ করা হলো। সেজন্য দুই বছর কাজ করতে হলো। বিশপের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কমিটিকে বসালাম, অভিভাবকদের চিঠি দিয়ে ডাকলাম। আট বছর ধরে তারা শিক্ষক বেতন বাড়ানোর চেষ্টা করলেও পারেননি। যে স্কুলে শিক্ষকের বেতনের উন্নতি হয় না, সেই প্রতিষ্ঠান ধুঁকে ধুঁকে চলে। আমি গিয়ে তাদের প্রতিবছর আট শতাংশ হারে বেতন বাড়ানোর ব্যবস্থা করলাম। হলিক্রস ফাদাররা সেখানে ভালো প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিলেন। এখন তো সেটি কলেজ হয়েছে। আমাদের ব্রাদাররাই পরিচালনা করেন। এরপর বরিশালের উদয়ন স্কুলেও একই সমস্যা হলো। সেখানেও ঢাকা থেকে গিয়ে গিয়ে সব ঝামেলা মিটিয়েছি। এখন নটর ডেম ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ট্রেজারার হিসেবে একে গড়ে তুলছি, প্রতিদিনই যেতে হয়। আশা করি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা চার বছরের মধ্যে অনার্স পাশ করতে পারবে। আমরা ভালোভাবে পড়ালেখা করাব। হলিক্রসের ফাদারদের মধ্যে আমিই এখন সবচেয়ে সিনিয়র বিদেশি।

 

সারা জীবন কাজ করে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মূল্যায়ন?

এই বিষয়ে আমি কী বলব? এ দেশে যথেষ্ট বুদ্ধিমান লোক আছে, তারা সবই জানে। সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে। এই বিষয়ে কাজ করার দায়িত্ব তো তাদের। তবে আমি নিজে কাজ করে উপলব্ধি করেছি—ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় সারা বছর নয়, পরীক্ষার আগেই পড়ে ছাত্ররা পরীক্ষা দেয়। তাদের মান ভালো হলেও সেটি প্রাথমিক বিচারের মাপকাঠি ‘৩৩’ মানে ‘পাস’। সেটি এখন বদলানো হয়েছে, অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী পাস করে, কিন্তু তাদের মান খুব কম। সব এক মানের ছাত্র-ছাত্রী না হলেও তারা একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেয়। নটর ডেম কলেজে আমরা ভালো ছাত্র পেয়েছি, মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে পেরেছি, ফলে আমাদের দুর্বল ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদানের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়নি, কিন্তু এই পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও একই প্রশ্নপত্রে কেন পরীক্ষা হবে? গ্রামের যে ছেলে বা মেয়েটি একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিচ্ছে, সে তো ঢাকার ছেলের সঙ্গে সুযোগের অভাবে মেধায় কুলাতে পারে না। তাদের কেন এক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে? সবার মান কী এক? কেন একসেট প্রশ্নে পরীক্ষা হবে? তাহলে তো প্রশ্ন ফাঁস হবেই। পরীক্ষা কয়েক সেটে হতে হবে, যাতে ফাঁস হলেও অসুবিধা না হয়। কোনো ক্লাসে ২০ জন ছাত্র থাকলে শিক্ষক তাদের আলাদাভাবে পড়াতে পারেন, ক্লাসের পর ব্যক্তিগতভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারেন, কিন্তু ১৫০ জন ছাত্রকে তো তিনি দেখিয়ে দিতে পারবেন না, সম্ভবও নয়। কলেজে আমাদেরও এই সমস্যা হচ্ছে। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট টিউশনিতে যেতে হচ্ছে, তাদের নোটবই লাগে—এসব কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা নয়। ছাত্রসংখ্যা কমিয়ে আলাদাভাবে যত্ন নিতে হবে। নোট, গাইড, নকল বন্ধ করতে হবে। বোর্ড পরীক্ষা দুই, তিন ধাপে আলাদা মানের হওয়া উচিত। গ্রাম-শহরের জন্য আলাদা প্রশ্ন থাকা প্রয়োজন। ব্রাদার জন রোজারিও অনেক বছর সেন্ট জোসেফ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁরও এই মত ছিল—যারা উচ্চতর লেখাপড়া করতে চায়, তাদের জন্য কঠিন প্রশ্নপত্র হবে, বাকিদের জন্য অভিন্ন প্রশ্নপত্র থাকবে। যদি পুরো দেশে একই প্রশ্ন হয় তাহলে গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো শিক্ষক, ভালো পরিবেশ ইত্যাদি কারণে ভালো করতে খুব কষ্ট হয়। অন্যদিকে শহরের ছেলে-মেয়েরা এই সুবিধাগুলো বেশি পাওয়ায় কোনো চ্যালেঞ্জই তাদের নিতে হয় না। কিন্তু তারাও তো পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়ে, জ্ঞান লাভ করার জন্য পড়ে না। গ্রামের ছেলেরা শহরে পরীক্ষা দিতে চাইলে সেটির সুবিধা থাকতে হবে, কিন্তু তার ফলাফল সেই পরীক্ষার ভিত্তিতেই হতে হবে।

 

(১৮ মে ২০১৮, রামপুরা, বনশ্রী, ঢাকা)

মন্তব্য