kalerkantho

শনিবার । ২ জুলাই ২০২২ । ১৮ আষাঢ় ১৪২৯ । ২ জিলহজ ১৪৪৩

উ প ন্যা স

শ্লীলতাহানির পর

সিজার বাগচী

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯৭ মিনিটে



শ্লীলতাহানির পর

অঙ্কন : নিয়াজ চৌধুরী তুলি

সুকোমলবাবু পেছন থেকে এসে শ্রাবন্তীকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর নাক ঘষতে লাগলেন ওর ঘাড়ে। আচমকা এমন ঘটনার জেরে হকচকিয়ে গেল শ্রাবন্তী। কী করবে ভেবে পেল না।

বিজ্ঞাপন

সুকোমলবাবু যে ওর অফিসের বস!

শুধু শ্রাবন্তী একা নয়, এই অফিসে সুকোমলবাবুর অধীনে রয়েছে প্রায় ৩০ জন স্টাফ। এই অ্যাকাউন্টস সেকশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তিনি। ইনক্রিমেন্ট থেকে প্রমোশন—সব তাঁর হাতে। সেই মানুষটার রুমে একটা ফাইল নিয়ে এসেছে শ্রাবন্তী। জরুরি ফাইল। প্রায় ২৫ লাখ টাকার একটা পেমেন্ট আটকে আছে ছয় মাস ধরে। বিলে প্রচুর গণ্ডগোল ছিল। সেসব ধরে ধরে ওকে ঠিক করতে হয়েছে। সেই কাজে সুকোমলবাবু আগাগোড়া গাইড করেছেন। যেমন তিনি করে থাকেন। সব ঠিক হওয়ার পর প্রিন্ট আউট নিয়ে ও হাজির হয়েছে সুকোমলবাবুর রুমে।

তবে দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকে ও একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। সুকোমলবাবু সদ্য দুপুরের খাওয়া শেষ করেছেন। আগে অফিস ক্যান্টিনে খেতেন। জন্ডিস হওয়ার পর বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসেন। শ্রাবন্তী যখন ঢুকল, তখন মাছের কাঁটা আর ডাঁটার ছিবড়ে ছাড়া পুরো থালা সাফ। তবু ও বেরিয়ে যাচ্ছিল। সেটাই ভদ্রতা।

সুকোমলবাবু আটকালেন। বললেন, ‘এসো, এসো। আমার খাওয়া শেষ। এক মিনিট দাও। হাতটা ধুয়ে নিই। ’

টেবিল থেকে থালা তুলে তিনি রুমের এক পাশে নামিয়ে রাখলেন। তারপর ঘরের কোণের বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে লাগলেন। শ্রাবন্তী তখনো চেয়ারে বসেনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রিন্ট আউটের পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিল। কোথাও গোলমাল রয়ে যায়নি তো? ওর কানে আসছিল সুকোমলবাবুর কুলকুচির শব্দ।

একসময় ছোট্ট একটা ভুল নজরে পড়ল ওর। টাইপিং এরর। তখন টেবিলে কাগজগুলো রেখে নিচু হয়ে ডটপেন দিয়ে সেটা ও ঠিক করল। সেই কাজ করতে গিয়ে সুকোমলবাবুর দিকে খেয়াল রাখতে পারেনি। তা ছাড়া খেয়াল রাখারও তো কিছু নেই। তিনি মুখ ধুয়ে তোয়ালেতে হাত মুছে এসে সই করে দেবেন। ব্যস, এইটুকু।

কাজে অল্প তন্ময় হয়েছিল শ্রাবন্তী। হঠাৎ পেছন থেকে ময়াল সাপের মতো দুটো কালো রোমশ হাত এসে পেঁচিয়ে ধরল। নাকে ঝাপটা দিল আঁশটে গন্ধ। সেই গন্ধ ছাপিয়ে এক গা ঘিনঘিনে অনুভূতি সারা শরীরে চারিয়ে গেল, যখন লোকটা ওর কাঁধে নাক ঘষতে শুরু করল।

সুকোমলবাবু ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘রোজ শাড়ি পরে আসো না কেন?’

দুই হাতে চেপে ধরলে কোনো পায়রা যেভাবে ডানা ঝাপটায়, সেভাবে শ্রাবন্তী নিজের শরীর ঝাড়া দিল। সোজা হওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘কী করছেন! ছাড়ুন। ’

দাপুটে বস হিসেবে সুকোমল সেনগুপ্তকে সারা অফিস চেনে। সেটা চেহারায়ও স্পষ্ট। ভারী গড়ন। গায়ের রং সিনেমা হলের অন্ধকারের মতো কালো। মাথার মাঝখানে গোল টাক। তার চারপাশে গ্যালারির মতো কাঁচা-পাকা চুল। কোনো দিন পারফিউম মাখেন না। তাই শরীরে সব সময় বোঁটকা গন্ধ। এমন মানুষ যদি চেপে ধরে, দম তো আটকে আসবেই।

তবু শরীরের সব শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করল শ্রাবন্তী। বলল, ‘আমি কিন্তু চিৎকার করব। সবাই এসে পড়বে। ’

কিন্তু সুকোমলবাবু সেই শাসানিকে তেমন আমল দিলেন না। শ্রাবন্তীর একমুহূর্তের জন্য মনে হলো, ভদ্রলোক নিশ্চয়ই আগেও অনেক মেয়ের সঙ্গে এমনটাই করেছেন এবং সেই মেয়েরা মুখে যতই তড়পাক, শেষে নিজেকে সমর্পণ করেছে। তাই ওর হুমকিকে ভদ্রলোক একেবারেই পাত্তা দিচ্ছেন না। তিনি যেন জানেন, শ্রাবন্তী পায়রার মতো ধড়ফড় করবে, কিন্তু ঠোকরাবে না।

বরং শ্রাবন্তী যখন নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ধস্তাধস্তি করছিল সুকোমলবাবু ফের ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘একদিন মন্দারমণি চলো। উইকএন্ডে। সামনের শুক্রবার বউ যাবে তারাপীঠে পুজো দিতে। তখনই...’

কিন্তু সেই কথার মাঝখানে শ্রাবন্তী একঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। সোজা ঘুরে দাঁড়াল সুকোমলবাবুর মুখোমুখি। সুকোমলবাবুর মুখে মুচকি হাসি। চোখ ঘুরছে শ্রাবন্তীর সারা শরীরে। সেই চাহনি অসহ্য। নিজেকে সামলাতে পারল না শ্রাবন্তী। সপাটে দুটো চড় কষিয়ে দিল সুকোমলবাবুর গালে।

মারটা জোরেই হলো। সুকোমলবাবুর কালো গালে ওর তিন আঙুলের দাগ ফুটে উঠল। তার পরও শ্রাবন্তী থামল না। চিতা বাঘের মতো জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকল। ওর ইচ্ছে করছিল, লোকটাকে খুন করে ফেলে।

শ্রাবন্তী যে চড় মারতে পারে, সুকোমলবাবু ভাবেননি। একমুহূর্তের জন্য তিনি থমকে গেলেন। চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি। তিনি এই দপ্তরের শেষকথা। চড় তো দূর-অস্ত, এখানে কেউ তাঁর চোখের দিকে কড়া করে তাকানোর হিম্মত রাখে না। অথচ একটা অ্যাকাউন্ট্যান্ট মহিলা কিনা গায়ে হাত তুলল সুকোমল সেনগুপ্তের!

চোয়াল শক্ত করে সুকোমলবাবু এবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন শ্রাবন্তীর ওপর। দুই হাত দিয়ে আটকাতে চেয়েও শ্রাবন্তী পেরে উঠল না।

হিসহিসে গলায় সুকোমলবাবু বললেন, ‘একদম চুপ। একটা শব্দ মুখ থেকে বেরোলে চাকরি নট করে দেব। ’

শ্রাবন্তী তবু বশে এলো না। দুই হাত দিয়ে লোকটাকে দূরে ঠেলতে ঠেলতে চিৎকার করে উঠল, ‘কী করছেন! আমাকে ছাড়ুন। হেল্প হেল্প...’

শেষ চিৎকারটা খুব জোরেই হয়েছিল। সেই চিৎকারের জেরে অহনা ও চিরঞ্জিত হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকে পড়ল। সুকোমলবাবু এতটা আশা করেননি। দুজনকে ওভাবে ঢুকতে দেখে তিনি এমন ভেবলে গেলেন যে শ্রাবন্তীকে ছাড়তে পর্যন্ত ভুলে গেলেন।

অন্যদিকে দুজন রুমে ঢুকে সুকোমলবাবু ও শ্রাবন্তীকে ওই অবস্থায় দেখে শুধু অবাক নয়, অপ্রস্তুতও হয়ে পড়ল। এমন কাণ্ড যে রুমের ভেতর চলছে দুজন আন্দাজ করতে পারেনি। শুধু ওই দুজন নয়, পেছন পেছন এসে ঢুকল অভিজিৎ-সুনন্দও; এবং রুমে ঢুকে সবাই স্থির। চুপ। কারো মুখে কোনো কথা বেরোচ্ছিল না। সুকোমলবাবুর মাথাও কেমন নিচু হয়ে গেল।

শ্রাবন্তী নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজের মুখ ঢাকল একবার। তারপর ফুঁসে উঠল। বলল, ‘আপনার মতো নোংরা, ইতর আমি দুটো দেখিনি। সারা অফিস দেখল আপনি নিজের সাবোর্ডিনেটের সঙ্গে কী করেছেন!’

সবাই তখনো চুপ। সুকোমলবাবুর মুখের অন্ধকার আরো ঘন হলো। বাকিদের চেহারায় হালকা অস্বস্তি।

শ্রাবন্তী চিৎকার করে বলেই চলল, ‘আমি পুলিশে যাব। কমপ্লেইন করব আপনার বিরুদ্ধে। ’

এবার এগিয়ে এলো অহনা। শ্রাবন্তীর দুই কাঁধ চেপে ধরে বলল, ‘শান্ত হ। জল খা। ’

অহনার গলায় এমন কিছু ছিল যে শ্রাবন্তীর রাগ ধাক্কা খেল। তার বদলে ওর ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান বেরিয়ে এলো চোখের জল হয়ে। অহনার কাঁধে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে ফেলল শ্রাবন্তী। ধীরে ধীরে ওর মাথায় হাত বোলাতে লাগল অহনা। বাকিরা কে কী করবে, ভেবে পাচ্ছিল না।

অহনাই শেষ পর্যন্ত শ্রাবন্তীকে রুমের বাইরে আনল। চেয়ারে বসাল। জলের গ্লাস এগিয়ে দিল। জলে অল্প চুমুক দিয়ে সামান্য ধাতস্থ হলো শ্রাবন্তী। তার পরই ওর পুরনো রাগ ফিরে এলো। এত বড় অপমান ওকে সারা জীবনে কখনো পেতে হয়নি।

বাসে কিংবা মেট্রো রেলে কেউ কেউ শরীরে হালকা হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেটা এমন কিছু নয়। শ্রাবন্তীকে ছোটবেলা থেকে মা শিখিয়েছিল কিভাবে এসব পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিয়ে চলতে হয়। কিন্তু আজকের ঘটনা সব প্রতিরোধ ভেঙে দিয়েছে। জলের গ্লাস নামিয়ে রেখে শ্রাবন্তী উঠে দাঁড়াল। মেয়েদের বাথরুমে গিয়ে মুখে-ঘাড়ে জল দিল। ঘাড়ে জল দিতে গিয়ে ও টের পেল খানিক আগে এই জায়গায় নাক ঘষেছেন সুকোমলবাবু। কথাটা মনে পড়তেই ও হড়হড় করে বমি করে ফেলল।

কিছুক্ষণ বাথরুমে দাঁড়িয়ে থেকে শ্রাবন্তী শরীর-মন শান্ত করল। তারপর মুখটা ধুয়ে বেরিয়ে এলো। সাইড ব্যাগ নিয়ে হনহন করে বাইরের দিকে হাঁটা দিল।

অহনা এতক্ষণ চুপচাপ ওকে জরিপ করছিল। দৌড়ে এসে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’

শ্রাবন্তী ততক্ষণে লিফটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। অহনার দিকে একঝলক তাকিয়ে বলল, ‘থানায়। ’

         

দুই.

আগে কখনো থানায় আসেনি শ্রাবন্তী। অবশ্য অনেকবার থানার সামনে দিয়ে যাতায়াত করেছে। থানা সম্পর্কে ওর ধারণা গল্পের বই পড়ে আর ছবি দেখে। ঝোঁকের মাথায় অফিস থেকে বেরিয়ে ও যখন থানার সামনে এলো, তখন মনে হালকা আড়ষ্টতা। পুলিশকে কে না ভয় পায়! পুলিশ বাঘের চেয়েও ভয়ংকর।

তবু মনে জোর আনল শ্রাবন্তী। ভাস্করের সঙ্গে ডিভোর্সের আগে তো কখনো আদালত চত্বরেও যায়নি। সেদিন তো গিয়েছিল! তাহলে? সেদিন অবশ্য সঙ্গে আইনজীবী ছিলেন। বাবা ছিলেন। আজ শ্রাবন্তী একা এবং প্রায় হুট করেই এসে হাজির হয়েছে।

শ্রাবন্তীর একবার মনে হলো, আগে কোনো আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে নেওয়া দরকার। তাঁরা এই ধরনের কেসে আইনি প্যাঁচ দিয়ে বয়ান লিখতে পারেন, কিন্তু থানার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো ক্রিমিনাল লইয়ারের নাম স্মরণে এলো না ওর। বরং শ্রাবন্তী ভেবে দেখল, আইনজীবী খুঁজতে দেরি হয়ে যাবে। কে বলতে পারে, সেই সুযোগে সুকোমলবাবু হয়তো নতুন কোনো চাল দিয়ে বসলেন। ফাস্ট মুভার অ্যাডভান্টেজ বলে ইংরেজিতে একটা কথা আছে। ও যদি আগে গিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ লেখাতে পারে, তাহলে সুবিধা পাবে। তারপর না হয় কোনো আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যাবে।

সেসব ভেবে যাবতীয় আড়ষ্টতা ঝেড়ে শ্রাবন্তী থানার গেট পেরিয়ে ঢুকল। গেটের পর অনেকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে পর পর পুলিশের গাড়ি দাঁড় করানো। কালো প্রিজন ভ্যানও চোখে পড়ল। জানালাগুলো জাল দিয়ে ঘেরা। এ ধরনের গাড়ি দেখলে ওর বুক ছমছম করে ওঠে।

সেসব গাড়ি পেরিয়ে তিন ধাপ সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা ঘর। সেখানে দুটি বড় টেবিল। এক ধারে কয়েকটা বেঞ্চ। সেই বেঞ্চে লোফার চেহারার চারজন বসা। একজন অফিসার সেই চারজনের সামনে দাঁড়িয়ে তড়পাচ্ছেন।

শ্রাবন্তী অস্বস্তির মধ্যে পড়ল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। এমন সময় এক কনস্টেবল এগিয়ে এলো। বলল, ‘কোনো দরকার?’

শ্রাবন্তী মাথা নাড়ল। বলল, ‘একটা এফআইআর লেখাব। ’

কনস্টেবল একটা টেবিল দেখিয়ে বলল, ‘ওখানে চলে যান। থানার ডিউটি অফিসার বসে আছেন। কথা বলুন। ’

শ্রাবন্তী এগিয়ে গেল সেই টেবিলের দিকে। ডিউটি অফিসার ভদ্রলোকের বেশি বয়স নয়। বছর পঁয়ত্রিশের আশপাশে। মাথায় ঘন চুল। নাকের নিচে স্মার্ট গোঁফ। চোখ দুটো ধারালো। চেহারায় সৌম্য ভাব।

শ্রাবন্তীকে দেখে বললেন, ‘বসুন। কী হয়েছে?’

টেবিলের উল্টো দিকের একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে শ্রাবন্তী বসল। বলল, ‘আমার অফিসের বসের নামে এফআইআর করব। শ্লীলতাহানির অভিযোগ। ’

একনিঃশ্বাসে কথাগুলো উচ্চারণ করে ও দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

অফিসার ভদ্রলোক ওকে মাপলেন। বললেন, ‘আপনার নাম?’

‘শ্রাবন্তী রায়। ’

‘কী করেন?’

‘চাকরি। ’

‘কোথায়?’

‘ভাগ্যলক্ষ্মী স্টিল প্লান্টের হেড অফিসে। অ্যাকাউন্টস সেকশনে আছি। ’

‘কী হয়েছে, গুছিয়ে বলুন তো?’

এবার থমকে গেল শ্রাবন্তী। গুছিয়ে বলুন মানে তো সব কথা বলতে হবে। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। শ্রাবন্তীর চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরো ঘটনা। শরীর আবার গুলিয়ে উঠল।

অফিসার আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ফোন এলো তাঁর মোবাইলে। তিনি কথা বলতে থাকলেন। বোধ হয় ওই চারজন সম্পর্কে জানতে কেউ ফোন করেছেন। শ্রাবন্তী চুপ করে গেল।

এমন সময় একজন এসে অফিসারের সামনে চায়ের কাপ রাখল। ভদ্রলোক ফোনে কথা বলতে বলতেই ইশারায় শ্রাবন্তীকে দেখালেন। লোকটা ফের গিয়ে আরেক কাপ চা এনে শ্রাবন্তীকে দিল। অন্য সময় হলে চা খেতে রাজি হতো না শ্রাবন্তী। দুধ চা খাওয়া ও বহুদিন ছেড়ে দিয়েছে। আজ পারল না। বরং চা-টাই ওকে স্বস্তি দিল। চায়ে চুমুক দিয়ে মনের অস্বস্তি কাটিয়ে উঠল।

অফিসারের ফোন শেষ। মোবাইল টেবিলে রেখে তিনি চায়ের কাপ টেনে বললেন, ‘বলুন। কোনো ডিটেল মিস করবেন না। ’

শ্রাবন্তী তা-ও সহজভাবে বলতে পারল না।

এবার অফিসার ঝুঁকে এলেন ওর দিকে। বললেন, ‘দেখুন, এটা পুলিশ স্টেশন। আপনি এসেছেন কমপ্লেইন লেখাতে, কিন্তু আপনি যদি সব কথা ঠিক ঠিক না বলেন, তাহলে কিন্তু পুলিশ কমপ্লেইন নেবে না। অ্যাকশনও নেবে না মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। ’

মাথা হেঁট করে বসে থাকল শ্রাবন্তী।

ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিলেন। বললেন, ‘ভালো করে ভাবুন। আদৌ কমপ্লেইন লেখাবেন তো? কারণ এরপর বিষয়টা কোর্টে উঠবে। তখন বিরুদ্ধপক্ষের উকিল আপনাকে জেরা করবেন। সেটা হবে সবার সামনে। হ্যান্ডেল করতে পারবেন?’

‘পারব’, মাথা তুলে বলল শ্রাবন্তী। তারপর একটু একটু করে অফিসে যা যা ঘটেছে সব বলতে থাকল ওই অফিসারকে।

শ্রাবন্তী থামার পর অফিসার জানতে চাইলেন, ‘পরিবারে কে কে আছে?’

‘আমার ছেলে রন আর আমি। ’

‘আপনার হাজব্যান্ড?’

‘আমি ডিভোর্সি। ’

‘একাই থাকেন?’

‘হ্যাঁ। ’

‘কোথায়?’

‘সুইস পার্ক নার্সিংহোমের কাছে। ’

‘ফ্ল্যাট না বাড়ি?’

‘ভাড়ার ফ্ল্যাট। ’

‘আপনার নিজের পরিবার? আই মিন, বাপের বাড়ি?’

‘আমরা দুর্গাপুরের লোক। এখনো বাবা আর ভাই দুর্গাপুরে থাকে। ’

‘আপনার মা?’

‘মারা গেছেন। বছর পাঁচেক। ’

‘আপনার ডিভোর্স হয়েছে কত বছর?’

‘বছর পাঁচেকের মতোই। ’

‘আপনার ভাই কী করেন?’

এবার বিরক্ত হলো শ্রাবন্তী। পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘সেটার সঙ্গে এই কেসের কী সম্পর্ক?’

‘সব সম্পর্ক কি সোজা রাস্তায় হাঁটে?’ অফিসার হেসে বললেন, ‘কী করেন আপনার ভাই?’

‘ওখানে ওর ছোটখাটো ব্যবসা আছে। ’

অফিসার ফের চায়ে চুমুক দিলেন। বললেন, ‘আপনার কথা থেকে যা বুঝলাম, আপনি একা থাকেন। সঙ্গে ছেলে। নিজের বাড়ি নেই। চাকরিও করেন বেসরকারি অফিসে। তাইতো?’

শ্রাবন্তী কোনো জবাব দিল না। অপলক তাকিয়ে থাকল। লোকটা পুরো বিষয়টা কোন দিকে নিয়ে যেতে চাইছে, সেটা আন্দাজ করতে চাইল।

অফিসার বললেন, ‘আপনাদের অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই?’

‘আছে। তবে টয়লেট আর সুকোমলবাবুর ঘরে নেই। ’

‘তার মানে কোনো এভিডেন্স নেই। ’

‘যে কলিগরা ছুটে এসেছিল তারা সাক্ষ্য দেবে। ’

অফিসার হাসলেন। বললেন, ‘শুধু সেইটুকু!’

‘বিশাখা গাইডলাইন অনুযায়ী, কিন্তু আইন আমার পক্ষে,’ শ্রাবন্তী ইচ্ছা করেই কথাটা বলল। অফিসার যেন ধরে না নেন, আইনের ব্যাপারে ও একেবারে নভিস।

মাথা নাড়লেন অফিসার। বললেন, ‘অ্যাবসলিউটলি। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মুশকিল কী জানেন, আইন প্রমাণ চায়। আমাদের দেশের অর্ধেক অপরাধী প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস হয়ে ড্যাং ড্যাং করে বেরিয়ে যায়। কত খুন, ধর্ষণের কেসে এই কাণ্ড হচ্ছে। ’

‘আপনি কি এফআইআর নেবেন না?’ শ্রাবন্তী সরাসরি প্রশ্ন করল।

‘আপনি বললে নেব,’ অফিসার বললেন, ‘কিন্তু আমার একটা সাজেশন আছে। হুট করে এফআইআর করবেন না। ভুলে যাবেন না, আপনাকে কিন্তু থানা থেকে বেরিয়ে ওই অফিসে গিয়ে কাজ করতে হবে। ওই বসের আন্ডারেই। কারণ অভিযোগ যতক্ষণ না প্রমাণিত হচ্ছে, তিনি অপরাধী নন, অভিযুক্ত। এবার তিনিও তো ছেড়ে কথা বলবেন না। দুম করে যদি চাকরি যায়, ছেলেকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন? মাথার ওপর যে ছাদ, সেটাও তো ভাড়ার!’

‘আপনি ঘুরিয়ে ভয় দেখাচ্ছেন,’ শ্রাবন্তী বলল।

‘নট অ্যাট অল। আমি এক্ষুনি এফআইআর নেব। কিন্তু আপনি করার আগে ভেবে নিন,’ অফিসার চায়ের কাপে বড় চুমুক দিলেন।

আতান্তরে পড়ল শ্রাবন্তী। কী করবে? এফআইআর? নাকি এবারকার মতো ছেড়ে দেবে? এখন ছেড়ে দিলেও বিপদ। সুকোমল সেনগুপ্ত সবার সামনে বেইজ্জত হয়েছে। সে তো ছাড়বে না!

শ্রাবন্তী বলল, ‘আপনি কী সাজেস্ট করছেন?’

অফিসার আঙুল মটকালেন। বললেন, ‘জিডি করুন। ’

‘জেনারেল ডায়েরি?’

‘হ্যাঁ, তাতে সাপও মরবে। লাঠিও ভাঙবে না। আমরা জিডি নিয়ে কোনো অ্যাকশন নেব না। আপনিও গিয়ে অফিস করুন। তিনি যদি কোনো আইনি পথে যেতে চান, জিডির জোরে আপনি এগিয়ে থাকবেন। কিংবা তিনি যদি ফের আপনার সঙ্গে ওই ধরনের আচরণ করেন, তখনো ওই জিডির দৌলতে কেসটা নিয়ে আরো এগোতে পারবেন। ’

প্রস্তাবটা মনে ধরল শ্রাবন্তীর। লোকটা ভুল বলছে না। এফআইআর করলে পুলিশ গিয়ে সুকোমল সেনগুপ্তকে গ্রেপ্তার করবে। অফিসে পুলিশ ঢোকানো ঠিক হবে না। তাতে কর্তৃপক্ষ অসন্তুষ্ট হতে পারে।

তাই জেনারেল ডায়েরি করে ও থানা থেকে বেরিয়ে এলো। তবে অফিসে ফিরল না। সোজা বাড়ির দিকে রওনা দিল।

 

তিন.

প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা রন পড়তে যায়। তিন দিন আর্টস গ্রুপ। তিন দিন সায়েন্স। শুধু রবিবার সন্ধ্যাবেলা ও ফাঁকা। বারো বছর বয়স হলো ছেলের। এখন নিজেই যেতে পারে। দুটি কোচিং সেন্টারই ওদের পাড়ায়। হাঁটা পথ। আগে অফিস থেকে ফিরে শ্রাবন্তী নিয়ে যেত। কোচিং ছুটির সময় গিয়ে নিয়েও আসত। এখন রন একা যায়। শ্রাবন্তী ফিরলে ও বেরিয়ে পড়ে। তাতে অবশ্য শ্রাবন্তীর সুবিধা হয়েছে। সারা দিনের ধকলের পর জিরিয়ে নিতে পারে। তা ছাড়া ও ফেরার আধাঘণ্টা বাদে অনেক দিন বিতান আসে। ফাঁকা ফ্ল্যাটে ওরা নিজেদের মতো করে কিছুটা সময় পায়।

আজও ডোরবেল বাজাতে রন দরজা খুলল। শ্রাবন্তী দেখল, ছেলে রেডি। কাঁধে ব্যাগ। শ্রাবন্তী দরজার পাশে জুতা খুলে বলল, ‘খেয়েছিস ঠিকভাবে?’

রন ঘাড় কাত করে জুতা পাল্টে বেরিয়ে গেল। ছেলেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখল শ্রাবন্তী। ভাস্করের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর ছেলেটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। শ্রাবন্তী সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছে ওকে সহজ করার। খানিকটা হয়েছেও। তবে পুরোপুরি এখনো হয়নি। অথচ এতগুলো বছর পেরোতে চলল।

ভাস্করকে এক-দুবার বিষয়টা বলেছিল। কিন্তু ভাস্কর তেমন আমল দেয়নি। ওদের বিচ্ছেদের পর ভাস্কর আবার বিয়ে করেছে। নতুন পরিবার নিয়ে ও ব্যস্ত। রনর জন্য হাতে বেশি সময় নেই। ছেলেটা আগে ছিল বাবা ন্যাওটা। এখন মায়ের দিকে ঝুঁকেছে। তবু শ্রাবন্তী টের পায়, রনর একটা নিজস্ব জগৎ রয়েছে। সেখানে ও কাউকে ঢুকতে দেয় না।

ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক যদি বন্ধুর মতো হতো তাহলে শ্রাবন্তী হয়তো বিতানের কথা বলত, কিন্তু ছেলের মতিগতি দেখে বলার সাহস হয় না।

রন বেরিয়ে যাওয়ার পর শ্রাবন্তী ফ্রেশ হয়ে নিল। তখনই ডোরবেল বাজল। দরজা খুলে দেখল, বিতান দাঁড়িয়ে। কপালে ভাঁজ। ভেতরে ঢুকে বিতান ধপ করে সোফায় বসল। বলল, ‘এক কাপ চা। অনেক কথা আছে। ’

শ্রাবন্তী দ্রুত রান্নাঘরে গেল। চায়ের সঙ্গে দুটি ডিমের অমলেটও করল। এই অফিসে চাকরি পাওয়ার পর বিতান হলো ওর সবচেয়ে বড় অবলম্বন। প্রায় প্রথম দিন থেকে বিতান নানাভাবে ওকে আগলে রেখেছে। কাজ শিখিয়েছে। এভাবে ধাপে ধাপে ওরা কাছাকাছি এসেছে।

সব সম্পর্ক ঠিক হিসাব কষে হয় না। এটাও তেমনই এক সম্পর্ক। দুজনের কেউই বোধ হয় কোনো সম্পর্কে জড়াতে চায়নি। তবু কেমন করে যেন জড়িয়ে গেছে। যখন দুজনে সেই ব্যাপারে সচেতন হলো, তখন উপলব্ধি করল, এই সম্পর্ক ভাঙা সম্ভব নয়। এদিকে বিতানের ভরা সংসার। সেই সংসারে মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই মেয়ে রয়েছে। হুট করে সংসার ভেঙে ও এসে শ্রাবন্তীর সঙ্গে জীবন শুরু করতে পারবে না। শ্রাবন্তী নিজেও তা চায় না। একবার তো একজন পুরুষের সঙ্গে চার দেয়ালের মধ্যে কয়েক বছর কাটিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা একেবারেই সুখের নয়। বরং খানিক হলেও বিভীষিকার। পরাধীনতার। তাই খোলা জীবনে এসে আবার নতুন করে খাঁচায় ঢুকতে ও রাজি নয়। তার চেয়ে এই ভালো। তা ছাড়া রনর কথাও ভাবতে হবে। ওরা যদি কখনো সত্যি বিয়ে করার কথা ভাবে, সেটা রনই বা কেমনভাবে নেবে?

ছেলেটার বাবা থেকেও নেই। এবার যদি ও দেখতে পায়, মা-ও অন্য কারো হাত ধরে দূরে চলে যাচ্ছে, সেই ধাক্কা রন সহ্য করতে পারবে না।

তবে বিতান প্রায়দিনই অফিসফেরত ওর ফ্ল্যাটে আসে। এমন সময় আসে, যখন রন থাকে না। সেটাই ওদের খোলা আকাশ।

চা এবং ডিমের অমলেট নিয়ে এসে শ্রাবন্তী দেখল বিতান চোখ বন্ধ করে বসে। ওর সাড়া পেয়ে চোখ খুলল। বলল, ‘ডিম ভাজার গন্ধেই খিদে পেয়ে যায়! দাও। ’

কপকপ করে ডিমের অমলেট শেষ করে বিতান চায়ে চুমুক দিল।

শ্রাবন্তী নিঃশব্দে খাওয়ার পর প্রশ্ন করল, ‘কী বলবে বলছিলে?’

বিতান ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘অত বাড়াবাড়ি করার কি খুব দরকার ছিল?’

‘কোনটার কথা বলছ?’

‘ওই চড় মারা...লোক ডেকে হেনস্তা করা...অফিস ছেড়ে বেরিয়ে চলে আসা...’

‘বেরিয়ে বাড়ি আসিনি। থানায় গিয়েছিলাম। ডায়েরি করে ফিরেছি। ’

‘হোয়াট!’ বিতান চোখ বড় বড় করে বলল, ‘থানায় গেছ? তুমি কি পাগল? এই কাজ কেন করলে?’

শ্রাবন্তী কড়া চোখে বিতানের দিকে তাকাল। বলল, ‘এই প্রশ্নগুলো তো তোমার সুকোমল সেনগুপ্তকে করা উচিত। তাই না?’

‘সুকোমলদা ম্যানেজমেন্টের কাছেরজন...’

‘তো? ম্যানেজমেন্টের কাছেরজন হলে কম্পানির যেকোনো মেয়ের গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার জন্মে যায়? ভালো যুক্তি দিলে!’

‘তবু বলব, তুমি বাড়াবাড়ি করেছ। লোকটা অমনই। ’

‘বাহ, লোকটা নষ্টামি করল, আর তুমি এসে বলছ, আমি বাড়াবাড়ি করেছি? লোকটা অমনই! একবারও তো বলছ না, সুকোমলদাকে ঠাঁটিয়ে চড় মেরে ভালো করেছ। ’

বিতান চট করে কোনো জবাব দিল না। চা খেতে থাকল। একসময় কাপটা টেবিলে রেখে বলল, ‘তুমি বেরিয়ে আসার পর অফিসে তুলকালাম শুরু হয়েছে। ’

শ্রাবন্তীরও চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সোফায় এলিয়ে ও বলল, ‘কী রকম?’

‘আমি তখন ছিলাম না। বাইরে গিয়েছিলাম। এসে শুনছি, সুকোমলদা তুমুল চিৎকার করছে। বলছে, ‘আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা! স্বামী বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিল চাকরির জন্য। আমি দয়াপরবশ হয়ে চাকরি দিলাম। এখন আমাকেই ছোবল মারার চেষ্টা?’

শ্রাবন্তীর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগে গা চিড়বিড় করতে লাগল। মনে হলো, লোকটাকে আরো তিন-চারটা চড় মারলে ভালো হতো।

বিতান বলে চলল, ‘প্রথমে বুঝতে পারিনি কী নিয়ে রাগারাগি। তখন অহনা ইশারায় বাইরে ডাকল। ও সব জানাল। ’

‘সুকোমলবাবু যখন এসব বলছিলেন, তখন অহনারা কিছু বলেনি?’

‘অহনা কি তোমার মতো উন্মাদ? ও জানে চাকরি রাখতে হলে এখন চুপ করে থাকতে হবে। ’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শ্রাবন্তী। অহনার মতো মেয়েরা চুপ করে সব মেনে নেয় বলেই সুকোমলবাবুদের এত দাপট। অন্যায় করেও তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

বিতান এবার উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘পরশু বড় মেয়ের জন্মদিন। কিছু কেনাকাটা করার আছে। আজ উঠব। তুমি সাবধানে থেকো। খুব ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছ। আরো বড় ঝুঁকি নিয়েছ থানায় গিয়ে। অফিসের ঝামেলা অফিসে মিটিয়ে নিতে পারতে। এইচআরকে কমপ্লেইন করতে পারতে। সোজা পুলিশে চলে গেলে? এতে কম্পানির বদনাম। কম্পানি বিষয়টা ভালোভাবে দেখবে না। ’

বিতান চলে যাওয়ার পর ফাঁকা ফ্ল্যাটে শ্রাবন্তী নিজের ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দিল। সত্যি কি ও   বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে? তাহলে কি বিতান ঠিক, ও ভুল? ব্যাপারটা চেপে গেলে হতো? এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও হালকা হাসি পেল ওর। নিজের সম্মান রক্ষা করাটাও আজকাল ভুল পদক্ষেপ হয়ে যাচ্ছে। সবই এখন স্ট্র্যাটেজি সাজিয়ে করতে হবে। না হলেই বিপদ।

হঠাৎ ওর মোবাইল ফোন বেজে উঠল। হাতে নিয়ে ও দেখল অচেনা নম্বর। খানিক ইতস্তত করে শ্রাবন্তী ফোনটা ধরেই ফেলল।

ওপাশ থেকে এক মহিলা কণ্ঠ প্রশ্ন করল, ‘শ্রাবন্তী রায় বলছেন?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে বলছেন?’

‘আমি জেড টিভি থেকে সুদেষ্ণা বলছি। ’

জেড টিভি? থমকে গেল শ্রাবন্তী। এটা আবার কোন চ্যানেল?

মেয়েটা বোধ হয় ওর মনোভাব ধরতে পারল। তাই বলল, ‘নিউজ চ্যানেল ম্যাডাম। আপনার কেবল লাইন চালালেই দেখতে পাবেন। চ্যানেল নম্বর আট শ সাতাশি। আমাদের চ্যানেল ছোট হতে পারে ম্যাডাম, কিন্তু অনেক স্কুপ ও ব্রেকিং নিউজ করে থাকি। ’

শ্রাবন্তী তখনো ধাতস্থ হতে পারেনি। আজকাল প্রতিদিনই একটা করে নিউজ চ্যানেল খুলছে। এটা হয়তো তেমনই কোনো এক চ্যানেল হবে। সেই চ্যানেল থেকে ওকে কেন ফোন করছে? ওর নম্বরই বা পেল কোত্থেকে?

‘আপনার কী দরকার বলুন তো?’ মেয়েটাকে থামিয়ে শ্রাবন্তী প্রশ্ন করল।

‘আমরা জানতে পেরেছি, আজ অফিসে আপনার সঙ্গে কী হয়েছে। আপনি থানায় গিয়ে ডায়েরিও করেছেন। আমরা সেটা নিয়ে একটা স্টোরি করতে চাই। ’

 

চার.

মিডিয়ার লোকজন শ্রাবন্তীর পিছু ছাড়ল না।

পরদিন রবিবার। সাধারণত এই একটা দিন ও একটু গড়িয়ে কাটায়। কখনো কখনো রনর পছন্দের রান্না করে। বিকেলে ওকে নিয়ে কাছেপিঠে কোথাও ঘুরতে যায়। কলকাতা শহরের অনেক দ্রষ্টব্য জায়গা রনর দেখা নেই।

এই রবিবার তা পারল না। সুদেষ্ণা থেকে থেকে ফোন করছে। এক-দুবার সরাসরি না বললেও মেয়েটা কথা শুনছে না। নানাভাবে বোঝাচ্ছে, এই খবরটা কেন সামনে আসা দরকার। শেষ পর্যন্ত ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে বাধ্য হলো শ্রাবন্তী, কিন্তু সুদেষ্ণার আচরণে ওর মেজাজ খিঁচড়ে গেল।

দুপুরে রনর জন্য ফ্রায়েড রাইস-চিলি চিকেন করল। তাতেও মেজাজ ঠিক হলো না। রোদটা একটু হেলে পড়তেই শ্রাবন্তী উঠে পড়ল।

ছেলেকে বলল, ‘একটা জায়গায় যাবি?’

‘কোথায়?’

‘পার্ক স্ট্রিটে ইংরেজদের একটা পুরনো কবরখানা আছে। অনেক আগেকার। দেখতে যাবি? ফেরার পথে চেলো কাবাব খাওয়াব। ’

রন নড়েচড়ে বসল। বলল, ‘যাব। ’

শ্রাবন্তী দ্রুত রনকে তৈরি করল। নিজে একটা সালোয়ার-কামিজ পরল। বেরোতে যাবে, এমন সময় ওর মোবাইল ফোন বেজে উঠল।

সেই ফোন ধরতে ওপাশ থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ বলল, ‘নমস্কার, সবার বাংলা চ্যানেল থেকে বিজেশ সেন বলছি...’

বিজেশ সেন পুরো কথা বলার আগেই শ্রাবন্তী লাইন কেটে দিল। লোকটা তাতে দমল না। ফের ফোন করল। শ্রাবন্তী আর ফোন ধরল না। রনকে নিয়ে বেরিয়ে মেট্রো স্টেশনের দিকে হাঁটার সময়ও ফোন এলো। এবার অন্য নম্বর। কিন্তু কিন্তু করে শ্রাবন্তী ফোন ধরল। এবারও বিজেশ সেন।

শ্রাবন্তী আবার লাইন কাটল।

রন একটু অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। জানতে চাইল, ‘কে?’

‘কেউ না,’ কঠিন মুখে জবাব দিল শ্রাবন্তী।

এরপর দুজন গেল পার্ক স্ট্রিটে। মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে শ্রাবন্তীর মন খানিক হলেও হালকা। রবিবার বিকেলের পার্ক স্ট্রিটে ভালো ভিড়। কত ছেলেমেয়ে হইহই করছে। বইয়ের দোকানেও গিজগিজে ভিড়। রেস্তোরাঁয় সব জোড়ায় জোড়ায় বসে।

হঠাৎ ওর ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। ধরবে না ধরবে না করেও শ্রাবন্তী ফোন ধরল। এবার বিজেশ সেন নয়, নতুন একজন। নাম বললেন শিখা সমাদ্দার। তিনি কোনো চ্যানেল নয় আজকের খবর সংবাদপত্রের নিউজ এডিটর।

যথারীতি সেই ফোনটাও কাটতে হলো শ্রাবন্তীকে। এবার ওর মেজাজ গরম হয়ে গেল। সারা সকাল সুদেষ্ণা জ্বালিয়েছে। দুপুর থেকে শুরু হয়েছে আরো দুজনের ফোন। এদের হাতে কি স্টোরি নেই? নাকি ওর ডায়েরিটাই বড় স্টোরি?

শ্রাবন্তী ভালো করে ঘুরতে পারল না। কোনোমতে খেয়েদেয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে এলো।

সোমবার অফিসে গিয়ে ও বুঝল হাওয়া খারাপ। বিতান সরাসরি কথা বলছে না। ইশারায় জানিয়ে দিয়েছে, ‘এখানে কোনো কথা নয়। যা কথা সব ফ্ল্যাটে হবে। ’

বাকিরাও ওকে এড়িয়ে চলছে। অফিসে শ্রাবন্তীর ভালো বন্ধু হলো ঈপ্সিতা। গত শনিবার ঈপ্সিতা ছুটি নিয়েছিল। আজ এসেছে।

শ্রাবন্তী নিজের চেয়ারে বসতেই ঈপ্সিতার মেসেজ ঢুকল, ‘এখন কোনো কথা বলিস না। লাঞ্চে ক্যান্টিনে কথা হবে। ’

অতএব শ্রাবন্তী আর এগিয়ে গিয়ে ওর সঙ্গে কোনো কথা বলল না। কিন্তু সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওর কাছে কোনো কাজ এলো না। সুকোমলবাবু অফিসে নেই। তিনি কি ছুটি নিয়েছেন? নাকি অন্য কোনো কাজে গেছেন? শ্রাবন্তী চুপ করে বসে থাকল। নিজের থেকে গিয়ে অহনাদের সঙ্গে কোনো গল্প করল না।

দুপুরে ক্যান্টিনে ঈপ্সিতা বলল, ‘আজ এসে শুনলাম সব। ম্যানেজমেন্ট তো সুকোমলবাবুকে ডেকে কড়কেছে। আগের দিনের ঘটনার জবাবদিহি করতে হবে। ’

‘কখন হলো এসব?’

‘শনিবার সন্ধ্যাবেলা। লোকটা হেভি কেস খেয়েছে। দেখছিস না, আজ আসেনি। বাকি স্টাফরাও ঘাবড়ে গেছে। ওরা ঠিক বুঝতে পারছে না কার পক্ষ নেবে। ম্যানেজমেন্ট যার দিকে ঢলবে, সব তো সেদিকে ঢলবে। ম্যানেজমেন্ট কার দিকে সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। এদিকে সুকোমলবাবু বিগ শট। হয়তো তিনিই জিতবেন। তখন তোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে যদি ওরা বিপদে পড়ে? সে জন্য সবাই দূর থেকে জল মাপছে। ’

ঈপ্সিতা আরো কিছু পরামর্শ দিল। তার মধ্যে একটা হলো, এখন ও যেন কাউকে বিশ্বাস না করে। সুকোমলবাবু চাইবেন ছলে-বলে-কৌশলে দান উল্টে দিতে। একবার সেটা করতে পারলে শ্রাবন্তীর বিপদ।

ক্যান্টিন থেকে নিজের জায়গায় ফিরে এলো শ্রাবন্তী। ঈপ্সিতার কথায় ও খানিক হলেও ভরসা পেয়েছে। ছুটির পর বেরিয়ে ফোন করল বিতানকে। জানতে চাইল, ‘আজ আসবে?’

‘আজ হবে না। মেয়ের জন্মদিন। কাল কিংবা পরশু যাব। ’

এরপর আর কথা চলে না। শ্রাবন্তী বাড়ির রাস্তা ধরল।

আজও ফ্ল্যাটের ডোরবেল বাজার পর রন দরজা খুলল এবং রোজকার মতো বেরিয়েও পড়ল।

শ্রাবন্তী ধীরেসুস্থে ফ্রেশ হলো। বড় এক কাপ কফি তৈরি করে বসার ঘরের সোফায় এলিয়ে পড়ল। অনেক দিন টিভি দেখা হয় না। কিছু একটা দেখার জন্য রিমোটের দিকে হাত বাড়াল। ঠিক তখনই ডোরবেল বাজল।

অবাক হলো শ্রাবন্তী। এখন কে এলো? রন?

তাড়াতাড়ি উঠে ও দরজা খুলল। দেখল এক মেয়ে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে আরেকটা ছেলে। মেয়েটার বয়স বছর পঁচিশেক। ছিপছিপে গড়ন। গায়ের রং শ্যামলা। নাক-চোখ কাঁটা কাঁটা। পরনে গোল গলা টি-শার্ট। আর হাঁটুর কাছে ছেঁড়া জিন্স। সঙ্গের ছেলেটার ক্ষয়াটে চেহারা। মাথার সব চুলই প্রায় পেকে গেছে। চোখ দুটো খুব জ্বলজ্বলে। তবে ছেলেটা মনে হলো মেয়েটার বয়সী।

‘বলুন?’ শ্রাবন্তী গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল।

‘আপনি নিশ্চয়ই শ্রাবন্তী রায়? আমার নাম বিপাশা। আর ও হলো অয়ন। আমার বন্ধু কাম কলিগ। আপনার সঙ্গে কি দুই মিনিট কথা বলতে পারি?’

‘আপনারা কে? কী দরকারে এসেছেন, সেটা তো আগে জানা দরকার!’

‘সব বলব। তার আগে কি দুই মিনিট বসা যায়?’

মেয়ে দুটি বোধ হয় কোনো মিডিয়া হাউসের। তবু মুখের ওপর অভদ্রতা করতে পারল না শ্রাবন্তী। মোবাইলে কাউকে কাটিয়ে দেওয়া সহজ। দরজার সামনে থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তত ও পারল না। বাধ্য হয়ে দুজনকে ভেতরে ঢোকাল।

বিপাশা বলল, ‘আমরা একটা নিউজ পোর্টাল চালাই। মেয়েদের ম্যাগাজিন। নাম, উর্বশী। ’

‘আপনারা কি আমার অফিসের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন?’

হাসল বিপাশা। বলল, ‘উত্তরটা একসঙ্গে হ্যাঁ এবং না। ’

‘বুঝলাম না। ’

‘আপনার সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটা কোনো আলাদা ঘটনা নয়। সারা বিশ্বে #মিটু আন্দোলন চলছে। চলবেও। কারণ এই সমস্যা শাশ্বত। যদি গুহামানবদের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায়, সেখানেও দেখা যাবে #মিটু হয়েছে। ইনফ্যাক্ট, আমার এই নিউজ পোর্টাল চালু করার পেছনেও রয়েছে তেমনই এক মোলেস্টেশনের ঘটনা। আমি একেবারেই মিডিয়া লাইনে ছিলাম না। একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়াতাম। পাশাপাশি টুকটাক কবিতা লিখতাম, কিন্তু একদিন স্কুলের প্রিন্সিপাল একটা কাজের ছুতায় ঘরে ডেকে আমাকেও...’

মেয়েটা থামল। শ্রাবন্তী দেখল ও একটা কষ্ট চাপছে। খারাপ লাগল শ্রাবন্তীর। এই পরিস্থিতি যে কতটা কষ্টকর, সেটা দুই দিন ধরে অনুভব করছে।

অয়ন আলতো করে বিপাশার কাঁধে হাত রাখল। নিজেকে সামলে নিল বিপাশা। বলল, ‘তার পরই সব ছেড়েছুড়ে এই পোর্টাল খুলেছি। এখানে আমরা মেয়েদের কথা বলছি। মেয়েদের যন্ত্রণা নিয়ে, মেয়েদের রোজকার বঞ্চনা নিয়ে। এই যে ঘটনাগুলো আজকাল ঘটছে তার পেছনে একটা বড় কারণ কী জানেন? পুরুষরা যখন আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারছে না, তখন ফাউল প্লে শুরু করেছে। ’

শ্রাবন্তীর ভালো লাগল মেয়েটার কথাগুলো। তাই বলল, ‘আমাকে কী করতে বলছেন?’

‘আপনি সরাসরি মুখ খুলুন। যা হয়েছে সেটা সবার জানা দরকার। আইন এখন মেয়েদের পক্ষে। ’

‘কিন্তু মুখ খুললে...’

‘আপনি নিজের নাম নেবেন কেন? পুরো ঘটনা পোর্টালে বেরোবে। তবে আপনার নাম কিংবা পরিচয় সামনে থাকবে না। এমনকি আপনার অফিস, বসের নাম—কিছুই সামনে আসবে না। খবরের কাগজে ধর্ষণের খবর পড়েননি? সেখানে কি এই ধরনের খবরে ধর্ষিতার ডিটেইলস থাকে? থাকে না। এখানেও থাকবে না। কিন্তু ঘটনাটা, সমস্যাটা থাকবে। লোকের জানা দরকার। কম্পানিগুলোরও বোঝা দরকার, আগেকার দিন আর নেই। ’

বিপাশার কথা মনে ধরল শ্রাবন্তীর। সব বলতে রাজি হলো।

বিপাশা পুরো সাক্ষাৎকারটা মোবাইলে রেকর্ড করল। তারপর বলল, ‘আপনার ডায়েরির কপিটা দেখতে পারি?’

শ্রাবন্তী দেখাল। বিপাশা সেটার ছবিও তুলল। শ্রাবন্তী একবার কফি খাওয়ার কথা তুলেছিল। দুজন রাজি হলো না। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুরো কাজ করে বিপাশা-অয়ন চলে গেল।

পরদিন সকালে ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে শ্রাবন্তী অফিস যাওয়ার জন্য শাড়ি পরছে, বিতানের ফোন এলো। সেই ফোন ধরতে ওপাশ থেকে বিতান ঝাঁজিয়ে উঠল, ‘উর্বশী নামের নিউজ পোর্টালে কী বলেছ?’

‘কেন?’

‘ওরা তোমার নাম, অফিসের নাম, সুকোমলদার নাম দিয়ে স্টোরি করে দিয়েছে নিজেদের পোর্টালে। তোমার ছবিও আছে তাতে। থানার ডায়েরির কপিও পোস্ট করেছে। ফেসবুকে এই নিয়ে তুমুল হৈচৈ শুরু হয়েছে! অফিসের ম্যানেজমেন্টের কানেও নিশ্চয়ই এতক্ষণে সব খবর পৌঁছে গেছে। এবার তো তুলকালাম বাধবে। এটা কী করলে?’

শ্রাবন্তীর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো।

 

পাঁচ.

উর্বশীর পোর্টাল খুঁজে পেতে বিশেষ সময় লাগল না। সেখানে গিয়ে ও খবরটা পড়তে পারল। বিপাশা কিছুই রাখঢাক করেনি। এমনকি কোথাও কোথাও ওর রেকর্ড করা কণ্ঠস্বরও দিয়েছে। যেখানে ও বর্ণনা করেছে সুকোমলবাবু কিভাবে শ্লীলতাহানি করেছিলেন। রাগে শ্রাবন্তীর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। কাল রাতে মেয়েটা নিজের নম্বর দিয়ে গিয়েছিল। সেই নম্বরে ও ফোন করল, কিন্তু নম্বর একবার ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে যান্ত্রিক গলা বলে উঠল, ‘এই নম্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ’

উর্বশীর পোর্টালে একটা মোবাইল নম্বর রয়েছে। সেই নম্বরেও বেজে গেল। কেউ ধরল না। শ্রাবন্তী এবার বিতানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইল। পারল না। বিতান বোধ হয় রাস্তায়। নিচের ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল শ্রাবন্তী। এবার কী করবে? কাল রাতে মেয়েটা যেভাবে এসে কথা বলেছিল, তাতে সত্যি ওর মনে হয়েছিল, এদের সাক্ষাৎকার দেওয়া যায়। তাই দিয়েওছিল। কিন্তু সেই বিপাশা যে এক রাতের মধ্যে এমন কাণ্ড করতে পারে, ও ভাবেনি।

বিছানায় বসে ও ফেসবুক খুলে খানিকক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করল। প্রথমে কিছু চোখে পড়ল না। তারপর একটু একটু করে চোখে পড়তে লাগল। অনেকে শেয়ার করেছে খবরটা। অনেক ফেসবুক গ্রুপেও আছে। তার নিচে নানা মন্তব্য। কেউ বলছে, ‘ঠিক করেছে কমপ্লেইন করে। ’ কেউ আবার বলছে, ‘হঠাৎ একটা লোক এমনি এমনি জড়িয়ে ধরবে? নিশ্চয়ই ভদ্রমহিলা কোনোভাবে প্রভোক করেছিল। আজকাল কিছু মেয়েছেলে এসব শুরু করেছে। এভাবে তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে চায়। যদি কোনো ভদ্রলোক তাদের শর্তে রাজি না হয়, তখন এভাবে ফাঁসিয়ে দেয়। ’

তর্ক চলেছে জোর দমে। অতি উৎসাহী এক-দুজন চুপিসারে ওর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে হানা দিয়ে গ্যালারি থেকে ছবি নিয়ে ওখানে পোস্ট করেছে। সেখানে একটা ছবি আছে দিঘার সমুদ্রসৈকতে স্নান করার। ভিজে সালোয়ার-কামিজ পরে শ্রাবন্তী দাঁড়িয়ে। বছর সাতেক আগের ছবি। তখনো ভাস্করের সঙ্গে ডিভোর্স হয়নি, হব হব করছে। ছেলেকে নিয়ে ভাস্কর স্নান করছিল। শ্রাবন্তী সরে এসেছিল পারের দিকে। তখন ওদের গ্রুপের কেউ ছবিটা তুলেছিল। সেই ছবি যে ফেসবুকে রয়ে গেছে, শ্রাবন্তীর খেয়াল ছিল না। আজ খেয়াল হলো। একজন সেটা ওখানে পোস্ট করেছে। তার নিচে চলছে নানা রসালো মন্তব্য।

শ্রাবন্তী আরো খুঁটিয়ে ফেসবুকের পোস্টগুলো দেখত, হঠাৎ বাবার ফোন ঢুকল।

সেই ফোন ধরতে বাবা বললেন, ‘তুই নাকি তোর বসের বিরুদ্ধে থানায় রিপোর্ট করেছিস!’

গম্ভীর গলায় শ্রাবন্তী বলল, ‘তোমাকে কে বলল?’

‘করেছিস কি না বল!’

‘করেছি। ’

‘কেন?’

‘লোকটা নোংরামি করেছিল। তাই প্রতিবাদ করেছি। ’

‘সেটা অফিসের ওপরমহলে করা যেত না? একেবারে থানায় যেতে হলো?’

‘তুমি তো জানো না কী হয়েছিল। ’

‘কিন্তু তোকে তো জানি। এই রকম সৃষ্টিছাড়া কাজ করার জন্যই তোর সংসার ভাঙল। তার পরও জেদ ধরে কলকাতায় রয়ে গেলি। একা। এখন যেখানে চাকরি করছিস সেখানেও নোংরামিতে জড়িয়ে পড়েছিস!’

শ্রাবন্তী দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে সংযত করল। শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, ‘তোমাকে কে বলল এত কিছু?’

‘ভাস্কর ফোন করেছিল। ফেসবুকটুকে নাকি ঢি ঢি পড়ে গেছে...’

‘আমাদের ডিভোর্সের পর থেকে এত বছরে একবার খোঁজ নিয়েছে তোমার? কলকাতা থেকে আমি যে মাসে মাসে ওষুধ পাঠাই, সেসব ওষুধ এবার থেকে ওকে পাঠাতে বোলো। ’

‘এসব কথা কেন তুলছিস?’

‘প্রাক্তন স্ত্রীর দিকে এখনো এত নজর যে প্রাক্তন শ্বশুরকে সকালে ফোন করে খবর দিতে হলো! ভাবছি, ওর বউকে এবার আমি ফোন করে সব জানাব। ’

‘তুই কথা ঘোরাচ্ছিস। ’

‘একেবারেই নয়। ভাস্করের সঙ্গে গত পাঁচ বছরে আমার পাঁচবার কথা হয়েছে কি না সন্দেহ। ছেলেটার একবারও খোঁজ নেয় না...’

‘সে তো তুই ছেলের সঙ্গে ওকে দেখা করতে দিতে চাস না! সেটা নিয়েও আমার কাছে দুঃখ করল। ’

‘তাই নাকি? আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো একবার বলতে বোলো?’

বাবা তবু নাছোড়বান্দার মতো বললেন, ‘আগেও অনেক ভুল করেছিস। আবার ভুল করলি। তোর ভুলে তোর জীবন তো ছারখার হবেই, ছেলেটারও হবে। ’

‘যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বোলো না। বরং তোমার গুরুদেবের আশ্রমের ভজনের সিডি শোনো। আর অফিসে বেরোনোর আগে ফোন করে এসব কথা একদম বলবে না। ’

বাবা রেগে গিয়ে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। শ্রাবন্তী লাইন কেটে দিল। মোবাইলটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফাঁকা ঘরে ও কেঁদে ফেলল।

একজন মানুষ কত নীচ হতে পারে! আর বাবাও চিরকাল ওর শত্রুই রয়ে গেলেন। নিজে পুরুষতান্ত্রিক। সারা জীবন মাকে জ্বালিয়ে খেয়েছেন। মেয়ের স্বাধীন মানসিকতা তিনি কোনো দিন বরদাশত করেননি। শ্রাবন্তীকে নিজের আদলে বড় করেছেন ওর মা। সেই স্কুলজীবন থেকে তিনি পইপই করে মেয়েকে বুঝিয়েছেন, ‘পড়াশোনা করে চাকরি করবি। নিজে রোজগার করতে না পারলে তোর অবস্থাও আমার মতো হবে। রোজ দেখিস না, তোর বাবা কিভাবে আমাকে পেষাই করেন!’

মায়ের কথাগুলো যেন তাড়া করত শ্রাবন্তীকে। তাই উচ্চ মাধ্যমিকের পর ও বায়না ধরেছিল কলকাতার কলেজে পড়াশোনা করবে। বাবা রাজি হননি গোড়ায়, কিন্তু মা অনেক কষ্টে বাবাকে রাজি করিয়েছিলেন। কলকাতায় এসে ও ভর্তি হয়েছিল লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে। মেয়েদের কলেজ। তাই বাবা বিশেষ আপত্তি করেননি। সেই সময় শ্রাবন্তী থাকত যাদবপুরে মেয়েদের মেসে।

তখন থেকে বাবা পাত্র খোঁজা শুরু করেছিলেন। শেষে ভাস্করকে ভারি মনে ধরেছিল তাঁর। দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলীপুর পার্কের কাছে ভাস্করদের সাবেকি বাড়ি। সেই বাড়িতে বিরাট করে কালীপূজা হয়। ভাস্কর একটা সরকারি ব্যাংকে ভালো চাকরি করছে। বাবা মারা গেলেও দাপুটে মা ছিলেন।

তাই কলেজ শেষ হতে না হতেই শ্রাবন্তীর বিয়ে ঠিক করে ফেললেন বাবা। ভাস্করদেরও ভারি পছন্দ হয়েছিল ওকে। দেখতে সুন্দরী। দুর্গাপুরে ওদের বড় বাড়ি। দেনা-পাওনার ব্যাপারেও বাবা কার্পণ্য করেননি। আর কী চাই?

মা ক্ষীণভাবে বাধা দিতে চেয়েছিলেন। শ্রাবন্তী বলেছিল চাকরির কথা, কিন্তু বাবা আমল দেননি। তা ছাড়া ভাস্করদের পরিবারেও চাকরি করা বউ নিয়ে আপত্তি ছিল। বাবা মনে করতেন, সেই আপত্তির পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে। মেয়েরা সংসার করবে, ছেলেপুলে মানুষ করবে। চাকরি করা পুরুষমানুষের কাজ। ভাইকে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার যাবতীয় কোচিং সেন্টারে ভর্তি করেছিলেন তিনি, কিন্তু শ্রাবন্তী একবার ভর্তি হতে চেয়েছিল। বাবা ভর্তি করাননি।

শ্রাবন্তীর বিয়ে হয়েছিল বড় করেই, কিন্তু বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ও প্রবল ধাক্কা খেয়েছিল। ওদের পরিবারে রক্ষণশীলতা থাকলেও পূজা নিয়ে গোঁড়ামি ছিল না, কিন্তু ভাস্করদের পরিবারে প্রচুর নিয়ম। সকালে উঠে বাসি কাপড় ছেড়ে স্নান করতে হবে। তারপর পূজা সেরে তবেই রান্নাঘরে ঢোকা। সপ্তাহে  দু-তিন দিন ওরা নিরামিষ খেত। মাসে তিন-চারবার উপোস। তা ছাড়া বাইরের কাপড় পরে কোনো ঘরের কাজ করা যাবে না, ছোঁয়াছুঁয়ি, সন্ধ্যার পর চুল খোলা রাখা যাবে না—হাজার নিয়ম।

মাসখানেকের মধ্যে হাঁপ ধরে গিয়েছিল শ্রাবন্তীর। তা-ও যদি বুঝত ভাস্কর পাশে আছে, এত কিছুর মধ্যে তবু খানিক ভরসা পেত। শুরুর দিকে সেটা ছিলও। ভাস্কর বিয়ের পর কিছুদিন বউকে নিয়ে ঘুরতেটুরতে যেত। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে গল্প করত। হঠাৎ শাশুড়ির চোখে পড়ল সেটা। তিনি তখন ছেলেকে কথায় কথায় খোঁটা দিতেন, ‘তুই তো এখন সুন্দরী বউ পেয়েছিস। আর মায়ের কী দরকার! বউয়ের আঁচলের তলাতেই থাক। ’

এর পর থেকেই ভাস্কর আলগা হতে শুরু করল। ছুটির দিন সন্ধ্যাবেলা আর ঘুরতে যেতে চাইত না। বরং চলে যেত বন্ধুদের বাড়ির আড্ডায়। অফিস থেকেও তাড়াতাড়ি ফিরত না। অনেক দিন ওর ফিরতে রাত হতো। রন হওয়ার পর থেকে দূরত্ব আরো বাড়ল। একদিকে শাশুড়ির অত্যাচার, বাড়ির আচার-অনুষ্ঠানে প্রাণ ওষ্ঠাগত, অন্যদিকে ভাস্করের সরে থাকা—দুইয়ে মিলে শ্রাবন্তী যেন অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে মাকে ফোনে বলত। তবু সেই ফোনও সতর্কভাবে করতে হতো। বাড়িতে শাশুড়ির নজর এড়িয়ে কিছু করার জো ছিল না। মাকে ফোন করলেও তিনি আড়ি পাততেন।

এই করতে করতে একদিন শ্রাবন্তী জানতে পারল, ভাস্করের সঙ্গে ওর এক অফিস কলিগের সম্পর্ক। জানিয়েছিল আরেক মহিলা কলিগ। সেই অপমান ও মেনে নিতে পারেনি। সরাসরি প্রতিবাদ করেছিল। আশ্চর্যের কথা হলো, শাশুড়ি কিন্তু সেই সম্পর্কের জন্যও শ্রাবন্তীকে দায়ী করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘স্বামীকে আঁচল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। যে বউয়ের কাছে স্বামী সুখ পায় না, সেই বউয়ের রূপ থাকলেই বা কী, আর না থাকলেই বা কী!’

শ্রাবন্তীর মনে হয়েছিল, ও যেন এক ক্রীতদাসী। যাকে বিয়ে করে আনা হয়েছে, শরীর-মন দিয়ে স্বামীর সেবা করতে এবং স্বামীর পদতলে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে। প্রথমে ও ফোনে বাবাকে সব কথা জানিয়েছিল। বাবা অবাক হয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলেছিলেন, কিন্তু শ্রাবন্তী তখন ডিভোর্সের জন্য মরিয়া। বাবা কিছুতেই সেই প্রস্তাবে সায় দেননি। তাঁর মতে, মা-বাবার মতো মেয়েদের স্বামীও নির্দিষ্ট থাকে। সেই স্বামীর সঙ্গেই জীবন কাটাতে হয়।

কিন্তু বাবার এই মত মা মেনে নেননি। সেই নিয়ে দুজনের তুমুল অশান্তি শুরু হয়েছিল। সেই সময় শ্রাবন্তী দেখেছিল, তার শান্ত মায়ের রুদ্রাণী মূর্তি। বাবা পর্যন্ত ভয় পেয়েছিলেন। রাজি হয়েছিলেন ডিভোর্সের মামলা লড়তে। এমনকি শ্রাবন্তী যে কলকাতায় থেকে নতুন করে জীবন শুরু করবে, মায়ের সেই জেদও বাবা মেনে নিয়েছিলেন বাধ্য হয়েই। সেই পরিস্থিতিতে শ্রাবন্তীর জীবন তিনি ঠিক ট্র্যাকে এনে ফেলেছিলেন। কিন্তু এত ধকল বোধ হয় মা নিতে পারেননি। তাই ডিভোর্সের রায় হাতে আসার মাসখানেক আগে আচমকা সেরিব্রালে মারা গেলেন।

সেটা শ্রাবন্তীর জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। তারপর এলো সুকোমল সেনগুপ্তর ধাক্কা।

চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল শ্রাবন্তী। এত সহজে ভেঙে পড়লে হবে না। সামনে বড়সড় যুদ্ধ আসছে। তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

দ্রুত বেরিয়ে ও একটা ট্যাক্সি নিল। অফিসের লিফট থেকে বেরিয়ে যখন ডিপার্টমেন্টের দিকে পা বাড়িয়েছে, হঠাৎ পেছন থেকে কেউ ডাকল।

শ্রাবন্তী ঘুরে দেখল অহনা। প্রায় দৌড়ে ওর কাছে এলো। বলল, ‘তোর আজ এত দেরি? সকাল থেকে এইচআরের অনিমেষবাবু তোকে তিনবার খুঁজেছেন। বলেছেন, এলে যেন ওঁর সঙ্গে দেখা করিস। মনে হচ্ছে ওই দিনের ব্যাপারে কথা বলবেন। ’

 

ছয়.

‘আপনার সঙ্গে আগে কখনো সুকোমল সেনগুপ্ত ওই ধরনের আচরণ করেছিলেন?’

‘না। ’

‘কখনো কোনো ইঙ্গিত?’

‘না। ’

‘তাহলে হঠাৎ সেদিন কী এমন ঘটল যে সুকোমল সেনগুপ্ত আপনাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন?’

‘সেটা তো তিনিই বলতে পারবেন। আমি শুধু ফাইল দেখিয়ে সই করাতে গিয়েছিলাম। ’

‘ঠিক। তিনিই বলতে পারবেন। তবু আপনার তো একটা আইডিয়া থাকবে! নাকি?’

‘আমার কোনো আইডিয়া নেই। ’

‘আপনি কখনো সুকোমল সেনগুপ্তকে দেখেছেন অন্য কারো সঙ্গে এমন আচরণ করতে? কিংবা কোনো কিছু কানে এসেছে কখনো?’

‘মনে পড়ছে না। ’

‘ভালো করে ভাবুন!’

‘নাহ। তেমন শুনিনি। ’

রামধনুর মতো বাঁকা একটা টেবিলের এক পাশে বসে শ্রাবন্তী। টেবিলের অন্য পাশে বসে তিনজন। দুজনকে ঠিক চিনতে পারল না ও। তবে মাঝখানে যে মহিলা বসে, তাঁকে চেনে। দিতিপ্রিয়া দত্তগুপ্ত। ওদের উইমেন হ্যারাসমেন্ট সেলের প্রধান। খুব স্পষ্টবক্তা এবং দাপুটে মহিলা। পর পর প্রশ্নগুলো তিনি করছিলেন শ্রাবন্তীকে।

অহনার কাছে খোঁজাখুঁজির কথা শুনে ও সরাসরি গিয়েছিল এইচআর ডিপার্টমেন্টে। তখন অনিমেষবাবু বললেন, ‘আপনি একবার দিতিপ্রিয়া ম্যামের সঙ্গে দেখা করুন। তিনি ডেকেছেন। ’

তা-ই গিয়েছিল শ্রাবন্তী।

নিজের কেবিনে কাজ করছিলেন দিতিপ্রিয়া। শ্রাবন্তীকে দেখে বললেন, ‘এই ঢুকলে?’

‘হ্যাঁ। আজ একটু দেরি হলো। ’

‘ঠিক আছে। গিয়ে ধাতস্থ হও। আজ লাঞ্চ আওয়ারের পর তোমাকে একবার ডাকব। সুকোমল সেনগুপ্তর কেসটা নিয়ে কথা আছে। তুমি নাকি পুলিশে ডায়েরি করেছ?’

অল্প ইতস্তত করে শ্রাবন্তী মাথা নাড়ল।

দিতিপ্রিয়া অপলকভাবে ওকে দেখলেন। বললেন, ‘তার আগে আমাকে একবার জানাতে পারতে। ঠিক আছে। যা কথা হওয়ার তখন হবে। তুমি ঘামছ। গিয়ে জলটল খাও। ’

ঘড়িতে ঠিক তিনটা বাজতেই ওর ডাক পড়ল। শ্রাবন্তী এসে ঢুকল এই ঘরে। তিনজনের তদন্ত কমিটি ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। তার পর থেকে দিতিপ্রিয়ার প্রশ্ন চলছে। তবে শ্রাবন্তী লক্ষ করল, এই জেরার সময় তিনি কিন্তু ওকে ‘তুমি’র বদলে ‘আপনি’ বলছেন।

দিতিপ্রিয়ার প্রশ্ন থামল। এবার বাঁ পাশের ভদ্রলোক বললেন, ‘আমরা আপনার কথা শুনলাম মিসেস আই মিন মিস রায়। কিন্তু সুকোমল সেনগুপ্ত পাল্টা কিছু অভিযোগ করেছেন আপনার বিরুদ্ধে। ’

‘কী অভিযোগ?’ শ্রাবন্তীর ভ্রু দুটি কাছাকাছি এলো।

সুকোমলবাবু জানিয়েছেন, ‘আপনি অনেক দিন ধরেই তাঁকে প্রভোক করছিলেন...’

‘প্রভোক!’ শ্রাবন্তীর কথায় ঝাঁজ মিশল, ‘প্রভোক করা মানে!’

ভদ্রলোক শান্তভাবে ওকে জরিপ করলেন। বললেন, ‘আমি এখনো কথা শেষ করিনি। আপনি উত্তেজিত না হয়ে পুরো কথাটা শুনুন, প্লিজ। ’

থেমে গেল শ্রাবন্তী। খেয়াল হলো, ম্যানেজমেন্টের তিনজন দুঁদে কর্মকর্তার সঙ্গে ও খেলতে নেমেছে। এখন মেজাজ হারালে ভুল করবে।

ভদ্রলোক বললেন, ‘অ্যাকর্ডিং টু মিস্টার সেনগুপ্ত, আপনি কিছুদিন ধরেই তাঁর সঙ্গে বাড়তি হেসে কথা বলছিলেন। কথায় কথায় গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়ছিলেন। ইভেন, উইকএন্ডে মন্দারমণি যাওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন। আপনি এমন কথাও বলেছেন, ওখানে দু-তিনটা অমন হোটেল আপনার চেনা, যেখানে আপনারা স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে অনায়াসে থাকতে পারবেন। ’

‘আপনি...’ শ্রাবন্তী ফের মেজাজ হারাচ্ছিল।

ভদ্রলোক ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘শেষটা করতে দিন, প্লিজ। আপনাকেও বলার সুযোগ দেওয়া হবে। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, সুকোমলবাবু আপনার ওই চেয়ারে বসে আমাদের জানিয়েছেন, আপনি অনেক দিন তাঁর কাছে দুঃখ করেছেন একা থাকা নিয়ে। তাই তাঁকে কাছে পেতে চাইছেন। এবং সুকোমলবাবুও অনেকবার আপনাকে বুঝিয়েছেন যে তিনি বিবাহিত জীবনে সুখী। আপনার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছা তাঁর নেই। বারবার যখন তিনি রিফিউজ করেন, তখন আপনি প্রতিশোধ নিতে এই অভিযোগ করেছেন এবং অফিসের ম্যানেজমেন্টকে কিছু না জানিয়ে সরাসরি পুলিশে ডায়েরি করেছেন, যাতে অফিসও চাপে থাকে। ’

ভদ্রলোক থামলেন। শ্রাবন্তী চুপ।

দিতিপ্রিয়া বললেন, ‘এবার আপনি যা বলতে চাইছিলেন, বলতে পারেন। ’

শ্রাবন্তী অনেক কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ভদ্রলোক শেষ করার পর ওর সেই কথাগুলো বলার প্রবৃত্তি চলে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও শুধু বলল, ‘সুকোমলবাবু যা যা বলেছেন, তার কোনো প্রমাণ তাঁর হাতে কি আছে?’

‘দেয়ার ইউ আর,’ দিতিপ্রিয়া মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘প্রমাণ! দ্যাটস ইট। আপনার কথা থেকে দুটি পয়েন্ট বেরিয়ে আসে। এক. আপনি কিন্তু এত অভিযোগ শুনে সেসব সরাসরি অস্বীকার করলেন না। বরং প্রথম যে কথাটা বললেন, সেটা হলো অভিযোগের প্রমাণ কোথায়?’

শ্রাবন্তী ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য কিছু বলতে যাচ্ছিল।

দিতিপ্রিয়া হাত তুলে বললেন, ‘লেট মি ফিনিশ। দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো, আপনি প্রমাণ চেয়েছেন। খুব ভ্যালিড পয়েন্ট। প্রমাণ করা না গেলে তো কোনো অভিযোগই ধোপে টেকে না। এবার মিসেস রায়, সেই প্রশ্ন তো আমরাও আপনাকে করতে পারি। আপনি যা যা বলেছেন এবং থানায় গিয়ে রিপোর্ট করেছেন, তার কী প্রমাণ আপনার হাতে আছে? শুধু মুখের কথা?’

‘অহনা, চিরঞ্জিত, অভিজিৎ, সুনন্দরা দেখেছে। ’

‘কী দেখেছে?’

‘আমি তো আগেই বলেছি। আমি যখন চিৎকার করেছিলাম প্রথমে অহনা ও চিরঞ্জিত ছুটে এসে ঘরে ঢোকে। পেছন পেছন অভিজিৎ ও সুনন্দ। ’

‘সেই সময় সুকোমলবাবু কী অবস্থায় ছিলেন?’

‘তিনি তখন আমাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছিলেন। আমি বাধা দিচ্ছিলাম। একটা ধস্তাধস্তি চলছিল। ’

দিতিপ্রিয়া এবার বাকি দুজনের দিকে তাকালেন। চোখে চোখে তিনজনের কিছু কথা হলো, কিন্তু সেই কথার মানে ধরতে পারল না শ্রাবন্তী।

দিতিপ্রিয়া চেয়ারে হেলান দিয়ে একমুহূর্ত ভাবলেন। বললেন, ‘ওয়েল। আমরা ওই চারজনের সঙ্গে কথা বলব। আপনি এখন যেতে পারেন। ’

শ্রাবন্তী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ওর খুব ক্লান্ত লাগছিল।

পায়ে পায়ে ও দরজার কাছে গিয়ে পৌঁছেছে এমন সময় পেছন থেকে দিতিপ্রিয়ার গলা ভেসে এলো, ‘শুনুন। ’

ঘুরে তাকাল শ্রাবন্তী।

দিতিপ্রিয়া বললেন, ‘এরপর অফিসে কেউ যদি কোনো ধরনের হ্যারাসমেন্ট আপনাকে করে, আমরা আশা করব, আপনি সেটা নিয়ে পুলিশ স্টেশনে যাওয়ার আগে একবার অন্তত আমাদের জানাবেন। আমার মোবাইল নম্বর টোয়েন্টিফোর সেভেন খোলা থাকে। আপনার নম্বরে আমি হোয়াটসঅ্যাপ থেকে পিং করে দিয়েছি। অতএব আমার নম্বরটাও পেয়ে যাবেন। ’

মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল শ্রাবন্তী। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

 

সাত.

তিন দিন পর ফের শ্রাবন্তীর ডাক পড়ল। এবারও ঘরে ঢুকে ও দেখতে পেল আগের দিনের মতো তিনজন বসা। দিতিপ্রিয়া দত্তগুপ্তর মুখ গম্ভীর। একটু রুক্ষ।

শ্রাবন্তী উল্টো দিকের চেয়ারে বসতে তিনি বললেন, ‘আগের দিন আপনি চারজনের নাম নিয়েছিলেন। মনে আছে তো?’

‘আছে। অহনা, চিরঞ্জিত, অভিজিৎ ও সুনন্দ। ’

‘রাইট। আমরা চারজনের সঙ্গে কথা বলেছি। ’

‘কী বলল তারা?’ শ্রাবন্তী প্রশ্ন করল।

‘চারজনের সঙ্গে কথা বলে আমাদের মনে হয়েছে, তাদের একবার আপনার সামনে প্রশ্ন করা উচিত। সেটাই ফেয়ার ডিল হবে। ’

ফেয়ার ডিল! কথাটা গোলমেলে শোনাল শ্রাবন্তীর। তবু ও কোনো মন্তব্য করল না।

দিতিপ্রিয়া ইন্টারকমে প্রথম ডাকলেন অহনাকে।

মিনিট তিনেকের মধ্যে অহনা এলো। ভীতু ভীতু চাহনি। একবার আড়চোখে শ্রাবন্তীকে দেখে নিয়ে ও তাকাল সামনের তিনজনের দিকে।

দিতিপ্রিয়া ইশারায় ওকে বসতে বললেন। অহনা বসল। আড়ষ্টভাবে।

এবার দিতিপ্রিয়া জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা অহনা, সেদিন আপনি কেন ছুটে গিয়েছিলেন সুকোমল সেনগুপ্তর চেম্বারে?’

‘শ্রাবন্তীর চিৎকার শুনে,’ অহনা ফ্যাসফেসে গলায় বলল। একবার শ্রাবন্তীকে দেখেও নিল।

‘তারপর ছুটে গিয়ে কী দেখলেন?’

‘দেখলাম, সুকোমলবাবু আর শ্রাবন্তী মুখোমুখি। দুজনে দুজনের হাত ধরে। ’

‘ভালো করে ভেবে বলুন। আপনাকে কিন্তু কোর্টে দাঁড়িয়েও বলতে হতে পারে। ’

অহনা ঢোক গিলল। বলল, ‘আমি আর চিরঞ্জিত চেম্বারের কাছেই কথা বলছিলাম। হঠাৎ চিৎকার শুনে আমরা দুজন ছুটে ঢুকলাম চেম্বারে। দেখলাম, দুজন দুজনের হাতের ওই কী বলে কনুই মানে যেখানে হাত ভাঁজ হয়, সেখানে ধরে। ’

‘এক কথা বারবার বলার দরকার নেই,’ দিতিপ্রিয়া চাপা ধমক দিলেন, ‘শ্রাবন্তী অভিযোগ করেছেন, সুকোমল সেনগুপ্ত মোলেস্ট করেছেন ওঁকে। আপনি কি তেমন কিছু দেখেছেন?’

‘আমি ওইটুকুই দেখেছি। তবে শ্রাবন্তী খুব চিৎকার করছিল। আর সুকোমলবাবু হাত ছাড়িয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। ’

‘আমরা মোলেস্টেশনের কথা বলছি। শ্লীলতাহানি। সে রকম কিছু কি দেখেছেন?’

‘শ্রাবন্তী উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করছিল...আমি গিয়ে সান্ত্বনা দিতে কেঁদে ফেলল...আবার রেগে গেল...’

দিতিপ্রিয়া ঠাণ্ডা চোখে অহনার দিকে তাকালেন। বললেন, ‘আপনি কি আজকাল নিজের মাতৃভাষা বুঝতে পারছেন না? লাস্ট টাইম বলছি, আপনি কি সুকোমলবাবুকে শ্লীলতাহানি করতে দেখেছেন?’

মাথা নামিয়ে নিল অহনা। অস্ফুটে বলল, ‘না। ’

দিতিপ্রিয়া একবার দেখলেন শ্রাবন্তীকে। অহনাকে বললেন, ‘এবার আপনি গিয়ে চিরঞ্জিতকে পাঠিয়ে দিন। ’

রাগে-অপমানে শ্রাবন্তীর মুখ লাল হয়ে উঠল।

কয়েক মিনিট বাদে চিরঞ্জিত এলো এবং দিতিপ্রিয়া ফের একই প্রশ্ন ওকে জিজ্ঞেস করলেন। এবং একই ফাঁদে চিরঞ্জিতও পড়ল। অহনা যেটুকু দেখার কথা বলেছে, চিরঞ্জিতও তা-ই বলল।

দিতিপ্রিয়া এবার একে একে বাকি দুজনকে ডাকার মতলব করছিলেন। শ্রাবন্তী বাধা দিল। বলল, ‘ওদের ডেকে লাভ নেই। প্রথম দুজন যেটুকু দেখেছে, ওরা সেটাও দেখেনি। কিন্তু ওরা দেখেনি মানেই যে ঘটনাটা ঘটেনি, সেটা ধরে নিচ্ছেন কেন?’

‘আমরা কিছুই ধরে নিচ্ছি না,’ এবার দিতিপ্রিয়ার ডান পাশের ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি আগের দিন প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছিলেন। আমরাও সেই প্রশ্ন তুলছি। আপনি যে চারজনকে সাক্ষী হিসেবে মেনেছিলেন, সেই চারজনের দুজন তো পরিষ্কার বলেই দিলেন, তাঁরা সুকোমল সেনগুপ্তকে শ্লীলতাহানি করতে দেখেননি। ’

‘হাতে হাত ধরাটুকু...’

‘ওটার ব্যাপারে সুকোমলবাবু একটা আলাদা ভার্সন দিয়েছেন। সেই ভার্সনে আপনার দিকে আঙুল উঠছে। অতএব আমরা ওটাকে বেনিফিট অব ডাউট দিচ্ছি। ’

‘বেনিফিট অব ডাউট! মানে? আপনারা বলতে কী চাইছেন?’

‘আমরা কিছু বলছি না। আমরা প্রমাণ চাইছি। প্রমাণ যদি ঠিক হয়, আজই সুকোমল সেনগুপ্তকে রিজাইন করতে বলা হবে। ’

এবার বিব্রত হলো শ্রাবন্তী। সুকোমল সেনগুপ্ত শাস্তি পাক, এটা ও প্রথম থেকে চেয়েছে। তাই পুলিশে গিয়ে অভিযোগও করেছে, কিন্তু চাকরি যাওয়ার কথা মাথায় ছিল না। এটা শ্রাবন্তী কখনো চায়নি। সুকোমলবাবুর পরিবার আছে। হঠাৎ করে লোকটা এত ভালো চাকরি খোয়ালে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এই বয়সে জুতসই চাকরি পাওয়া কি সোজা কথা? কলকাতায় চাকরি কোথায়?

তাই ও বলল, ‘দেখুন, আপনারা কী শাস্তি দেবেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমি জানি না। কিন্তু অহনা ও চিরঞ্জিত একটা কথা বলেছে, সেটা হলো, আমার চিৎকার শুনে ওরা ঘরে ঢুকেছিল এবং ঢুকে দেখেছে আমরা যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে সেটা কোনো অফিশিয়াল ভঙ্গি নয়। এই দুটি ঘটনা কি কিছুই প্রমাণ করে না?’

‘নিশ্চয়ই করে,’ ভদ্রলোক বললেন, ‘কিছু একটা ঘটেছিল। কিন্তু সেটা কী? সুকোমল সেনগুপ্ত শ্লীলতাহানি করতে গিয়েছিলেন? নাকি শ্রাবন্তী রায় ব্ল্যাকমেইল করতে চেয়েছিলেন?’

‘আপনারা কিন্তু এবার আমাকে ইনসাল্ট করছেন!’ শ্রাবন্তী আর রাগ চাপতে পারল না, ‘বিশাখা গাইডলাইন অনুযায়ী আইন আমার পক্ষে। ১৯৯৭ সাল থেকে সেই আইন কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের শ্লীলতাহানির হাত থেকে রক্ষা করছে। আমি এবার সরাসরি আইনি পদক্ষেপ নেব। কারণ আমি বুঝতে পারছি, আপনারা বিষয়টা লঘু করে ফেলছেন। ’

দিতিপ্রিয়া এবার জ্বলে উঠলেন। হিসহিসে গলায় বললেন, ‘সে আপনি আইনি পদক্ষেপ নিতেই পারেন। তবে যদি দেখা যায়, সুকোমল সেনগুপ্ত দোষী প্রমাণিত হলো না, তখন কিন্তু তীর আপনার দিকে ঘুরবে। কারণ কোর্টও প্রমাণই চাইবেন। প্রমাণ ছাড়া আইন কথা বলে না। ’

পাশের ভদ্রলোক বললেন, ‘তা ছাড়া আপনি বিষয়টা নিয়ে মিডিয়ার সামনে মুখ খুলেছেন। অফিসের পরিবেশ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এতে আমাদের কম্পানির ক্ষতি হয়েছে। আমরা চাইলে আপনাকে শোকজ করতে পারি। ’

‘আপনারা কিন্তু আমাকে শাসাচ্ছেন!’

‘একেবারেই না। আমরা শুধু একটা কনক্লুশনে পৌঁছতে চাইছি। যে অপরাধের কোনো প্রমাণ আপনার হাতে নেই, সেটা নিয়ে আপনি থানা-পুলিশ থেকে মিডিয়া সবার কাছে বলে বেড়িয়েছেন। আপনার কোনো ধারণা আছে, এর ফলে কম্পানির গুডউইল কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো? আপনার মতো ডিভোর্সি সিঙ্গল মাদাররা নিজেদের বেশি চালাক ভাবেন!’

শ্রাবন্তী রেগে গিয়ে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, দিতিপ্রিয়া বাধা দিলেন। বললেন, ‘কে নিজেকে কী ভাবেন, সেটা দেখার জন্য আমরা এখানে বসিনি। আমরা বসেছি দুটি কারণে। এক. এই সমস্যার সমাধান করতে। দুই. শ্রাবন্তীর বাইরে মুখ খোলায় অফিসের ভারি বদনাম হয়েছে। কেন অফিসকে না জানিয়ে আপনি পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন, মিডিয়ার সামনে মুখ খুলেছেন, সেটা লিখে আমাদের জানাবেন। আপনার অফিশিয়াল ই-মেইলে শোকজের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে জবাব দেবেন। ’

হতবাক হলো শ্রাবন্তী। দোষ করলেন সুকোমল সেনগুপ্ত। আর শোকজ করা হলো ওকে? ওর অপরাধ শ্লীলতাহানির রিপোর্ট লিখিয়েছে পুলিশে গিয়ে। সেই সঙ্গে মিডিয়া মানে একটা ছোট ওয়েব পোর্টালে সব বলে দিয়েছে! অথচ সুকোমল সেনগুপ্তকে কিছুই বলা হলো না।

মাথা হেঁট করে বসে থাকল শ্রাবন্তী। বুঝতে পারল, পায়ের তলা থেকে জমি সরে যাচ্ছে। অল্প অল্প করে।

 

আট.

বিধ্বস্ত শ্রাবন্তী একটু আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। অন্যদিন ও ময়দান মেট্রো স্টেশনের দিকে হাঁটা দেয়। আজ তেমন কিছু করল না। ফুটপাতে এখনো অফিস ছুটির ভিড় উপচে পড়েনি। তবু লোক আছে। সেসব লোক কাটিয়ে কাটিয়ে ও আনমনে হাঁটতে থাকল। কিচ্ছু ভালো লাগছে না।

উল্টো দিক থেকে আসা লোকজনের দিকে ওর চোখ গেল। কত মানুষ! কত ধরনের মুখের অভিব্যক্তি! মানুষ নিয়ে গবেষণা করতে হলে কলকাতার ফুটপাত হলো আদর্শ জায়গা। দুর্গাপুর থেকে এসে এই শহরে ঘাঁটি গাড়ার ফলে শ্রাবন্তী আরো বেশি করে শহরটাকে বুঝতে পারে। একেক সময় ওর মনে হয়, কলকাতা খুঁজলে পৃথিবীর সব জনজাতির লোকজনই বোধ হয় পাওয়া যাবে। এমনকি এক-দুটো এক্সিমো পর্যন্ত। এত লোকের জীবনেও নিশ্চয়ই প্রচুর সমস্যা। শ্রাবন্তীর মতো মিথ্যা অভিযোগে তাদের অনেককে নিশ্চয়ই শাস্তি পেতে হয়। কিংবা হচ্ছে। মানুষের ইতিহাসে সেসব কোনো দিন লেখা হবে না। শুধু থেকে যাবে বড় বড় যুদ্ধ আর ক্ষমতার আস্ফাালন।

একসময় ও দেখল পার্ক রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশনের কাছাকাছি প্রায় চলে এসেছে। রাস্তা পেরিয়ে শ্রাবন্তী ঢুকে পড়ল। ও গেলে তবেই রন পড়তে যেতে পারবে।

অন্য দিনের চেয়ে মিনিট পনেরো আগে শ্রাবন্তী ফ্ল্যাটে পৌঁছল। রন তখনো তৈরি হয়নি। মাকে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘আগে চলে এলে!’

‘হয়ে গেল,’ সংক্ষেপে জবাব দিয়ে শ্রাবন্তী বাথরুমে ঢুকল।

রন দরজা আটকে বেরিয়ে গেল খানিক বাদে।

শ্রাবন্তী যখন স্নান করে চা নিয়ে এসে বসেছে, তখন আবার ডোরবেল বাজল। বিতান এসেছে।

আজ বিতানের মুখও দিতিপ্রিয়ার মতো রুক্ষ। ফ্ল্যাটে ঢুকে সোফায় বসল চুপ করে। শ্রাবন্তীর মনে হলো, ও যেন কিছু বলতে চাইছে। তার আগে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে।

বাজিয়ে দেখার উদ্দেশ্যে ও বলল, ‘চা খাবে?’

‘না,’ মাথা নাড়ল বিতান, ‘আমার কিছু বিশেষ কথা আছে তোমার সঙ্গে। ’

‘বলো!’

বিতান নড়েচড়ে বসল। বলল, ‘তুমি কাল গিয়ে সুকোমলদার কাছে ক্ষমা চাও শ্রাবন্তী। তাতে তোমার ভালো হবে। ’

‘ক্ষমা চাইব? মানে? হঠাৎ এই কথা কেন বলছ?’ শ্রাবন্তী এত অবাক হলো যে চায়ে চুমুক দিতে ভুলে গেল।

বিতান এগিয়ে এসে ওর হাত ধরল। বলল, ‘শ্রাবন্তী, এই অফিসে জয়েন করার প্রথম দিন থেকে আমি তোমাকে দেখছি, তুমিও আমাকে দেখছ। আমি বরাবর তোমার ভালো চেয়ে এসেছি। তাই বলছি, তুমি গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নাও। ’

বিতান ওভাবে হাত ধরায় চায়ের কাপে ছ্যাঁকা খেল শ্রাবন্তী। হাত ছাড়িয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে ও বলল, ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। সুকোমলবাবু আমার সঙ্গে ওই আচরণ করলেন। আমি গিয়ে থানায় ডায়েরি লেখালাম। অফিসের এইচআর তারপর বিষয়টা নিয়ে তদন্ত শুরু করল। আমি ডেঁটে দাঁড়ালাম নিজের জায়গায়। এরপর যে চারজন সেদিন সুকোমলবাবুর চেম্বারে ছুটে গিয়েছিল তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। আজ হঠাৎ আমাকে শোকজ করানো হলো। এখন তুমিও এসে বলছ আমাকে গিয়ে ক্ষমা চাইতে? একবার ক্ষমা চাইলে আমার অবস্থাটা কী হবে ভেবেছ? এইচআর কি আমায় ছেড়ে দেবে? ক্ষমা চাওয়া মানে তো দোষ কবুল করা। মানে আমি দোষী। তাহলে থানায় যে ডায়েরি করেছি, সেটাও তো আমার বিরুদ্ধে চলে যাবে?’

‘আমি বলছি, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি ঠিক করব। তুমি শুধু কাল গিয়ে সুকোমলদার কাছে ক্ষমা চাও। ’

‘তারপর তাঁর সঙ্গে দিঘায় এক রাত কাটিয়ে এসো! তাইতো?’

‘সুকোমলদা তেমন প্রস্তাব আর দেবেন না। তুমি বুঝতে পারছ না, এবার যদি তেমন কিছু তিনি করেন, তাহলে তো ফেঁসে যাবেন। ’

শ্রাবন্তী অপলকভাবে বিতানকে দেখল। বলল, ‘কিন্তু তুমি কিভাবে পুরো ব্যাপারটা ঠিক করবে? তুমি তো দিতিপ্রিয়া দত্তগুপ্ত নও। সুকোমল সেনগুপ্তও নও। জাস্ট একজন সিনিয়র এমপ্লয়ি। তাহলে?’

বিতান সামান্য ইতস্তত করল। বলল, ‘শোনো, তুমি সুকোমলদাকে কিছু করতে পারবে না। ভদ্রলোকের হাত অনেক দূর পর্যন্ত রয়েছে। অফিসে তো আছেই। অফিসের বাইরেও লোকটার বিরাট পলিটিক্যাল কানেকশন। যে পার্টির কথাই বলবে, সেখানে সুকোমলদার চেনাশোনা কেউ আছেন, উঁচু পদে। তাই একটা লেভেলের পর অফিসও আর তাঁকে ঘাঁটাবে না। অনেক সরকারি ছাড় লোকটা জোগাড় করে দেয় অফিসকে। তোমার মতো একজন খসে গেলে অফিসের কিছু এসে-যায় না। কিন্তু সুকোমল সেনগুপ্ত যেকোনো অফিসের কাছে একটা অ্যাসেট। এই যে তিনজনের কমিটি, হ্যাড্ডা ভ্যাড্ডা, এসব হলো আই ওয়াশ। চোখে ধুলা দেওয়া হচ্ছে। আসল গল্প হলো সুকোমল সেনগুপ্তকে বাঁচানো। এর আগেও এমন কাণ্ড হয়েছে। অফিসের ওপরমহল জানে। সেই মেয়েরা তোমার মতো হুট করে থানায় চলে যায়নি। পুরো ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়া গিয়েছিল সহজে। ’

‘আমারও আজ সেটা মনে হচ্ছিল। দিতিপ্রিয়া দত্তগুপ্ত কেন এই কাজ করছিলেন, ধরতে পারছিলাম না। এবার পারলাম। ’

বিতান আবার ওর হাত ধরল। বলল, ‘তাই বলছি, কাল গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নাও। তোমার চাকরি থেকে যাবে। আমাদের সম্পর্ক থাকবে। সুকোমলদাও সমঝে চলবেন। ’

হঠাৎ শ্রাবন্তীর মনে অন্য ভাবনা উঁকি দিল। চায়ে বড় করে চুমুক দিয়ে ও ধীরেসুস্থে সেটা খেল। লুডোর দান দেওয়ার মতো করে বলল, ‘তোমাকে সুকোমলবাবু ঠিক কী বলে আমার কাছে পাঠিয়েছেন? ইন ফ্যাক্ট আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে তিনি কতটুকু জানেন?’

এমন প্রশ্ন আসতে পারে, বিতান আন্দাজ করেনি। তাই থতমত খেয়ে গেল। ধরা পড়া মুখে বলল, ‘আমাদের সম্পর্কের কথা তিনি আগাগোড়াই জানেন। ’

‘কিভাবে?’

‘অফিসের বসদের এটা কাজের মধ্যে পড়ে। এটা না জানতে পারলে তো অনেক ইকুয়েশন ঠিক ধরা যায় না। ধরো...’

‘আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আগাগোড়া জানতে হলে তো পেছনে গোয়েন্দা লাগাতে হবে। আরেকটা সম্ভাবনা অবশ্য রয়ে যায়। হয় আমি গিয়ে তাঁকে সব বলেছি, না হলে তুমি!’ তীক্ষ চোখে বিতানের দিকে তাকিয়ে শ্রাবন্তী কেটে কেটে বলল।

বিতান চোখ নামিয়ে নিল। বলল, ‘আমি কিছু কিছু বলেছি। ’

‘কিছু কিছু? নিজের বউকে বলছ না, বলছ গিয়ে অফিসের বসকে? কেন বলেছ জানতে পারি?’

‘তোমার ভালোর জন্য। মনে আছে, তুমি যখন প্রথম দিকে তেমন কাজ পারতে না, তখন কী ঝাড়িটাই না খেতে! তখন কি তোমার চাকরি থাকত? ছিল শুধু এই শর্মার জন্য। আমি গিয়ে সুকোমলদাকে সব বলেছিলাম। বলেছিলাম, ‘ও আমার স্ত্রীর চেয়েও আপন। ওর চাকরি খাবেন না। ’

‘এসব কথা তো আগে কোনো দিন জানাওনি। জানতে পারলে আমি এমন অসম্মানজনক শর্তে চাকরি করতাম না। ’

‘কী করতে?’ বিতান দপ করে জ্বলে উঠল, ‘এখন বসে বড় বড় লেকচার দিচ্ছ। সেদিন আমি ওভাবে পাশে না দাঁড়ালে ফুটপাতে ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে। ’

‘মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ!’ শ্রাবন্তীর চোয়াল শক্ত হলো।

‘ওই সব ল্যাঙ্গুয়েজ দেখাতে এসো না। সেদিন আমি তোমার জন্য করেছিলাম, তাই তোমার চাকরি আছে। আজ সুকোমলদা সরাসরি আমাকে থ্রেট করেছেন। তুমি ক্ষমা না চাইলে আমার পরিবারের কাছে সব কথা ফাঁস করে দেবেন এবং সেই সঙ্গে আমার চাকরিও যাবে। ’

‘চাকরি যাওয়া অত সহজ নয়,’ শ্রাবন্তী বলল।

‘যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বোলো না। কাল গিয়ে ক্ষমা চাইবে,’ বিতান রেগে গিয়ে বলল।

হঠাৎ শ্রাবন্তীর মনে পড়ল বহু বছর আগেকার কথা। শাশুড়ির আচরণে ও এক রাতে ভাস্করকে বলেছিল, ‘তোমার মায়ের এত আচার, এত সংস্কার মানতে পারব না। আমাদের বাড়িতে এসব ছিল না। মাকে আমি আজ সন্ধ্যাবেলা সাফ জানিয়ে দিয়েছি। ’

সেদিন ভাস্কর খুব রেগে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘যা বোঝো না, তাই নিয়ে একদম কথা বলবে না। কাল সকালে মাকে গিয়ে স্যরি বলবে। ’

বিতান রেগে রেগে আরো কিছু বলছিল। সেসব কথা ওর কানে ঢুকল না। শ্রাবন্তী এবার উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘শোনো বিতান, আমি ক্ষমা চাইব না। সেটা গিয়ে তোমার সুকোমলদাকে জানিয়ে দিয়ো। আর তুমি কোনো দিন বলোনি যে আমার চাকরি রাখার জন্য সুকোমলদার কাছে ভিক্ষা চেয়েছিলে। ব্যাপারটা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। তবু যদি তা হয়েও থাকে তাতে আমার কোনো দায় নেই। কারণ আমার অনুমতি নিয়ে তুমি কাজটা করোনি। আমার কাছে তখন বললে আমি বারণ করতাম। ’

বিতানও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘তুমি তাহলে ক্ষমা চাইবে না? আমি বিপদে পড়ছি বুঝতে পেরেও ক্ষমা চাইবে না?’

‘তোমার বিপদ তুমি নিজেই ডেকে এনেছ। আমাকে না জানিয়ে তুমি আমাদের ব্যক্তিগত কথা অফিসের বসের কাছে বলেছ। তখন একবারও মনে হয়েছিল, কাজটা করার আগে শ্রাবন্তীকে অন্তত একবার জানিয়ে রাখি? এখন ‘আমার বিপদ আমার বিপদ’ বলে সহানুভূতি চাইছ কেন? তুমি একটা অন্যায় করেছ, তার শাস্তি পাচ্ছ। এখন চাইছ, তোমার শাস্তি ঠেকাতে আমি একটা অন্যায় করি। আমি সেটা করব না। ’

বিতান বাঁকা হাসল। বলল, ‘চমৎকার যুক্তি দিলে। সুকোমলদা ঠিক বলেছিল। সেদিন যখন তোমার হয়ে বলছিলাম, তিনি সাবধান করেছিলেন, ক্যারিয়ারের ব্যাপারে কোনো দিন মেয়েদের হেল্প করবি না। তোর মাথায় পা রেখে আরো ওপরে উঠে যাবে। আজ দেখছি, তিনিই ঠিক। আমি ভুল। ’

‘তোমার ওই শুভানুধ্যায়ীই কিন্তু তোমাকে বিপদে ফেলেছেন। আমি ফেলিনি। আমি তোমাকে ব্যবহার করে কোনো দিন ছুড়ে ফেলিনি। ফেলবও না। কিন্তু তিনি এক দিকে তোমাকে হিতোপদেশ দিচ্ছেন, অন্য দিকে ব্ল্যাকমেইল করছেন। বলছেন, তোমার চাকরি খাবেন এবং পরিবারকেও সব জানিয়ে দেবেন। সেটা ভেবেছ?’

‘তুমি, তুমি কী করছ? যখন প্রয়োজন ছিল, তখন আমার সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলেছ। এরপর যখন বুঝেছ, আমাকে দিয়ে কাজ উঠে গেছে, এবার বড় গাছে নৌকা বাঁধতে হবে, তখন গিয়ে সুকোমলদাকে ধরতে চেয়েছ। তিনি পোড় খাওয়া লোক। আমার মতো বোকা নন। তাই এখন তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছ। তোমার কি এমনি এমনি ঘর ভেঙেছে। অফিসে সবাই জানে তুমি কী জিনিস!’

শ্রাবন্তী এই অপমান হজম করতে পারল না। সকাল থেকে ঝড় চলছে। আজ বিকেলে ই-মেইলে শোকজের নোটিশ এসেছে। সেটা পড়ে ও বুঝেছে, আরো বড় বিপদ সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে। তার ওপর বিতান। তাই এবার ওর সংযমের বাঁধ ভাঙল। চিৎকার করে ও বলল, ‘বেরিয়ে যাও। আর কোনো দিন আমার কাছে আসবে না। ’

বিতানও আর থাকল না। নিজেই গিয়ে দরজা খুলল। বেরোনোর আগে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তোকে আমি দেখে নেব। ’

 

নয়.

পরদিন অফিসে গিয়ে শ্রাবন্তী দেখল, সবাই আরো বেশি বেশি করে ওকে এড়িয়ে চলছে। অহনার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। এত দিন তবু হাসি বিনিময় হতো। এবার অহনা মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। অভিজিেক দেখে ইচ্ছা করেই ও ঠাট্টা করে বলল, ‘কী অভিজিত্বাবু, শার্টটা তো ফাটাফাটি। কে কিনে দিল? বউ, না বান্ধবী?’

আগেও এমন ঠাট্টা হয়েছে। অভিজিৎও সুন্দর জবাব দিয়েছে, কিন্তু এবার অভিজিৎ কোনো উত্তর দিল না। এমনভাবে বিরক্ত হয়ে তাকাল, যেন গায়ে পড়া বদ ইয়ার্কি ও একেবারে পছন্দ করে না। বিতানকেও দেখতে পেল। এমনভাবে ঘুরছে-ফিরছে, যেন ওর সঙ্গে কোনো দিন কথাই হয়নি।

নিজের চেয়ারে বসে দূরে বসে কাজ করা বিতানকে দেখতে থাকল ও। মানুষ কী অদ্ভুতভাবে পাল্টে যায়! নাকি ভুল হলো। মানুষের ভেতরে কত স্তর থাকে। ওপরে শান্ত। কিন্তু কখনো কখনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ভেতরে জমে থাকা লাভার স্রোতের মতো বিষ বেরিয়ে আসে। তখন শান্ত প্রকৃতি তছনছ হয়ে যায়। আচমকা দেখলে অন্যরা অবাক হয়ে ভাবে, এই বিষ কোথায় ছিল?

কালকে রাতের বিতান আর গাদিয়ারার রূপনারায়ণের পারে বসে থাকা বিতান কি একই জন ছিল? সে প্রায় চার বছর আগেকার কথা। সেদিনের কথা ও কোনো দিন ভুলবে না। রনর স্কুল থেকে ওদের এক্সকারশনে নিয়ে গিয়েছিল। বিষ্ণুপুর। সেই সুযোগে দুই দিনের জন্য ওরা গিয়েছিল গাদিয়ারা। নদীর পারে ছিমছাম জায়গা। হুগলি আর রূপনারায়ণ নদী এসে মিশেছে সেখানে। জলের দুই রকম রং। তিন প্রান্তে তিন জেলা। একদিকে হাওড়া, অন্যদিকে মেদিনীপুর, আরেক কোণে উত্তর চব্বিশ পরগনা। মাঝে বিরাট সংগম। যেন এপার-ওপার দেখা যায় না।

দুজন যেদিন গাদিয়ারা গিয়েছিল, সেদিন ছিল পূর্ণিমা। সন্ধ্যার পর মাটির পায়ে চলা পথ ধরে দুজন গিয়ে বসেছিল নদীর ধারে। একটা গাছের নিচে। সামনে শুধু জল আর জল। সেই জলে জ্যোত্স্না এসে মিশেছে। কোথাও কেউ নেই। সেদিন ওই পরিবেশে বসে আনমনে গান গেয়েছিল শ্রাবন্তী। অনেক দিন পর। কোনো দিন গান শেখেনি ও, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ওর গলায় সুরেরা অনায়াসে খেলে বেড়ায়। সেই সন্ধ্যারাতে ও গেয়েছিল, ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...’

বিতান পুরো সময়টাই ওকে জড়িয়ে বসে ছিল। দুজনের শরীর-মন মিশে গিয়েছিল জ্যোত্স্নায়।

সেই মানুষটাই কি কাল সন্ধ্যারাতে এসে সুকোমল সেনগুপ্তর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছিল? হাসি পেল শ্রাবন্তীর।

একটা মেসেজ ঢুকল ওর মোবাইলে। ঈপ্সিতা পাঠিয়েছে, ‘আজ ছুটির পর পার্ক স্ট্রিটের মুখে এশিয়াটিক সোসাইটির সামনে দাঁড়া। কথা আছে। ’

শ্রাবন্তী বুঝল, ফিরতে দেরি হবে। ও মোবাইলে ধরল রনকে। বলল, ‘শোন, আমার আজ আসতে দেরি হবে। তুই দরজা ভালো করে লক করে পড়তে যাবি। আমি এসে খুলে ঢুকব। ’

রন শুধু বলল, ‘আচ্ছা। ’

ফোনটা ছেড়ে চুপ করে বসে থাকল শ্রাবন্তী। ছেলেটা বড় দুর্ভাগা। বাবা থেকেও নেই। মাকে সারা দিন পায় না। একা একা পড়তে যায়। বিকেলে একা একা খাওয়াদাওয়া করে। জামাকাপড় পরা থেকে বই গোছানো—সব নিজেকে করতে হয়। বারো বছরের ছেলের পক্ষে কাজটা তেমন সোজা নয়, কিন্তু শ্রাবন্তীর মতো রনও বোধ হয় বুঝতে পেরেছে, এভাবেই ওকে বড় হতে হবে।

হাতে কাজ না থাকলে হাজার চিন্তা মাথায় ঘোরে। শ্রাবন্তীর খেয়াল হলো, বাবা কিংবা ভাই আর একবারও ফোন করে ওর খোঁজ নেয়নি। সেই যে সেদিন ফোনের লাইন কেটে দিয়েছিল, তার পর থেকে বাবা আর একবারও ফোন করেনি। মেয়ে বাঁচল না মরল, সেই নিয়ে যেন তার কোনো ভাবনাই নেই। শ্রাবন্তী জানে, ভাইয়ের ফোন আসবে আরো দুই সপ্তাহ পরে। তখন বাবার হার্ট ও লিভারের ওষুধগুলো ফুরিয়ে আসবে। বাবা সরাসরি ফোন করে ওষুধ দিতে বলবেন না। ভাইকে দিয়ে বলাবেন।

শ্রাবন্তী মাঝেমধ্যে ভাবে, দুর্গাপুর তো আর আগের দুর্গাপুর নেই। এখন আরো অনেক ঝকঝকে। সেখানে কি এসব ওষুধ পাওয়া যায় না? এক-দুবার গিয়ে ওখান থেকেই ও ওষুধ কিনে বাবাকে দিয়েছে। তারপর ওর খেয়াল হয়েছে, ভাই ইচ্ছা করে কলকাতার ওষুধ চায়। তাহলে টাকাটা ওকে খরচ করতে হবে না। দিদির ঘাড় দিয়ে দাম উসুল হয়ে যাবে। তা ছাড়া বাবা তো ওর একার নয়। দিদিরও। তাহলে ও যদি চার বেলা বাবাকে দেখাশোনা করতে পারে, দিদি কেন হাজার সাতেক টাকার ওষুধ মাসে মাসে কিনে পাঠাবে না?

শ্রাবন্তী জানে, বিয়ের পর থেকে ভাই চূড়ান্ত হিসাবি হয়ে গেছে। মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের সব গয়না ও হস্তগত করেছে। যুক্তি দিয়েছে, ‘দিদি তো বিয়ের সময় অনেক পেয়েছে। বাকিটুকু আমার স্ত্রীর জন্য থাকুক। ’

বাবাও সেই মতকে সমর্থন করেছিলেন। শ্রাবন্তী তাতে আপত্তি করেনি। অবশ্য আপত্তি করলেও ভাই কিংবা বাবা শুনত না।

ভাইয়ের জন্য একেক সময় ওর করুণা হয়। বাবা কিছুতেই চাননি শ্রাবন্তী চাকরি করুক। কিন্তু ভাই যাতে সরকারি চাকরি পায়, তার জন্য বাবা খুব চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি কিছুদিন দিল্লিতে এক আত্মীয়র বাড়িতে ওকে রেখে ইউপিএসসি পরীক্ষায়ও বসিয়েছিলেন, যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের বড় চাকরি পায় ভাই। কিন্তু ভাই কোনো পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি। বাবার লাখ লাখ টাকা অপচয় হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাবার টাকায় ব্যবসা শুরু করেছে ও। প্রথমে করেছিল ছাতার ব্যবসা। ছয় মাসের মধ্যে সেই ব্যবসা ডুবল। তখনো ওদের বাড়িতে প্রায় সাত-আট শ ছাতা ডাঁই করে রাখা। পরে অনেককে ওরা ছাতা বিলিয়েছিল। কারণ না বিলালে সেই ছাতার কোনো হিল্লে করা যাচ্ছিল না। একসময় এমন হলো, কেউ আর ছাতা নিতে চায় না। এদিকে ওরা ছাতা দিতে পারলে বাঁচে। সেকি দড়ি টানাটানি!

এরপর ভাই কিছুদিন স্থানীয় এক গুঁড়া সাবান কম্পানির ডিলারশিপ নিল। তখন ওদের বাড়িতে সেই সাবান দিয়ে সব জামাকাপড় কাচা শুরু হলো। প্রথমেই বিগড়ে গেল ওয়াশিং মেশিন। মেকানিক এসে দেখেটেখে বলল, ‘সাবান পাল্টান। ওই সাবান ইটের মতো শক্ত ড্যালা পাকিয়ে নানা জায়গায় আটকে থাকছে। জল পাস করতে পারছে না। ’

সেই ব্যবসা লাটে উঠতে সময় লাগল না। তখনো বাবাকে লোক খুঁজতে বেরোতে হয়েছিল কয়েক বস্তা সাবান বিলানোর জন্য। কাজটা সহজ ছিল না। চেনাশোনা সবাই জানত সাবানের কীর্তি। তাই কেউ নিতে চায়নি। বাধ্য হয়ে অচেনা লোক খুঁজতে হয়েছিল বাবাকে।

দুটি ব্যবসা ফেল মারার পর ভাই এখন একজন প্রমোটারের ব্যবসায় টাকা খাটায়। কী রোজগার করে শ্রাবন্তী জানে না। তবে বাবা রোজ নিজের পেনশনের টাকায়ই সকালের বাজার করে থাকেন। ভাই এক টাকা ছোঁয়ায় না।

হঠাৎ ঈপ্সিতার ফোন এলো।

‘ওই রকম হাঁদার মতো মুখ করে বসে আছিস কেন? বেরিয়ে পড়। আমি যাচ্ছি। ’

শ্রাবন্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল।

এশিয়াটিক সোসাইটির সামনে পৌঁছে দেখল ঈপ্সিতা পিছু পিছু চলে এসেছে। দুজনে গিয়ে একটা কফি শপে বসল।

দুটি ক্যাপুচিনোর অর্ডার দিয়ে ঈপ্সিতা বলল, ‘শোন, আমি বেশি কথা বলব না। বেশিক্ষণ থাকবও না। কে কোথায় দেখে ফেলবে! এখন তোর সঙ্গে যে থাকবে, তাকেই সুনজরে দেখবে না কম্পানি। ’

‘তাহলে এলি কেন?’

‘এলাম, কারণ তুই বিপদে পড়েছিস। যত তাড়াতাড়ি পারিস কোনো লইয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ কর। সুকোমল সেনগুপ্ত কিন্তু তোকে পুঁতে ফেলার ব্যবস্থা করছেন। আর বিতানদার থেকে সাবধান। ’

‘এটা কেন বলছিস?’

‘আমি জানি বিতানদার সঙ্গে তোর অ্যাফেয়ার আছে, কিন্তু বিতানদা দিনের শেষে সুকোমলের দালাল। ওর হয়ে অনেক কাজ করে। আমি আগে জানতাম না। রিসেন্টলি জেনেছি। ’

কফি চলে এলো। দুজনে তাতে চুমুক দিল।

ঈপ্সিতা আরো কিছু বলত। হঠাৎ শ্রাবন্তীর মোবাইলে রনর ফোন। কাঁদো কাঁদো গলায় রন বলছে, ‘মা, তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি এসো! আমি আজ আর পড়তে যাব না!’

‘কেন রে, কী হলো?’ শ্রাবন্তী উদ্বিগ্ন হয়ে বলল।

‘আমি...আমি...বাবা ফোন করেছিল...ওরাও যা-তা কথা বলেছে মা...তুমি তাড়াতাড়ি এসো!’ রন অদ্ভুত বিকৃত গলায় বলতে থাকল।

দশ.

শ্রাবন্তী যখন ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পৌঁছল তখন নয়টা বেজে গেছে। রনর ফোন পাওয়ার পরই ও পার্ক স্ট্রিট থেকে প্রায় ছুটতে শুরু করেছিল। কিন্তু মেট্রো স্টেশনে গিয়ে দেখল, বেজায় ভিড়। কী ব্যাপার? জানা গেল, শোভাবাজার স্টেশনে কেউ মেট্রো রেলের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাই ট্রেন বন্ধ। কখন চালু হবে, তা-ও ঠিকমতো বলা যাচ্ছে না।

এমনিতেই পাতালরেলের স্টেশনগুলো বেশ গরম। এই পরিস্থিতিতে গিজগিজে ভিড়ে আরো গরম। শ্রাবন্তী বুঝল, এখানে দাঁড়িয়ে লাভ নেই। যা ভিড় তাতে ট্রেন এলেও ওঠা যাবে না। শুধু তো পার্ক স্ট্রিট নয়, সব স্টেশনে নিশ্চয়ই এমন গাদাগাদি ভিড় হয়েছে। অন্তত চার-পাঁচটা ট্রেন না গেলে এই ভিড় হালকা হবে না। ও তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে এলো। এসে দেখল সেখানেও প্রচুর লোক বাসের জন্য দাঁড়িয়ে। সারা কলকাতা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে মেট্রোর গোলমালে।

তখন শ্রাবন্তীর খেয়াল হলো, মেট্রো স্টেশনের দিকে ছুটে যাওয়ার সময়ও এমন ভিড় ছিল। ও খেয়াল করেনি। ভেবেছিল, কোনো মিছিলটিছিলের ভিড়।

কিন্তু এবার কী হবে?

বাসে প্রবল ভিড়। লোকে ঝুলছে। একটি-দুটি ট্যাক্সি আসছে। সেই গাড়িতে ওঠার জন্য প্রচুর লোক দৌড়াচ্ছে। ট্যাক্সির চালকরাও দর হাঁকছে ইচ্ছামতো। একজন তো টালিগঞ্জ যাওয়ার জন্য পাঁচ শ টাকা চাইল। দুজন যাত্রী তাতেই রাজি। দুজনেই পাঁচ শ টাকা করে দিয়ে টালিগঞ্জ যাবে। অ্যাপ ক্যাবের রেট কত মোবাইলে দেখল শ্রাবন্তী। সেই চার্জও আকাশছোঁয়া। ওর ফ্ল্যাট পর্যন্ত একটা ছোট গাড়ির ভাড়া বারো শ টাকা বলছে।

পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক বলেই ফেললেন, ‘এদের রেট দেখে মনে হচ্ছে টাকা রোজগার করতে হয় না। গাছে ফলে!’

শ্রাবন্তী ফিরবে কিভাবে? সবার আগে ও ফোন করল রনকে। বলল, ‘শোন, মেট্রো বন্ধ। আমি পার্ক স্ট্রিটে। যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরছি। তুই একদম ভাববি না। অন্য কেউ এলে দরজা খুলবি না। ’

রন শুধু বলল, ‘ঠিক আছে। ’

শ্রাবন্তী উপলব্ধি করল, কিছু গোলমাল হয়েছে। ছেলের গলা ঠিক সুবিধার ঠেকছে না, কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে হেঁটে বাড়ি ফেরা ছাড়া আপাতত আর কোনো উপায় নেই।

শ্রাবন্তী হাঁটা শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে এক্সাইডের মোড় পর্যন্ত এসে ও হাঁপিয়ে পড়ল। ব্যাগের ভারে কাঁধ টনটন করছে।

এর মধ্যে রন দুবার ফোন করেছে। জানতে চেয়েছে, ‘মা তুমি কত দূরে?’

দুবারই শ্রাবন্তী ভরসা দিয়েছে ছেলেকে। বলেছে, ‘এই আসছি। তুই চিন্তা করিস না। ’

এক্সাইডের মোড়ে এসে শ্রাবন্তী থামল। ওর ডান হাতে নন্দন চত্বর। বাঁ দিকে মিন্টো পার্ক। সব জায়গায়ই থিকথিকে ভিড় এবং গাড়ির জ্যাম।

হঠাৎ একটা চেনা গলা কানে এলো, ‘অ্যাই শ্রাবন্তী!’

ডাকটা কোথা থেকে এলো ও বুঝতে পারল না। এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, ওর সামনেই একটা ছোট গাড়ি থেমেছে। সেখান থেকে সুজাতা হাত নাড়ছে। সুজাতাকে দেখে ভারি অবাক হলো শ্রাবন্তী। ধীরে ধীরে ও এগিয়ে গেল গাড়িটার দিকে। সুজাতা ছিল ভাস্করের অফিস কলিগ। দুজনে একই ব্রাঞ্চে ছিল কয়েক বছর। সেই সময় সুজাতার সঙ্গে ভাস্করই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এবং দুজনের তখন ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হতো। সুজাতাই প্রথম ভাস্করের প্রেমের খবর দিয়েছিল। যে খবরের সূত্র ধরে ওদের ডিভোর্স। তারপর আর কখনো সুজাতার সঙ্গে দেখা কিংবা কথা হয়নি। এত বছর বাদে এই দুর্যোগের দিনে হঠাৎ সুজাতা কোত্থেকে উদয় হলো?

সুজাতা নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিল। ওকে পাশের দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘উঠে এসো। আজ আর কিছু পাবে না। ’

অন্য দিন হলে শ্রাবন্তী রাজি হতো না প্রস্তাবে, কিন্তু আজ ওর বিপদ। শ্রাবন্তী কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল।

সুজাতা গাড়ি স্টার্ট দিল।

রাস্তায়ও প্রবল ভিড়। গাড়ি ফার্স্ট আর সেকেন্ড গিয়ারে চলতে থাকল। তার মধ্যে সুজাতা জানতে চাইল, ‘কেমন আছ?’

‘ভালো। ’

‘বাই দ্য ওয়ে, তুমি কোথায় নামবে?’

‘তুমি কোথায় যাবে?’

‘বাঁশদ্রোণী। ’

‘আমাকে তাহলে রবীন্দ্রসরোবর মেট্রো স্টেশনের কাছে নামিয়ে দিয়ো। ’

‘আজকাল থাকছ কোথায়?’

‘সুইস পার্ক নার্সিংহোমের কাছে। ’

‘একা আছ? নাকি আবার বিয়ে করেছ?’

‘আমি আর ছেলে থাকি। ’

‘চাকরি করছ?’

‘হ্যাঁ। ’

সুজাতা রাস্তার দিকে তাকিয়েই কথা বলছিল। এবার থামল। একটু বিরতি দিয়ে বলল, ‘তুমি তো আর যোগাযোগই রাখলে না!’

‘রাখার মতো পরিস্থিতি হলো কোথায়?’

সুজাতা মাথা নাড়ল। বলল, ‘সব না হলেও কিছু কিছু জানি। তোমার ওপর দিয়ে ঝড় গিয়েছিল। অবশ্য ভাস্করের অবস্থা এখনো ভালো নয়। ’

‘ভালো নয় মানে?’

‘শুনেছি তো স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। ’

‘আবার?’

সুজাতা হেসে ফেলল। বলল, ‘হ্যাঁ, আবার। তবে ওর স্ত্রী অনিন্দিতাকে চিনতাম। সে তোমার মতো নিরীহ নয়। কেস ঠুকে দিতে পারে। জেলের ভাতও খাওয়াতে পারে। ভাস্কর তাই নিয়ে টেনশনে। তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি একদম? ছেলের খরচ দেয় না?’

‘না। ’

‘তুমি কোর্টে আপিল করোনি কেন?’

শ্রাবন্তী ম্লান হাসল। বলল, ‘আত্মসম্মানে লাগল। তা ছাড়া আমি চাই নিজের রোজগারে ছেলেকে মানুষ করতে। যে মানুষটাকে ঘেন্না করে বেরিয়ে এসেছি, তার টাকা হাত পেতে নিতে আমার আপত্তি আছে। ’

সুজাতা আর কথা বাড়াল না। শুধু রবীন্দ্রসরোবর মেট্রো স্টেশনের সামনে পৌঁছে গাড়ি থামাল। বলল, ‘তোমার নম্বরটা কি পেতে পারি?’

শ্রাবন্তী নিজের মোবাইল নম্বর দিল। বলল, ‘কিন্তু নিয়ে কী করবে?’

‘চারপাশে মাথা তুলে বাঁচার মতো মেয়ে বিশেষ দেখি না। তোমাকেই যা দেখেছিলাম। এত বছর বাদে দেখলাম, তুমি একই আছ। তাই যোগাযোগ রাখতে চাইছি। যদি না তোমার দিক থেকে কোনো আপত্তি থাকে। ’

শ্রাবন্তী হেসে ফেলল। বলল, ‘হোয়াটসঅ্যাপে পিং করে দিয়ো। আমিও ফোন করব। ’

সুজাতা বেরিয়ে গেল। শ্রাবন্তী ছুটল বাড়ির দিকে।

তিন-চারবার ডোরবেল বাজানোর পর রন দরজা খুলল। ভেতরে ঢুকে দেখল, একটা নাইট ল্যাম্প জ্বলছে। বাকি ফ্ল্যাট অন্ধকার।

ও গিয়ে জড়িয়ে ধরল রনকে। বলল, ‘কী হয়েছে বাবু?’

‘তোমার অফিসে কী হয়েছে মা?’

‘কেন, বল তো?’

‘আমার স্কুলে কেউ তোমাকে নিয়ে খারাপ খারাপ খবর দিয়েছে। ক্লাসে দুটি ছেলে সপ্তর্ষি আর অভিরূপ নোংরা কথা বলছিল। ’

‘কী বলছিল?’

‘সে খুব খারাপ কথা। ’

‘তবু বল!’

‘বলছিল,’ রন ইতস্তত করল, ‘বলছিল, তোর মায়ের রেট কত?’

অন্ধকারে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল শ্রাবন্তীর। তবু শান্ত গলায় ও বলল, ‘তুই কী বললি?’

‘আমি জিওমেট্রি বক্স দিয়ে অভিরূপের মাথায় জোরে মেরে দিয়েছি মা। আমার নামে ওরা কমপ্লেইন করেছে মিস চ্যাটার্জিকে। তিনি খুব বকেছেন। বোধ হয় গার্ডিয়ান কলও হবে। তারপর বিকেলে বাবা ফোন করেছিল। ’

‘বাবা কী বলল?’

‘বলল, রন, বাবা তুই আসবি আমার কাছে? আমি আর তোর ঠাকুরমা একা থাকি। ঠাকুরমা খুব তোর কথা বলছে। তোর মা তো খারাপ কাজ করছে বাবা। কী আর বলব! বড় হলে বুঝবি। তুই চলে আয় আমার কাছে। ’

‘তুই কী বললি?’

‘আমি বললাম, আমি মায়ের কাছেই থাকব। বাবা তবু নানা কথা বোঝাতে থাকল। তখন বললাম, ঠিক আছে, মা আসুক। মাকে সব বলব। মা যদি যেতে বলে, যাব। এরপর বাবা ফোন রেখে দিয়েছে। ’

শ্রাবন্তী আরো জোরে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরল।

রন হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, ‘কাল আমি স্কুলে যাব না মা। তোমার অফিসে কি খারাপ কিছু হয়েছে? ওরা তোমার নামে এসব কেন বলছে?’

শ্রাবন্তী হাত বাড়িয়ে আলো জ্বালল। ছেলের সামনে নিচু হয়ে বসল। রনর চোখ মুছিয়ে বলল, ‘আমার দিকে তাকা। ’

রন তাকাল মায়ের চোখের দিকে। শ্রাবন্তী বলল, ‘শোন রন, তোর মা এমন কোনো কাজ করেনি এবং করবে না, যার জন্য তোকে অসম্মান নিয়ে বাঁচতে হবে। কাল আমি তোর স্কুলে যাব। তুই তখন থাকবি আমার সঙ্গে। দরকার হলে শুধু মিস চ্যাটার্জি নয়, আমি তোদের প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলব। ’

ছেলে জড়িয়ে ধরল মাকে।

এমন সময় শ্রাবন্তীর মোবাইল বেজে উঠল। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে ও দেখল অচেনা নম্বর। সেই ফোন ধরতে ওপাশ থেকে জড়ানো গলায় কেউ বলল, ‘শ্রাবন্তী?’

‘বলছি। ’

‘নেক্সট উইকএন্ডে তাজপুর যাব। দুই রাতের ট্রিপ। আমরা চারজন থাকব। তাই বুকিং করতে ফোন করেছি। কত নেবে?’

 

এগারো.

রনর স্কুল থেকে শ্রাবন্তী বেরিয়ে এসে ঘড়ি দেখল। দুপুর বারোটা। মাথার ওপর ঝাঁ ঝাঁ রোদ। শরীর ঝলসে যাচ্ছে। তবু হালকা স্বস্তি পেল ও।

সকালে উঠে ও স্কুলের পুল কারের ভদ্রমহিলাকে জানিয়ে দিয়েছিল, আজ গাড়ি লাগবে না। রনকে নিয়ে ও নিজেই স্কুল যাবে। সেইমতো বেরিয়েছিল দুজন। দক্ষিণ কলকাতার নামি স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করেছে শ্রাবন্তী। এখানে প্রিন্সিপালের সঙ্গে চাইলেই হুট করে দেখা করা যায় না। আগে দেখা করার কারণ জানাতে হয়। তিনি যদি মনে করেন সেই কারণ যথাযথ, তখন একটা নির্দিষ্ট সময় দিয়ে থাকেন। তখনই শুধু দেখা করা যায়।

কিন্তু শ্রাবন্তীর হাতে অত সময় নেই। রনর মানসিক অবস্থা ভালো নয়। ও কিছুতেই স্কুলে যেতে চাইছে না। এই পরিস্থিতিতে অপেক্ষা করা মানে ছেলের ক্ষতি। শ্রাবন্তী তাই সরাসরি স্কুলে হাজির হলো। কথা বলল অফিসে। কিন্তু অফিস থেকে সেই চিরাচরিত পদ্ধতির কথা জানিয়ে দেওয়া হলো।

কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না শ্রাবন্তী। এদিকে ছেলে কিছুতেই ক্লাসে ঢুকবে না। মিস চ্যাটার্জির ভয় এবং বাকি ছেলেদের আচরণের জন্য ও বাড়িতে থাকতে চাইছে।

শ্রাবন্তী পড়ল দোটানায়। হঠাৎ ও দেখতে পেল প্রিন্সিপাল আসছেন। মোবাইলে কারো সঙ্গে কথা বলতে বলতে। শ্রাবন্তী দৌড়ে গেল তাঁর কাছে। একজন ভদ্রমহিলাকে ওভাবে ছুটে আসতে দেখে প্রিন্সিপাল থমকে গেলেন।

শ্রাবন্তী তখন মরিয়া। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘স্যার, আপনার সঙ্গে আমার জরুরি দরকার। আমার ছেলেকে কাল যা-তা বলা হয়েছে। ও ক্লাস করতে চাইছে না। আপনি প্লিজ পাঁচ মিনিট সময় দিন। ’

প্রিন্সিপাল মোবাইলের ওপাশের কাউকে বললেন, ‘পরে কথা বলছি। ’

তারপর শ্রাবন্তীর দিকে ঘুরে বললেন, ‘এখন কথা বলতে পারব না। তবে আপনি যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন তাহলে পারব। ’

‘আমি অপেক্ষা করব। আমার নাম শ্রাবন্তী রায়। আমার ছেলের নাম অমিতাভ বসু। ’

প্রিন্সিপাল মাথা নেড়ে চলে গেলেন। শুধু বললেন, ‘ওকে ক্লাসে পাঠান। আমি যা বলার বলে দেব। আপনার সঙ্গে কথা বলার আগে ওকে কেউ ডিস্টার্ব করলে সেটা আমার দায়িত্ব। ’

রনকে বুঝিয়েসুঝিয়ে ক্লাসে পাঠাল শ্রাবন্তী। তারপর ঠায় বসে থাকা। অনেকক্ষণ পর প্রিন্সিপালের রুমে ওর ডাক পড়ল। গেল শ্রাবন্তী।

প্রিন্সিপাল একাই ছিলেন। হাতের ইশারায় ওকে বসতে বললেন।

এবার শ্রাবন্তী একে একে সব কথা বলল। ডিভোর্সের কথা। চাকরির কথা। সুকোমল সেনগুপ্তর কথা। ডায়েরির কপিও দেখাল। তারপর গতকাল স্কুলে যা যা হয়েছে, তা-ও বলল।

প্রিন্সিপাল সব শুনলেন। গম্ভীরভাবে। তারপর ইন্টারকমে কাউকে ইংরেজিতে বললেন, ‘মিসেস চ্যাটার্জির এই পিরিয়ড অফ। ওঁকে একবার আমার ঘরে পাঠাও তো। ’

মিনিট দুয়েকের মধ্যে ভদ্রমহিলা এলেন। প্রিন্সিপাল সংক্ষেপে পুরো ঘটনা তাঁকে বললেন।

মিসেস চ্যাটার্জি আমতা আমতা করে বললেন, ‘অ্যায়াম স্যরি মিসেস রায়। আমি এত কিছু জানতাম না। আমি দেখব অমিতাভের যাতে আর কোনো অসুবিধা না হয়। কিন্তু বুঝতেই তো পারছেন, জিওমেট্রি বক্স দিয়ে মাথায় মারাটা...’

ঘাড় নাড়ল শ্রাবন্তী।

এবার প্রিন্সিপাল বললেন, ‘আপনি লিগ্যাল ব্যাটেল চালিয়ে যান। অমিতাভ আমাদের স্টুডেন্ট। আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। ওর মেন্টাল হেলথের দিকে আমরা নজর রাখব। সবার আগে জানার দরকার ওই ছেলে দুটি এই খবর পেল কোত্থেকে। মিসেস চ্যাটার্জি, আপনি ব্যাপারটা দেখবেন তো!’

‘ওকে স্যার,’ মাথা নাড়লেন মিসেস চ্যাটার্জি।

রোদের মধ্যে অফিসে রওনা দিল শ্রাবন্তী। আজও দেরি হবে। দিন কয়েক ধরে বড্ড ধকল যাচ্ছে। এখন ওর কাহিল লাগছে।

অফিসে ঢোকার মুখে ঈপ্সিতার সঙ্গে দেখা। কোথাও বেরোচ্ছিল। ওকে দেখে বলল, ‘এখন ঢুকছিস! লইয়ারের কাছে গিয়েছিলি?’

ওড়না দিয়ে মুখ মুছল শ্রাবন্তী। বলল, ‘নাহ। ছেলের স্কুলে। ’

ঈপ্সিতা অবাক হলো। এবার শ্রাবন্তী সবটাই বলল। এমনকি তাজপুর যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে উড়ো ফোন পর্যন্ত। সব শুনে ঈপ্সিতা কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু বলল, ‘তুই অফিসে ঢোক। আমি একটা কাজে যাচ্ছি। ’

ঈপ্সিতার সেই চলে যাওয়ার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকল শ্রাবন্তী। এই মেয়েটাও বোধ হয় পালাল। এর পর থেকে ঈপ্সিতা এড়িয়ে চলবে ওকে। গুটি গুটি পায়ে শ্রাবন্তী অফিসে ঢুকল। আজকাল অফিস করতে একদম ভালো লাগে না। কোনো কাজ নেই। শুধু বসে থাকা। ওদিকে শোকজের জবাব দিতে হবে। আগামীকালের মধ্যে। কী লিখবে তার মকশো করা দরকার।

নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল ও। কম্পিউটার চালু করল। এমন সময় ওর মোবাইলে ফোন এলো। সেই ফোন ধরতে ওপাশ থেকে বলল, ‘শ্রাবন্তী? তুমি কী কী সার্ভিস দাও? নুরু ম্যাসাজ করো?’

‘কে বলছেন?’ শ্রাবন্তী চিৎকার করে উঠল, ‘আমি কিন্তু পুলিশে কমপ্লেইন করব!’

ওপাশের লাইন কট করে কেটে গেল। আর শ্রাবন্তী দেখল, অফিসের সবাই হাঁ করে তাকিয়ে ওর দিকে। মাথা নামিয়ে নিল ও। কেউ একজন ফুট কাটল, ‘এবার কার নামে ডায়েরি করবে?’

কে ব্যঙ্গ করল, শ্রাবন্তী ধরতে পারল না।

দুপুর পর্যন্ত ও বসেই থাকল। একফাঁকে ক্যান্টিনে গিয়ে খেয়ে এলো। বিকেল তিনটা নাগাদ দিতিপ্রিয়ার ফোন এলো, ‘শ্রাবন্তী, একবার আসবেন?’

‘কোথায়?’

‘মিটিংরুমে। যেখানে আমরা কথা বলেছিলাম। ’

শ্রাবন্তীর বুক গুড়গুড় করে উঠল। আবার জেরা! তবু ও উঠে পড়ল। গেল মিটিংরুমে। না গিয়ে তো উপায় নেই।

সেখানে দিতিপ্রিয়া ছাড়া আগের দুই ভদ্রলোক যথারীতি দুই পাশে বসা।

শ্রাবন্তীকে দেখে দিতিপ্রিয়া বললেন, ‘আপনি তো শোকজের জবাব দিলেন না!’

‘এখনো তো সময় আছে। কাল পর্যন্ত। ’

‘তা আছে। তবে আপনার এগেইনস্টে নতুন অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগ ঠিক নয়, প্রমাণ। দিয়েছেন সুকোমল সেনগুপ্ত। ’

‘কিসের প্রমাণ?’

‘সুকোমলবাবু তো আগেই অভিযোগ করেছিলেন, আপনি শরীর ব্যবহার করে অফিস কলিগদের কাছ থেকে ফায়দা তোলেন। যেমন তুলতে চেয়েছিলেন তাঁর কাছ থেকেও...’

‘এক মিনিট,’ শ্রাবন্তী বাধা দিল, ‘আমাকে সেক্সুয়ালি মোলেস্ট করা হলো। আমি তার অভিযোগ করলাম। সেই অভিযোগের কী সুরাহা হলো?’

‘আপনার অভিযোগের এখনো কোনো প্রমাণ নেই শ্রাবন্তী রায়,’ দিতিপ্রিয়ার বাঁ পাশের ভদ্রলোক বললেন, ‘কিন্তু আমরা যে প্রমাণ দেব, সেটা অকাট্য। ’

‘কিসের প্রমাণ?’

দিতিপ্রিয়া টেবিলে রাখা ফাইল খুললেন। সেখান থেকে একটা ছবি বের করে শ্রাবন্তীর সামনে তুলে ধরলেন। সেই ছবির দিকে তাকিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল শ্রাবন্তী। গাদিয়ারা ট্রিপে ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তে একটি-দুটি ছবি তুলেছিল বিতান। বলেছিল, ‘এটা আমি স্মৃতি হিসেবে রেখে দেব। বুড়ো বয়সে দেখব আর ভাবব এই সব দিনের কথা। ’

এখন দিতিপ্রিয়া দত্তগুপ্তর হাতে তেমনই একটা ছবি। দিতিপ্রিয়া বললেন, ‘সুকোমলবাবুর মতো বিতানও কিন্তু একই কথা বলেছে। বলেছে যে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনি ব্যবহার করেছিলেন ওকে। এবং তখন বিতানকেও নিজের জালে জড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন হোটেলের রুমে। ’

শ্রাবন্তী কোনো কথা বলতে পারল না। ধীরে ধীরে ওর মাথা নুয়ে এলো। শ্রাবন্তী বুঝতে পারল, এই যুদ্ধে ও হেরে গেছে।

দিতিপ্রিয়া বললেন, ‘আপনি কম্পানির অনেক ক্ষতি করেছেন। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বহু মানুষেরও ক্ষতি করেছেন। আমরা চাইলে আপনার এগেইনস্টে লিগ্যাল অ্যাকশন নিতে পারি, কিন্তু আমরা তা নিচ্ছি না। আপনি এবার দ্রুত রিজাইন করুন। আপনার যা পেমেন্ট সব দিয়ে দেওয়া হবে। তিন মাসের বেসিকসহ। এক্সপেরিয়েন্স সার্টিফিকেটও দেব। কিন্তু মনে রাখবেন, কোনো চালাকি করতে গেলে আমরা কোর্টে যাব এবং এসব এভিডেন্স জমা দেব। সেটা আপনার কিংবা আপনার সন্তানের পক্ষে ভালো হবে না। ’

শ্রাবন্তী আর মাথা তুলে দিতিপ্রিয়ার দিকে তাকাতে পারল না।

একসময় দিতিপ্রিয়া বললেন, ‘এবার আপনি যেতে পারেন। ’

ক্লান্ত পায়ে উঠে দাঁড়াল শ্রাবন্তী। বেরিয়ে এলো মিটিংরুম থেকে। হঠাৎ ওর মনে হলো, সব ভুল ভুল ভুল...

বারো.

নিজের চেয়ারে ফিরে ব্যাগটা নিল শ্রাবন্তী। অবশ্য নিজের চেয়ার বলে তো আর কিছুই থাকল না। কম্পিউটার অফ করল। একবার চোখ বোলাল সারা ফ্লোরে। তারপর মন্থর পায়ে বেরিয়ে এলো। লিফটের কাছাকাছি পৌঁছে বিতানের সঙ্গে দেখা। বিতান কোথাও গিয়েছিল। হন্তদন্ত হয়ে লিফট থেকে বেরোচ্ছে। শ্রাবন্তীর মুখোমুখি হতে থমকে গেল। মাথা নিচু করল।

শ্রাবন্তী কোনো কথা বলল না। ভাবলেশহীন মুখে ওর পাশ দিয়ে গিয়ে লিফটে উঠল। লিফট নিচে নামছে। শ্রাবন্তী শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকল লিফটের দরজার কাচে। সেখানে নিজের ক্লান্ত মুখ দেখা যাচ্ছে। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে শ্রাবন্তীর চোখে ভেসে উঠল গাদিয়ারার ছবি। সঙ্গে খানিক আগে দেখা বিতানের মুখ।

অনেক কথা মনে পড়ল শ্রাবন্তীর। চাইলে এখনই বিতানের স্ত্রীর কাছে গিয়ে ও সব বলতে পারে। বলতে পারে, কিভাবে দুজনে গাদিয়ারা গিয়েছিল। বলতে পারে, কিভাবে বিতান ব্যবহার করেছে শ্রাবন্তীকে। তারপর নিজের চাকরি বাঁচাতে ওকেই এভাবে গোটা অফিসের সামনে হেয় করেছে।

কিন্তু শ্রাবন্তী জানে, ও কোনো দিন এই কাজ করবে না। এটা করার মানসিকতা থাকলে তো ভাস্কর এবং ওর মায়ের বিরুদ্ধেই ফোর নাইনটিএইট ধারায় মামলা করত। নির্ঘাত জেল হতো দুজনের। কিংবা ডিভোর্সের পর এত কষ্ট করে চাকরি না করে মোটা খোরপোশ আদায় করতে পারত। তাতেও পায়ের ওপর পা তুলে জীবন কাটানো যেত। ছেলেকে সময় দেওয়া যেত।

কোনো দিনই সেই রাস্তা নেয়নি শ্রাবন্তী। আজও নেবে না।

অফিস থেকে বেরিয়ে কড়া রোদে এসে দাঁড়াল ও। শেষ হলো এখানকার পালা। এবার আবার নতুন চাকরি খুঁজতে হবে। কবে পাবে কিংবা আদৌ পাবে কি না ও জানে না। কিন্তু কিছু তো একটা করতে হবে। না হলে ছেলেকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। যে কথা প্রথম দিন থানার সেই অফিসার বলেছিলেন।

শ্রাবন্তী হাঁটতে হাঁটতে এলিয়ট পার্কে এলো। অনেক দিন এই পার্কে আসা হয়নি। শেষ এসেছিল রনকে নিয়ে। বছর পাঁচেক আগে। পার্কটা বেশ ছিমছাম। সেখানে ছায়া ছায়া জায়গা দেখে ও বসল। খুব গরম। হাওয়াও তেমন নেই। বিজবিজে ঘাম হচ্ছে। তবু এক্ষুনি বাড়ি ফেরার ইচ্ছা ওর নেই।

শ্রাবন্তী যেন আবার দেখতে পেল দিতিপ্রিয়া দত্তগুপ্তকে। হাতে সেই ছবি। ঠোঁটে বাঁকা হাসি। বিতান কিভাবে ওই ছবি তুলে দিতে পারল সুকোমল সেনগুপ্তর হাতে? তখন ওর একবারও কি মনে হলো না যে শ্রাবন্তীর চাকরি গেলেও এই অফিসে ওকে থেকে যেতে হবে। এসবের জের মিটে গেলে বাকি কলিগদের সামনে ওর সম্মান কোথায় গিয়ে ঠেকবে? কিংবা আগামী দিনে ওই ছবি ওর স্ত্রীকে পাঠানোর ভয় দেখিয়ে সুকোমল সেনগুপ্ত আরো কত বেআইনি কাজ ওকে দিয়ে করিয়ে নেবে! মানুষটা এত নির্বোধ? নাকি চাকরি বাঁচাতে বেপরোয়া?

শ্রাবন্তীর খুব কান্না পাচ্ছিল, কিন্তু ও নিজেকে সামলাল। কিছুতেই চোখের জল বের করবে না। যেদিন সুজাতা প্রথম ইতস্তত করে খবর দিয়েছিল, ‘ভাস্করের সঙ্গে অনিন্দিতার অ্যাফেয়ার চলছে। তুমি সাবধান হও। ’ সেদিনও ছিল এমনই গরমকালের দুপুর। শোবারঘরের জানালায় বসে ও বাইরের নারকেলগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। চুপচাপ। সেদিনও খুব কান্না পাচ্ছিল ওর। ভাস্করের অন্য    মহিলায় আসক্তি তো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে নারী হিসেবে ওর ব্যর্থতা। তাহলে ওর কী করা উচিত? ঝাঁপিয়ে পড়ে বাধা দেবে? নিজের ভেতর থেকে সেদিন সায় পায়নি শ্রাবন্তী। এভাবে কাউকে আটকানো যায় না। হয়তো ওর চাপাচাপিতে অনিন্দিতার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙবে। কিন্তু আবার নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠতে কতক্ষণ? সমস্যা তো বাইরে নয়, ভেতরে। অতএব যা করার ভেতর থেকেই করতে হবে। বাইরে ঢিল ছুড়ে লাভ নেই।

তাই সেদিনও কাঁদেনি শ্রাবন্তী। বরং মনকে শক্ত করেছে সাতপাকের বাঁধন কাটার উদ্দেশ্যে।

কিন্তু বিতানের আঘাত আরো তীব্র। সেটা শুধু ওর ব্যক্তিগত ছবি অফিসের সবার সামনে তুলে ধরার জন্য নয়। ভাস্করের সঙ্গে ওকে জুতে দিয়েছিলেন বাবা। সেখানে ওর পছন্দ-অপছন্দ কাজ করেনি। কাজ করেছিল বাবার ইচ্ছাটুকু। কিন্তু বিতানের সঙ্গে সম্পর্ক তো তা নয়। বিতানকে সর্বস্ব দিয়ে ও ভালোবেসেছিল। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল বিতানের কাছে। ধরেই নিয়েছিল এই সম্পর্কে নোঙর ফেলেই বাকি জীবন কাটাবে।

সেদিন বিতানের সঙ্গে তুমুল অশান্তির পর ওর খারাপ লেগেছিল। অফিসে বিতানকে এড়িয়ে যেতে দেখে মনে মনে ঠিক করেছিল, দিন সাতেক বাদে নিজেই গিয়ে বিতানকে ধরবে। ওর মান ভাঙাবে, কিন্তু তার মধ্যে সব চুরমার হয়ে গেল।

নিজের জীবনের দিকে তাকাল শ্রাবন্তী। কে থাকল ওর পাশে? বাবা-ভাই নেই। বিতান নেই। অফিসের কলিগরাও নেই। থাকার মধ্যে রয়েছে শুধু রন। সে এখনো মায়ের পাশ থেকে সরে যায়নি। ভাস্কর টোপ দিয়েছিল। রন ফিরিয়ে দিয়েছে। শ্রাবন্তী জানে, ভাস্কর সহজে থামবে না। অনিন্দিতার কাছ থেকে ঘাড়ধাক্কা খাওয়ার পর ওর টনক নড়েছে। এত দিনে ছেলের প্রতি ভালোবাসা উথলে উঠেছে। তারপর শ্রাবন্তীর একটা দোষ খুঁজে পেতে ও কোমর বেঁধে নেমেছে। প্রথম ফোন করেছিল বাবাকে। ভাস্কর বিলক্ষণ জানে, শ্বশুর ওর প্রতি দুর্বল। তাই প্রথম কাঁদুনি ওখানে গিয়ে রেখেছে। এবার ছেলেকে ধরবে। প্রয়োজন হলে ফের আদালতে যাবে।

মুশকিল হলো, ভাস্কর ভালো চাকরি করে। টাকার অভাব নেই। শ্রাবন্তীর চাকরি গেছে। হাতে জমানো টাকাও বিশেষ নেই। থাকবে কোত্থেকে? বাড়িভাড়া। রনর স্কুলের মোটা মাইনে। পুল কারের টাকা। কোচিং সেন্টারের মাইনে। নিজেদের খরচ। বাবার ওষুধের দাম। কখনো কখনো আরো কিছু জিনিস পাঠাতে হয়। এত করে কি টাকা জমে? কত টাকাই বা মাইনে পায়, থুড়ি পেত? এখন তো সেটাও বন্ধ হচ্ছে।

ব্যাগের মধ্যে শ্রাবন্তীর মোবাইল বেজে উঠল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মোবাইল নিয়ে ও দেখল আবার অচেনা নম্বর। এবার দাঁতে দাঁত পিষল। আবার সেই নোংরা প্রস্তাব আসবে! এটাও বোধ হয় সুকোমল সেনগুপ্তর কারসাজি। ও একবার ভাবল ফোন ধরবে না, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করল। ও পিছিয়ে গেলে সুকোমল আরো চেপে ধরবে। তাই নিজেকে প্রস্তুত করে ও ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে রিনরিনে গলা বলল, ‘কি ম্যাডাম, অফিসে? ভুল সময়ে ফোন করলাম?’

‘কে বলছেন?’ গম্ভীর গলায় বলল শ্রাবন্তী।

ওপাশের মহিলা থমকে গেল। বলল, ‘নম্বর সেভ করোনি! আমি কিন্তু পিং করেছিলাম। ’

হেসে ফেলল শ্রাবন্তী। বলল, ‘সুজাতা!’

‘যাক। তবু চিনেছ। খবর কী? অফিসে?’

‘নাহ। এলিয়ট পার্কে বসা। ’

‘এই রে। ভুল সময়ে ফোন করলাম। তুমি এনজয় করো। আমি পরে করছি। ’

‘তুমি যা ভাবছ, তা নয়,’ ম্লান হাসল শ্রাবন্তী, ‘একটু আগে আমার চাকরি গেছে। এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে কী করব। তাই চুপচাপ বসে আছি। ’

সুজাতা হতভম্ব হয়ে গেল। অস্ফুটে বলল, ‘চাকরি গেছে? মানে? তুমি কি বেটার কোথাও কিছু পেলে?’

‘না, না। চাকরি গেছে। ’

‘সেকি! কেন?’

‘সে অনেক কথা। ’

‘আমি শুনতে চাই। ’

‘তোমার অফিস নেই?’

‘আমি এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে দার্জিলিং এসেছি। ফিরব সামনের রবিবার। সোমবার কি তোমার সঙ্গে বসা যায়?’

‘তাতে আর কী এমন অসুবিধা? আমার হাতে এখন অফুরন্ত সময়। কলকাতার বাজারে তো চাকরি নেই। এবার অন্য কোথাও কিছু খুঁজতে হবে। ’

সুজাতা বলল, ‘এই পরিস্থিতিতে তোমাকে আরো একটা খবর দিয়ে রাখি। তোমার ছেলের বাবা এখন শ্রীঘরে। ’

‘কেন?’

‘ওর স্ত্রী থানায় মানসিক টর্চারের অভিযোগ এনেছে। আজই অ্যারেস্ট হয়েছে। এটা নন-বেইলেবল অফেন্স। মানে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেতে হবে। সময় লাগবে। তত দিন হাজতে কাটাতে হবে। সেটা বলতেই তোমাকে ফোন করেছিলাম। লোকটা তোমার জীবন নষ্ট করেছে। ’

শ্রাবন্তী নিজের মনে হাসল। কার জীবন যে কে নষ্ট করে!

তেরো.

বিকেল বিকেল বাড়ি ফিরল শ্রাবন্তী। রন একটু আগেই স্কুল থেকে এসেছে। মাকে দেখে অবাক। বলল, ‘এখন চলে এলে?’

‘আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম। ’

‘কেন?’

‘অন্য প্ল্যান আছে। ’

‘এটা নিয়েই কি বাবা বলছিল?’

‘তোর বাবা এখন জেলে। ’

রন হাঁ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

শ্রাবন্তী হয়তো খবরটা এভাবে ছেলেকে দিত না। কিন্তু ভাস্কর যেভাবে ছেলেকে হস্তগত করতে চাইছে তাতে চেক ভালভ না বসালে যেকোনো দিন রন হাতছাড়া হয়ে যাবে।

এবার ছেলের চুলে বিলি কেটে ও বলল, ‘চিন্তা করিস না। কয়েক দিন বাদেই ওরা তোর বাবাকে ছেড়ে দেবে। ’

‘কিন্তু জেলে কেন?’

‘বড় হলে বুঝবি। সব কিছু কি এত অল্প বয়সে বোঝা যায়?’

রন আর কথা বাড়াল না।

শ্রাবন্তী বাথরুমে গিয়ে ভালো করে স্নান করল। সবার আগে হিসাব-নিকাশ করা দরকার। হাতে কয় মাসের রসদ আছে! তার মধ্যে তো ওকে নতুন কিছু খুঁজে নিতে হবে। না পারলে তখন ভাববে বাবার দ্বারস্থ হবে কি না। কিন্তু সেই রকম কোনো ইচ্ছা ওর নেই।

একটু বাদে রন পড়তে চলে গেল। শ্রাবন্তী কাজ নিয়ে বসতে গিয়েও পারল না। বড় ক্লান্ত লাগল। বোধ হয় দুপুরের রোদ লেগে হয়েছে।

তাই সিলিং ফ্যান চালিয়ে ও ঘুমিয়ে পড়ল বসার ঘরের সোফায়। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল খেয়াল নেই। ডোরবেলের শব্দে ঘুম ভাঙল। কেউ জোরে জোরে ডোরবেল বাজাচ্ছে।

ধড়ফড় করে উঠে ও গিয়ে দরজা খুলল। দেখল ঈপ্সিতা এসেছে। খানিক বিরক্ত হয়েই ঈপ্সিতা বলল, ‘কিরে, কখন থেকে বেল বাজাচ্ছি!’

‘ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ’

‘তুই কি কোনো লইয়ারের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিস?’

হাই তুলে মাথা নাড়ল শ্রাবন্তী।

ঈপ্সিতা ভেতরে ঢুকে একটা কার্ড এগিয়ে দিল। বলল, ‘এই ভদ্রলোকের নম্বরে ফোন কর। অম্বরীশ চৌধুরী। থাকেন ঢাকুরিয়ায়। আজ পারলে আজই যা। গিয়ে সবটা খুলে বল। ’

শ্রাবন্তী এসে সোফায় বসল। এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। বলল, ‘চা খাবি?’

‘খেতে পারি। ’

শ্রাবন্তী গিয়ে চা আর ডিমের অমলেট করে আনল। ঈপ্সিতা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘এখনই ফোনটা কর না। ’

শ্রাবন্তী হাসল। বলল, ‘লাভ নেই। ট্রেন বেরিয়ে গেছে। আমি কাল গিয়ে রেজিগনেশন দেব। ’

‘মানে!’

‘তুই বোধ হয় সবটুকু জানিস না’, শ্রাবন্তী বলল।

ঈপ্সিতা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। শ্রাবন্তী তখন একটু একটু করে সব বলল। কিছু লুকাল না। শুনে খানিকক্ষণ কথা বলতে পারল না ঈপ্সিতা।

অনেকক্ষণ পর ও বলল, ‘সুকোমল-দিতিপ্রিয়া-বিতানরা এত নিচে নেমে গেছে? এটা অফিস না খোঁয়াড়! আমার তো ভাবতেই গা ঘিনঘিন করছে। এখানে তো আমার পক্ষেও চাকরি করা নিরাপদ নয়। ’

‘তোর কিসের সমস্যা। তোর সঙ্গে তো প্রদীপের ভালো সম্পর্ক। আমার জীবনই ভাঙাচোরা। আমি বিতানকে বিশ্বাস করেছিলাম। ভুল আমারই। ’

‘এটাকে ভুল বলে না। এটা অন্যায়। একটা মেয়েকে ব্যবহার করতে না পেরে তাকে সবাই মিলে পিষে মারল। দিতিপ্রিয়া দত্তগুপ্ত মেয়ে হয়ে কী করে এই কাজ করতে পারল?’

‘শোন, ওই চেয়ারের কোনো ছেলে-মেয়ে হয় না। চেয়ার চেয়ারই। ’

‘তবু বলব, তুই একবার লইয়ারের সঙ্গে কথা বল। তোর তো হারানোর কিছু নেই। ’

শ্রাবন্তী চায়ে চুমুক দিল। বলল, ‘করে কী করব? মামলা? ওরা দুঁদে লইয়ার দেবে। আমি খরচ চালাতে পারব না। তা ছাড়া তুই জানিস না, খারাপ প্রস্তাব দিয়ে উড়ো ফোন আসছে। ’

‘থানায় জানিয়েছিস?’

‘নাহ। জানিয়ে কিছু হবে না। নির্ঘাত কোনো বাতিল সিম থেকে ফোন করছে। কিংবা ফোন করে সিম ফেলে দিচ্ছে। এর পেছনে বড় চক্র রয়েছে। ’

‘এখন তাহলে কী করবি?’

‘নতুন চাকরি খুঁজব। ’

‘নতুন চাকরি কি মালদার ফজলি আম? বাজারে যাবি আর কিনে আনবি? তা চেয়ে বরং হাতের পাখিটাকে ঠিক রাখার চেষ্টা কর। ’

‘আমার পক্ষে ওই অফিসে আর চাকরি করা সম্ভব নয়,’ শ্রাবন্তী অধৈর্য হয়ে বলল, ‘অফিস কলিগরা ওই সব ছবি দেখেছে। সুকোমল সেনগুপ্ত থাকবে, বিতান থাকবে। আমি রোজ রোজ তাদের সামনে ওভাবে অফিস করতে পারব না রে। প্লিজ, বোঝার চেষ্টা কর। আমাকে সব আবার নতুন করে সাজাতে হবে। ’

ঈপ্সিতা চুপ করে গেল। তারপর শ্রাবন্তীর কাঁধে হাত দিয়ে বলল, ‘ভেঙে পড়িস না। টাকা লাগলে আমার কাছ থেকে ধার নিস। পরে ধীরে ধীরে শোধ করিস। ’

‘তোর কি রিজার্ভ ব্যাংক আছে?’

‘তা নেই। তবু বন্ধুর জন্য কিছু অন্তত আছে। ’

দুজনে ফাঁকা ঘরে চুপচাপ বসে থাকল।

একসময় ঈপ্সিতা প্রশ্ন করল, ‘সেই যে নিউজ পোর্টাল থেকে মেয়েটা এসেছিল। বিপাশা। ওর আর কোনো খবর পেয়েছিস?’

‘নাহ। আমি আর খোঁজ করার সুযোগ কোথায় পেলাম?’

‘মেয়েটাও আর যোগাযোগ করেনি, তাইতো?’

‘কেন করবে? ওর তো স্টোরি হয়ে গিয়েছিল। আর তো আমাকে প্রয়োজন নেই। ’

‘তবু ফলোআপ স্টোরি...’

‘ওই ধরনের পোর্টাল উত্তেজক খবর ছড়িয়ে নিজেদের ভিউয়ার বাড়ায়। দেখ, আবার অন্য কোথাও গিয়ে ছিপ ফেলেছে। ’

ঈপ্সিতা উঠে পড়ল। ওকে আবার শ্যামবাজার ফিরতে হবে। সেখানে ওর শ্বশুরবাড়ি। যৌথ পরিবার।

দরজা বন্ধ করল শ্রাবন্তী। ঘড়ি দেখল। রনর ফিরতে আরো আধাঘণ্টা। ও একটা প্যাড আর কলম নিয়ে বসল। পদত্যাগপত্রের একটা খসড়া লিখে রাখা দরকার। কালকে অফিসে ঢুকে লেখার মতো মানসিক অবস্থা ওর থাকবে না।

চৌদ্দ.

অফিসে বসে ইস্তফাপত্র ই-মেইলে পাঠানোর পর শ্রাবন্তীর মন ফুরফুরে হয়ে গেল। অনেক দিন ধরে গুমোট গরমের পর বৃষ্টি নামলে যেমন অনুভূতি হয়, তেমনই অনুভূতি ওর ভেতর হচ্ছিল। নিজের টেবিলে বিশেষ কিছু রাখে না। তবু ও ভালো করে খুঁজে দেখল। একটা পুরনো কলম ছাড়া আর কিছু পড়ে নেই। কলমটা ও ডাস্টবিনে ফেলে দিল।

এবার বেরিয়ে পড়তে হবে। তার আগে ও গেল এইচআরের অনিমেষবাবুর কাছে। বলল, ‘রেজিগনেশন জমা দিয়েছি। বাকি ফরমালিটি তো আপনারা করবেন। ’

মাথা নাড়লেন অনিমেষবাবু। বললেন, ‘আপনার ছুটি কী বাকি আছে দেখি। বাকি টাকা ঢুকে যাবে আপনার অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে। তবে ওই টাকা তুলে অ্যাকাউন্টটা ক্লোজ করে দেবেন। হাজার হোক ওটা তো আপনার আর এই অফিসের ট্রানজেকশনের জন্য করা। ’

ঘাড় কাত করল শ্রাবন্তী। বলল, ‘আর এক্সপেরিয়েন্স সার্টিফিকেট?’

‘পেয়ে যাবেন। আমি ই-মেইলে পাঠিয়ে দেব। আপনার নিজস্ব যে ই-মেইলটি আমাদের দিয়েছেন তাতে। বাকি কাগজপত্রও ওখানে পাঠিয়ে দেব। চিন্তা করবেন না। ’

‘শুধু প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তোলা বাকি থাকল। ’

‘সেটার জন্য তিন মাস সময় লাগবে। তখন আসবেন। ’

এরপর আর কোনো কথা থাকে না। শ্রাবন্তীও নিজের চেয়ারে ফিরল। শেষবারের মতো দেখল নিজের কর্মস্থলকে। তারপর ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। যাওয়ার আগে একবার দু-তিনজনকে বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তাদের দিকে তাকিয়ে বুঝল, কেউই কথা বলতে আগ্রহী নয়। শ্রাবন্তী যে এই অফিসে আছে, সেটা পর্যন্ত যেন তারা অস্বীকার করছে নিজেদের ব্যবহার দিয়ে।

লিফটে করে নেমে মূল গেট পেরিয়ে বেরোতে যাবে, চোখে পড়ল বিতান দাঁড়িয়ে। ওর দিকে তাকিয়ে। বিতান কি কিছু বলতে চায়? একঝলকের জন্য শ্রাবন্তীর মনে হলো, শেষবারের মতো বিতানের সঙ্গে কথা বলে যায়। আশ্বস্ত করে যায়, ও কোনো দিন গিয়ে বিতানের স্ত্রীর কানে কিছু তুলবে না। তারপর মনে হলো, কী দরকার? ভাস্করের মতো বিতানও এখন অতীত। অতীতকে আঁকড়ে থাকলে নিজের ক্ষতি।

মুখটা কঠিন করে ও হনহন করে হেঁটে বিতানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। বিতান বলি বলি ভাব নিয়ে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ওকে কোনো সুযোগ দিল না শ্রাবন্তী।

ফ্ল্যাটে ঢোকার পর ওর মোবাইলে পর পর দুটি ফোন এলো।

প্রথমটা করলেন বাবা। জানতে চাইলেন, ‘তোর অফিসের সমস্যাটার কী হলো?’

‘কেন, আদরের জামাই কিছু জানাচ্ছে না?’

বাবা অল্প চুপ করে থাকলেন। বললেন, ‘সত্যি বলতে, আমি দিন কয়েক হলো ভাস্করকে পাচ্ছি না। প্রথম কয়েকবার রিং হয়েছিল। ও ধরেনি। তার পর থেকে ওর ফোন নট রিচেবল বলছে। ’

‘আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো। ফের গলা শুনতে পাবে। এই ধরো দিন সাতেক। কিংবা বড়জোর পনেরো। ’

‘তুই জানিস ও কেন ফোন ধরছে না? বিদেশটিদেশ গেছে?’

‘তোমার জামাই এখন জেলে। জেলে বোধ হয় ফোন কাছে রাখতে দেয় না!’

‘জেলে!’ বাবা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, ‘কেন, জেলে কেন?’

‘যত দূর শুনেছি, দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে এমন কিছু করেছিল যে সেই মেয়ে পুলিশে কমপ্লেইন করে এবং তার পরই ভাস্কর অ্যারেস্ট হয়েছে। ’

বাবা চুপ করে থাকলেন।

‘ভাস্করের হিসাবে একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল। আসলে আমাকে ছাড়ার সময় ও শুধু বউয়ের দিকে মন দিয়েছিল। শ্বশুরের দিকে নজর দেয়নি। ওর দ্বিতীয় শ্বশুর নিশ্চয়ই তোমার মতো জামাই অন্তপ্রাণ নয়। তাই এমন বিপত্তি। ’

বাবা এবারও কিছু বললেন না।

শ্রাবন্তী বলল, ‘শোনো, এই বাড়ি ফিরলাম। টায়ার্ড। এবার ফোন রাখছি। ’

‘তোর চাকরির কী হলো?’

‘আজ রিজাইন করলাম। তবে তুমি ভেবো না। তোমার ওষুধ ঠিকঠাক পৌঁছে যাবে। তোমার নাতির যদি ভাত জোটে, তোমারও ওষুধ জুটবে। ’

বাবা এবারও চুপ।

শ্রাবন্তী যখন ফোন কাটতে যাবে, হঠাৎ বাবা বললেন, ‘আমি ভালো নেই। ’

লাইন কাটতে গিয়েও থমকে গেল শ্রাবন্তী। বাবার গলায় এমন কিছু ছিল, যা ওকে স্পর্শ করল।

বাবা সেভাবে বলতে থাকলেন, ‘আজকাল তোর মাকে খুব মনে পড়ে। বেঁচে থাকতে কোনো দিন তোর মাকে নিয়ে আলাদা করে কিছু ভাবিনি। নিজেকে নিয়ে ভেবেছি। নিজের ছেলে নিয়ে ভেবেছি। তোকেও যে বিরাট কিছু দিয়েছি, তা তো নয়। বরং আমার ভুল সিদ্ধান্তে তোর জীবন ছারখার হয়ে গেছে। আজকাল একা থাকলে এসব ভুল আমাকে জাপটে ধরে। দম আটকে আসে। ’

শ্রাবন্তীর ইচ্ছা করছিল বাবাকে আরো কিছু কড়া কথা শোনানোর, কিন্তু ও কোনো জবাব দিল না।

বাবা বলে চললেন, ‘তোর ভাই ফের টাকা চেয়েছে। ব্যবসায় নাকি লস হয়েছে। তাই দশ লাখ টাকা দরকার। তুই বল তো, আমার কাছে আর কত টাকা থাকবে? লাখ পনেরো আমি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছি। তার নমিনি তোর ছেলে আর ওর মেয়ে। সেটাই আমার শেষ সম্বল। বুড়ো বয়সে যদি বড়সড় রোগ হয়, সেই টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাব। কিন্তু সুজয়ের এখন ওই টাকার দিকে নজর পড়েছে। ছয়-সাত দিন ধরে সেই নিয়ে বলছে। নমিতাকেও তো চিনিস। যেমন বর, তার তেমন বউ। রোজ দুপুরে ভাত দেওয়ার সময় নমিতাও বলতে শুরু করেছে ওই টাকা সুজয়কে দেওয়ার ব্যাপারে। বিশ্বাস কর, গলা দিয়ে সেই ভাত নামতে চায় না...’

মোবাইলের ওপ্রান্ত থেকে বাবার ফোঁপানো কানে এলো শ্রাবন্তীর।

ফোঁপাতে ফোঁপাতে বাবা বললেন, ‘কাল রাতে বোধ হয় নেশা করে ফিরেছিল। টাকা নিয়ে আমার কাছে কী জোরাজুরি। শেষে আমি থাকতে না পেরে বললাম, ‘বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে। ’ তখন কী বলল জানিস? বাড়ি নাকি এখন ওদের। কখন জীবন বীমা না কিসের সই করানোর সময় একফাঁকে আমাকে দিয়ে এই বাড়ির সব কাগজপত্রে সই করিয়ে নিয়েছে। এখন এই বাড়িতে আমার কিংবা তোর কোনো অধিকার নেই। সুজয় শুধু সেখানেই থামল না...কাল...কাল ও আমার গায়ে হাত তুলেছে...’

বাবার গলায় কান্না ছাপিয়ে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল।

‘শেষ বয়সে নিজের ছেলের হাতে মার খাওয়া যে কী, সেটা যে না খেয়েছে, সে জানে না। যে ছেলেকে এত করে বড় করলাম, সে কিনা আমার সব ঠকিয়ে নিজের নামে করে নিল? তুই আর আমাকে ওষুধ পাঠাস না। এভাবে আমি বেঁচে থাকতে চাই না। যত তাড়াতাড়ি মরব, তত তাড়াতাড়ি মুক্তি পাব। ’

বাবা নিজেই লাইন কেটে দিলেন।

শ্রাবন্তীর ইচ্ছা করছিল ঘুরিয়ে বাবাকে একবার ফোন করে। কিন্তু করে কী বলবে? দুই মাস আগে হলে ও তবু বাবাকে নিজের কাছে এনে রাখতে পারত। এখন তো তা একেবারেই সম্ভব নয়। ওর আর রনর জীবনেই তো চরম অনিশ্চয়তা।

এসব ভাবনার মধ্যে দ্বিতীয় ফোনটা এলো। শ্রাবন্তী দেখল সুজাতা।

ফোন ধরতেই সুজাতা বলল, ‘তুমি কি সত্যি চাকরি ছাড়ছ?’

‘অলরেডি রিজাইন করে এলাম। ’

‘আচ্ছা, নতুন কিছু ভেবেছ?’

‘না। ’

‘ভাববে?’

‘ভাবতে তো হবেই। না হলে চলবে কী করে?’

‘দার্জিলিংয়ে আসবে?’

‘মানে!’

‘মানে তুমি রাজি থাকলে আমি রাজি হব। ’

১০ মাস পর

এই সবুজ মাঠের ধারে এসে দাঁড়ালে শ্রাবন্তীর মন অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়ে। সামনে পাহাড়ের ঢেউ। সেই পাহাড়ের গলার কাছে ওড়নার মতো সাদা মেঘ। দূরে দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। পর পর দুই দিন মেঘলা থাকার পর আজ রোদ উঠেছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা চূড়া ঝলমল করছে।

নিচে সারি সারি চা-বাগান। শ্রাবন্তী দেখতে পেল সেখানে অনেক মেয়ে নেমেছে চা-পাতা তুলতে। পিঠে ঝুড়ি। পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঝুড়ি ভরছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ছবির মতো জীবন। কিন্তু শ্রাবন্তী কয়েক মাস ধরে মিশেছে ওদের সঙ্গে। জানে, সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য কী প্রবল পরিশ্রম করতে হয় ওদের। ওই ফুটফুটে চেহারার মেয়েরা অনায়াসে বিরাট কাঠের ঝাঁকা পিঠে নিয়ে জঙ্গল থেকে তরতর করে পাহাড়ি পথ বেয়ে নিজের গ্রামে যেতে পারে। বড় বড় পাথর তুলতে পারে। বাড়ির সব কাজ করতে পারে। ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারে। সবচেয়ে বেশি যা পারে তা হলো, এত পরিশ্রমের পরও নিজেদের মনকে হাসিখুশি রাখতে। অনেক কিছু শেখার আছে ওদের কাছ থেকে।

কষ্ট করে হয়তো কমলালেবু ফলিয়েছে। দাম পাচ্ছে সেই তুলনায় কম। তবু রনকে দেখলে কী অনায়াসে গাছ থেকে দুটি লেবু পেড়ে উপহার দেয়। দাম দিতে গেলে কিছুতেই নেবে না।

কলকাতার দম আটকানো পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এখানে এসে শ্রাবন্তী যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। সেই জন্য ও কৃতজ্ঞ সুজাতার কাছে। সেদিন সুজাতার ফোন ওকে নতুন দিশা দেখিয়েছিল।

সুজাতা অনেক কিছু জানত ওর সম্পর্কে। কিন্তু সুজাতার সম্পর্কে ও কিছু জানত না। সুজাতার এক ছেলে ছিল। বছর পনেরোর সেই ছেলে আচমকা ক্যান্সারে মারা যায়। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগে ধরা পড়ে, ওর স্বামীর ব্রেন টিউমার। মুম্বাইয়ে গিয়ে অপারেশনও করা হয়েছিল, কিন্তু ভদ্রলোককে বাঁচানো যায়নি।

ওর মতো সুজাতাও আর কলকাতায় টিকতে পারছিল না। চারপাশে শুধু ছেলে আর স্বামীর স্মৃতি। ফাঁকা ফ্ল্যাট যেন গিলে খেতে আসত। তাই ব্যাংকের চাকরি থেকে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে ও চলে আসতে চেয়েছিল পাহাড়ে। ইচ্ছা ছিল ছোট রিসোর্ট খোলার। সেই রিসোর্ট দেখাশোনা করবে এবং এখানেই বাকি জীবন কাটাবে।

কিন্তু সুজাতা জানত, ওর মতো একা মহিলার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। তখনই শ্রাবন্তীর সঙ্গে ওর যোগাযোগ। কাকতালীয়ভাবে শ্রাবন্তীও তখন অফিসের সমস্যায় জর্জরিত।

তাই শ্রাবন্তীকে এই কাজে পেতে চেয়েছিল ও। শর্ত হলো, ফিফটি-ফিফটি পার্টনারশিপ। সুজাতার টাকা, শ্রাবন্তীর পরিশ্রম। জায়গাটা অবশ্য সুজাতারই আবিষ্কার। রিংপিং। পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট গ্রাম। এখনো রাস্তাঘাট ভালো নয়। ভাঙাচোরা। খাড়াই। শিলিগুড়ি থেকে গাড়িতে আসতে রীতিমতো ঝাঁকুনি লাগে। কিন্তু একবার এসে পড়লে মনে হয় যেন স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও পৌঁছে গেছি। হাত বাড়ালেই কাঞ্চনজঙ্ঘা ছুঁতে পারব।

সাত মাস ধরে এখানেই পড়ে আছে শ্রাবন্তী। রনকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনেছে। সবার আগে কাঠের রিসোর্ট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসার কাগজপত্রও। তারপর চারপাশে কিছু সবজি চাষ। কমলালেবুর বাগান। গ্রামের মেয়েদেরই কাজ দিচ্ছে শ্রাবন্তী। শেখাচ্ছে কী করে বাঙালি রান্না করতে হয়। কারণ বেশির ভাগ পর্যটকই তো বাঙালি।

রিসোর্টের পেছনে দুটি পাশাপাশি ঘর। একটা ওর, অন্যটা সুজাতার।

এরপর ওরা ফেসবুকে একটা পেজ খুলল। পরিচিতদের কাছে ভিডিও তুলে পাঠাল। দু-একটা ভ্রমণের পত্রিকায় ছবিসমেত বিজ্ঞাপন দিল। এখানকার হোম স্টে মালিকরা একটা সংগঠন করেছেন। শ্রাবন্তীরা সেখানে নাম লিখিয়েছে। সব টাকা সুজাতা দিচ্ছে। এমনকি ওর সংসার খরচও। অবশ্য এখানে খরচ খুবই কম।

তবে কাজ সবটাই একা হাতে করেছে শ্রাবন্তী। সুজাতা এখনো ভিআরএস পায়নি। তবে শিগগিরই পেয়ে যাবে।

প্রথম প্রথম টুকটাক লোক আসছিল। ধীরে ধীরে নাম ছড়িয়ে পড়ছে। এখন রিসোর্টে পাঁচটা ঘরই ভর্তি। শুধু এখন নয়, আগামী আড়াই মাসের সব রুম বুকড। যে মেয়েদের কাজে নিয়েছে শ্রাবন্তী তারা দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছে না। স্থানীয় দুটি ছেলে গাড়ি চালাতে পারে। তাদের সঙ্গেও ব্যবস্থা করেছে। আশপাশের এলাকা, দার্জিলিং শহরও ওরা ঘুরিয়ে আনছে পর্যটকদের।

পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে শ্রাবন্তী সেসবই ভাবছিল। বাকি থাকল রনর পড়াশোনা। মাঝে একদিন কার্শিয়াং গিয়েছিল। সেখানকার বোর্ডিং স্কুলের সঙ্গে কথা বলেছে। পরের সেশন থেকে রনকে সেখানে ভর্তি করে দেবে। কলকাতার নামি স্কুলে পড়ত। ভর্তি করাতে তেমন সমস্যা হবে না। তবে রনকে নিজের কাছে রাখা যাবে না। সপ্তাহের শেষে নিয়ে আসবে। আবার সোমবার সকালে পৌঁছে দেবে। বাকি সময় ছেলে থাকবে স্কুল হোস্টেলে।

সুজাতা আসে মাঝেমধ্যে। রাতে রন ঘুমিয়ে পড়লে দুজনে রিসোর্টের সামনে চেয়ার পেতে গল্প করে। তখন চারপাশ নিঝুম। অন্ধকার। দূরে দূরে কোথাও কোনো আলো থাকে না। সেই গভীর অন্ধকারে কাঞ্চনজঙ্ঘাও ডুবে যায়। শুধু মাথার ওপর জ্বলজ্বল করে রাশি রাশি তারা। নক্ষত্র। সেই নক্ষত্রের আলোয় বসে জীবনের অনেকটা পথ হেঁটে আসা দুই নারী নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার গল্প করে। কখনো সুজাতা কাঁদে নিজের ছেলের কথা ভেবে। কখনো শ্রাবন্তীর মনে পড়ে যায়, ওর আর বিতানের ঘনিষ্ঠ ছবি এখনো অফিসের কয়েকজনের কাছে রয়ে গেছে।

রিংপিংয়ে থাকতে থাকতেই শ্রাবন্তী এক সকালে ভাইয়ের ফোন পেল। ঘুম ঘুম চোখে সেই ফোন ধরতে ওপাশ থেকে ভাইয়ের হাউহাউ কান্না, ‘দিদি, কাল রাতে বাবা সুইসাইড করেছে। ব্লেড দিয়ে বাঁ হাতের শিরা...’

শ্রাবন্তী কাঁদতে পারেনি। বরং বাবার সেই কথাগুলো ওর মনে পড়ছিল, ‘এভাবে আমি বেঁচে থাকতে চাই না। যত তাড়াতাড়ি মরব, তত তাড়াতাড়ি মুক্তি পাব। ’

শ্রাবন্তী আর দুর্গাপুরে যায়নি। পাহাড়েই বাবার শ্রাদ্ধশান্তি করেছে।

ভাস্করের খবরও পেয়েছে। অনিন্দিতা নাকে দড়ি দিয়ে ওকে ঘোরাচ্ছে। শাশুড়িও শয্যাশায়ী। এখন নাকি তিনি নিথর হয়ে পড়েই থাকেন। স্মৃতিভ্রম হয়েছে। মানুষ চিনতে পারেন না। সারা দিন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। খাওয়ানো হলে খান। বিছানায়ই মলমূত্র ত্যাগ করে ফেলেন। দিনে তিনটা আয়া রাখতে হচ্ছে তাঁর জন্য।

সুজাতা বলছিল, ভাস্কর নাকি খুব রোগা হয়ে গেছে। সুগার, প্রেসার, কোলেস্টেরল। শরীরে অনেক রোগ।

শুধু বিতানের কোনো খবর পায়নি। বিতান যেন ভারতবর্ষের গভীরে হারিয়ে গেছে।

দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থাকল শ্রাবন্তী। পাশে একটা গির্জাঘর। সেখানে ঢং ঢং করে কেউ ঘণ্টা বাজাচ্ছে। সেই ঘণ্টার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাহাড়ে পাহাড়ে। শ্রাবন্তীর মনে।

পাহাড়চূড়ার দিকে তাকিয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নিল শ্রাবন্তী। এবার ও মাথা উঁচু করে নিজের মতো বাঁচবে।