kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জরাজীর্ণ ভোলা

   

৫ জুন, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



জরাজীর্ণ ভোলা

ভোলা গজনবী স্টেডিয়াম, ছবি : শিমুল চৌধুরী

উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলা। এখানকার চর কুকরিমুকরি আর মনপুরা মন কাড়বে সবার। সেই জেলারই ক্রীড়া সংস্থার এ কি হাল? খসে পড়ছে পলেস্তারা। নিচতলায় ভয়ে যান না অনেকে। কোনো রকমে কাজ চালান উপরতলায়। সেখানেও গা ছমছমে ব্যাপার! কখন না মাথায় ভেঙে পড়ে ছাদ! এমন আতঙ্ক নিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিসে কাজ হয় কিভাবে? সংস্থার দুই যুগের বেশি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা ইয়ারুল আলম লিটন জানালেন, 'এভাবেই চলে যাচ্ছে। স্টেডিয়াম সংস্কারে এক কোটি ৯৫ লাখ টাকার টেন্ডার হয়েছে। কিন্তু কার্যাদেশ না হওয়ায় সেটাও হচ্ছে না।'

ভাঙা, পরিত্যক্ত গ্যালারির গজনবী স্টেডিয়ামটাই ভরসা ভোলার ক্রীড়াঙ্গনের। ক্রিকেট, ফুটবলসহ প্রায় সব খেলাই হয় এখান। অথচ ২০০ ফুটের মতো গ্যালারি আছে বসার মতো। বাকি ১৫০ ফুটের অস্তিত্বই নেই। সীমানা প্রাচীর ভেঙে গেছে তিন ভাগ। এই স্টেডিয়ামের জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১৯৬২ সালে। জেলার কৃতী ফুটবলার এসএম গজনবীর নামকরণে স্টেডিয়াম হয় আশির দশকে। এরপর আর সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। এক কোটি ৯৫ লাখ টাকার টেন্ডারের পর কার্যাদেশ পেলেই কেবল বদলাতে পারে ছবিটা। ভোলার উপজেলাগুলোর মধ্যে লালমোহনে মেজর (অব.) হাফিজ ও দৌলতখানে গজনবী নামের একটা করে স্টেডিয়াম আছে। জরাজীর্ন স্টেডিয়াম দুটো এখন গোচারণভূমি। তবে মনপুরা, তজুমউদ্দিন, বোরহানউদ্দীনে স্টেডিয়াম তৈরির উদ্যোগ নেয়নি কেউই। সব চাপ তাই জেলার গজনবী স্টেডিয়ামের ওপরই। সেই স্টেডিয়াম যেমন জীর্ণ তেমন মাঠের হালও করুণ। পরিচর্যার অভাবে ঘাসের নিচে হারিয়ে গেছে ক্রিকেট পিচটা। সমস্যা আছে পিচেরও। কেননা স্টেডিয়াম মাঠের চতুর্দিকে লেক। এ জন্য সমস্যা বলের বাউন্সে। এই বাউন্সের পিচে খেলে কিশোররা গড়ে উঠবে কিভাবে? একই মাঠে ফুটবল হওয়ায় প্রতি বছরই ক্ষত-বিক্ষত হয় পিচটা।

স্টেডিয়াম সংস্কারে প্রথমে টেন্ডার ছিল সাড়ে তিন কোটি টাকার। সেটা কমতে কমতে এখন এক কোটি ৯৫ লাখে নেমেছে। এ জন্য জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তাদের অভিমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের ওপর। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ইয়ারুল আলম লিটন জানালেন, 'সরকারের এত প্রভাবশালী মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জন্য গর্বিত ভোলার মানুষ। এখানে তিনি যথেষ্ট উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনে নজর দেননি সেভাবে। তাঁর সামান্য সুদৃষ্টিতে বদলে যেতে পারে জেলার খেলার ছবিটা।'

ফুটবলে অনেক কৃতী খেলোয়াড় বেরিয়ে এসেছে ভোলা থেকে। বাংলাদেশ ফুটবলের কিংবদন্তি এসএম গজনবী, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, আমিনুল হকরা এই জেলারই। লালমোহনের কাজল গাঙ্গুলি খেলেছেন অনূর্ধ্ব-২৩ দলে। এ ছাড়া রুহুল আমিন মোহামেডানে, বিপুল পাল ফায়ার সার্ভিসে আর বজলু-ফজলুরা খেলেছেন ঢাকার নানা দলে। ঢাকার ফুটবলে ভোলার সেই পাইপলাইনটা বন্ধ এখন। তবে একটা সময় ফুটবল যেমন নিয়ে আসত ঈদের আমেজ, এখনো একই রয়ে গেছে ব্যাপারটা। ২০১৩ সালের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপে কেবল ফাইনালেই টিকিট বিক্রি হয়েছিল ৯০ হাজার টাকার। অথচ ভাঙা গ্যালারিতে মেরেকেটে দর্শক বসতে পারে মাত্র কয়েক হাজার। গত বছর নানা কারণে টুর্নামেন্টটা না হলেও এ বছর আবারও পরিকল্পনা চলছে সেটা আয়োজনের।

ভোলার মেয়েরা বছরপাঁচেক আগেও চলত রিকশায় কাপড় বেঁধে, যেন পুরুষের চোখে না পড়ে। এখনো দুর্গম অঞ্চলের অনেক বাড়িতে মেয়েরা কাজ করেন বাইরে পর্দা লাগিয়ে। সেই ভোলার মেয়েরা ২০০৬ সালের প্রথম জাতীয় মহিলা আন্তজেলা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন! কিভাবে সম্ভব? রূপকথার সাফল্যটা এসেছে যাঁদের সৌজন্যে সেই খেলোয়াড়দের অবশ্য খোঁজ মিলল না! না পাওয়ারই কথা। কেননা ভোলার কোনো ক্রিকেটারই খেলেননি টুর্নামেন্টটিতে। ভোলায় শ্বশুরবাড়ি হওয়ায় কানাডাপ্রবাসী ফরিদা ইয়াসমিন মূলত গড়েছিলেন দলটা। জাতীয় দলের বর্তমান অধিনায়ক সালমা খাতুন, পান্না ঘোষের মতো খেলোয়াড়দের মোটা টাকায় ভোলায় এনেছিলেন তিনি। সেই দলটাই এনে দেয় শিরোপা। এরপর ফরিদা ইয়াসমিন কানাডায় ফেরায় মেয়েদের দলের পথচলার সেখানেই শেষ। তবে ভোলা জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে স্থানীয়দের নিয়ে শিরোপা জেতা দলটার সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলা হয়েছিল একটা। এরপর শিরোপাজয়ী দলকে সংবর্ধনাও দেয় সংস্থাটি। কিন্তু সেভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি শক্তিশালী দল গড়ার। স্কুল দলগুলোকে নিয়ে অবশ্য একটা টুর্নামেন্ট করে মহিলা ক্রীড়া সংস্থা। সর্বশেষ আসরের শিরোপা জিতেছে নিজামউদ্দিন স্কুল। এ ছাড়া ভলিবল টুর্নামেন্টও করে মহিলা ক্রীড়া সংস্থা। এর সুফল পেয়েছে এ বছর বিভাগীয় ভলিবলের শিরোপা জিতে।

১৯৮৮ সালে তখনকার পুলিশ সুপার মাজহারুল ইসলাম ভুঁইয়া প্রথম ক্রিকেট পিচ করেন ভোলায়। ক্রিকেটের যাত্রা শুরু গজনবী স্টেডিয়ামের সেই পিচে। এ বছর এখনো মাঠে না গড়ালেও ক্রিকেট মোটামুটি নিয়মিত ভোলায়। প্রথম বিভাগের সঙ্গে মাঠে গড়ায় দ্বিতীয় বিভাগ লিগও। এখানকার লিগে খেলতে পারেন অন্য জেলার তিনজন। তাই জাতীয় দলের জাভেদ ওমরের মতো তারকা একটা সময় খেলে গেছেন ভোলার লিগে। এখন জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা হয়ে পড়েছেন দূর আকাশের তারা। তার পরও ঢাকা প্রিমিয়ার বা প্রথম বিভাগের অনেকে আসেন এই জেলার লিগে খেলতে।

বিসিবির নিয়োগ দেওয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার কোচ নজরুল হুদা গোফরান। লেভেল টু আপগ্রেড করেছেন তিনি। গোফরানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভালো ফল করছে বয়সভিত্তিক দলগুলো। ২০১১-১২ মৌসুমে বরিশাল বিভাগীয় আঞ্চলিক ক্রিকেটের শিরোপা জেতে অনূর্ধ্ব ১৪ ও ১৮ দল। সেবার ফাইনাল খেলেছিল অনূর্ধ্ব ১৬ দলও। ২০১২-১৩ মৌসুমেও আঞ্চলিক শিরোপা ধরে রাখে অনূর্ধ্ব ১৪ ও ১৮ দল। এবার অবশ্য তেমন কিছু করতে পারেনি অনূর্ধ্ব ১৪ ও ১৬ দলের ছেলেরা। তবে ঠিকই শিরোপা জিতেছে ১৮ দল। ক্রিকেটে জাতীয় দল পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি কেউই। সেই স্বপ্ন দেখছেন আবু সায়েম চৌধুরী। তিনি খেলেছেন অনূর্ধ্ব ১৯ দলে। শেখ জামালের মতো দলে খেলায় জাতীয় নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতিই দিলেন তিনি, 'জাতীয় দলটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য। তবে সেখানে পৌঁছতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। আমিও চেষ্টা করে যাচ্ছি নিজের যথাসাধ্য দিয়ে।'

ক্রিকেটের পাশাপাশি ভোলায় নিয়মিত হয় ভলিবল, ব্যাডমিন্টন আর কাবাডি লিগ। এন্ট্রি ফি নিয়েও এ বছর অনেক লিগ না হওয়ার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। জেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিসে বসে কাজ করার সময়ই গত মার্চে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মুনতাসির আলম রবিন চৌধুরী ও নির্বাহী সদস্য সাবেক টেনিস খেলোয়াড় সুমন খানকে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই সংগঠকদের পুলিশ সন্দেহ করেছিল 'বোমাবাজ' বলে। সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে ছাড়াও পান দুজন। মামলার কারণে খোদ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক লিটন আছেন কিছুটা আড়ালে। পিছিয়ে পড়া এই জনপদের ক্রীড়াঙ্গন আরো পিছিয়েছে তাই। উপজেলাগুলোর ভালো খেলোয়াড়দের জেলা দলে সেভাবে সুযোগ না দেওয়ারও অভিযোগ করলেন অনেকে। এই উপজেলাগুলোয় প্রতি বছরই কোথাও না কোথাও হয় কোনো টুর্নামেন্ট। গত বছর লালমোহনেই যেমন 'এমপি শাওন কাপে'র ফাইনাল খেলতে দুই দলে চলে এসেছিলেন জাতীয় পর্যায়ের অনেক ফুটবলার। লালমোহন ক্রীড়া চক্রের সাধারণ সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ রাকিব জানালেন, 'ভোলার উপজেলাগুলোর মধ্যে লালমোহন খেলায় অনেক এগিয়ে। প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো টুর্নামেন্ট হয় এখানে। সর্বশেষ মেয়র কাপে খেলা ভোলার ৫৪ জনের ২৮ ফুটবলারই আমাদের লালমোহনের। এখানে মেজর হাফিজ স্টেডিয়াম ছাড়া খেলার মাঠ বলতে কলেজ মাঠ আর হাইস্কুল মাঠ। স্টেডিয়ামের সংস্কার হলে লালমোহন এগিয়ে যাবে আরো।'

ফুটবলে গর্বের অতীত ছিল ভোলার। ষাট-সত্তরের দশকে হতো হাবিব শিল্ড। স্বাধীনতার পর বন্ধ সেটা। জমজমাট হাবিব শিল্ডের ধারাবাহিকতায় আরো অনেক টুর্নামেন্টই হতো এখানে। এরই সুফল হিসেবে শেরে বাংলা কাপে অনেকবারই আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভোলা। ১৯৯৪ সালে তো করে বসে বাজিমাতই। শিরোপা জিতে যায় শেরে বাংলা কাপের। সে সময় বছরজুড়েই মাঠে থাকত ফুটবল। আলফাজ, নকিবসহ জাতীয় দলের তারকারা আসতেন নিয়মিত। সেই ভোলায় গত সাত বছরে ফুটবল লিগ হয়েছে একটাই। জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে আলাদা হয়ে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফএ) বাফুফে ও প্রাইম ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় লিগ করেছিল ২০১২ সালে। সেবার তিন লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রাইম ব্যাংক দেয় এক লাখ টাকা। অথচ জেলা ক্রীড়া সংস্থার খরচ তিন লাখের মতো। বাকি টাকাটা না পাওয়ায় উৎসাহে ভাটা পড়েছে নতুন করে। তাই গত বছর বাফুফের উদ্যোগে নিটল টাটা এক লাখ টাকা দিলেও লিগ করেনি ভোলা জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এ নিয়ে ডিএফএ-র যুগ্ম সম্পাদক মুনতাসির আলী রবিন চৌধুরী জানালেন, 'একবার লিগ করেই দেনার মধ্যে পড়ে গেছি। তাই নিটল টাটা এক লাখ টাকা দিলেও গত বছর লিগ করিনি। প্রাইম ব্যাংকের মতো ওরা বাকি টাকা না দিলে দেনা শোধ করব কিভাবে? স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকরা এগিয়ে এলেই কেবল সম্ভব প্রতি বছর লিগ করা। না হলে পিছিয়ে পড়বে ফুটবল।'

লিগ না হলেও জেলা প্রশাসক গোল্ড কাপটা নিয়মিত ভোলায়। জমজমাট এই টুর্নামেন্ট হয়ে আসছে আশির দশকে থেকে। শিরোপাটাও আকর্ষণীয়। ২৫ ভরি সোনা দিয়ে তৈরি ট্রফিটা নজর কাড়ে সবার। এত বেশি সোনা দিয়ে তৈরি শিরোপা বাংলাদেশে আছে খুব কম জেলায়। তবে জয়ী দলকে আসল ট্রফির বদলে দেওয়া হয় রেপ্লিকা। জেলা প্রশাসক গোল্ড কাপের পাশাপাশি গত বছর অনুষ্ঠিত হয়েছে মেয়র কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে আয়োজিত টুর্নামেন্টটার জন্য তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন স্থানীয় মেয়র মনিরুজ্জামান।

হাউজি না থাকায় জেলা ক্রীড়া সংস্থার ফান্ড নেই কোনো। এ নিয়ে তদবির করেও অনুমোদন আনতে না পারার অন্যতম কারণ ধর্মীয় অনুশাসন। এ জন্য আফসোসও আছে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তাদের। ফান্ডের জন্য ২০০৭ সালে শিল্পী মমতাজকে এনেছিলেন সে সময়ের জেলা প্রশাসক। তবে লাভের বদলে উল্টো এই কনসার্ট আয়োজনে ক্ষতি হয় এক লাখ ২৭ হাজার টাকা!