kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৩ আষাঢ় ১৪২৮। ১৭ জুন ২০২১। ৫ জিলকদ ১৪৪২

হতাশার বৃত্তে জামালপুর

   

১৬ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হতাশার বৃত্তে জামালপুর

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকের সময়। আমিন রানা তখনো খেলেন জাতীয় ফুটবল দলে। নিজের জেলা জামালপুর স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতে এসে মাঠ ছেড়েছিলেন চরম অপমানিত হয়ে। সে সময়ের জেলা ক্রীড়া সংস্থার এক কর্তা মাঠ থেকে বের করে দিয়েছিল তাঁকে! সময়টাকে জামালপুর ক্রীড়াঙ্গনের অন্ধকার যুগই অ্যাখ্যা দিলেন আমিন রানা, '১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত একরকম স্থবির ছিল জামালপুরের ক্রীড়াঙ্গন। তখন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তারা ছিলেন রাজনৈতিক লোকজন। আমি যে জাতীয় দলে খেলি ওরা জানত না সেটাও! পরে জানার পর ক্ষমা চেয়েছে আমার কাছে। তাঁর সঙ্গে এখন ভালো সম্পর্কও আমার।'

সেই অন্ধকার কেটে গেছে। তার পরও হতাশার বৃত্তেই জামালপুরের ক্রীড়াঙ্গনে। আইনি জটিলতা শেষে ২০১৩ সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন হওয়ার পর ক্রিকেট হচ্ছে মোটামুটি। জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হওয়ার পর নিয়মিত ছিল না ফুটবল লিগ। গত আট বছরে হয়েছে তিনটা লিগ। হ্যান্ডবলের সর্বশেষ লিগ হয়েছিল ২০১১ সালে। দুই বছর হয় না ভলিবল লিগ। জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে একধরনের হাতাহাতি করেও মেয়েদের কাবাডি লিগ আদায় করতে পারেননি কোচ রজব আলী! তাই একসময় ঢাকার ফুটবল মাতানো শাহাদাৎ হোসেন ভুট্টোর হতাশা, 'জামালপুরের ক্রীড়াঙ্গন গ্রাস করেছে হতাশা। খেলা নেই বললেই চলে। একটা সময় যে উন্মাদনা ছিল তার ছিটেফোঁটাও নেই এখন। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের।' জেলার কাবাডি কোচ রজব আলী এ জন্য দায়ী করলেন রাজনীতিকে, 'জেলা ক্রীড়া সংস্থা আর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ দুই কর্তা বিএনপির রাজনীতি করেন। অথচ ক্ষমতায় এখন আওয়ামী লীগ। এই দলাদলির শিকার হয়েই পিছিয়ে পড়েছি আমরা।' জেলার প্রথম ক্রিকেট দল গড়া ডা. ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের আক্ষেপ, 'আমার দল তৃতীয় বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রাইজমানিই পেলাম না! এমনিতেই খেলা নেই, তারপর এ ধরনের নোংরামি হলে ছেলেরা আগ্রহ পাবে কিভাবে?' ২০০৩ সাল থেকে তিনবার নির্বাচন জিতে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ান। জামালপুর মোহামেডান, রিলেশনসহ কয়েকটা ক্লাব পরিচালনা করেন তিনি। ক্রীড়াঙ্গনের পিছিয়ে পড়ার ব্যর্থতার দায়টা এড়ালেন না ফুয়াদ রেদোয়ানও, 'প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা পাই না আমি। এনএসসি থেকে যে টাকা পাই কর্মচারীর বেতন মিটিয়ে সেই টাকায় নিয়মিত লিগ করা সম্ভব নয়। অহযোগিতার জন্য স্পনসরও পাচ্ছি না। এমনকি ৯ মাস ধরে বিলের চেকও পাচ্ছি না। এজন্য নিজের এফডিআর ভেঙে পর্যন্ত খেলা চালিয়েছি আমি।'

রকিবুল হাসান, জুবায়ের হোসেনের মতো ক্রিকেটার উঠে এসেছেন জামালপুর থেকে। অথচ এই জেলায় ক্রিকেট নিয়মিত ছিল না কখনো। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ লিগ হয় অনেক বছর বিরতির পর। ২০১০ সালের পর সর্বশেষ প্রথম বিভাগ হয়েছে ২০১৪ সালে। ২০১২-১৩ মৌসুমে হয়েছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ। এরপর থেকেই বন্ধ এই লিগ। এ নিয়ে মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজুর ক্ষোভ, 'লিগ না হলে খেলোয়াড় উঠে আসবে কোথা থেকে! খেলোয়াড়দের মাঠে রাখতেই আমরা উদ্যোগী হয়ে গড়ে তুলেছি জামালপুর ক্রিকেট একাডেমি। জাতীয় দলে খেলা জুবায়ের আমাদেরই ছাত্র।' ২০০৯ সালে গড়ে ওঠা জামালপুর ক্রিকেট একাডেমির বর্তমান ছাত্র প্রায় ১০০ জন। তাদের দেখানো পথে গড়ে উঠেছে আরো দুটি একাডেমি। তারা থাকাতেই অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেটে ২০১৩-১৪ মৌসুমে ঢাকা উত্তরের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জামালপুর। ২০১৪-১৫ মৌসুমে জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জিতেছিল জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া ঢাকা বিভাগ। অথচ গ্রুপ ম্যাচে ঢাকার ২৫৫ রানের জবাবে জামালপুর জেলা দল করেছিল ২৪৪। চারটি এলবিডাব্লিউর আউট দেওয়াটাকে এখনো মানতে পারেন না জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তারা।

জেনারেল আঠারলোনী তাঁর গোয়া সেনাবাহিনীসহ জামালপুরে ক্যাম্প করেছিলেন একসময়। সেই ক্যাম্পের সৈনিকদের ফুটবল খেলা দেখে উৎসাহের সঞ্চার হয়েছিল স্থানীয়দের মধ্যে। একসময়ের মহকুমা প্রশাসক ডানোও ছিলেন ফুটবল অনুরাগী। এমএস স্যাকসি নামের আরেক জার্মান যুবকেরও যথেষ্ট অবদান আছে জামালপুরের ফুটবল উন্নয়নে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক অল্পদিনের জন্য জামালপুর মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে অবদান রেখেছিলেন টাউন ক্লাব গড়ে তুলতে। তাতে দৃঢ় ভিত পায় জামালপুর সদর, দেওয়ানগঞ্জ, সরিষাবাড়ী আর ইসলামপুরের ফুটবল।

তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার আব্দুল করিমের নামকরণে 'করিম শিল্ডে' খেলে গেছে ঢাকার ওয়ান্ডারার্স ও ওয়ারীর মতো শক্তিশালী দল। সরিষাবাড়ীর আলহাজ জুট মিলের ফুটবল দলটাও সুনাম কুড়িয়েছিল যথেষ্ট। ১৯৮৩ সালে শিশু-কিশোর এরশাদ গোল্ডকাপের শিরোপা জেতে জামালপুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে জামালপুরের শিরোপা আছে ঢাকা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলেও।

দেওয়ানগঞ্জে জমজমাটভাবে অনুষ্ঠিত হতো শহীদ স্মৃতি টুর্নামেন্ট। ঢাকা প্রথম বিভাগের অনেক খেলোয়াড়ই খেলেছেন এই টুর্নামেন্টে। অংশ নিত ঢাকার ওয়ারী, ভিক্টোরিয়ার মতো দলও। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাশাপাশি টুর্নামেন্টটা সাড়া ফেলেছিল পুরো জেলায়। তবে ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমের পর বন্ধ হয়ে গেছে জনপ্রিয় সেই শহীদ স্মৃতি টুর্নামেন্ট। এই উপজেলায় যেমন ক্রীড়াঙ্গনে পৃষ্ঠপোষকতা করত সুগার মিল তেমনি সরিষাবাড়ী উপজেলায় জুট মিল। এই দুটো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পিছিয়ে পড়েছে উপজেলা দুটির ক্রীড়াঙ্গন। অনিয়মিত হয়ে পড়েছে জেলা ফুটবল লিগও। ডিএফএ গঠনের পর অনুষ্ঠিত হয়েছে তিনটি লিগ। স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য গত লিগ বন্ধ হয়ে যায় মাঝপথে। তবে চাইলেই সংস্কারের আগে লিগটা শেষ করা যেত বলে অভিযোগ জানালেন খোদ ডিএফএর কয়েকজন সদস্য।

অক্টোবরে প্রথমবারের মতো আগামীকাল থেকে হতে যাচ্ছে আন্তউপজেলা কাবাডি। জেলার প্রতিটি উপজেলা নিয়ে টুর্নামেন্টটি আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ সুপার নিজামউদ্দীন। একটা সময় মেয়েদের স্টেডিয়ামে খেলা দেখার ওপরই নিষেধাজ্ঞা ছিল যেখানে, সেই জামালপুরের মেয়েরা রেনেসাঁই ঘটিয়েছেন কাবাডিতে। তারা বিভাগীয় মহিলা কাবাডি চ্যাম্পিয়ন ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে। একাধিকবার শিরোপা আছে আন্তবিভাগীয় মহিলা কাবাডিতেও।

জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য আছে স্কুলপর্যায়েও। ২০১১ ও ২০১২ সালে আন্তস্কুল কাবাডির চ্যাম্পিয়ন জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ২০১৫ সালে শিরোপাটা জেতে সরিষাবাড়ী উপজেলার সৈয়দপুর বশিরউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়। রুপালি আক্তার, হেনা আক্তার খেলেছেন জাতীয় দলেও। এই সাফল্যের রূপকার কোচ রজব আলী জানালেন, 'নিয়মিত লিগ হলে অনেক উন্নতি করতে পারতাম আমরা। কিন্তু কর্তাদের বেশি আগ্রহ ক্রিকেট নিয়ে। লিগ চাওয়ায় প্রায় হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে আমার সঙ্গে। কাজ হয়নি তাতেও।'

আইনি জটিলতায় ২০১১ থেকে দুই বছর জামালপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন বন্ধ ছিল। তাতে ক্রীড়াঙ্গনে নেমে আসে স্থবিরতা। আইনি জট খুলে ২০১৩ সালে হয় ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন। তাতে অংশ নেয় ক্রীড়া সংগঠক ও খেলোয়াড় ঐক্যপরিষদ নামের একটি মাত্র প্যানেল। প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বিজয়ী করা হয় তাদেরই।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আব্দুল হাকিম স্টেডিয়ামের উদ্বোধন হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। এই স্টেডিয়ামে সফলভাবেই হয়েছে ২০তম জাতীয় হ্যান্ডবল, ২০তম জাতীয় ভারোত্তোলন, জাতীয় শুটিং আর জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেট। সেই স্টেডিয়াম অনেকটাই জীর্ণ এখন। ৬ ইঞ্চি মাটি সঠিকভাবে না ফেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাঠের উন্নয়নের বদলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ স্টেডিয়ামে ভবন নির্মাণ করায় ক্ষুব্ধ খোদ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ানও।

গ্রামীণ কিছু খেলা এখনো বিনোদন বিলিয়ে যায় এই জেলার মানুষদের। এ বছরের জানুয়ারিতে ইসলামপুর উপজেলার পলবান্ধা ইউনিয়নের বাটিকামারী গ্রামে হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। খেলা হয়েছে সাতটি। এর দুটির নাম দাপট ও পাঁচটি কদম ঘোড়দৌড়। বিভিন্ন জেলার প্রায় ৫০টি ঘোড়া অংশ নিয়েছিল এতে। মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের মির্জাপুরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় হয় গ্রামীণ মইদাবাড় খেলা। দর্শনীয় এই খেলায় প্রতি দাবাড়ে চারজন রাখাল দুটি করে মই নিয়ে অংশ নেয়। প্রতিটি মইয়ের সঙ্গে জোঁয়াল দিয়ে বাঁধা থাকে চারটি করে মোটাতাজা গরু। প্রতি মইয়ের উপর উঠে দুজন করে রাখাল। এটাও এ বছর হয়েছে জানুয়ারিতে। এ ছাড়া প্রতিবছর মেলান্দহের ঝাড়কাটা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জমজমাট নৌকাবাইচ। কেউ ভেলা ভাসিয়ে, কেউ নদীপারে কেউবা নদীতে গলা ডুবিয়ে উপভোগ করেন এই নৌকাবাইচ।

জেলা শহরের সঙ্গে অন্যান্য উপজেলার দূরত্ব গড়ে প্রায় সমান। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো। তবে সীমান্তে হাতির উপদ্রবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিবছর নদীভাঙন ও বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এখানে। ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও মাদারগঞ্জে নির্মিত হয়েছে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ। তাতে এই তিন উপজেলায় বন্যার ভয়াবহতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। দেশের সর্ববৃহৎ সার উৎপাদন কারখানা যমুনা ফার্টিলাইজার, প্রাকৃতিক নৈস্বর্গমণ্ডিত লাউচাপড়া বিনোদনকেন্দ্র, জিল বাংলা চিনিকলসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে এখানে। জেলার উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, জামালপুর জেনারেল হাসপাতালকে মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তর, যমুনা নদীর তলদেশ দিয়ে ফুটানী বাজার থেকে বালাসী ঘাট পর্যন্ত চ্যানেল নির্মাণ, ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতু নির্মাণের প্রকল্প। এগুলোর বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে জামালপুর। ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতিতেও এ ধরনের কিছু পরিকল্পনার দাবি জানালেন সংগঠকরা। অমিত সম্ভাবনার জামালপুর তাহলেই ফুল হয়ে ফুটবে কুড়ি থেকে।