kalerkantho

নির্বাচনের প্রস্তুতি

সত্যজিৎ বিশ্বাস

২০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নির্বাচনের প্রস্তুতি

বন্ধু-বান্ধবদের দেওয়া বিপুল উত্সাহ আর পরিচিত অনেকের মনোনয়ন ফরম কেনা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না আদনান সাহেব। গলায় মালা পরে মনোনয়ন ফরম কেনামাত্রই বন্ধুরা স্লোগান তুলল— 

সজাগ করো সবার কান,

এমপি এবার আদনান।

এলাকার সম্মান,

হাফনান, আদনান।  

বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেল আদনান সাহেবের।

নিজের এলাকায় সাধারণত যাওয়া হয় না বলে এলাকার ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন কাল্লু মিয়াকে ঢাকায় ডাকলেন। মানুষ একাই ১০০ পর্যন্ত হতে পারে, কাল্লু মিয়া একাই হাজার। কাল্লু মিয়ার সঙ্গে সংলাপে বসে খুলে বললেন মূল সমস্যার কথা, ‘আমি জীবনেও কোনো বক্তৃতা দিইনি। মাইক দেখলেই পা কাঁপে। কোনো বক্তৃতা ছাড়া আমাকে পাস করিয়ে আনতে হবে।’

পেটভর্তি খেয়ে আর পকেটভর্তি নিয়ে কাল্লু মিয়া ওয়াদা করলেন, ‘কোনো টেনশন নিয়েন না, আজ থেকে শুরু করে এমপি না হওয়া পর্যন্ত আমার ঘুম হারাম। আগামী এক সপ্তাহ নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। এলাকায় পরিচিতি ও বিশাল কর্মসূচির প্ল্যান করেই আপনাকে ডাকব।’      

যেমন কথা তেমন কাজ। ঠিক এক সপ্তাহ পরে কাল্লু মিয়ার কাছ থেকে ফোন এলো, ‘আগামীকাল ট্যাড়া বাবুরে পাঠাইতেছি, ওর সঙ্গে আইসা পড়েন।’

আদনান সাহেব মুগ্ধ হয়ে গেলেন কথার সঙ্গে কাজের এত মিল দেখে।

ট্যাড়া বাবুর সঙ্গে এলাকায় পৌঁছে দেখলেন, সামনেই খোলা মাঠে একটা স্টেজ ঠিক করা হয়েছে। পাশে একটা প্যান্ডেল। স্টেজের ওপর ভয়ানক ব্যস্ত ভঙ্গিতে লুঙ্গি পরে ঘোরাফেরা করছে কয়েক যুবক। একজন মাইক হাতে বারবার হ্যালো ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর বলে যাচ্ছে। খুব সম্ভব এর চেয়ে বেশি আর গুনতে পারে না। কোনোভাবেই ফাইভ, সিক্স, সেভেন পর্যন্ত উঠছে না। আদনান সাহেবকে দেখে কাল্লু মিয়া ছুটে এসে স্টেজে রাখা দুটি চেয়ারের একটিতে বসিয়ে দিলেন। তারপর মাইকের সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে ইশারা দিতেই ছেলেটি পকেট থেকে কাগজ বের করে পড়া শুরু করে দিল—‘ভাইসব, আমাদের এলাকার গর্ভ, জনদরজি, গরিবের বন্দু, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জনাব আদনান সাহেব আমাদের মধ্যে এসে পড়েছেন। আপনারা দলে দলে যোগদান করুন। আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেলে কিন্তু আর কাউকে অনুষ্ঠানে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’  

ভুল উচ্চারণে মনে মনে যথেষ্ট বিরক্ত হলেও আদনান সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন, ছেলেটার কথায় যেন জাদু আছে। ঘোষণার আগে ১০, ১৫ জন বসা ছিল। অথচ ঘোষণার পর মানুষের সেকি ভিড়। এরা এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে ছিল কে জানে?

আবার ঘোষণা এলো, এবার আমাদের হবু এমপি সাহেবকে দোয়া করতে আসবেন পাঁচ গ্রামের সবার মুরব্বি আঠালি দাদু।

আদনান সাহেব হাঁ হয়ে দেখলেন, মঞ্চে একজন ঘাটের মড়াকে কোলে করে নিয়ে এসে তার পাশে বসিয়ে দেওয়া হলো। পুরো ‘দ’ হয়ে যাওয়া একটা দেহ। সব সময় কাঁপছে থরথর করে। আদনান সাহেবের ভয় করতে লাগল, কোন সময় না পাশে বসেই টেসে যায়। পরে তো থানা-পুলিশের কেস। মহাবিরক্তির চোখে কাল্লু মিয়াকে খুঁজতে লাগলেন। 

ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা এলো, ‘আঠালি দাদু এবার ফুলের মালা পড়িয়ে দেবেন আমাদের এলাকার গর্ভকে।’

একজন দৌড়ে একটা গাঁদা ফুলের মালা নিয়ে এসে দাদুর হাতে ধরিয়ে দিল। দাদু কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আদনান সাহেব আর রিক্স নিলেন না। দাদুকে বসিয়েই মালায় গলা ঢুকিয়ে দিলেন। চারদিকে হাততালি পড়তে থাকল পাইকারি হারে।            

মাইক আবার গর্জে উঠল, ‘ভাই সব এবার মূল অনুষ্ঠান। এবার গরিবদের বস্ত্রহরণ করবে আমাদের এলাকার গরিবের বন্দু, আগামী দিনের এমপি আদনান সাহেব।’

বিপুল হাততালির সঙ্গে এবার শুরু হয়ে গেল ফিসফাস। আদনান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভ্রু কুঁচকে কাল্লু মিয়াকে ডাকলেন, ‘বস্ত্রহরণ মানে? এটা আবার কী?’

কাল্লু মিয়া উল্টো ঝাড়ি মেরে বললেন, ‘বারবার এত ডাকাডাকি কিসের? আমি একা কয় দিক সামলাব?’ আদনান সাহেব থতমত খেয়ে বললেন, ‘তা ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে আমি এখন গরিবদের বস্ত্রহরণ করব?’

‘করবেনই তো। কোনো কথাও বলবেন না, কিছু দেবেনও না, তাহলে ওরা আপনাকে ভোট দেবে কেন? তা ছাড়া টাকাগুলো দিয়েছেন কেন? ওদের কিছু দেওয়ার জন্যই তো।’

কাল্লু মিয়ার কথা এতক্ষণে বুঝতে পারলেন আদনান সাহেব। ও আচ্ছা, বস্ত্র বিতরণ? তো সে কথা না বলে বস্ত্রহরণ বলছে কেন ছেলেটা?

‘ওই হলো, এখন আসুন তো, শুরু করুন’ বলে দৌড়ে আরেক দিকে ছুটে গেল কাল্লু মিয়া।

মাইকে আবার অ্যানাউন্স শুরু হয়ে গেল, আমাদের নেতা মুখের কথায় বিশ্বাস করে না, উনি কাজে বিশ্বাসী। এখন এক এক করে সবাই লাইনে আসুন, নেতা আপনাদের শীতবস্ত্রহরণ করবেন।

এত মানুষের ভিড়ের কারণ এবার পরিষ্কার হয়ে গেল আদনান সাহেবের কাছে। তবে যা-ই হোক, কাল্লু মিয়া কাজের লোক, মানতেই হবে। এই শীতে সবাইকে একটা একটা করে কম্বল বিতরণের আইডিয়াটা দুর্দান্ত।

আদনান সাহেব একটা একটা করে কম্বল দিচ্ছেন, তালির পর তালি পড়ছে। শখানেক দেওয়ার পর আদনান সাহেবের জিব বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা হলো। তবু থামার উপায় নেই, লোকের বিশাল লাইন। আড়াই শ খানা বিতরণের পর যখন মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাচ্ছেন, মাইকে শুনলেন—আমাদের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব ঘণ্টাখানেক পর।

মন্তব্য