kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

তিন কোটিতে বদলাচ্ছে বরগুনা

   

১০ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তিন কোটিতে বদলাচ্ছে বরগুনা

বরগুনা নামটা এলো কিভাবে? নানা মুনির নানা মত। কারো মতে, কাঠব্যবসায়ীরা খরস্রোতা খাকদোন নদী পার হওয়ার আগে প্রতীক্ষায় থাকত বড় গোন বা অনুকূল প্রবাহের। এখান থেকেই নাম বরগুনা। কারো মতে, স্রোতের বিপরীতে গুন (দড়ি) টেনে নৌকা অতিক্রম করতে হতো বলে বরগুনা। অনেকের অভিমত আবার বরগুনা নামের প্রতাপশালী রাখাইনের জন্য জেলার এমন নাম! আসল ব্যাপার যাই হোক, ১৯৮৪ সালে জেলার স্বীকৃতি পাওয়া বরগুনা যে সুন্দরবন কেটে সৃষ্টি তাতে দ্বিমত নেই কারো। সুন্দরবন কেটে আবাদ শুরু করা এই জনপদ বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্রের কোলঘেঁষে সুগন্ধা, পায়রা আর হরিণঘাটা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এক ভূখণ্ড। ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা এটাই। সেই ক্ষত এখনো দৃশ্যমান জেলা স্টেডিয়ামে। পূর্ব দিকের প্রায় তিন ফুট সীমানাপ্রাচীর বিলীন হয়ে গেছে একেবারে। ক্রীড়া ভবনসহ তিনটি গ্যালারির ক্ষতিও হয়েছে যথেষ্ট। তবে সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করা সাহসী এই জনপদের খেলোয়াড়রা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই খেলছেন এখানে। অর্থ সংকটের পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতা থাকলেও ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, দাবা আর ব্যাডমিন্টন নিয়মিত করার চেষ্টা করেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তারা।

সেই কর্তাদের দৌড়ঝাঁপে বরগুনা স্টেডিয়ামের উন্নয়নে বরাদ্দ পাওয়া গেছে তিন কোটি ৩৫ লাখ টাকা। নির্মাণ ও সংস্কার কাজও শুরু করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। নির্মাণ চলছে ১০০ ফুটের দ্বিতল ক্রীড়া ভবন আর ২০০ ফুট নতুন গ্যালারি নির্মাণের। উন্নয়ন কাজ ঠিকঠাক শেষ হলে বরগুনা স্টেডিয়ামে প্রাণ ফিরে আসবে বলে বিশ্বাস জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনের,' গত জেলা প্রশাসক গোল্ড কাপে উপচেপড়া দর্শকদের দেখে খারাপই লাগছিল। গ্যালারি নেই, তার পরও হাজার হাজার দর্শক! স্টেডিয়ামের কাজ শেষ হলে অবশ্যই গতি পাবে আমাদের ক্রীড়াঙ্গন।'

প্রতিকূলতা আর অর্থ সংকটের মধ্যেও ক্রিকেট মোটামুটি নিয়মিত বরগুনায়। জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে ১২টি দল আর দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে অংশ নেয় ২০-২৫টি দল । বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬ ও ১৮ ক্রিকেটের পাশাপাশি স্কুলক্রিকেটও হয় প্রতিবছর। স্কুলক্রিকেটে আছে সাফল্যও। বরগুনা জিলা স্কুল ২০১২ সালে জাতীয় স্কুলক্রিকেট টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এছাড়া ২০০৩ সালে ভারতের দিল্লি পাবলিক স্কুলের আর,কে পুরাম শাখা আয়োজিত প্রথম ইনভাইটেশনাল ওয়ার্ল্ড কাপ স্কুল ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে বরগুনা জিলা স্কুল। বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার আন্তজেলা টি-টোয়েন্টিতেও রানার্স আপ বরগুনা। এর আগে ২০০৭ সালে শিরোপা জিতেছিল বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেটে। অনূর্ধ্ব-১৬তেও পৌঁছেছিল ফাইনালে। অথচ স্টেডিয়ামের মাঠে ক্রিকেট পিচও নেই বরগুনায়। মেটের ওপর খেলেন ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের রিজিওন্যাল প্যানেল আম্পায়ার ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক এম. হারুন-অর-রশিদ রিংকুর কণ্ঠে আফসোস ঝরল এ নিয়ে, 'বরগুনার ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় সমস্যা মাঠ। শুধু স্টেডিয়াম মাঠটা থাকায় নিয়মিত ক্রিকেট অনুশীলন করা যায় না। আর্থিক সমস্যার জন্য একটি টার্ফ পিচ, অনুশীলনের জন্য ভালোমানের কংক্রিট পিচ তৈরি করতে পারিনি। নেটসহ প্রয়োজনীয় প্র্যাকটিস উপকরণও দিতে পারছি না।' নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বরগুনা জেলা দলের ক্রিকেট কোচ মোহাম্মদ নাজমুল হুদা আন্তরিকভাবেই অনুশীলন করান তরুণদের। তাঁর হাত ধরে ঢাকা প্রথম বিভাগে খেলেছেন মইনুল ইসলাম ও ওমর ফারুক আকাশ। তবে মেয়েদের দল গড়ে তুলতে পারেননি এখনো।

স্টেডিয়াম ছাড়া মোটামুটি খেলার উপযোগী সার্কিট হাউস মাঠটা। স্থানীয় মেয়র আর জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে হয়েছে এটা। খেলোয়াড়দের পদচারণায় মুখর না থাকলেও খেলা হয় এখানে। তবে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী জেলা স্কুল মাঠ, কলেজ মাঠ আর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার মাঠ উপযুক্ত না হওয়ায় ইনজুরির শঙ্কা থাকে খেলোয়াড়দের।

বেশির ভাগ জেলারই একটা গল্প মোটামুটি এক। স্বাধীনতার আগে যেমন অনুষ্ঠিত হতো বিভিন্ন শিল্ড, তেমনি অন্তত নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত থাকে ফুটবলের স্বর্ণযুগ। ব্যতিক্রম বরগুনা। এখানে স্বাধীনতার আগে কোনো শিল্ডের ইতিহাস নেই। এমনকি নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ফুটবলের রমরমা যুগও নেই। বরং নব্বইয়ের দশকের পরই শুরু বিভিন্ন গোল্ডকাপ আর টুর্নামেন্টের। উপকূলবর্তী এই জেলায় জাতীয় দলের একাধিক ফুটবলারের পদচারণাও নব্বইয়ের দশকের পর। কিছু দিন আগে শেষ হওয়া জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ খেলে গেছেন জাহিদ হাসান এমিলি, এনামুল হকের মতো তারকা। তবে অর্থ সংকটে ফুটবলটা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে এখন। ২০০৭ সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থা (ডিএসএ) থেকে আলাদা হওয়ার পর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফএ) আয়োজন করেছে মাত্র দুটি ফুটবল লিগ। বাফুফে থেকে প্রাইম ব্যাংক আর নিটল টাটার পৃষ্ঠপোষকতায় সেই দুটো লিগ করে দেনায় পড়ার কথা জানালেন ডিএফএর সাধারণ সম্পাদক মীর বজলুর রহমান, 'আমাদের দ্বীপ জেলায় কোনো শিল্পকারখানা গড়ে না ওঠায় স্পনসর পাই না। নিজেদের টাকায় কত টুর্নামেন্ট আয়োজন করা সম্ভব! বাফুফে লিগের জন্য দুবার টাকা দিয়েছে। প্রতিশ্রুত টাকা না পাওয়ায় দেনাতেও পড়েছি আমরা।'

ডিএফএ নিয়মিত লিগ করতে না পারলেও ডিএসএ আয়োজন করে জেলা প্রসাশক কিশোর গোল্ডকাপ ফুটবল আর দু বছর পরপর জেলা প্রসাশক গোল্ডকাপ। গত ২২ অক্টোবর শেষ হয়েছে চতুর্থ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। এর চ্যাম্পিয়ন বরগুনা সদর উপজেলা ও রানার্সআপ বেতাগী উপজেলা । প্রতিদিন ১০-১৫ হাজার দর্শক উপভোগ করেছে এই টুর্নামেন্ট। ফাইনালে তো প্রায় ২৫ হাজার দর্শক আসে মাঠে। মাত্র তিন হাজার দর্শকই সুযোগ পেয়েছিল গ্যালারিতে বসার। বাকিরা খেলা দেখেছে মাঠ বরাবর দাঁড়িয়ে। কোনো সমস্যা ছাড়া টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ায় জেলা প্রশাসক মীর জহুরুল ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তারা। তবে সাবেক জেলা প্রশাসক মজিবর রহমানের সময়ে হাউজি বন্ধ হওয়ায় কিছুটা অনুযোগ জানালেন ডিএসএর সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, 'আমাদের সাবেক জেলা প্রশাসক স্বপন কুমার সরকার হাউজি চালু করেছিলেন বরগুনায়। এটা সরকার অনুমোদিত, তাই সমস্যার কিছু নেই। হাউজিতে অনেক টাকার ফান্ডও করে ফেলেছিলাম। কিন্তু বর্তমানে সেটা বন্ধ থাকায় ক্রীড়া সংস্থার ফান্ড বলে কিছু নেই।' জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে পাওয়া সাড়ে তিন লাখ টাকাই ভরসা সারা বছরের। স্টাফদের বেতন-বোনাস, বিদ্যুৎ-পানি-টেলিফোন বিল দিতেই খরচ হয় অনেকটা। বাকি টাকার সঙ্গে সুহৃদদের সহায়তায় চলে খেলাধুলার আয়োজন। স্টেডিয়ামসংলগ্ন কয়েকটা দোকান থেকে অবশ্য পাওয়া যায় কয়েক হাজার টাকা। অপর্যাপ্ত এই টাকার জন্য গত বছর বরিশালে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল দল পর্যন্ত পাঠাতে হয়েছে হাত পেতে!

বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত বিভাগীয় কমিশনার্স কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে বরগুনা জেলা দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কয়েকবার। জেলার অবৈতনিক ফুটবল কোচ ও ক্রীড়া সংস্থার সহ সম্পাদক মীর বজলুর রহমান চেষ্টা করেন বছরজুড়ে তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলছেন তাঁর অনেক ছাত্র। বিকেএসপিতেও আছে অনেকে।

বরাদ্দ ও অবকাঠামেগত সমস্যা ছাড়াও সুইমিংপুল, ব্যায়ামাগার নেই এখানে। তাই ক্রিকেট, ফুটবলের বাইরে ভলিবল, কাবাডি, দাবা আর ব্যাডমিন্টনই করতে পারে জেলা ক্রীড়া সংস্থা। বরগুনা সদর ও পাথরঘাটায় ভলিবলের চর্চা হয় যথেষ্টই। শীতের সময় সাড়া ফেলে নৈশকালীন একক ও দ্বৈত ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট। টেবিল টেনিস, হ্যান্ডবল, জুডো, তায়কোয়ান্দোর মতো খেলাগুলোও আয়োজনে আগ্রহী জেলা ক্রীড়া সংস্থা। এ জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর আবেদন করলেন ডিএসএর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, 'নিজেদের পকেট থেকে আর বন্ধুদের সাহায্যে যতটা সম্ভব ক্রিকেট, ফুটবল, দাবা, ব্যাডমিন্টন চালিয়ে নিচ্ছি। অন্য খেলাগুলোও করতে চাই। এ জন্য দরকার পর্যাপ্ত বরাদ্দ আর সরকারের সহযোগিতা। সেই প্রতীক্ষাতেই আছি আমরা।'

মন্তব্য