kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

মাঠ সংকটে মানিকগঞ্জ

   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মাঠ সংকটে মানিকগঞ্জ

দূরদিগন্তে দৃষ্টির সীমানায় আকাশের নীলিমার সখ্য নিয়ে ধলেশ্বরী, গাজীখালি, কালীগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা বন্দর মানিকগঞ্জ। ধলেশ্বরীর রুপালি বেলাভূমিতে মোহনীয় হয়ে ওঠে ভোরের আকাশের উদীয়মান সূর্যের শ্বাশত রূপ। একটা সময় জেলার ক্রীড়াঙ্গনেও ছিল এমন স্নিগ্ধতা। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, অ্যাথলেটিক্সে মানিকগঞ্জের দাপট ছিল যথেষ্ট।

বিজ্ঞাপন

আগের সেই দাপট নেই আর। জাতীয় দলেও নেই কারো প্রতিনিধিত্ব। তবে ক্রিকেটটা হচ্ছে নিয়মিত। কোনো বছর ছয় তো কোনো বছর হয় সাতটি করে টুর্নামেন্ট। ফুটবলের আগের জৌলুস নেই। তবে মাঠে গড়াচ্ছে তিনটি টুর্নামেন্ট। হ্যান্ডবল, হকি, ভলিবল, বক্সিংয়ের মতো অন্য খেলাগুলো সেভাবে আয়োজন করে না জেলা ক্রীড়া সংস্থা। এর কারণ নিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আজম আপেলের ব্যাখ্যা, 'জেলা ক্রীড়া সংস্থার তেমন তহবিল নেই। তার পরও ক্রিকেটের মতো খরুচে খেলার ছয়-সাতটা টুর্নামেন্ট করছি। আমাদের আসল সমস্যা আসলে মাঠ। মাঠ সমস্যার জন্যই সব খেলা করতে পারছি না। এলাকার ছেলেমেয়েরাও খেলার জায়গা পাচ্ছে না। '

খুব একটা ভুল বলেননি তিনি। জেলা স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখা গেল, এই মাঠ আর যাই হোক ক্রিকেটের জন্য আদর্শ নয়। মাঠটা এতই ছোট যে চার-ছক্কা হয়ে যায় অনায়াসে। দৌড়ে দুই রান নেওয়ার কথা ভাবাই দায়! তাই বড় মাঠে খেলতে গেলে সমস্যায় পড়েন স্থানীয় ক্রিকেটাররা। জেলা ক্রিকেট দলের কোচ ও সত্তরের দশকে শান্তিনগর ও অগ্রণী ব্যাংকে খেলা পরেশ মালাকারের আক্ষেপ, 'স্টেডিয়ামটা স্কুল ক্রিকেট আর বয়সভিত্তিক খেলাগুলোর জন্য ঠিক আছে। কিন্তু জাতীয় মানের খেলার জন্য আদর্শ নয় মোটেও। '

মানিকগঞ্জে স্টেডিয়াম নির্মিত হয় ষাটের দশকে। জমি দান করেছিলেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও বেদার বখত নামের জেলার দুই ক্রীড়াপ্রেমী। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ওবায়দুল্লাহ খান যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন স্টেডিয়াম নির্মাণে। মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে দুই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মিরাজুর রহমান মিরাজ ও তপন চৌধুরীর নামে স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয় 'শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়াম'। মিরাজ ছিলেন পোল ভোল্টে তখনকার ইস্ট পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন। আর তপন কৃতী ফুটবলার ও অ্যাথলেট।

খেলার পাশাপাশি স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসের কর্মসূচি পালিত হয় এই স্টেডিয়ামে। মাঠসংলগ্ন অফিসার্স ক্লাবে বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের রান্নাবান্নার কাজও চলে স্টেডিয়ামের এক কোনায়! দেখা গেছে খেলোয়াড়রা ম্যাচ খেলছেন মাঠে আর রান্না চলছে মাঠের বাইরে। এমন একটা ছবি দেখালে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আজম আপেল নিশ্চিত করেছেন এখন আর রান্নার অনুমোদন দেন না তাঁরা।

স্টেডিয়ামসংলগ্ন সরকারি বালক বিদ্যালয়ের মাঠটিতেও বছরের বেশির ভাগ সময় কোনো না কোনো কর্মসূচি থাকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজয়মেলা, বইমেলা, কৃষিমেলা লেগেই থাকে। মাঠসংলগ্ন জেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থাকায় সেখানেও চলে নানা অনুষ্ঠান। সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মাঠটিকে একসময় বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পরিচর্যার অভাবে সেই মাঠও প্রায় অনুপযোগী। শহরের এক কোনায় একটি সরকারি জমি মাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিছু দিন ধরে। কিন্তু নিচু জমি হওয়ায় প্রায়ই পানি জমে থাকে সেখানে।

এত হতাশার মধ্যেও আশার কথা মানিকগঞ্জে হতে যাচ্ছে নতুন একটি স্টেডিয়াম। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক ও সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান (দুর্জয়) চীনের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গত ১২ আগস্ট পদ্মাপাড়ে পরিদর্শনও করে এসেছেন স্টেডিয়ামের সম্ভাব্য জায়গা। এ নিয়ে আশাবাদী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আজম, 'নাঈমুর ভাই প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন যত দ্রুত সম্ভব নতুন স্টেডিয়ামের কাজ শুরু করতে। এটা হয়ে গেলে আমাদের জেলার ক্রীড়াঙ্গনে গতি ফিরবে যথেষ্ট। '

ক্রিকেটে নিয়মিতই হচ্ছে প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, কোয়ালিফাইং, পৌরসভা গোল্ডকাপ, প্রয়াত সাংসদ এএম সাইদুর রহমান টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। একটা সময় নিয়মিত হলেও এখন প্রতি এক বা দুই বছর অন্তর হয় স্বাধীনতা কাপ। তবে বন্ধ হয়ে গেছে শহীদ স্মৃতি কাপ। এ ছাড়া স্কুল ক্রিকেট লিগ অনুষ্ঠিত হচ্ছে শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়ামে। ২০১৪-১৫ মৌসুমে মানিকগঞ্জের অনূর্ধ্ব-১৪ দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ঢাকা উত্তর বিভাগে। আর জেলা দল ঢাকা উত্তর বিভাগের ভেন্যু চ্যাম্পিয়ন ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ মৌসুমের।

ফুটবল লিগে মারামারির ঘটনা নিয়মিতই হতো মানিকগঞ্জে। এমনো হয়েছে মাঠের মারামারির রেশে হামলা হয়েছে ক্লাব কর্তাদের বাড়িতে! এ জন্য নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে গতি হারিয়েছিল ফুটবল। সুদেব সাহা ডিএসএর ফুটবল কমিটির প্রধান ও ডিএফএর সভাপতি হওয়ার পর চেষ্টা করছেন গতি ফেরানোর। এরই সুফল হিসেবে ফুটবলে প্রিমিয়ার লিগের পাশাপাশি যোগ হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ। গত বছর থেকে শুরু হওয়া প্রিমিয়ার ফুটবল লিগের দল আটটি। হাফিজুল ইসলাম উট্টু স্মৃতি প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগেরও দল আটটি। মাহাবুবুর রশিদ খান মিঠু স্মৃতি দ্বিতীয় বিভাগ লিগে অংশ নেয় ২৮ থেকে ৩০টি ক্লাব। এ ছাড়া হয় ডা. জীবন সাহা স্মৃতি ভেটারেন্স ফুটবল লিগ। এক-এগারোর পট পরিবর্তনের আগে জেলার সাতটি উপজেলা, পৌরসভা ও মানিকগঞ্জ সদর দল নিয়ে মাঠে গড়িয়েছিল জেলা প্রশাসক কাপ। গত দুই দশকে এমন জমজমাট লিগ এই অঞ্চলে হয়নি আর। জাতীয় দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই খেলে গেছেন এই টুর্নামেন্ট। সবাইকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পৌরসভা দল। সেই জেলা প্রশাসক গোল্ড কাপ অবশ্য অনিয়মিত এখনো। জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুদেব সাহা জানালেন, 'ফুটবল একটা সময় ঝিমিয়ে পড়েছিল। এখন গতি পেয়েছে অনেকটাই। খেলাটা কিভাবে নিয়মিত মাঠে থাকে সেই চেষ্টাই করছি আমরা। '

কুলফা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট মানিকগঞ্জের ফুটবলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল একসময়। এই টুর্নামেন্টে মানিকগঞ্জ থেকে একটি মাত্র দল রেখে ঢাকার ক্লাবসহ অন্যান্য জেলা থেকে আসত অনেক দল। ঢাকার মোহামেডান, ভিক্টোরিয়া, আরামবাগসহ আরো অনেক ক্লাব অংশ নিয়েছে কুলফা গোল্ডকাপে। জনপ্রিয় এই টুর্নামেন্ট বন্ধ অনেক দিন।

একসময় মানিকগঞ্জে ভলিবল ছিল দারুণ জনপ্রিয়। তবে এই খেলাটিও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আশার কথা আটটি দল নিয়ে এ বছর থেকে জেলা ক্রীড়া সংস্থা ভলিবল টুর্নামেন্ট চালু করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে মানিকগঞ্জে ফুটবলের পাশাপাশি হকিও ছিল জনপ্রিয়। দেবেন্দ্র কলেজ, মানিকগঞ্জ সরকারি বালক বিদ্যালয়, মডেল স্কুলসহ বেশ কয়েকটি ক্লাব হকি খেলত। সত্তরের দশকে মানিকগঞ্জ মডেল হাইস্কুল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হকিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু মাঠের অভাব আর সংগঠকদের ব্যর্থতায় হারিয়ে গেছে হকি। তবে অনিয়মিতভাবে হচ্ছে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট।

স্টেডিয়ামে কোনো দোকান না থাকায় জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়ের উৎস বলতে হাউজি। সেই হাউজিও অন্যান্য জেলার মতো হয় না বছরজুড়ে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আজম জানালেন, 'কেবল ডিসেম্বর মাসেই হাউজি করতে পারি আমরা। একমাসে আর কত টাকা আয় করতে পারি! অন্যান্য জেলার মতো এটা বছরজুড়ে করতে পারলে আয়ের উৎস থাকত। তবে নাঈমুর রহমান, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ আরো কিছু ক্রীড়ানুরাগী সাহায্য করায় চালিয়ে নিতে পারছি খেলাগুলো। '

মানিকগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অবশ্য বছরদুয়েক আগে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা সুলতানুল আজম আপেল। নির্বাচনের পরপরই সাবেক ফুটবল তারকা দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে মামলা করেন। মামলা ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত কোর্ট ওই কমিটিকে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন। এরপর থেকে এভাবেই চলছে মানিকগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা।