kalerkantho

ওয়েট, ওয়েটার, ওয়েটিং

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




ওয়েট, ওয়েটার, ওয়েটিং

‘সুন্দরের জন্য অপেক্ষাতেও সুখ, আর অপূর্ব সুন্দরীদের জন্য হলে তো কথাই নেই’—কে যেন কথাটা বলেছেন? খুব সম্ভবত স্যার ভল্টেয়ার। উনি অতি উঁচুমানের দার্শনিক। অতি উঁচুমানের ব্যক্তিদের আমি স্যার ডাকি। ছাত্রজীবন পার করে দিয়েছি দুই দার্শনিকের নাম মুখস্থ করে। একজন স্যার সক্রেটিস, অন্যজন স্যার ভল্টেয়ার। হালকা গবেষণা করে দেখেছি, তাবত্ দুনিয়ার যত দার্শনিক কথাবার্তা, তার বেশির ভাগই এঁরা বলে গিয়েছেন। সেই সূত্রে এই কথাটা তাঁদের কেউ একজনেরই বলার কথা। সক্রেটিসের নামটা বলতাম; কিন্তু সক্রেটিস নামটা মনে হলে কেন জানি ফুটবলার সক্রেটিসের কথাই আগে মনে আসে।         

সেই বিকেল ৪টা থেকে গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বেইলি রোডের চিপায়। নিপা কথা দিয়েছে বিকেল ৫টায় আসবে। এই অসহ্য গরমে হাতঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতে তাকাতে ঘড়িটাকেই কাঁটা কাঁটা মনে হওয়ায় খুলে রেখে দিলাম পকেটে। নিজেকে প্রবোধ দিলাম, সুন্দরীরা একটু লেট করেই আসে। যে যত লেট করবে, সে তত বেশি সুন্দরী। এটা অবশ্য স্যার ভল্টেয়ার বলেননি, এটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা। সেই সূত্রে নিপা অতি উচ্চমানের সুন্দরী। ঘণ্টা দুয়েক পার করে দিয়েছে অনেক আগেই।           

আচ্ছা, ওয়েট যে করে তাকে কি ওয়েটার বলে? তাহলে তো আমি আজন্ম ওয়েটার। সারাটা জীবন কাটল ওয়েট করে। মিলি, বেলী, আনিকা, মনিকা, ফারজানা, ফারহানা—কার জন্য ওয়েট করিনি? অবশ্য ওরা কেউ আমার জন্য ওয়েট করতে চায়নি। তাতে কী, আমি তো করেছি। যে সময়টা ওদের জন্য শুধু বসে থেকে ওয়েট করেছি, সেই সময়ে যদি সামনে এক গামলা গরম শিঙাড়া নিয়ে বসে ওয়েট করতাম, এত দিনে একটা খাবারের হোটেল থাকত আমার। হোটেলের ওয়েটাররা আমাকে স্যার স্যার বলে মুখে ফেনা তোলে, সেই ফেনা মোছার সময় পেত না।     

ওয়েটার দর্শন নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাস্তার পাশের টং দোকানে বসে চা পান করছি, আর মশারা পান করছে আমাকে। প্রথমে দু-তিনবার মারার চেষ্টা করলাম। মশারাও এখন কুশলী হয়ে গেছে। খালি হাতে আর আগের মতো মারা যায় না। উল্টো একটাকে মারার চেষ্টা করলে গ্রুপ নিয়ে আসে। এই দলবদ্ধতা নিশ্চয়ই কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আয়ত্ত করেছে। এদের সংখ্যাধিক্য দেখে হাল ছেড়ে দিয়েছি। প্রেমিক জাতটাই তো ওয়েটার জাতি। কত প্রেমিক ডেট করতে এসে কত কিছু সহ্য করে, আমি দু-চারটা মশার কামড় সহ্য করতে পারব না?         

মশার দর্শন বাদ দিয়ে বরং নিপার দর্শন কখন পাব, তাই নিয়ে ভাবতে বসি। আমার জন্য নিপা সাজুগুজু করছে, ভাবতেই কেমন জানি সুখ সুখ লাগছে। ইস, সুখ মাপার একটা যন্ত্র থাকত যদি, তাহলে এখনই মেপে দেখতাম, ওয়েট করার এই সুখটা সর্বকালের সব রেকর্ড ভাঙতে পারল কি না। বিজ্ঞানীরা এত কিছু মাপার যন্ত্র আবিষ্কার করেন, একটা সুখ মাপার যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারেন না?     

নিপা নিশ্চয়ই এতক্ষণে সাজুগুজু করে রিকশায় রওনা দিয়ে দিয়েছে। রাস্তায় জ্যাম না থাকলে হয়তো এতক্ষণে চলে আসত। এ শহরে আর কেউ বুঝুক আর না বুঝুক, রিকশাওয়ালারাই সবচেয়ে বেশি বোঝে সুন্দরীদের মূল্য। সব প্যাসেঞ্জারকে ‘যামু না’ বললেও সুন্দরী প্যাসেঞ্জারকে কখনো ‘না’ বলে না। বরং রিকশায় উঠিয়ে, পারলে পঙ্খিরাজের বেগে উড়াল দেয়।       

পাঁচ কাপ চা চুমুক দিতে দিতে শেষ করেছি। সামনে রিকশার দিকে তাকাতে তাকাতে এখন চোখে ঘোলা দেখছি সব। দূর থেকে কোনো রিকশা সামনে এলেই মনে হচ্ছে, এই বুঝি নিপা এলো। সামনে এগিয়ে গিয়ে এ নিয়ে দুবার বিগলিত হাসি উপহার দিয়ে গোলাপ বাড়িয়ে দিয়েও ইউটার্ন নিয়েছি শেষ মুহূর্তে। প্রতিবারই ভাগ্য সহায় ছিল। লোক ডাক দিয়ে অঘটন ঘটায়নি কেউই। অবশ্য আমারই বা কী দোষ! সাজুগুজু করে আসা সব মেয়েকেই দূর থেকে কেন জানি নিজের কাঙ্ক্ষিতজন বলে মনে হয়।            

সূর্যটাকে নিয়ে বিকেল আর সন্ধ্যার টানাটানিতে সন্ধ্যা জিতে যাবে যাবে করছে। একটা রিকশা মোড়ে দাঁড়াতেই আবার এগোব কি না ভাবছি—এমন সময় নিপার ফোন এলো। রিসিভ করেই ওকে কিছু বলতে না দিয়েই বললাম, ‘কী ব্যাপার,  এতক্ষণে এলে? আমি দেখেছি তোমাকে। রিকশায়ই বসে থাকো, আসছি।’

হন্তদন্ত করে রিকশার সামনে গিয়ে মেয়েটার হাতে ফুল তুলে দিতে গিয়ে দেখি রিকশাভাড়া মেটাতে থাকা মেয়েটার হাতে কোনো মোবাইল ফোন নেই। 

সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোনটা কানে চেপে ধরি আবার। নিপা ঘুম মাখানো কণ্ঠে বলে যাচ্ছে, ‘এইরে! ভাইয়া, আপনি কাকে কী বলছেন? আমি তো বাসায়। অনেক অনেক স্যরি ভাইয়া, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভাইয়া কি রাগ করলেন? কী হলো, কথা বলছেন না কেন?’     

চাইলেও কথা বলার অবস্থানে নেই এখন। আমার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ওয়েট করছে মেয়েটার প্রেমিক। কান্নাকাটি করে বুদ্ধিমতী মেয়েটা এরই মধ্যে আরো চার-পাঁচজন পথিক জড়ো করে ফেলেছে। এদের কেউ কেউ আবার মোবাইল তাক করে আমার ছবি তোলাও শুরু করে দিয়েছে। এরপর ভিডিও হবে কি না কে জানে?     

রেস্টুরেন্টে অর্ডার দিয়ে সবাই যেমন ওয়েটারের আশায় বসে থাকে, কখন খাবার নিয়ে আসবে, আমজনতা ঠিক সে আশায় মোবাইল ক্যামেরা তাক করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

মন্তব্য