kalerkantho

সুমনদের দিন-রাত্রি

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সুমনদের দিন-রাত্রি

এই সুমন, ওঠ তাড়াতাড়ি। এতবার ডাকেও ওঠে না ছেলে। রাতে কি চুরি করতে গেছিলি নাকি?

মায়ের চিত্কার, চেঁচামেচিতে কোনোমতে চোখ কচলে কচলে উঠে নিজের বিছানায় বসল সুমন। মোবাইলের ডিসপ্লে জ্বালিয়ে সময় দেখল। সকাল ৭টা ০৩। দেখেই মাথা গরম হয়ে গেল তার। ঘুমোতে গিয়েছে কাল রাতে সেই ২টার দিকে। তার মেজো খালামণি এসেছিল গতকাল। তাদের রাতে সিএনজি ঠিকঠাক করে দিয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে রাত ২টা। এখন আবার সকাল সকাল ডাকাডাকি। আজ এর একটা বিহিত করতে হবে, ভাবল সুমন। নিজের রুম থেকে বের হয়ে দেখল, বাবা পেপার পড়ছে আর মা বসে কী একটা তরকারি কাটছে।

‘কী ব্যাপার? হয়েছে কী তোমাদের?’ চেঁচাল সুমন।

‘কী আর হবে। পরোটা নিয়ে আয়। তোর বাবা নাশতা খাবে।’ সুমনের মা নির্লিপ্ত।

‘বলি, আমি তো একটা মানুষ। রাতে কয়টায় ঘুমিয়েছি দেখেছ? খালামণিকে গাড়ি-ফাড়ি ঠিক করে দিয়ে এসে ঘুমোতে ঘুমোতে রাত ২টা। তোমরা কী আমাকে ঠিকমতো ঘুমোতেও দেবে না?’

কেউ কোনো জবাব দিল না। খালি তার বাবা পেপারটা মুখের সামনে থেকে নামিয়ে বলল, ‘পরোটা দুই পাশ ভালো করে সেঁকে লাল করে আনিস।’

রাগে-দুঃখে কিছু বলল না সুমন। এলাকার পরোটার দোকানে গিয়ে দেখে, এই সকালেই বিশাল লাইন। এলাকার সবাইকে নুরুল হকের পরোটাই খেতে হবে, না হলে যেন কোষ্ঠ পরিষ্কার হবে না। লাইনে দাঁড়িয়ে কোনোভাবে পরোটা নিয়ে বাসায় এসে সে শুয়ে পড়ল। দেখে ঘুম পালিয়ে গেছে, সে আর আসে না। একটু পর উঠে মুখ-হাত ধুয়ে পড়তে বসে গেল। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা তার। সকাল ১০টার দিকে কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য বের হতেই তার মা বলল, ‘শোন, কোচিংয়ে যাওয়ার আগে গ্যাসের বিলটা দিয়ে আসিস।’

স্তব্ধ হয়ে গেল সুমন। ৯৯ রানে কোন ব্যাটসম্যান ক্লিন বোল্ড হয়ে গেলে যেমনটা হয়।

‘মা, আমার ১১টা থেকে কোচিং। এখন আবার বিল দিতে যাব কিভাবে?’

‘রিকশা করে চলে যা।’ তার বাবা পাশ থেকে বলল। এই ভদ্রলোকের ভাবসাব যেন সে ডেইলি ঘোড়ার গাড়ি করে যায়। 

‘ভাইয়া শোন, এই নোটগুলো দিবি আমার বান্ধবী শিল্পাকে।’ রুম থেকে বের হয়ে সুমনের ছোট বোন রুমী বলল।

‘কোনো শিল্পী-টিল্পীকে কিছু দিতে পারব না। থাপ্পড় খাইস না, সরে দাঁড়া।’

‘শিল্পী না তো, শিল্পা। পারবি না দিতে কেন?’

সুমন তার বোনের বাক্যচয়নে অবাক হয়ে তাকাল। এই মেয়ে সামনে এসএসসি দেবে। ইদানীং কথা বলে কবিতার মতো করে। যেখানে বলার কথা, ‘কেন দিতে পারবি না?’ সে বলবে, ‘পারবি না দিতে কেন?’

‘পারব না, কারণ আমি তোদের কাজের ছেলে না। পারব না, কারণ সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা। পারব না, কারণ সকাল থেকে অলরেডি অনেক কাজ করে ফেলছি। এখন আবার বিল দিয়ে তারপর ক্লাসে যাব।’

‘আরে ক্লাসের পরে দিলেই হবে। এমন করিস না, ভাই আমার লক্ষ্মী।’

আর কিছু বলল না সুমন। নোটগুলো নিয়ে নিল। এখানে দাঁড়িয়ে এই ভাষায় বেশিক্ষণ কথা চালালে মাথা ধরে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। বিল দিতে গিয়ে ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে গেল তার। ক্লাসে ঢোকার সময় স্যার বলল, ‘বাংলার শেষ নবাবের এত দেরি। খাজনার হিসাব-নিকাশ করে এলেন নাকি জাহাপনা?’ ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। এরপর ক্লাস শেষেই সে দৌড়াল তার বোনের নোটগুলো দিতে। তার

বোনের বান্ধবী শিল্পা নোটগুলো হাতে নিয়ে ভেতরের প্যাকেটটা ভালো করে দেখে বলল, ‘উপটানের প্যাকেটটা কই?’

‘কিসের প্যাকেট?’ অবাক সুমন।

‘একটা উপটানের প্যাকেট দেওয়ার কথা ছিল।’

‘কোনো টান-ফান কিছু দেয়নি আর।’ এই বলে বাসার দিকে গেল সুমন, তখন সন্ধ্যা ৭টা হয়ে গেছে। বাসায় গিয়ে পড়তে যখন বসেছে, তখন ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। হিসাববিজ্ঞানের অঙ্ক করতে গিয়ে দেখে ক্যালকুলেটর নেই।

‘আম্মা আমার ক্যালকুলেটর কোথায়?’

‘ড্রয়িংরুমে সোফার আশপাশে আছে কোথাও। কালকে তোর মেজো খালামণির ছেলে কান্না করতেছিল, তাকে খেলতে দিছি।’

‘মানে কী?’ ধৈর্যের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে গেল তার। ‘ওইটা কি খেলার জিনিস?’

সোফার নিচ থেকে ক্যালকুলেটর বের করতে যখন সোফার নিচে ঢুকেছে, তার বোন রুমী এসে বলল, ‘দেখ তো ভাইয়া, আমার একটা ক্লিপ পাচ্ছি না, সেই অনেক দিন ধরে। সোফার নিচে আছে কি না দেখ তো?’

সোফা থেকে ক্যালকুলেটর উদ্ধার করে দেখল, তার ডিসপ্লের এক পাশ ভেঙে গেছে।

‘রুমী তোর সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরটা দে তো।’

‘আরে পাগল নাকি। আমার ক্যালকুলেটর অনেক দামি আর আমার একটু পরেই করতে হবে অঙ্ক।’ এই বলে রুমী তার রুমে ঢুকে গেল। 

সেই ভাঙা ক্যালকুলেটর আর এত সব ঝামেলার মধ্য থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিল সুমন। পেল জিপিএ ৪.২৫। আর ওদিকে তার বোন সেবার এসএসসিতে পেল গোল্ডেন ফাইভ।

আবার রেজাল্টের পরদিন পত্রিকায় একটা খবর পড়ছিল সুমন। পড়ালেখায় এবারও ছেলেদের থেকে এগিয়ে মেয়েরা। এ সময় তার মা ভেতর থেকে বলল, ‘সুমন, ময়লার বালতিটা একটু নিচে নামিয়ে দে, ময়লার গাড়ি আসছে।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল সুমন। আকাশটা আজ এত

নীল কেন?

মন্তব্য