kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

নিলয়কে সুস্থ হতেই হবে

জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য

৯ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিলয়কে সুস্থ হতেই হবে

ডাক্তার সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আপনার ছেলের সমস্যা কী?’

আমি চিন্তিত গলায় বললাম, ‘আমার ছেলে একটু ইন্ট্রোভার্ট টাইপের। কোনো কিছুতেই রিঅ্যাক্ট করে না। এই ধরেন কোথাও ব্যথা পেল, কিছু হারিয়ে গেল, অসুস্থ হলো অথবা ধরেন জন্মদিনে প্রচুর গিফট পেয়েছে, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছে বা ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ জিতেছে—কোনো কিছু নিয়েই ফেসবুকে পোস্ট দেয় না। ওর জন্মদিন উপলক্ষে কত বড় পার্টি করলাম, একটাও সেলফি তোলে নাই। ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, ফেসবুকেও ওর কোনো আগ্রহ নাই। ঈদের সময় কাউকে ঈদ মোবারক মেসেজ পর্যন্ত দেয় না।’

ডাক্তার সাহেব তার টাকে হাত বুলাতে বুলাতে চিন্তিত গলায় বললেন, ‘হুঁ! খুব রেয়ার কেস। লাস্ট দুই ইয়ারে এই টাইপ কেস মাত্র তিনটি ফেস করেছি। বাচ্চা রিঅ্যাক্ট করে না! এই ধরনের বাচ্চারা বাইরে রিঅ্যাক্ট না করতে পারার কারণে ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত ইমাজিনেশনের ভেতরে থাকে। এদের মনের ভেতরটা একটা ডাস্টবিনের মতো হয়ে যায়! রিঅ্যাক্ট করাটা জরুরি।’

আমি চিন্তামিশ্রিত গলায় বললাম, ‘অনেক চেষ্টা করেছি। ও তো ফেসবুকে পর্যন্ত রিঅ্যাক্ট করে না। সিম্পল লাইক দিয়ে চলে যায়। ল্যাপটপ কিনে দিয়েছি, চালাতে পর্যন্ত পারে না। সারা দিন বই পড়ে আর টিভি দেখে। ওর বন্ধুরা সারা দিন কত সেলফি আপলোড করে, তার মধ্যে কখনো ওকে দেখা যায় না।’

ডাক্তার সাহেব নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘খোকা! ক্রিকেটে তোমার কাকে পছন্দ? ম্যাশ না সাকিব?’

নিলয় জবাব দিল, ‘ম্যাশ।’

—তো ম্যাশ যখন সেঞ্চুরি করে, তুমি ওর ছবি ফেসবুকে কাভার পিকে দাও না?

: না!

—বাংলাদেশ যখন হারে তখন কেন হারল, কার দোষে এটা হলো, কাকে দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত—এ রকম শিক্ষামূলক স্ট্যাটাস দাও না?

—জি না।

: যখন ঢাকার বাইরে ঘুরতে যাও ঞত্ধাবষরহম ঃড়... স্ট্যাটাস দিতে মন চায় না তোমার? অথবা কোনো রেস্টুরেন্টে গেলে চেকইন দিতে বা কোনো গান শুনলে, মুভি দেখলে অ্যাক্টিভিটি আপডেট দিতে ইচ্ছা করে না?

—না!

ডাক্তার সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, যার অর্থ হলো—অবস্থা খুব খারাপ। তিনি নিলয়ের নাড়ি দেখলেন। প্রেসার, হার্টবিট—সব চেক করে আবার বললেন, ‘আচ্ছা খোকা, তোমার কি কখনো মন চায় না, তোমার হাজার হাজার ফলোয়ার হোক। সবাই তোমার পোস্ট শেয়ার করুক। কখনো কবিতা লিখতে ইচ্ছা করে না? অথবা শিক্ষামূলক লেখা, সাকিব আল হাসানের বউ কেন পর্দা করে না বা ধরো, জয়া আহসান, পূর্ণিমার যে বয়স বাড়ে না অথবা মেহজাবিনের চোখের পানি—এসব নিয়ে পোস্ট দিতে মন চায় না?’

নিলয় নাসূচক মাথা নাড়ল।

ডাক্তার সাহেব এবার রেগে গেলেন। তেজি স্বরে আমাকে বললেন, ‘আপনার ছেলে ক্রিমিনাল অথবা সাইকোপ্যাথ। সারাক্ষণ ওর মাথায় খুনের পরিকল্পনা ঘোরে। এভাবে চুপচাপ থাকতে থাকতে একদিন আপনাদের সবাইকে খুন করে ফেলবে!’

আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘এসব কী বলেন? আমার ছেলেটা একটু অস্বাভাবিক। রিঅ্যাক্ট করে না। কিন্তু তার মধ্যে মানবিকতা আছে। রাস্তায় কুকুর দেখলে বাড়িতে নিয়ে এসে খেতে দেয়। ভিখিরি দেখলে টাকা দেয়। একবার শীতে ওর বয়সী একটা ছেলেকে নিজের দামি জ্যাকেট খুলে দিয়েছিল।’

ডাক্তার সাহেব মানতে নারাজ। তিনি দুদিকে ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘উঁহু! তাহলে ছবি কই? ছবি দেখান। আছে ছবি? তুলেছে আপনার ছেলে ওদের সঙ্গে কোনো সেলফি, বলেন? আমি সাইকিয়াট্রিস্ট। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, সে ছবি তোলেনি।’

আমি মাথা নিচু করলাম। সত্যিই ছবি তোলেনি।

ডাক্তার সাহেব বিজয়ীর হাসি দিয়ে বললেন, ‘আপনার ছেলে অস্বাভাবিক। ওর কাউন্সেলিং দরকার। এ দেশে হবে না, বিদেশে নিয়ে চিকিত্সা করান। নাহলে অনেক বড় সমস্যা দেখা দেবে। ভবিষ্যতে বিয়ে করবে, ম্যারিড স্ট্যাটাস দেবে না। বাচ্চা হবে কাভার ফটো দেবে না। বউয়ের সঙ্গে পিক তুলতে আপত্তি করবে। চাকরি পাবে; কিন্তু বায়ো চেঞ্জ করবে না। চাকরিতেও টিকতে পারবে না। যে ছেলে দেশের কারেন্ট ইস্যুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, সেই ছেলে কি স্বাভাবিক, বলুন আপনি? বলুন!’

—তাহলে এখন কী করব ডাক্তার সাহেব?

: এখনো আপনার ছেলে ছোট। এখন থেকেই কাউন্সেলিং করলে ঠিক হলেও হতে পারে। যত বয়স বাড়বে, সমস্যা তত গুরুতর হবে।

নিলয় এতক্ষণ ধরে চুপ করেই আছে। সবই শুনছে; কিন্তু একটা কথাও বলছে না। ডাক্তারের ফি মিটিয়ে আমি ওকে নিয়ে বের হয়ে রিকশা নিলাম।

এতক্ষণে নিলয় মুখ খুলল, ‘আম্মু, আইসক্রিম খাব। ওই দেখো দোকান।’

আমি দুটি আইসক্রিম কিনলাম। একটি ওর হাতে দিয়ে একটি নিজে নিলাম। তারপর বললাম, ‘বাবা! আসো একটা সেলফি তুলি।’

নিলয় নাসূচক মাথা নাড়ল।

আমি দুঃখী গলায় বললাম, ‘একদিন আমি বেঁচে থাকব না। তোমার বাবা বেঁচে থাকবে না। এই সেলফিগুলো দেখেই তোমার আমাদের কথা মনে পড়বে। প্লিজ! একটা সেলফি তুলি?’

নিলয় আবার নাসূচক মাথা নেড়ে আইসক্রিমে কামড় দিল।

আমি রিকশায় উঠলাম। এক হাতে নিলয়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভেজা চোখে ভাবতে লাগলাম, ‘যেভাবেই হোক, ওকে সুস্থ করতে হবে। প্রয়োজনে যত জমিজমা, গয়নাগাঁটি আছে, সব বিক্রি করে বিদেশের সবচেয়ে বড় ডাক্তার দিয়ে ওর কাউন্সেলিং করাব। নিলয়কে সুস্থ হতেই হবে। সেই সঙ্গে আজই ফেসবুকে ওর জন্য দোয়া চেয়ে একটা স্ট্যাটাস লিখতে হবে।’

মন্তব্য