kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

আমি যেভাবে বিসিএস দিলাম

শরীফ মজুমদার

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




আমি যেভাবে বিসিএস দিলাম

একটু আগে ইনভিজিলেটর স্যার ওএমআরে রেজিস্ট্রেশন নম্বরটম্বর পূরণ করার নির্দেশনা দিতে গিয়ে বললেন, ‘খুবই সতর্কতার সঙ্গে পূরণ করবে। একটু ভুল হলেই কিন্তু জীবন বৃথা।’

আমিও সাবধানতার সঙ্গে পূরণ করতে লাগলাম। বিসিএস বলে কথা। এত সহজে জীবন বৃথা হতে দেওয়া যায় না!

আমার রুম নম্বর ২০৩। আশপাশে বেশ খোলামেলা। আলো-বাতাস আছে। জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। দরজার ওপাশে মাঠের মেহগনিগাছ দেখা যায়। অত্যন্ত মনোরম পরিবেশ। কিছু না পারলেও এসব প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করে দুই ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। প্রশ্ন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ‘হারানোর কিছু নেই’ ভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কী আছে জীবনে!

প্রথমে গণিত, তারপর বিজ্ঞান। তারপর আন্তর্জাতিক, ইংরেজি, বাংলাদেশ বিষয়াবলি...। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে দেখলাম, ভালোই দাগিয়েছি। এক শ চল্লিশটার মতো। আনন্দে হূিপণ্ডের মধ্যে রক্ত ছলাত করে উঠল! নির্ঘাত পাস। মনে মনে একটা কবিতাও বানিয়ে ফেললাম—

হইব আমি ক্যাডার,

ঠ্যাকাইব কে?

সাধ্যটা কোন ব্যাডার?

বাসায় এসে প্রশ্ন মেলাচ্ছি। ম্যাথের ২০টার মধ্যে দুইটা দাগাইনি। আর দুইটা ভুল হয়েছে। এর মধ্যে এক্সের অনেক পাওয়ারওয়ালা সমাধান একটা ছিল। এত পাওয়ার দেখে আর সাহসে কুলোয়নি! অন্যটা একটা লোকের হাঁটাহাঁটি নিয়ে। লোকটা প্রথমে চার মাইল উত্তরে গেল। সেখান থেকে ১২ মাইল পূর্বে গেল। তারপর আবার গেল ১২ মাইল উত্তরে। তাহলে যাত্রার স্থান থেকে তার দূরত্ব কত? মাপজোখ করে লোকটা কত দূরে আছে খুঁজতে গিয়ে বেশ হয়রান হয়ে গেলাম। শেষে যেখানে পেয়েছি, এখন দেখছি লোকটা নাকি সেখানে ছিল না! কী আজব! এত কষ্টের ফল এ-ই!

যা-ই হোক, বিজ্ঞানও ভালোই হয়েছে। একটা দাগাইনি। দুইটা ভুল। ডিমে কোনো ভিটামিন নেই? অপশনে এ, বি, সি, ডি ছিল। মাথার মধ্যে একটা ডিম নিয়ে এসে ভিটামিনগুলো খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। এ আর বি ঠিকঠাক পাইলেও সি, ডি নিয়া বিশাল প্যাঁচ লাগল। শেষে ছাড়ান দিছি। আরেকটা—কোনটির জন্য পুষ্প রঙিন ও সুন্দর হয়? ক্রোমোপ্লাস্ট হবে। আমি ক্রোমাটোপ্লাস্টকে দায়ী করে আসছি!

এর পরই চোখে আন্ধার দেখা শুরু করলাম। সাধারণ জ্ঞান, ইংরেজি, বাংলায় একটার পর একটা ভুল বের হতে লাগল। ফ্ল্যাশব্যাকে আবার পরীক্ষার হলে চলে গেলাম...

ম্যাথ আর বিজ্ঞান দাগানোর পর খানিকটা ব্রেক নেওয়ার জন্য বাইরে তাকিয়েছিলাম। একটু আগের ঝুম বৃষ্টিতে মেহগনিগাছগুলো কাকভেজা হয়ে আছে। পাতা থেকে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ছে। আহা! অপার্থিব দৃশ্য! যথেষ্ট রোমান্টিসিজম নিয়ে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ব্যাক করছিলাম।

অতঃপর...ন্যামকে একপাশে রেখে ন্যাটোরে সদর দপ্তরহীন করলাম। জিবুতি থেকে চীনের সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিলাম জাম্বিয়ায়। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সানশাইন পলিসি দিয়া দিলাম চীন আর রাশিয়াকে। এবং কটোউইসের পরিবর্তে লাস্ট জলবায়ু সম্মেলন করার কৃতিত্ব দিলাম প্যারিসকে! হাম্বানটোটার বদলে চীনের কাছে শ্রীলঙ্কার গলবন্দরকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিয়েছি কোনোরূপ ভাবনা ছাড়াই! পোল্যান্ড আর অস্ট্রিয়ার মধ্যে কোনটারে বাল্টিক অঞ্চলে পাঠানো যায়, এ নিয়ে মনে মনে বেশ খানিকক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পরও সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। বেশ কবার মনে হয়েছিল, দিই অস্ট্রিয়ার গোল্লা ভরাট করে। ভাগ্য ভালো, অল্পের জন্য অস্ট্রিয়ারে বাল্টিকে পাঠাই নাই।

ইংরেজিতে ‘স্ত্রী মারা যাওয়া লোকটারে’ নির্দ্বিধায় ব্যাচেলর বানিয়ে আসছি! জেমস জয়েসের উপন্যাস দিয়ে দিয়েছি জোসেফ কনরাডকে! এমনকি স্বয়ং শেকসপিয়ার মহোদয়কেও ছাড় দিইনি। বেচারাকে জন্মগ্রহণ করিয়েছি তাঁর মৃত্যুর ঠিক ৫০ বছর পর! বাকি বিষয়গুলোর কথা আর কী-ই বা বলব!

গতকাল পেপারে একটা আর্টিকল দেখছিলাম, ‘বিসিএসই জীবনের সব কিছু নয়।’ পেপারটা যে কই রাখলাম...।

মন্তব্য