kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

পিছিয়েছে সুনামগঞ্জ

   

১ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পিছিয়েছে সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জ জেলা স্টেডিয়াম, ছবি : শামস শামীম

মোগল সেনা সুনামউদ্দিন যুদ্ধে জেতে সম্রাটের কাছ থেকে যে ভূমি পেয়েছিলেন সেটাই আজকের সুনামগঞ্জ। ইতিহাস আরো বলছে কালিদহ সাগরের বুক চিড়ে জেগে ওঠা হাওর-বাঁওড়, বিপ্লবের নাভিভূমি খ্যাত সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ছিল গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সেই ঐতিহ্য হারিয়ে এখন বিবর্ণ সুনামগঞ্জ। এই জেলার কেউ এ পর্যন্ত সুযোগ পাননি জাতীয় ক্রিকেট দল, 'এ' দল বা একাডেমি দলে। অন্য খেলাতেও জাতীয় পর্যায়ে প্রায় তিন দশকে নেই কোনো প্রতিনিধিত্ব। অথচ ক্রিকেট, ভলিবল, হ্যান্ডবল, দাবা, অ্যাথলেটিঙ্ নিয়মিতই আয়োজন করে জেলা ক্রীড়া সংস্থা। তারপরও জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় উঠে না আসার কারণটা জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নানু মিয়া জানালেন এভাবে, 'আসলে আমাদের জেলাটা একেবারে সীমান্ত অঞ্চলে। উন্নতমানের সুযোগ-সুবিধা সেভাবে পায় না খেলোয়াড়রা। তবে বেশির ভাগ খেলার লিগ চালু রেখেছি আমরা। খেলা যেহেতু মাঠে থাকে তাই কোনো না কোনো সময় অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসবে কেউ। এখন শুধু নিয়মিত খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। সেটারই চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা।'

২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর বন্ধ ছিল সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট লিগ। জেলা থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে কাউন্সিলর মনোনয়ন নিয়ে জটিলতাতেই এই অচলাবস্থা। ক্লাবগুলো সরাসরিই জানিয়ে দিয়েছিল কাউন্সিলর পরিবর্তন না হলে জেলার কোনো খেলায় তারা নেই। সেই জটিলতা কাটিয়ে এখন বিসিবির কাউন্সিলরের দায়িত্বটা পালন করছেন জেলার সাবেক ক্রিকেটার রেজোয়ানুল হক রাজা। এরপর থেকে ক্রিকেট লিগ হচ্ছে নিয়মিতই।

সুনামগঞ্জের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট দলগুলো অবশ্য আশাজাগানিয়া পারফরমেন্সই করছে। অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেট দল ২০১৩, ২০১২ ও ২০১০ সালে হয়েছে সিলেট বিভাগের চ্যাম্পিয়ন। অনূর্ধ্ব ১৮ দল বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ২০১১ ও ২০১২ সালে। তবে অনূর্ধ্ব-১৬ দল সেভাবে সাফল্য পায়নি। ২০১০, ২০১১ আর ২০১২ সালে টানা তিনবার আঞ্চলিক রানার্সআপ হয়েছে তারা। এখানকার লিগে খেলে গেছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল, মেহরাব হোসেন অপির মতো জাতীয় দলের অনেকে। জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা অবশ্য এখন আসেন না আগের মতো। লিগে না এলেও প্রায়ই ছাতক, জগন্নাথপুরের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় দেখা যায় ক্রিকেট বা ফুটবলের জাতীয় দলের খেলোয়াড় আর ঢাকায় থাকা বিদেশি ফুটবলারদের। লন্ডনে থাকা সুনামগঞ্জের ধনাঢ্যরা দেশে আসার আগে মোটা টাকায় চুক্তি করে ফেলেন তাদের সঙ্গে। জাতীয় তারকা আর বিদেশিদের প্রীতি ম্যাচ দেখতে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ ভেঙে আসে তাই।

সুনামগঞ্জে চালু হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটও। সরকারি শিশু পরিবার বালিকা এতিমখানার মেয়েদের নিয়ে স্বপ্নও দেখছেন এখানকার সংগঠকরা। ক্রিকেট খেলে এই এতিমখানার মেয়েরা নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে মুখিয়ে থাকাতেই এমন স্বপ্ন। ২০১২ সালে এখানে হয়ে গেছে জাতীয় মহিলা ক্রিকেট। জাতীয় দলের সালমা, শুকতারাদের কাছ থেকে দেখে খেলাটায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে এই মেয়েরা।

ফুটবলে একটা সময় শৈলবালা শিল্ডসহ আরো কিছু টুর্নামেন্ট ছিল জমজমাট। সেগুলো এখন বন্ধ। ১৯৯২ সালে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে অনুষ্ঠিত হয় জেলা প্রশাসক গোল্ড কাপ। এরপর ২০ বছর বন্ধ ছিল সেটি। ২০০২ সালে আরো একবার মাঠে গড়ালেও নিয়মিত করা যায়নি টুর্নামেন্টটি। তেমনি বন্ধ হয়ে গেছে স্টার কম্পানির আয়োজনে নব্বই দশকের জমজমাট একটি ফুটবল লিগও। ২০০৮ সালে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা ডিএফএ গঠনের পর সেভাবে হয়নি ফুটবল লিগও। ডিএফএ গঠনের প্রথম মৌসুমে অর্থাৎ ২০০৭-০৮ মৌসুমেই লিগ হয়েছিল একটি। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে সংস্থাটি গত বছর আয়োজন করে ফুটবল লিগের।

অর্থাৎ ২০০৯ থেকে টানা ২০১৩ সাল পর্যন্ত জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কোনো লিগের আয়োজন করতে পারেননি। ২০১৩ সালে জমিরুল হক তালুকদারকে আহ্বায়ক করে এক মাসের মধ্যে কমিটি গঠনের জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কমিটি করে দিয়েছিল। কমিটি গঠন করতে জমিরুল হক তালুকদার কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা বিজন সেন রায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সুনামগঞ্জে এসে সুনামগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দেবজিৎ সিংকে কমিটি গঠন করে দেওয়ার দায়িত্ব দেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পরে ২০১৩ সালে শাহ আবু জাকেরকে সভাপতি করে কমিটি গঠন করে দেন। এই কমিটি দীর্ঘদিনের বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগের আয়োজন করলে চারটি খেলা চলার পরই মারামারি করার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফুটবলের পিছিয়ে যাওয়া নিয়ে ডিএফএর সভাপতি শাহ আবু জাকেরের আক্ষেপ, 'খুবই হতাশার ব্যাপারটা। এ নিয়ে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে বাফুফেতে। আমরা চেষ্টা করছি সমস্যা সমাধান করে লিগ আয়োজনের।' তবে যাদের কারণে বন্ধ হলো লিগ তাদের বিপক্ষে পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য তাকেই দুষছেন খেলোয়াড় ও সংগঠকরা ।

অনেক টুর্নামেন্ট বন্ধ হয়ে গেলেও আন্তউপজেলা ফুটবল এখনো নিয়মিত সুনামগঞ্জে। এই আসরে দাপট সুনামগঞ্জ সদর, জগন্নাথপুর আর তাহিরপুরের। তিনটি উপজেলাই অন্তত পাঁচবার করে জিতেছে এর শিরোপা।

২০০১ সালে খেলার বাইরের লোকদের জেলা ক্রিড়া সংস্থায় দায়িত্ব দেওয়ায় সুনামগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গনে স্থবিরতা নেমে এসেছিল। তখন সরকারি নির্দেশেই ১০ জনের আহ্বায়ক কমিটি করে দেওয়া হয় সংস্থাটিতে যাতে ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। ক্রীড়া সংগঠক দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরী হাইকোর্টে এ কমিটির বিপক্ষে রিট করায় সরকারি এ নির্দেশনা স্থগিত করেন আদালত। ২০০৮ সালে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবের হোসেন উদ্যোগী হয়ে স্থগিতাদেশ তুলে সর্বসম্মতিক্রমে ১০ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করে দেন। এই কমিটিই ৯১ সদস্যের সাধারণ পরিষদ গঠন করে দেয়। সে বছরে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন নাজির হোসেন ।

২০১২ সালের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদকের পদে জিতেন অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির জাহানুর। এই কমিটিতে আবার জেলা প্রশাসকের কোটায় ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের কিছু মানুষ চলে আসেন। ২০১৩ সালে হুমায়ূন কবির জাহানুর মারা গেলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন অ্যাডভোকেট নানু মিয়া।

স্বদেশি আন্দোলনের সুনামগঞ্জের অন্যতম পুরোধা কমরেড রবি ধাম কলোনিযুগে তরুণদের শারীরিক কসরত শেখাতেন। এটা যতটা না খেলা তার চেয়ে বেশি ব্রিটিশদের এ দেশ থেকে তাড়ানোর মহড়া। তবে খেলার প্রচলনটা তা থেকেই। সুনামগঞ্জে জেলা স্টেডিয়ামের পাশাপাশি খেলার উপযোগী ভালো মানের মাঠ বলতে সরকারি ষোলঘর মাঠ। ষোলঘর মাঠে অবশ্য কোনো গ্যালারি আর বাউন্ডারি নেই। মাঠটাই সম্বল। সেই ১০ একরের বেশি জমির মাঠটা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পরিবর্তিত করার পরিকল্পনা আছে জেলা ক্রীড়া সংস্থার। অনুমোদন হয়ে গেছে এর বাউন্ডারি ওয়াল। এখন বাকি শুধু টেন্ডার হওয়া। এ ছাড়া ঢেলে সাজানো হবে জেলা স্টেডিয়ামও। ক্রীড়া পরিষদ থেকে প্রায় চার কোটি টাকার টেন্ডারও হয়ে গেছে দুই তলা প্যাভিলিয়ান নির্মাণসহ স্টেডিয়াম সংস্কারের।

হ্যান্ডবলে সাত আর ভলিবলে ছয় দল নিয়ে নিয়মিতই লিগ হয় সুনামগঞ্জে। এই দুটি দল প্রতিবছর অংশ নেয় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে। ভলিবলের বড় মাপের সাফল্য বলতে গত বছর আন্তজেলা টুর্নামেন্টে আঞ্চলিক রানার্সআপ হওয়া। হ্যান্ডবলের সাফল্য এর চেয়েও বেশি। দু-দুবার জাতীয় হ্যান্ডবলের ফাইনাল খেলেছে তারা।

এই জেলার শতবর্ষী 'ভাইয়াপি কুস্তিখেইড়' বা, 'প্রীতি কুস্তিখেলা'র সুনাম আছে যথেষ্ট। খেলার নিয়ম অনুযায়ী কোনো কুস্তিগিরের হাঁটু, মাথা, কোমর, হাত, পিঠ বা বুক মাটিতে পড়ে যাওয়া মাত্র তিনি হেরে যাবেন। এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের টুর্নামেন্টে দুই গ্রামের সেরা ছয়জন খেলোয়াড় অংশ নেন এতে। জয়ের জন্য নানা কৌশল বা 'প্যাঁচ' ব্যবহার করেন খেলোয়াড়রা যার অন্যতম 'ঘারি মুছকা' (কোমর ধরে ফেলে দেওয়া), 'বাইম্যা প্যাঁচ' (বাইম মাছের প্যাঁচ), 'বাল্লা' (পায়ে পায়ে লড়াই), 'আউকরা' (গোড়ালি দিয়ে ফেলা) ও 'বস্তাটান' (ঘাড়ের ওপর তুলে ফেলা)। সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর-এই পাঁচ উপজেলাতেই বেশি প্রচলন খেইড়ের। কুস্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয় স্বাগতিক গ্রাম। নিমন্ত্রিত হয় প্রতিপক্ষ গ্রামবাসী। এমনও হয়েছে-জয়ী 'মালের' (খেলোয়াড়) সঙ্গে বিয়ে হয়েছে পরাজিত গ্রামের কোনো ধনবান ব্যক্তির মেয়ের। সেই কুস্তিগিরের সহায়সম্বল না থাকাটা প্রতিবন্ধকতা হয়নি তাতে!

 

 

মন্তব্য