kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

বিশেষ লেখা

শিখরে ওঠার পেছনের গল্প

মোস্তফা কামাল

৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিখরে ওঠার পেছনের গল্প

২০০৯ সালের ঘটনা।

তখন সন্ধ্যা। প্রথম আলো অফিসে বসে রিপোর্ট লিখছি। হঠাৎ একটি ফোন। কুশল বিনিময়ের পর অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো, ‘আপনাকে একটা সুখবর দিই। আমরা নতুন একটা পত্রিকা করছি। আমাদের এই নতুন স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জের সহযাত্রী হিসেবে আপনাকে চাই।’

কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলাম। সংবাদপত্রজগতে তখন প্রথম আলো মহীরুহ। টানা প্রায় ১১ বছর ধরে কাজ করছি। কোনো রকম সমস্যা অনুভব করিনি। প্রথম আলো ছাড়ব—এ রকম কোনো ভাবনা ছিল না।

রাতে স্ত্রীকে বিষয়টি বললাম। সে বিশ্বাস করতে চাইল না। তার ধারণা, আমি ফান করছি।

যা হোক, কয়েক দিন পর আবার মোবাইলে ফোন—কী সিদ্ধান্ত নিলেন? দ্রুত জানালে ভালো হয়।

এবার জানতে চাইলাম, কোন গ্রুপ থেকে বের হবে?

গর্বের সঙ্গে উত্তর, বসুন্ধরা গ্রুপ।

বসুন্ধরা গ্রুপের নাম শুনে মনে মনে ভাবি, বড় গ্রুপ। সহসা কাগজ বন্ধ হবে না। কয়েক বছর চালিয়ে রাখতে পারলে কাগজ দাঁড়াবে। বাসায় গিয়ে আবার স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করলাম। সে বলল, ‘তোমার যা ভালো মনে হয় তাই করো।’ কাছের বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের কাছে পরামর্শ চাইলাম। তারা ঘোর আপত্তি জানাল। কেউ কেউ বলল, ‘তুমি কি পাগল হয়েছ!’

সবার বারণ উপেক্ষা করেই সম্পাদক আবেদ খানের ডাকে সাড়া দিলাম। এরপর প্রথম আলো থেকে একঝাঁক সাংবাদিক-সহকর্মী কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে যুক্ত হয়। মনে হচ্ছে, এই সেদিনের কথা। সময় কত দ্রুত চলে যায়! ৯ বছর পেরিয়ে এবার দশে পা রাখল কালের কণ্ঠ। এরই মধ্যে দেশের অন্যতম শীর্ষ দৈনিকে পরিণত হয়েছে পত্রিকাটি।

যাত্রার শুরু থেকেই অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছে। পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক বন্ধুর পথ। নানা রকম ষড়যন্ত্রও ছিল। টিম গঠন নিয়ে নানা জটিলতায় শুরুতেই বারবার হোঁচট খাচ্ছিলাম আমরা। পত্রিকা প্রকাশের ডেডলাইন পিছিয়ে যাচ্ছিল। এসব সংকট  কাটিয়ে উঠতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন বসুন্ধরা গ্রুপের শ্রদ্ধাভাজন চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। তাঁর দূরদর্শী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত পত্রিকার প্রকাশনাকে সহজতর করেছিল। সুদক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকদের নিয়ে টিম গঠনের ব্যাপারেও চেয়ারম্যান সাহেবের তাগিদ ও অনুপ্রেরণা অনেক কাজে দিয়েছে। তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দেন পত্রিকার একটি স্লোগান দিয়ে। তিনি শুরুতে বললেন, পত্রিকার স্লোগান হবে, ‘আংশিক নয় পুরো সত্য’। স্লোগানটি পরে মানুষের মুখে মুখে উঠে যায়। বলা যায়, প্রকাশের আগেই কালের কণ্ঠ আলোচনায় চলে আসে।

অবশেষে এলো সেই শুভ দিন। ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি। প্রথম দিনই লক্ষাধিক পাঠকের হাতে যায় কালের কণ্ঠ। অতি অল্প সময়ের মধ্যে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা লাভ করে পত্রিকাটি। এক লাখ, দেড় লাখ, দুই লাখ করে করে ছয় মাসের মধ্যেই প্রায় তিন লাখে পৌঁছে গেল পত্রিকার সার্কুলেশন। এমন বিস্ময়কর ঘটনা বাংলাদেশে সংবাদপত্রের ইতিহাসে ঘটেনি।

পত্রিকা প্রকাশের এক বছরের মধ্যে অফিসের ঠিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বেও কিছু রদবদল ঘটল। তার পরও সংকট আমাদের পিছু ছাড়ল না। কেউ কেউ অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করল। তবে শেষতক সেসব ধোপে টেকেনি।

আসলে কালের কণ্ঠ’র মূল শক্তি হচ্ছে একটি মেধাবী, পেশাদার সাংবাদিক টিম। টিম স্পিরিট অত্যন্ত চমৎকার। একেকটা বিভাগ একেকটি শক্ত পিলার। দুর্বিপাকে ভেঙে পড়ার নয়। বিচক্ষণ ও সুদক্ষ টিমের কারণেই অনেক ঘাত-প্রতিঘাতেও কালের কণ্ঠ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং থাকবে। কালের কণ্ঠ’র নেতৃস্থানীয় বেশির ভাগ সাংবাদিকই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। অনেকের দেশে ও বিদেশে বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। ফলে সাংবাদিকতার মতো সৃজনশীল কাজে তাঁরা সিদ্ধহস্ত। আর এই টিমকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন বসুন্ধরা ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের শ্রদ্ধাভাজন চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর। কালের কণ্ঠ পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগে পুরো বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও হয়ে উঠেছে সংবাদের উৎস। বিপুলসংখ্যক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার ভিড়েও কালের কণ্ঠ পড়তে হয়। না পড়লে পিছিয়ে পড়তে হয়। বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদপত্র পাঠকের হাতে তুলে দিতে আমাদের সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা রয়েছে। এ কারণেই পাঠকদের আস্থার শীর্ষে অবস্থান করছে কালের কণ্ঠ।

হলুদ সাংবাদিকতা বা মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে আমরা মানুষকে বিপদে ফেলি না। আমরা সর্বদা অসহায়ের পাশে দাঁড়াই এবং অসৎ-দুষ্ট লোকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমরা জানি, সংবাদ হচ্ছে গুলির মতো। একবার ছোড়া হয়ে গেলে তা আর ফেরানো যায় না। তাই আমরা পরিপূর্ণ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রকাশ করি না। আমরা সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলি। সাদাকে কালো বলে আমরা প্রিয় পাঠকদের বিভ্রান্ত করি না।

আমরা প্রমাণ করেছি, শুধু নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করেও পত্রিকাকে জনপ্রিয় করা যায়। প্রতিদিন ভোরে কোনো না কোনো সুসংবাদ নিয়ে পাঠকের দরজায় কড়া নাড়ে কালের কণ্ঠ। আমাদের হৃদয়ে বাংলাদেশ এবং চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ। আমরাই প্রথম কোনো পত্রিকা; প্রকাশের আগে ঘোষণা দিয়েছিলাম, কালের কণ্ঠ হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কাগজ। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করিনি। একটি পত্রিকার এর চেয়ে বড় অঙ্গীকার আর কী হতে পারে!

দীর্ঘ এই পথচলায় অনেকে কালের কণ্ঠকে কখনো সরকারি আবার কখনো সরকারবিরোধী পত্রিকা হিসেবে বলার চেষ্টা করেছেন। আমরা বলি না, আমরা নিরপেক্ষ। দেশের জনগণই আমাদের একমাত্র পক্ষ। তার প্রমাণও আমরা দিয়েছি। যে দল বা পক্ষই হরতাল ডেকেছে, আমরা তার বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, মাদক, খাদ্যে ভেজাল, চোরাকারবারির বিরুদ্ধে সব সময়ই সোচ্চার থেকেছি। ভবিষ্যতেও এই অবস্থান থেকে একচুল নড়ব না।

আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ইতিবাচক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতার রাজনীতিই আমাদের কাম্য। সেই লক্ষ্যে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি। ‘বিরল ভালোবাসা’র মতো ইতিবাচক প্রতিবেদন যেমন ছেপেছি, আবার শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর যে কল্প-কাহিনি ছিল সেই সত্য প্রকাশ করে বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছি। এ রকম হাজারো উদাহরণ আমাদের কাছে আছে।

আমরা মনেপ্রাণে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে আমাদের নীতি স্পষ্ট। আমরা সব দল ও মতের মানুষের খবর-মতামত-মন্তব্য প্রকাশ করে থাকি। আমাদের সঙ্গে আছেন দেশের সব পক্ষের লেখকগোষ্ঠী, যাঁরা আমাদের ডিকটেশনে লেখেন না। আমরা কোনো বিষয় লেখকের ওপর চাপিয়ে দিই না। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আর কোনো ব্যাপারে আমাদের কোনো দুর্বলতা নেই। কোনো দলের লেজুড়বৃত্তিও আমরা করি না। আমাদের কোনো এজেন্ডাও নেই। আমাদের এই স্পষ্ট অবস্থান পাঠকরাও উপলব্ধি করতে সক্ষম।

আমরা সততা ও নৈতিকতার ডানায় ভর করে চলি। যাঁরা এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না, তাঁরা অনায়াসে ঝরে পড়েন। বিগত দিনগুলোতে সেটাই বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

সব শেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলি—

‘সত্য যে কঠিন/কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,/সে কখনো করে না বঞ্চনা।’

কবিগুরুর কবিতার এই চরণগুলো পথপ্রদর্শক হিসেবে আমাদের প্রেরণা জোগায়।

আমরা আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছি। সেই স্বপ্নযাত্রায় সুপ্রিয় পাঠকরা আমাদের সঙ্গী। স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা একের পর এক সিঁড়ি ভাঙব আর ধাপে ধাপে এগিয়ে যাব দূরে, বহুদূরে।

মন্তব্য