kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

রসিকতা

সৈয়দ মুজতবা আলী

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



রসিকতা

হাসতে হয়, না হেসে উপায় নেই। এমনকি যারা ‘হাতুড়ি আর কাস্তে’র নিচে বসে আছে, তারাও হাসে। তবে প্রাণ খুলে নয়, কিংবা ‘পাবে’ বসে বেপরোয়া গালগল্প গুল-গ্যাস ছাড়বার মাঝে মাঝে নয়। সন্তর্পণে টাপেটোপে। এই কিছুদিন আগেই লৌহ-যবনিকার অন্তরালে একটি রসের গল্প মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে এই হেথা বাংলাদেশে পৌঁছেছে—অবশ্য একে বাঁচিয়ে, ওকে এড়িয়ে।

এক কমিউনিস্ট আরেক কমিউনিস্টকে সোল্লাসে খবর দিলে, “জানিস ভাই ‘প্রাভদা’ কাগজ সবচেয়ে সেরা পলিটিক্যাল রসিকতার জন্য একটা প্রাইজ দেবে, কাগজে ঘোষণা করেছে।”

দ্বিতীয় কমিউনিস্ট : (অধিকতর সোল্লাসে) ‘পয়লা প্রাইজ কত, কমরেড?’

প্রথম কমিউনিস্ট : ‘কুড়ি বচ্ছর সাইবেরিয়া নির্বাসন।’

‘নির্বাসন’ না ‘উইন্টার স্পোর্টস, অ্যান্ড হলিডে’ আমার সঠিক মনে নেই। তবে নিখরচায় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এর থেকে অবশ্য পাঠক মনে করতে পারেন, রুশ-চীনে বুঝি মানুষ মুখবন্ধ করে আছে। যেমন—হিটলার আমলে জর্মনিতে একটি রসিকতা বেশ প্রসার লাভ করেছিল। এক জর্মন আরেক জর্মনকে শুধোলে, ‘তুই নাকি ভাই, ডেনট্রিসট্রি পড়া ছেড়ে দিয়েছিস? কেন?’

‘কী আর হবে? দাঁতের চিকিত্সা করব কী করে? কেউ যে মুখ খুলতে আদৌ রাজি হয় না।’

তা নয়। লোকে মুখ খোলে। কারণ যে সব কর্তাব্যক্তিরা রুশ-চীনের ফুটন্ত জলের কািলর ওপর বসে আছেন তাঁরাও জানেন, মাঝে মাঝে ঢাকনাটা একটু ফাঁক না করে দিলে তাঁদেরও উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তবে এঁরা মোটামুটি ঠিক করে নিয়েছেন, কোন ধরনের রসিকতা একটুখানি বরদাস্ত করে নিতে হয়, আর কোন ধরনের রসিকতা ‘হারাম’ বিধান দিয়ে সাইবেরিয়ো ব্যবস্থা করতে হয়—চীন দেশে, শুনেছি, নেফা অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, গুলি খেয়ে মরবে, নয় শীতে জমে গিয়ে।

সবচেয়ে বরদাস্ত করা হয়, বাসস্থানের অভাব, আহারাদির অনটন, বাধ্য হয়ে অর্ধদিগম্বর বেশ ধারণ সম্বন্ধে। কারণ চোখের সামনে এগুলো এমনই জাজ্বল্যমান, সবাই এগুলো সম্বন্ধে হাড়ে হাড়ে এমনই সচেতন যে এ নিয়ে মসকরা করে, তাই সবাই কিছুটা মনের ভাব নামাক—একটা নতুন অক্টোবর রেভল্যুশন অদ্যকার কর্তাব্যক্তিদের পক্ষে আরামদায়ক অভিজ্ঞতা না-ও হতে পারে। এবং বাসস্থান-আহারাদির অনটন সম্বন্ধে পোল্যান্ড-রুমানিয়ার কাষ্ঠরসিকরা বলে, ‘সোশ্যালিস্ট রাজ্যের বর্তমান ক্ষণস্থায়ী অভাব-অনটন ভবিষ্যতের চিরস্থায়ী অভাব-অনটনের পথে পথে বিজয়স্তম্ভ।

ভবিষ্যতে কী রকম হবে তাই নিয়ে বলা হয়, আরো তিনটি ফাইভ ইয়ার প্ল্যান চিন্ময় থেকে মৃন্ময় রূপ ধারণ করার পর এমনই সুদিন আসবে যে সক্কলের আপন আপন সলুন মোটরগাড়ি, এমনকি আপন আপন হেলিকপ্টার থাকবে। সেই সময় মস্কোর ওপরে শূন্যমার্গে আপন হেলিকপ্টারে দুই কমরেডের দেখা। একজন আরেকজনকে শুধোলে, ‘কোথায় চললি কমরেড।’

‘তুই যদি আমার পিছু না নিস, তবে বলছি। অতি গোপনীয় সূত্রে খবর পেয়েছি, কৃষ্ণসাগরের পারে ওডেসার রেশন শপে আড়াই আউন্স মাখন পাওয়া যেতে পারে। সেখানে যাচ্ছি।’

এ তো ভবিষ্যতের কথা। আর বর্তমান দিনে?

হঠাত্ বাড়ি ফিরে কমরেড দেখেন, তাঁর স্ত্রী উপপতির সঙ্গে রসকেলিতে মত্ত। হুংকার দিয়ে স্বামী বললে—‘এই বুঝি প্রেম করার সময়। ওদিকে যে রেশন শপে এক ঘণ্টা ধরে নেবু বিক্রি হচ্ছে।’

সত্যই তো। প্রেম তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু নেবু কিছু আর নিত্যি নিত্যি মেলে না।

এই মর্মে আরেকটি চুটকিলা আছে।

গৃহবণ্টন বিভাগের কর্তা বললেন, ‘কী বলেন কমরেড, আপনার স্ত্রীর ফ্ল্যাটখানা পছন্দ হচ্ছে না? তা আর এমন কী? আমার উপদেশ নিন। স্ত্রী বদল করুন। ঢের কম হাঙ্গামায় পাবেন। ফ্ল্যাট পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা।’

কিংবা বাড়ি বাবদে—

ক্লাস টিচার শুধোলেন, ‘লেনিনের যে ছবিখানা দিলুম, সেটি কোথায় টাঙিয়েছ?’

‘আজ্ঞে কোথাও না।’

‘কেন?’

‘আজ্ঞে চার দেয়াল ঘেঁষে চারটি পরিবার বাস করে। আমরা থাকি মধ্যিখানে। আমাদের তো দেয়াল নেই।’

কিংবা ধরুন—এটা নাকি চীন দেশের—মন্ত্রীমশায় বেতারে বক্তৃতা দিচ্ছেন, ‘১৯৬০-এ আমরা আগের চেয়ে ১১০ গুণ বিজলি বাড়াতে পেরেছি। ১৯৬১-তে ৬০ গুণ। এ বছরে ২০০ গুণ—দাঁড়ান, কী হলো? আমি যে কিছুই দেখতে পাচ্ছি নে, কমরেড স্টুডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট একটি মোমবাতি নিয়ে আসো দিকিনি।’

তবে কোনো কোনো বাবদে বর্তমানে যে অবস্থা অনেকখানি ভালো, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ গল্পটা হলদে, না লাল জানি নে। এক কমরেড রিপোর্ট লিখছেন, ‘পূর্বের চেয়ে এখন অবস্থা অনেক ভালো। আগে গৃহিণী যখন জামা-কাপড় কাচতেন, আমাকে তখন সাহায্য করতে হতো। এখন সে দুর্দিন গেছে। এখন স্ত্রী বলেন, তোমার পাতলুন আর শার্টটা দাও তো। আর তুমি বিছানায় গিয়ে চাদর ঢাকা দাও।’

[এই স্ত্রীকে সাহায্য করার ব্যাপার নিয়ে মার্কিন মুল্লুকে অন্য পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। গত যুদ্ধে বহু মার্কিন কাপড় কাচা, বাসন মাজা, রান্না করা, আরো পাঁচটা কাজ শিখে এসে বাড়িতে যখন দেখে স্ত্রী আনাড়ির মতো কাজ করছে, তখন তারা অগ্রপশ্চাত্ বিবেচনা না করে বাতলে দেয়, কিভাবে কর্মগুলো সুষ্ঠুরূপে করতে হয়। ফলে বউরা তাদের খাটিয়ে মারতে শুরু করে। সেটা পরের পুরুষেও সংক্রামিত হয়। হালে যখন মার্কিন দেশে প্রস্তাব পাড়া হয়, ওভার প্রডাকশন হচ্ছে বলে সক্কলকে হপ্তায় দুদিন করে ছুটি দেওয়া হবে, তখন বিস্তর মার্কিন তারস্বরে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, ‘বউরা খাটিয়ে মারবে। তার চেয়ে আপিসের কলম পেষা ঢের ভালো।’ এরা বলে, নিগ্রো-দাসত্ব উঠে যাওয়ার পর এটা নাকি এক নতুন ধবল-দাসত্ব।]

কমিউনিস্ট দেশে নাকি রাজনৈতিক কারণের গ্রেপ্তারি হয় অতি ভোরবেলা—এ দেশে যে রকম ১৯৪৭-এর আগে হতো, আর হিটলারি জর্মনিতে তো নিজে দেখেছি। এ ব্যাপার নিয়ে নাকি ঠাট্টা-মসকরা খুব বেশি বরদাস্ত করা হয় না।

ভোর ৫টার সময় বাড়িওয়ালা ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ঘণ্টা বাজিয়ে মৃদুকণ্ঠে বলছে, ‘কমরেড, অযথা ভয় পাবেন না। আমি শুধু বলতে এসেছি, বাড়িতে আগুন লেগেছে মাত্র।’ কিংবা ‘কী বললে? ইভান ইভানোভিচ মারা গিয়েছে? কই, আমি তো তার গ্রেপ্তার হওয়ার খবরটা পর্যন্ত পাইনি।’ কিংবা খবরের কাগজে শোকসংবাদ কলমে পিতা-মাতা প্রকাশ করলেন, ‘আমাদের স্বর্গস্থ সৃষ্টিকর্তা তাঁর অসীম করুণায় আমাদের কন্যাকে কল্যাণতর লোকে নিয়ে গিয়েছেন।’ আপন সোশ্যালিস্ট দেশকে অপমান করার জন্য দুজনাই পরের দিন গ্রেপ্তার হন।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক রসিকতাই সবচেয়ে বেশি আদর পায়। পূর্বেই প্রাভদা প্রসঙ্গে তার একটি নিবেদন করেছি। এগুলো সচরাচর তৈরি হয় কতকগুলো বিশেষ বিষয়বস্তু নিয়ে; পার্টির দুর্নীতি, বড়কর্তাদের বিলাস ব্যসন (হালে চীনও খ্রশ্চফকে গালাগাল দিয়েছে এই বলে যে তাঁর দুখানা আপন মোটরগাড়ি আছে), ধর্মবিশ্বাসে অসহিষ্ণুতা, স্বাধীন-চিন্তার নিপীড়ন, চাষাদের বেগার খাটানো, উপরাষ্ট্র-ধর্ষণ ইত্যাদি। যারা কম্যুনিজমে বিশ্বাস করে না কিংবা কম্যুনিস্টদের কার্যকলাপে দুর্নীতি সহ্য করতে পারে না, তাদের আত্মাভিমান রক্ষা করার একমাত্র উপায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শরণ নেওয়া।

এক কয়েদি আরেক কয়েদিকে, ‘তোর কি মাথা খারাপ? আদালতে কেন স্বীকার করলি, কালোবাজারে চিনি কিনেছিস?’

দ্বিতীয় কয়েদি, ‘কী করি বল। সরকারপক্ষের উকিলই যে আমাকে চিনি বেচেছিল।’

কিংবা শিক্ষামন্ত্রীকে ‘পাগল’ বলার অপরাধে একজনের কুড়ি বছরের জেল হয়। পাঁচ বছর হয় সরকারি কর্মচারীকে অপমান করার জন্য, বাকি ১৫ বছর রাষ্ট্রের গোপন খবর প্রকাশ করে দেওয়ার জন্য। কিংবা

রুশ কর্মী কথায় কথায় বললে, ‘আমি সবচেয়ে ভালোবাসি কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বারদের জন্য কাজ করতে।’

সরকারি কর্মচারী প্রশংসা করে বললেন, ‘বড় আনন্দের কথা। তা, আপনি কী কাজ করেন?’

‘আজ্ঞে আমি গোর খুঁড়ি।’

কিংবা চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে প্রাপ্ত—

খবরের কাগজের হকাররা রাস্তায় চেঁচাচ্ছে, ‘রুশেরা চাঁদে পৌঁছে গেছে, রুশেরা চাঁদে পৌঁছে গেছে।’ রাস্তায় একাধিক উল্লসিত কণ্ঠস্বর, ‘সবাই? সবাই?’

কিংবা, ট্রামগাড়ির কন্ডাক্টর—‘এগিয়ে চলুন, মশাইরা, এগিয়ে চলুন।’

“আমরা ‘মশাইরা’ নই, আমরা কমরেড।”

‘মসকরা ছাড়ুন। কমরেডরা ট্রামগাড়ি চড়েন না, তাঁরা চড়েন আপন আপন মোটরগাড়ি।

কিন্তু আগেই বলেছি, এসব রসিকতা করতে হয় টাপেটোপে নিতান্ত আপনজনের মাঝখানে। নইলে—

তিন বৃদ্ধ পার্কের বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে। তার মধ্যে দুজনা ওয়াক্ থুঃ ওয়াক্ থুঃ বলে থুথু ফেলছে। তৃতীয়জন বললেন, ‘দয়া করে কোনো প্রকারের রাজনৈতিক আলোচনা আরম্ভ করবেন না। নইলে আমাকে গোয়েন্দা বিভাগে খবর দিতে হবে।’

ইংরেজিতে বলে, ‘নীরবতা হিরণ্ময়।’

ইহুদিরা আসলে প্রাচ্যদেশীয় বলে বহু শত বছর ইউরোপে থাকার পরও তাদের রসিকতায় বিদ্রূপ ও তিক্ততা থাকে অনেক বেশি। ওদিকে হিটলার যে রকম একদা ইহুদিদের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, তার দশ ভাগের এক ভাগ না হলেও কমিউনিস্ট দেশে ইহুদি নির্যাতন আরম্ভ হয়ে গিয়েছে—অনেক দিন। ইহুদিরাও বাধ্য হয়ে বাইরের দিক দিয়ে যত দূর সম্ভব গা বাঁচিয়ে চলেও ‘অন্তরে অন্তরে অন্তরীণ’ হয়ে থাকে।

‘চতুর পোলিশ ইহুদি মূর্খ পোলিশ ইহুদির সঙ্গে কিভাবে আলাপ করে?’

‘নিউ ইয়র্ক থেকে, টেলিফোনযোগে।’ কিংবা,

সরকারি কর্মচারী ইহুদিকে বললেন, ‘কমরেড লেভি, আপনি ফরমে লিখেছেন, আপনার কোনো আত্মীয় বিদেশে বসবাস করে না। ওদিকে আমরা খবর পেয়েছি, আপনার আপন ভাই ইসরায়েলে বাস করে।’

‘তা তো করেই। সে আছে আপন দেশে, আমিই তো আছি বিদেশে।’

সবচেয়ে কম শুনতে পাওয়া যায় ‘বড় পাণ্ডাদের’ নিয়ে রসিকতা। তার কারণ উত্পীড়িতজনেরাও অতি অল্প দিনের অভিজ্ঞতায়ও বুঝে যায়, যাকে নিয়ে রসিকতা করা হয়, গৌণভাবে তারই বিজ্ঞাপন করা হয় মাত্র। এ কথাটা উভয়পক্ষই বিলক্ষণ জানে বলে হিটলারের দক্ষিণ হস্তস্বরূপ গ্যোরিঙ তাঁর সম্বন্ধে বাজারে রসিকতা চালু হওয়া মাত্রই সেটি সংগ্রহ করে রাখতেন এবং এ ধরনের রসিকতা নিজেই যে শুধু বলে বেড়াতেন তা-ই নয়, অন্য সবাইকেও নয়া নয়া রসিকতা বানাবার জন্য টুইয়ে দিতে কসুর করতেন না।

রুশ দেশও ব্যত্যয় নয়। তাই খ্রশ্চফ্ ইত্যাদিকে নিয়ে রসিকতার বাড়াবাড়ি নেই, তবু দু-একটি যা শুনতে পাওয়া যায়, সেগুলো উপাদেয়। তারই একটি দিয়ে শেষ করি।

শীর্ষ সম্মেলন শেষ করে নিকিতা খ্রশ্চফ্ ও পুলিশকর্তা (আসলে গোয়েন্দা বিভাগের সর্বাধ্যক্ষ) সাখারফ একসঙ্গে উড়োজাহাজে করে দেশে ফিরছেন। সাখারফ বললেন, ‘কেনেডির অলংকারগুলো লক্ষ্য করেছিলি? একদম সাচ্চা।’

নিকিতা বললেন, ‘না, কই, দে তো।’

মন্তব্য