kalerkantho

মঙ্গলবার। ৯ আগস্ট ২০২২ । ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১০ মহররম ১৪৪৪

ফুটবল লিগই হচ্ছে না বান্দরবানে

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ফুটবল লিগই হচ্ছে না বান্দরবানে

বান্দরবানের নীলগিরি, নীলাচল, শৈলপ্রপাত, মেঘলা, মিলনছড়ি, তাজিনডং, কেওক্রাডাং, বগালেকের নৈসর্গিক বৈচিত্র্য মন কাড়বে সবার। পাহাড়িকন্যাখ্যাত এই জেলার ক্রীড়াঙ্গনও ছিল সমৃদ্ধ। এখন দিন বদলেছে। বিকাশমান পর্যটন শিল্প।

বিজ্ঞাপন

ফলে এসেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনের পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা খেলার প্রতি খেলোয়াড়দের ভালোবাসাও। মাঠে নিয়মিত অনুশীলনের বদলে অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়াতেই ঝোঁক অনেকের। তাই ২০০৮ সালে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পর হয়নি একটিও ফুটবল লিগ! শারীরিক গঠনের জন্য অ্যাথলেটিকসে যেখানে ভালো করার কথা বান্দরবানের, সেখানে গত দুই যুগ খেলাটাই হচ্ছে না! তার পরও মোহন খান দেশের দ্রুততম মানব হয়েছেন তিনবার। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাহায্যের বদলে সেনাবাহিনীর চাকরির সুবাদেই এমন কৃতিত্ব তাঁর।

একসময় ফুটবল, নৌকাবাইচ, মহিলা হ্যান্ডবলসহ আরো কিছু ইভেন্টে জাতীয় পর্যায়ে আলো ছড়িয়েছেন এই জেলার খেলোয়াড়রা। এখন সেটা ধরে রেখেছে কারাতে, আর্চারির মতো খেলাগুলো। নৌকাবাইচ ও মহিলা হ্যান্ডবল দলের সাবেক তারকারা এখন মহিলা ক্রীড়া সংস্থার হাল ধরেছেন। কিন্তু আর যেন ঝলসে উঠছে না আগের মতো কেউ। সম্প্রতি সাফল্য বলতে গতবার জাতীয় নৌকাবাইচে রানার্সআপ হওয়া। সেই টুর্নামেন্টেও আবার বান্দরবান অংশ নেয় দীর্ঘদিন পর। অথচ জাতীয় নৌকাবাইচে তিনবারের চ্যাম্পিয়ন বান্দরবানের মহিলা দল।

এই জেলায় বাস করে বাঙালিসহ ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়। তাই উপজাতীয় অনেক খেলাও জনপ্রিয় এখানে। ১৯৯৪ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলা। তঞ্চঙ্গ্যাদের সামাজিক অনুষ্ঠান এই ঘিলা খেলা। মারমা নববর্ষ সাংগ্রাই উপলক্ষে হয় পানি ছিটানো খেলা। তৈলাক্ত বাঁশ আরোহণও বেশ উপভোগ করেন স্থানীয়রা। রাজার মাঠে পহেলা বৈশাখে প্রায় প্রতিবছরই হয় বলি খেলা। সাংগু নদীতে বর্ষাকালের নৌকাবাইচে থাকে উৎসবের আমেজ।

একটা সময় ছেলে ও মেয়েদের হ্যান্ডবলে দাপট ছিল বান্দরবানের। হারিয়ে গেছে সেই ঐতিহ্য। তবে কারাতে ও আর্চারিতে ধরে রেখেছে দাপটটা। জ উ প্রু এসএ গেমস কারাতেতে দুটি সোনা জেতেন ব্যক্তিগত ও দলীয় ইভেন্টে। একসময় জাতীয় কারাতেতে রাজত্ব ছিল তাঁরই। জ উ প্রুর আগে-পরে আরো অনেকে দাপট দেখিয়েছেন কারাতেতে। প্রশিক্ষক হিসেবে স্থানীয়দের গড়ে তোলার কাজের অগ্রণী ক্য শৈ হ্লা ওং উ ক্য হ্লা। আর্চারিতে উ চাই নু সোনা জিতেছেন সাফ গেমসে। জাতীয় সাঁতারে তিনটি সোনা জিতেছেন তিং তিং ম্যা। এসএ গেমসের উশুতে সোনা জিতেছেন ইতি ইসলামও। লামা উপজেলার কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ দল ৪৩তম স্কুল ও মাদ্রাসা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল হ্যান্ডবলে। মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জাতীয় উপজাতি হকি টুর্নামেন্টে বান্দরবান রানার্সআপ হয়েছে তিনবার।

একসময় রাজার মাঠ কিংবা পুলিশ মাঠ দর্শকে ভরা থাকত। এখন স্টেডিয়াম হয়েছে। সুযোগসুবিধাও বাড়ছে। কিন্তু জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পর হয়নি একটিও ফুটবল লিগ! অর্থাৎ ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ফুটবল পিছিয়েছেই শুধু। লিগের বদলে মাঝেমধ্যে টুর্নামেন্ট হচ্ছে দু-একটা। এসব টুর্নামেন্টে স্থানীয়দের চেয়ে বাইরের খেলোয়াড়দের পোয়াবারো। মাঠ কাঁপিয়ে বেড়ানো নাসির, সাফো চিং জুনু, অসীম বড়ুয়া, জসিমসহ অনেকে পালন করছেন কোনো না কোনো দলে কোচের দায়িত্ব। কিন্তু নতুন ফুটবলার যেন আর তৈরি হচ্ছে না। কেউ বলছেন পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। কেউ বা দোষ চাপাচ্ছেন ক্রীড়া সংগঠকদের ওপর।

১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে সেনাবাহিনীর আর্থিক সহযোগিতায় বান্দরবানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল রোয়াংছড়ি গোল্ড কাপ। সেটাই নাম বদলে হয় রিজিয়ন গোল্ড কাপ। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় হতো এই টুর্নামেন্ট। গ্যালারিতে ছেলেদের চেয়ে বেশি উপস্থিতি থাকত পাহাড়ি মেয়েদের। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রাও খেলে গেছেন এখানে। বোমাং রাজা মং সৈ প্রু চৌধুরীর ছিল সিনেমা হল। এই ব্যবসার আয়ের বড় একটা অংশ তিনি ব্যয় করতেন খেলার উন্নয়নে। স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীরাও ছিলেন খেলাপাগল। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। জেলা হওয়ার আগে মহকুমা প্রশাসকরা কাঠের ‘পারমিট’ বেশি বরাদ্দ দিয়ে সাহায্য করতেন নানাভাবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ক্লাবও আলোড়ন তুলেছিল বান্দরবানের ফুটবলে। জেলার নামি ফুটবলার সাফো চিং জুনু তাদের হয়ে খেলতে না চাওয়ায় দুর্গম অঞ্চলে ট্রান্সফার দেওয়া হয়েছিল তাঁকে! এসব এখন অতীত। সড়ক ও জনপথ বিভাগের দলই নেই আর। আলোচিত রিজিওনাল কাপ ২০০২ সালের পর বন্ধ ছিল টানা একদশক। এ বছর অবশ্য সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হয়েছে টুর্নামেন্টটি। এর মধ্যে সাফল্য বলতে ২০১২ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় গোল্ড কাপে রানার্সআপ হওয়া।  

চার বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বান্দরবানে মাঠে গড়িয়েছিল ‘পার্বত্য মন্ত্রণালয় ফুটবল লিগ-২০১৪’। টুর্নামেন্টে অংশ নেয় ১০টি দল, কিন্তু এর একটিও জেলা ক্রীড়া সংস্থার নিবন্ধিত দল নয়! এ নিয়ে ক্ষোভ আছে অনেকের। তেমনি কাছাকাছি ১৫ লাখ টাকা বাজেটের টুর্নামেন্টের প্রায় ১০ লাখই হাতি ঘোরানো, উদ্বোধন-সমাপনী, অতিথির জন্য পুরস্কার বিতরণে ব্যয় হওয়াটাও মানতে পারছেন না কেউ। চ্যাম্পিয়ন দল মাত্র ৩০ হাজার আর রানার্সআপ দলকে দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা। টুর্নামেন্টের ফাইনালে পৌঁছেছিল সম্প্রীতির বান্দরবান দল ও বান্দরবান জেলা পুলিশ দল। ফাইনালে ২-১ গোলে পুলিশ দলকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল সম্প্রীতির বান্দরবান। তাই ডিএফএর সাধারণ সম্পাদক মং হ্নৈ চিংয়ের ক্ষোভ, ‘টাকাটা খেলোয়াড়দের কল্যাণে ব্যয় করা উচিত। ক্লাবগুলোকে এক লাখ করে টাকা দিলেও খেলোয়াড়দের অনুশীলন করাতে পারবে ওরা। না হলে ক্লাবগুলো নির্জীবই থাকবে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, উপজেলার দলগুলো অনেক সময় ইচ্ছা করে হেরে যায় যাতায়াত আর থাকা-খাওয়ার খরচ বাঁচাতে!’

দীর্ঘ আট বছর পর ২০ মে থেকে অনুষ্ঠিত হয়েছে মেয়েদের ১৫ দিনের ফুটবল প্রশিক্ষণ। সর্বশেষ মেয়েদের প্রশিক্ষণ হয়েছিল ২০০৭ সালে ২৫ দিনের। বিভিন্ন স্কুলের ৩২ জন ফুটবলার নিয়ে অনুষ্ঠিত এই ক্যাম্প শেষে হতাশা জানিয়েছেন অনেকে। ফুটবল প্রশিক্ষক শহিদুর রহমানের অসহায়ত্ব জানালেন এভাবে, ‘দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন ছাড়া কিছু হয় না। ১৫ দিনে মেয়েরা যা শিখেছে অনুশীলন করতে না পারলে ভুলে যাবে সব। থাকবে না তাদের ফিটনেসও। ’

ক্রিকেটটা হচ্ছে মোটামুটি নিয়মিত। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে হয়েছে দুটি লিগ। এ বছর অবশ্য এখনো খেলাটা মাঠে গড়ায়নি। এর আগেও কয়েক বছর লিগ ছিল অনিয়মিত। তার পরও পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলার তুলনায় ক্রিকেটে উন্নতির ধারাটা বেশি বান্দরবানেই। জেলা ক্রিকেট দলের কোচ তাহের টিপুর অন্তত তাই বিশ্বাস, ‘পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলার তুলনায় ক্রিকেটে আমরা উন্নতি করছি বেশি। লিগ মোটামুটি নিয়মিত। ক্লাবগুলোও গড়ে শক্তিশালী দল। স্টেডিয়ামে বানিয়েছিলাম পিচও। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেটার বেহাল দশা। তবে ম্যাটের ওপর খেলা হয় ঠিকই। ’ এই জেলার জসিম উদ্দিন খেলেছেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। অনূর্ধ্ব-১৭তে আছেন জিসান। ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেটে চট্টগ্রাম বিভাগে রানার্সআপ হয়েছিল বান্দরবান। ২০১১ সালে রানার্সআপ হয়েছিল অনূর্ধ্ব-১৮তে। তাই বলা যায় ক্রিকেটে উন্নতির পথেই আছে তারা।

বান্দরবান জেলা স্টেডিয়াম নির্মিত হয় ১৯৮২ সালে। স্টেডিয়ামের নতুন রূপ দেওয়ার জন্য বরাদ্দ হয়েছে এক কোটি সাত লাখ টাকা। নির্মাণ করা হচ্ছে মাঠের পূর্ব অংশে নতুন আরো একটি গ্যালারি। নতুন গ্যালারিটি নির্মিত হলে মাঠের দর্শক ধারণক্ষমতা বেড়ে হবে ২৫ হাজার। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে মাঠের পূর্ব প্রান্তে আরো একটি গ্যালারি নির্মাণ করা হয়। মাঠের অপর অংশে গ্যালারির পাশাপাশি পরিকল্পনা আছে মিডিয়া সেন্টার নির্মাণেরও।

এবার জুনে অনুষ্ঠিত হয়েছে কাবাডি লিগ। এতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জাদি তং পাড়া। তারা ফাইনালে হারায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ক্লাবকে। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ৭২ জন খেলোয়াড় নিয়ে বান্দরবান ক্লাব আয়োজন করেছিল ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের ফান্ড থেকে সাহায্য নিয়ে কিছুদিনের মধ্যে ভলিবল আর হ্যান্ডবল টুর্নামেন্ট করার প্রতিশ্রুতি দিলেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতি দীপ্তি কুমার বড়ুয়া, ‘বীর বাহাদুর আমারই ছাত্র। খেলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ওর। বীর বাহাদুরের ফান্ড থেকেই করেছি কাবাডি লিগ। প্রস্তুতি আছে ভলিবল, হ্যান্ডবল লিগ করারও। বর্ষা শেষ হলেই মাঠে গড়াবে এই দুটি খেলার টুর্নামেন্ট। ’

বান্দরবানের লামায় খুদে খেলোয়াড়দের জন্য টেবিল টেনিস একাডেমি নির্মাণ করেছে টিটি ফেডারেশন। এটা হয়েছে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এখানে একই সঙ্গে ১২ থেকে ১৪টি টেবিলে খেলতে পারে শিশু-কিশোররা, যেখান থেকে ভালো মানের খেলোয়াড় উঠে আসার প্রত্যাশা কর্তাদের। এখানে অবশ্য জেলা ক্রীড়া সংস্থার বাস্কেটবল কোর্ট নেই। জিমনেশিয়ামের কোর্টটি বিলুপ্ত হয়ে সেখানে খেলা হচ্ছে ব্যাডমিন্টন। অফিসার্স ক্লাবে একটা কোর্ট থাকলেও সেখানে অনুশীলনে যায় না কেউ। গত জুনে শেষ হয়েছে ২১ দিনব্যাপী হকি প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে খেলোয়াড়দের দেওয়া হয় সনদও।