kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

লোকাল বাসের যাত্রী

মাহতাব হোসেন

১১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



লোকাল বাসের যাত্রী

আঁকা : মাসুম

২৭ নম্বর বাসে চেপেছি আসাদ গেটের আড়ং থেকে। সিট নেই। হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে আছি। ভাবলাম, হয়তো সামনে খালি হবে, বসব। ইদানীং কী যে হয়েছে, যে ২৭ নম্বর বাসে একসময় আনায়াসে যাতায়াত করতে পারতাম, উঠলেই সিট ফাঁকা পাওয়া যেত। এখন ফাঁকা তো দূরের কথা, বাসের ভেতর শরীর ঢোকানোই রীতিমতো চ্যালেঞ্জের বিষয়। যারা এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়, তারা বাসের ভেতর চলে যায়, বাকিরা থাকে দরজায় ঝুলে।

খামারবাড়ি মোড়ে হুট করে বাস অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেল। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট পার হতেই টুকটাক আশপাশের সিট খালি হতে শুরু করল। প্রতিটি সিটের সঙ্গে লেপ্টে থাকা লোকগুলো সিট খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বসে যাচ্ছে। আমিও সেই পলিসি নিয়ে অপেক্ষা করছি। আমি যে সিটের পাশে দাঁড়িয়ে আছি, সেই ভাইকে হালকা নক দিলাম—

— ভাই কই যাবেন?

— কেন, ভাই? জাহাঙ্গীর গেট যাব।

ভদ্র যুবকের কথা শুনে ভালো লাগল। ছেলেটার প্রতি অজ্ঞাত কারণে কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। অন্তত জাহাঙ্গীর গেটের পর থেকে বেশ কিছুদূর পথ আরাম করে বসে যেতে পারব। বসে যেতে পারব—এটাই শান্তি। গরমে নেয়ে-ঘেমে একাকার অবস্থা। মনে মনে ত্যক্তবিরক্ত হচ্ছি আর এই অনাহূত ভিড়কে শাপশাপান্ত করছি। মনে হয়, প্রতি ঈদের পরেই ঢাকায় লোকজন হুট করে বেড়ে যায়। ঈদের পরেই বাসের ভিড়ও একই কারণে বেড়ে যায়। আবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর আরেক দফা ভিড় বাড়ে। ঢাকার বাইরে থেকে ছেলে-মেয়েরা কোচিং করতে আসে। বাসের ওপরের হ্যান্ডেল ধরে অপেক্ষা করছি জাহাঙ্গীর গেট কখন আসে।

একসময় অপেক্ষার পালা শেষ হলো। বহুল আকাঙ্ক্ষিত জাহাঙ্গীর গেট চলে এলো। আসার পরপরই ভদ্র যুবককে তাগাদা দিলাম, ‘ভাই, আপনার জাহাঙ্গীর গেট চলে আসছে নামুন, নামুন!’

ছেলেটা মনে হয় কিছুটা বিরক্ত হলো। চেহারা কেমন যেন বদলে গেল। মুখের রেখা পাল্টে গেল মুহূর্তে।

— ভাই, এখানে নামব না, আমি চেয়ারম্যানবাড়িতে নামব।

কথা শেষ করে মুখটা কেমন হাসি হাসি করার চেষ্টা করল। তারপর পাশের সিটের দিকে ঝুঁকে জানালা দিয়ে কী যেন দেখার চেষ্টা করল। বাস চলতে শুরু করল। মহাখালী উড়াল সেতুর ওপর উঠতে কিছুটা শান্তি পেলাম। শীতল বাতাস শরীরকে ছুঁয়ে দিল। নরম বাতাসে সাময়িক প্রশান্তিতে ভাসলাম; কিন্তু এইতো সামনেই বসতে পারব, এই ভেবে পুলক বোধ করে নিজের মনকে প্রবোধ দিলাম।

উড়াল সেতু অতিক্রম করে চেয়ারম্যানবাড়ি চলে এলো বাস। আমি দ্রুতই সে ভদ্র যুবককে তাগাদা দিলাম, ‘ভাই, ও ভাই নামেন, চেয়ারম্যানবাড়ি চলে আসছে।’

ছেলেটা কেমন করে যেন তাকাল। তারপর একটা আড়মোড়া ভাঙার মতো করে বলল—

—না ভাই, এই দিকের কাজ আজ হবে না মনে হয়!

—নামবেন না? আমি একটা সিটের জন্য অপেক্ষা করে আছি। কোথায় নামবেন?

—দেখি, এমইএস নামব।

একসময় বাস র্যাডিসন ব্লু, এমইএস, এমনকি জোয়ারসাহারাও চলে এলো। খিলক্ষেতে আমি নেমে গেলাম। কিন্তু ওই অভদ্র যুবক বাস থেকে নামল না।

আমি নিশ্চিত, ওর পাশের সুন্দরী মেয়েটা না-নামা পর্যন্ত ও বাস থেকে আজ নামবে না।

মন্তব্য