kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

মাঠ সংকটে নারায়ণগঞ্জ

২৫ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মাঠ সংকটে নারায়ণগঞ্জ

ফতুল্লা স্টেডিয়াম ছবি : দিলীপ কুমার মন্ডল

প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জ। ঢাকার অদূরে শীতলক্ষ্যা পারের এই জেলা বিখ্যাত ফুটবলের জন্যও। নারায়ণগঞ্জের ছেলে হলে নাকি ফুটবল না খেলে পারা যায় না! তাই ফুটবলের এই চারণভূমিতে সুন্দর গোলাপের মতো ফুটেছে একঝাঁক তারকা। ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট, সাঁতার, দাবায়ও ছড়াছড়ি তারকার। এমন ঐতিহ্যবাহী এই জেলা এখন ভুগছে মাঠ সংকটে।

শিল্পায়নের ফলে নতুন নতুন ভবন আর নাগরিক অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে শহরের অনেক মাঠই বিলীন হওয়ার পথে। ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, পাগলা, বন্দরসহ শহরের বাইরেও অনেক মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। আগের মতো অনুশীলন করা যায় না কুমুদিনী মাঠ, বিআইডব্লিউটিএর বরফকল মাঠ, ফতুল্লা ডিআইটি মাঠ, আলীগঞ্জের পিডাব্লিউডি মাঠ, আদমজী মাঠ ও চিত্তরঞ্জন মাঠে। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাঠে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফতুল্লার ডিআইটি মাঠ কমার্শিয়াল প্লট হিসেবে বিক্রির চেষ্টায় ভেতরে ছোট ছোট দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।  বিআইডব্লিউটিএ মাঠ প্রতিবছর গরুর হাটের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। কিন্তু হাট শেষে সংস্কার না হওয়ায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এটি। আদমজীর খেলার মাঠটির একাংশে র্যাবের কার্যালয় আরেক অংশে দেখা মিলল বহুতল ভবনের। চিত্তরঞ্জন কটন মিলের মাঠটি খেলায় মুখর থাকত একসময়। বিটিএমসি এ মাঠটি শিল্প প্লট হিসেবে বিক্রি করেছে। এর এক অংশে হয়েছে বনায়ন, তাই খেলার অপমৃত্যু। আলীগঞ্জের পিডাব্লিউডির মাঠটি অনেক বড় ছিল। কিন্তু গত একযুগ ধরে এলাকার কিছু লোক মাঠটি দখল করে ইট-বালুর ব্যবসা করছিল। তবে ক্রীড়াপ্রেমী শ্রমিকনেতা কাওসার আহমেদ পলাশ কিছুদিন আগে এর একটা অংশ দখলে নিয়ে করেছেন জেলা প্রশাসক কাপ ও শেখ রাসেল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। তেমনি হয়ে গেছে সিদ্ধিরগঞ্জে সোনামিয়া স্টেডিয়ামের ভিত্তি প্রস্তরও। খেলার মাঠের সংকট নিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ টিটু জানালেন, ‘আগে যে জমির দাম ছিল দুই লাখ টাকা এখন সেটা এক কোটি। তাই কেউ খেলার জন্য জায়গা ছাড়তে চান না। এর মধ্যেও আলীগঞ্জ আর সিদ্ধিরগঞ্জে দুটি মাঠ করা গেছে। ওসমানী পৌর স্টেডিয়ামের পাশে প্রস্তুতি চলছে আরেকটি স্টেডিয়াম আর ইনডোর তৈরির।’

নারায়ণগঞ্জে ৩নং জাতীয় স্টেডিয়ামের পরিকল্পনার সময় এর জায়গা ছিল ২৪ একর। এতে আউটফিল্ড, জিম, পার্কিং থাকার কথা ছিল। জেলা ক্রীড়া সংস্থার অধীনে থাকার কথা থাকলেও স্টেডিয়াম তৈরির পর তা ক্রিকেটের জন্য বরাদ্দ করা হয়। ফতুল্লার এই স্টেডিয়ামেই এখন হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। তাই জেলার খেলার ভরসা হয়ে ওঠা ওসমানী পৌর স্টেডিয়ামের ব্যস্ততার শেষ নেই যেন। ১৯৬৫ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা খেলার মাঠ হিসেবে এ স্টেডিয়ামের সাড়ে আট একর জায়গা উন্নয়ন করে। তবে গ্যালারির বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ। অনেক জায়গায় খসে পড়েছে ঢালাই। স্টেডিয়ামে গণশৌচাগার বলতে কিছু নেই। নেই প্রেস বক্স। শহরে শুধু ফুটবল, ক্রিকেট আর ভলিবলের ক্লাবই আছে ৫০টির বেশি। স্বাভাবিকভাবেই এসব ক্লাব গড়ে এক দিন করেও স্টেডিয়াম ব্যবহারের সুযোগ পায় না। সকালে এক দলের প্র্যাকটিস, দিনভর খেলা, বিকেলে প্র্যাকটিস অন্য দলের। মাঠে গিয়ে দেখা গেল ছয়টি নেটে অনুশীলন করছেন ক্রিকেটাররা। আর মাঝখানে হচ্ছে ফুটবল! ক্রিকেটের কয়েকটা বল এসে লাগল ফুটবলারদের গায়েও!

মোনেম মুন্না, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, সম্রাট হোসেন এমিলি, জাকির হোসেন, গাউসের মত তারকা উঠে এসেছেন নারায়ণগঞ্জ থেকে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ গেমস রানার্সআপ নারায়ণগঞ্জ জেলা দল। বিমান কাপ ২০০১ সালে আর ২০১২ সালে জেতে অনূর্ধ্ব-১৬ দলের শিরোপা। সবচেয়ে বড় সাফল্যটা আসে ২০০৪ সালে শেরেবাংলা কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে। ২০০৬ সালেরও জাতীয় চ্যাম্পিয়ন তারা। আর এ বছর প্রথমবার অনুষ্ঠিত সেইলর-বাফুফে অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলে ফাইনালে পৌঁছেছিল নারায়ণগঞ্জ।

এখনও বয়সভিত্তিক যেকোনো জাতীয় ফুটবল দলে থাকে এই জেলার কয়েকজন। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেই নারায়ণগঞ্জে স্থবির হয়ে পড়েছে ফুটবল। লিগই হয়নি টানা ছয় বছর। এ বছর লিগ মাঠে গড়ালেও শেষদিকে এসে নানা জটিলতায় শেষ করতে পারেনি জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। অথচ ডিএফএ’তে আছেন সাবেক ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, এসএম সালাউদ্দিন, গাউসের মতো সাবেক খেলোয়াড়রাই। আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০১৩ সালে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল দেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠক রিয়াজ উদ্দিন মামুনের ইপিলিয়ন গ্রুপ। নারায়ণগঞ্জ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে তিন বছরে ৭৫ লাখ টাকার চুক্তি করে তারা। তাতে আবারও আলোর পথে আসার কথা ছিল নারায়ণগঞ্জের ফুটবলের। কিন্তু দ্বিতীয় বিভাগ,মেয়েদের ফুটবল আর বয়সভিত্তিক খেলাগুলো করার পাশাপাশি ক্লাবগুলোকে এক লাখ টাকা করে অনুদান দিয়েও  লিগ করতে পারেনি ডিএফএ! এ নিয়ে ডিএফএর সভাপতি আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর হতাশা, ‘অশুভ মহলের চক্রান্ত, ক্লাবগুলোর অনীহা আর নানা দ্বন্দ্বে প্রথম বিভাগ লিগ করতে পারছি না। ইপিলিয়নের সঙ্গে দুই বছরের চুক্তি স্থগিত হওয়ার পর রুপায়ন গ্রুপ ১৫ লাখ টাকা দিয়েছিল। সেখান থেকে ১১টি ক্লাবকে ১১ লাখ টাকা দিয়েও করতে পারিনি প্রথম বিভাগ।’ রূপায়ণ গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় এ বছর ২০টির মত ম্যাচ করেও প্রথম বিভাগ লিগটা শেষ করতে না পারায় চুন্নুর মতো হতাশ পুরো নারায়ণগঞ্জের ক্রীড়াপ্রেমীরা। ফুটবলের এই চারণভূমিতে জেলা প্রশাসক কাপ হয়েছিল মাত্র দুবার। দীর্ঘ বিরতির পর আলীগঞ্জ ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতা ও আয়োজনে এ বছর হয়েছে ‘ডিসি কাপ’। ১৬ দলের এই টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দল এক লাখ আর রানার্সআপের জন্য পুরস্কার ছিল ৫০ হাজার টাকা। তবে আনুষ্ঠানিক জেলা প্রশাসক কাপ আগামী বছরই জাঁকজমকভাবে মাঠে গড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তারা। একসময় জমজমাট কিশোরদের ফুটবল মাজেদ-বাবুল কাপ বন্ধ হয়ে গেছে নব্বইয়ের দশকে। তেমনি দুবারের বেশি হয়নি পৌর কাপও।

ক্রিকেটে ১৯৯৮ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা দল জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল প্রথমবার। ২০১৩ সালে ৩৩তম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে আরো একবার। বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ফরিদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে তারা হারায় ৬ উইকেটে। ৪২.৩ ওভারে ফরিদপুর গুটিয়ে গিয়েছিল ১০৯ রানে। ২২.৩ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে জয় নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ। এর আগে ১৯৮৯ সালে হয়েছিল রানার্সআপ। যুব ক্রিকেটের শিরোপা আসে ১৯৯৬ সালে। দুবার শিরোপা আছে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটেও। বন্ধ হয়ে যাওয়া এই টুর্নামেন্টে সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল। শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ, জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ শরীফের মতো ক্রিকেটার এই জেলারই। এর অন্যতম কারণ নিয়মিত চারটি লিগের মাঠে থাকা। প্রিমিয়ার, প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগের সঙ্গে হয় পাইওনিয়ার লিগও। সাবেক ক্রিকেটার জাহাঙ্গীর আলম গড়ে তুলেছেন একটি ক্রিকেট একাডেমি। এখানকার ছাত্ররা ক্রিকেট শেখার সুযোগ পায় বিনা পয়সায়। এবারের লিগে গতবারের চ্যাম্পিয়ন নিট কনসার্নকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে নারায়ণগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমিই। নিট কনসার্নে নাসির হোসেন, অলক কাপালির মতো তারকারা খেললেও একাডেমির ছাত্র রাফসান, ইমনদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি তারা।

দাবায় গ্র্যান্ড মাস্টার আবদুল্লাহ আল রাকিব আর দেশের প্রথম মহিলা দাবাড়ু হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা শামিমা আক্তার লিজা এই জেলারই। তাঁদের পথ ধরে উঠে এসেছেন একঝাঁক দাবাড়ু। এ বছর জাতীয় মহিলা দাবায় অংশ নিয়েছিলেন দেশসেরা ১২ দাবাড়ু, যাঁদের সাতজনই নারায়ণগঞ্জের। শামীমা আক্তারের সঙ্গে অংশ নেন মহিলা ফিদে মাস্টার জাকিয়া সুলতানা ও শারমিন সুলতানা, ঝরনা বেগম, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, জহুরাতুল জান্নাত ও সুমাইয়া খন্দকার। ২০০৫, ২০১০ ও ২০১৪ সালের পর নৌবাহিনীর হয়ে খেলে চতুর্থবারের মতো শিরোপা জেতেন শামিমা আক্তার লিজা। এভাবে জেলার মেয়েরা বিভিন্ন দলের হয়ে খেলায় খুশি নারায়ণগঞ্জ মহিলা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আঞ্জুমান আরা আকসির, ‘নারায়ণগঞ্জের মেয়েরা এখন দাবা শাসন করছে, এটা গর্বের। এ জন্য কৃতিত্বটা আমাদের কোচ আর সংগঠকদের পাওনা।’

সেতারা বেগম, মাহমুদা শরীফ, রেহানা, দীন ইসলাম, এসএম ইসরাইল, সরদার ইদ্রিসের মতো সাঁতারু ছিল নারায়ণগঞ্জের। গ্রামের পুকুরে সাঁতার শিখে ঢাকার পুলে ঝড় তুলেছিলেন তাঁরা। তবে সেই পুকুরগুলোও ভরাট হয়ে যাওয়ায় সাঁতারু বেরিয়ে আসছে না আগের মতো। এ জন্য একটা সুইমিংপুল নির্মাণের দাবি করে আসছেন স্থানীয় সংগঠকরা। রাইফেল ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের শুটিংয়ে বড় অবদান আছে নারায়ণগঞ্জের। তেমনি নিট কনসার্নের কল্যাণে দেশের ব্যাডমিন্টন শাসন করছেন এই জেলার শাটলাররা। দেশসেরা বেশির ভাগ ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়ের ঠিকানা এখন নিট কনসার্ন। তবে অ্যাথলেটিকসে পিছিয়ে পড়েছে এই জেলা। লুত্ফুন্নেছা বকুলের মতো জাতীয় পদক পাওয়া খেলোয়াড় থাকলেও এখন আর সেই মানের অ্যাথলেট উঠে আসছে না। এর কারণ হিসেবে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ জেড এম ইসমাইল বাবুল জানালেন, ‘মোটা দাগে ক্রিকেট আর ভলিবলের লিগই নিয়মিত হয় নারায়ণগঞ্জে। অন্য খেলাগুলোর হয় টুর্নামেন্ট। তাই সেভাবে অন্য খেলার খেলোয়াড় পাইনি। তবে এখন থেকে পাওয়ার আশা করতেই পারি, কেননা ২৫ বছর পর এবার আমরা করলাম হ্যান্ডবলের লিগ। কাবাডি লিগও শুরু হবে। জাতীয় পর্যায়ে প্রায় সব খেলায় অংশ নিচ্ছি। বিভিন্ন খেলার অনুশীলন আর প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। জুডোর সময় যেমন ফেডারেশন থেকে ম্যাট এনে অনুশীলন চালিয়ে নিই।’