kalerkantho

শনিবার । ২ জুলাই ২০২২ । ১৮ আষাঢ় ১৪২৯ । ২ জিলহজ ১৪৪৩

মু ক্তি যু দ্ধ

সামরিক অধিনায়কদের রচিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা : একটি মূল্যায়ন

মুহাম্মদ লুত্ফুল হক

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩৬ মিনিটে



সামরিক অধিনায়কদের রচিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা : একটি মূল্যায়ন

২৬ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সৈনিকরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন ছাত্র, যুবক, কৃষকসহ দেশের আপামর জনসাধারণ। বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধকে সামরিক কর্মকর্তারা সংগঠিত করেন এবং নেতৃত্ব দেন। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর সামরিক কর্মকর্তারা সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশ বাহিনী গঠন করেন।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশকে প্রথমে চারটি অঞ্চলে আর পরে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতি সেক্টরে একজন সেক্টর অধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। জুলাই মাসের পর সেক্টরগুলোর অতিরিক্ত নিয়মিত বাহিনীর ব্রিগেডের অনুরূপ তিনটি ফোর্স গঠন করা হয় এবং তিনজন জ্যেষ্ঠ সেক্টর অধিনায়ককে ফোর্স অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পদোন্নতি, অসুস্থতা ও অন্যত্র বদলির কারণে এগারোটি সেক্টরে বিভিন্ন মেয়াদে মোট ১৬ জন সেক্টর অধিনায়ক দায়িত্ব পালন করেন। [সাহাদাত হোসেন খান। ভূমিকা]। ফোর্স ও সেক্টর অধিনায়ক ছাড়াও বাংলাদেশ বাহিনীর সদর দপ্তরে তিনজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে পূর্ণতা আনতে হলে ১৯৭১ সালের নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বরং বলা চলে যে এই সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। আর এই সশস্ত্র যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন পূর্বে বর্ণিত বাংলাদেশ বাহিনীর জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা, ফোর্স ও সেক্টর অধিনায়কসহ সামরিক কর্মকর্তারা। তাঁদের পরিকল্পনা আর সাহসী সম্পাদনের মধ্য দিয়েই যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে সরকারি উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার জন্য প্রণীত কমিটিগুলোয় সামরিক কর্মকর্তাদের বিশেষ মূল্যায়ন করা হয়নি। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস রচনার জন্য সরকার ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। দুর্ভাগ্য যে সেই কমিটিতে কোনো সামরিক কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কমিটি কার্যকর কিছু করার আগেই, এক বছরের মাথায় কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস প্রণয়নের পরবর্তী উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর মফিজুল্লাহ কবিরকে সভাপতি এবং কবি হাসান হাফিজুর রহমানকে সদস্যসচিব নির্বাচিত করে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ১৯৮৬ সালে পনেরো খণ্ডে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ প্রকাশ করে। দুঃখের বিষয় যে সেই কমিটিতেও কোনো সামরিক কর্মকর্তার স্থান হয়নি, যদিও এই বইয়ের তিনটি খণ্ড অর্থাৎ এক-পঞ্চমাংশ সশস্ত্র যুদ্ধসংক্রান্ত।

পরবর্তী সময়ে ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থ প্রকাশের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের নাম ছিল—‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দলিল ও ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ’। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতেও কোনো সামরিক কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই প্রকল্পের আওতায় পূর্বে প্রকাশিত স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র পুনর্মুদ্রণের জন্য তিন সদস্যের একটি সাবকমিটি গঠন করা হয়। এখানেও কোনো সামরিক কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।   একই প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে গঠিত সেক্টর ও ফোর্সগুলোর সশস্ত্র যুদ্ধের ইতিহাস বা স্বাধীনতাযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস ১২ খণ্ডে বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এই উদ্দেশ্যে প্রথমে চার সদস্যের গ্রন্থনা সাবকমিট গঠিত হয়, সেখানে মাত্র একজন সামরিক কর্মকর্তা যুক্ত হন। এরপর চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়, সেখানে তিনজন সামরিক কর্মকর্তা সংযুক্ত হন। শেষে পাণ্ডুলিপি পরিমার্জনার জন্য ১৬ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সেখানেও মাত্র একজন সামরিক কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত হন। শেষে দুই সদস্যের সম্পাদনা পরিষদ গঠন করে বইটি প্রকাশ করা হয়, সেখানেও কোনো সামরিক কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। যুদ্ধ একটি বিশেষায়িত বিদ্যা। যুদ্ধ ইতিহাস রচনা করতে হলে এ বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরি। অথচ স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র এবং ফোর্স ও সেক্টরের সশস্ত্র যুদ্ধের ইতিহাস রচনায় সামরিক কর্মকর্তারা খুব একটা সম্পৃক্ত হতে পারেননি।

স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস রচনার সরকারি উদ্যোগে সামরিক কর্মকর্তারা ভূমিকা রাখতে না পারলেও ব্যক্তি পর্যায়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতিকথা ও অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে তারা এই ইতিহাস রচনায় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা স্বাধীনতাযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসসহ বেশ কিছু স্মৃতিকথা রচনা করেছেন। তাঁদের এসব বই স্বাধীনতাযুদ্ধের মৌলিক উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে।

২০১৭ সালে প্রকাশিত গবেষক জাহেদুল গনি চৌধুরির ‘বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর লেখক অভিধান’ বইয়ে ৬৬ জন সামরিক কর্মকর্তা রচিত ২১৯টি মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। এই বইগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এবং ফোর্স ও সেক্টর অধিনায়ক ছিলেন। এ ধরনের সামরিক অধিনায়কদের মধ্যে এগারোজন প্রায় আঠাশটি বই রচনা করেছেন। বইগুলোর প্রায় সবই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, তবে অল্প কয়েকটি রাজনৈতিক বইও আছে। কোনো লেখক একই বই কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ একই বই বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় পৃথকভাবে প্রকাশ করেছেন। সামরিক অধিনায়কদের কেউ কেউ যৌথ সম্পাদনায়ও কিছু বই প্রকাশ করেছেন। সামরিক অধিনায়কদের বইয়ের বেশির ভাগই স্মৃতিকথা বা তাঁদের নিজস্ব যুদ্ধ অভিজ্ঞতা। তবে কেউ কেউ তাঁদের বইয়ে স্বাধীনতাপূর্ব ইতিহাস অর্থাৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর অবতারণা করেছেন। অধিনায়কদের কেউ কেউ নিজস্ব এলাকার যুদ্ধগাথা ছাড়াও অন্যান্য ফোর্স বা সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোকে তাঁর বইয়ে যুক্ত করেছেন। তাঁদের রচিত বইগুলো থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিশেষত সামরিক ইতিহাসের প্রচুর উপাদান পাওয়া যায়। এই রচনায় মূলত এসব সামরিক অধিনায়কদের মুক্তিযুদ্ধের বইগুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।

স্বাধীনতাযুদ্ধকালে গঠিত বাংলাদেশ বাহিনীর সর্ব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং প্রধান সেনাপতি ছিলেন কর্নেল (পরে জেনারেল) এম এ জি ওসমানী। তিনি ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন এবং ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে ১৫ খণ্ডে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের নবম, দশম ও একাদশ খণ্ডে তাঁর কিছু সাক্ষাৎকার, ভাষণ ও নির্দেশনামা যুক্ত আছে। এ ছাড়া যুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক কিছু সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। এগুলো থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল যে তিনি কী করে মার্চের শেষের দিকে হানাদার বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে ভারতে হাজির হন, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে কী নীতিমালার ভিত্তিতে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন ইত্যাদি। তিনি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কোনো বই রচনা করেননি।

লে. কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) আবদুর রব, বীর-উত্তম বাংলাদেশ বাহিনীর চিফ অব স্টাফ ছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন এবং ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে হবিগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হন। যুদ্ধের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ বাহিনীতে যুক্ত হন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের পঞ্চদশ খণ্ডে তাঁর খুব ছোট একটি বিবৃতি যুক্ত আছে। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি নিয়ে তিনি কোনো বই রচনা করেননি।

গ্রুপ ক্যাপ্টেন (পরে এয়ার ভাইস মার্শাল) এ কে খন্দকার, বীর-উত্তম বাংলাদেশ বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের মে মাসে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের নবম ও দশম খণ্ডে তাঁর সাক্ষাৎকারভিত্তিক দুইটি রচনা আছে। সেখানে তিনি অতি সংক্ষেপে মার্চ মাসে ঢাকার অবস্থা (নবম খণ্ড) এবং মুক্তিযুদ্ধকালে গঠিত বিমানবাহিনী সম্পর্কে বর্ণনা (দশম খণ্ড) দিয়েছেন। ২০১৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে তিনি একটি বই রচনা করেন। বইয়ের নাম ‘১৯৭১ ভিতরে ও বাইরে’।   বইটি রচনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, ‘আমি এই বই লেখার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছি মূলত তরুণ প্রজন্মের ইতিহাস জানার আগ্রহ থেকে। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে চায়, অথচ সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে তারা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে। সত্য ও মিথ্যাকে তারা আলাদা করতে পারছে না। আমার এ বই তাদের জন্য। ’ [এ কে খন্দকার। পৃ. ১১]।

বইয়ে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর স্মৃতি ও কর্মকাণ্ড বর্ণনা করেছেন। তবে বইয়ের শুরুতে লেখক যুদ্ধপূর্ব সামরিক জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। পরবর্তী সময়ে দশটি অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পৃক্ত দশটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইয়ে বর্ণিত কিছু বিষয়ে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না, তবে তা তিনি কাছে থেকে অবলোকন করেছিলেন। বিষয়গুলোর নির্বাচন সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি স্মৃতিকথার জন্য যে বিষয়গুলো বেছে নিয়েছি তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ অথচ তথ্যের অভাবে কম প্রচারিত বা আলোচিত, অথবা ভুলভাবে প্রচারিত। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে এ ধরনের বেশ কিছু বিশ্বাস আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে, যা প্রকৃত ঘটনার সঠিক চিত্র নয়। এ ধরনের বিশ্বাস সাধারণত জন্ম নেয় তথ্যের অপর্যাপ্ততা বা অভাব থেকে, আবার অনেক সময় কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টি ইচ্ছা করেই তাঁদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এ ধরনের ভুল তথ্য প্রচার করে থাকেন। ’ [এ কে খন্দকার। পৃ. ১০]। লেখক বইয়ে বেশ কিছু নথি সংযুক্ত করে প্রদত্ত তথ্যের সঠিকতা প্রমানের চেষ্টা করেছেন।

বইটি সম্পর্কে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ উল্লেখ করেন, ‘ইতিহাস রচনার দুটি উৎস : একটি হচ্ছে দলিল-দস্তাবেজ, আর অন্যটি হলো অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান বা তাদের স্মৃতিকথা। এগুলো এককভাবে ইতিহাস তৈরি করে না। কিন্তু এই দুইয়ের সার সংগ্রহ ও সংকলন করেই আমরা ইতিহাস রচনা করি। সে কাজ ইতিহাসবিদের। জনাব এ কে খন্দকার, বীর-উত্তম ইতিহাসবিদ নন—কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারী, যুদ্ধের সামরিক নেতা এবং অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর এই বই ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ সে কারণেই ইতিহাসের একটি অন্যতম আকরগ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যাঁরা বুঝতে চান, যাঁরা বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে চান, তাঁদের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য বলেই আমার মনে হয়েছে। ’ [প্রথম আলো। ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪]।

বইটি প্রকাশের পরপরই কিছু বিষয় নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সে সময়ে তিনি এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও ২০১৯ সালের জুন মাসে বইয়ে প্রদত্ত দুইটি তথ্য সম্পর্কে নিজেই দ্বিমত পোষণ করেন এবং আগের তথ্য বাতিল করেন অথবা নতুন তথ্য দেন। বইয়ে যে তিনি কিছু স্পর্শকাতর বিষয় যুক্ত করেছেন তা তিনি বইয়ের ভূমিকাতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘সত্য কথা লিখতে হলে নির্মোহ হতে হয় এবং আবেগের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। আবেগতাড়িত হলে বা কারো প্রতি আনুকূল্য দেখাতে গেলে অতি অবশ্য আমাকে হয় সত্য এড়িয়ে যেতে হবে, নতুবা মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে। আমি এর কোনোটাতেই বিশ্বাসী নই। তাই কখনো কখনো রূঢ় সত্য প্রকাশে ব্যক্তিবিশেষ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বাইরে আমি কিছু মন্তব্য করেছি বা প্রমাণ তুলে ধরেছি। আমি মনে করি, সত্যের স্বার্থে এটির প্রয়োজন ছিল। তবে আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করতে চাই, আমি যা কিছুই এই বইয়ে উপস্থিত করেছি, তা কাউকে খাটো করা বা কারো ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া বা কারো ছিদ্র অনুসন্ধান করার জন্য নয়, নেহাতই সত্য প্রকাশের জন্য এটি করেছি। ’ [এ কে খন্দকার। পৃ. ১১]।

২০০৯ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের নীতিগত ভিত্তি, চেতনা, ফলাফল এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে। সেখানে তিনজন আলোচকের মধ্যে গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকার ছিলেন অন্যতম। অন্য দুজন আলোচক ছিলেন সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধকালে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ প্রতিনিধি ও ‘মূলধারা ৭১’ বইয়ের লেখক মঈদুল হাসান এবং স্বাধীনতাযুদ্ধকালে যুব শিবিরের মহাপরিচালক উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা। ‘১৯৭১ ভিতরে ও বাইরে’ বইয়ে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার প্রদত্ত অনেক তথ্যই (বিতর্কিত তথ্যসহ) ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’ বইয়ে উল্লেখ ছিল।

মেজর (পরে লে. জেনারেল) জিয়াউর রহমান, বীর-উত্তম প্রথমে ১ নম্বর সেক্টর ও পরবর্তী সময়ে ‘জেড’ ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। ১১ নম্বর সেক্টর গঠনকালের প্রারম্ভিক সময়ে তিনি এই সেক্টরের অধিনায়কত্ব করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের নবম খণ্ডে তাঁর সাক্ষাৎকারভিত্তিক একটি রচনা যুক্ত আছে। সেখানে মার্চ মাসের শুরু থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে। যুদ্ধকালে বা পরবর্তী সময়ে তাঁর অল্প কয়েকটি সাক্ষাৎকার ও রচনা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এসব সাক্ষাৎকার বা রচনা থেকে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় তার রচিত একটি প্রবন্ধ প্রকাশ পায়। সেখানে তিনি চট্টগ্রাম বিদ্রোহের বর্ণনা দিয়েছেন। মেজর জিয়া স্বাধীনতাযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো বই রচনা করেননি। মেজর জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর লিখা বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রবন্ধ নিয়ে ইফতেখার রসুল জর্জের সম্পাদনায় ‘জনগণই ক্ষমতার উৎস’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়।

মেজর (পরে মেজর জেনারেল) কে এম সফিউল্লাহ, বীর-উত্তম প্রথমে ৩ নম্বর সেক্টর ও পরবর্তীতে ‘এস’ ফোর্সের অধিনায়কত্ব করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে জয়দেবপুর থেকে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

১৯৭৫ সালে গৃহীত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের নবম ও দশম খণ্ডে মেজর সফিউল্লাহর নাতিদীর্ঘ রচনা প্রকাশ পায়। রচনা দুইটির শিরোনাম : ‘জয়দেবপুর-তেলিয়াপাড়াব্যাপী সশস্ত্র প্রতিরোধে ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও অন্যান্য বাহিনী’ (নবম খণ্ড) এবং ‘৩ নম্বর সেক্টর ও এস ফোর্সের যুদ্ধ বিবরণ’ (দশম খণ্ড)। এ ছাড়া বিভিন্ন বই ও পত্রিকায় মেজর সফিউল্লাহর সাক্ষাৎকার ও দীর্ঘ রচনা প্রকাশিত হয়েছে। বই বা রচনাগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটিতে যুদ্ধস্মৃতি বা সামরিক ইতিহাসের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বিশ্লেষণও আছে।

১৯৮৯ সালে মেজর সফিউল্লাহ তাঁর নিজের যুদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনাসহ ‘বাংলাদেশ এট ওয়ার’ শিরোনামে একটি ইংরেজি বই রচনা করেন। ১৯৯৫ সালে ‘বাংলাদেশ এট ওয়ার’  বইয়ের বাংলা অনুবাদ ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ’ প্রকাশিত হয়। বইটি সম্পর্কে লেখক উল্লেখ করেন, ‘এ গ্রন্থে আমি ব্যক্তিগত মন্তব্য বাদ দিয়ে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধের কিছুসংখ্যক বৈশিষ্ট্য এবং আলেখ্য উপস্থাপনার ওপরে প্রাধান্য দিয়েছি। গেরিলা রণকৌশল এবং মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাভিযান সম্পর্কিত যথার্থতা বা তাৎপর্য মূল্যায়নের বিষয়টি আমি পাঠকদের হাতে ছেড়ে দিলাম। ’ [কে এম সফিউল্লাহ। পৃ. ১৩]।

গ্রন্থের ভূমিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, ‘আগ্রহের সাথে বইটি পড়েছি। বইটি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আমাদের স্মৃতিকে জাগরূক করে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সেক্টরে পরিচালিত রণাঙ্গনসমূহের প্রাণবন্ত বিবরণ। ভাষা সহজ। চমৎকার স্বচ্ছ।

স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক দিকের সাথে জনগণের কম-বেশি পরিচয় রয়েছে। রাজনৈতিক চিত্রের চেয়ে যুদ্ধের চিত্র নিয়ে ওদের অধিকতর আগ্রহ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চীফ অফ আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল কে. এম. সফিউল্লাহ সে প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। ’ [কে এম সফিউল্লাহ। পৃ. ৯]।

লেখক বইয়ের শুরুতে স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমি এবং ২৭ মার্চে বিদ্রোহ ঘোষণার বর্ণনা দিয়েছেন। এরপর তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের নকশাসহ বর্ণনা দিয়েছেন। এ ছাড়া বইয়ে যুদ্ধকালীন সামরিক পরিকল্পনা ও সংগঠনের বর্ণনা আছে। বইটি সামরিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বইটির বাংলা ও ইংরেজি, উভয় সংস্করণই পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে। এ পর্যন্ত বইগুলোর অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৪ সালে তিনি ‘15 August A National Tragedy’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নামকরণ থেকে বোঝা যায় যে বইটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুকে ঘিরে রচিত।

মেজর (পরে মেজর জেনারেল) খালেদ মোশাররফ, বীর-উত্তম প্রথমে ২ নম্বর সেক্টর পরবর্তীতে ‘কে’ ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ২৩ অক্টোবর যুদ্ধে আহত হয়ে যুদ্ধ এলাকা ছেড়ে যান। ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি তাঁর যুদ্ধস্মৃতি বা অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন, যা ১৯৮৪ সালে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ বইয়ের নবম ও দশম খণ্ডে প্রকাশ পায়। এ সময়ে রচনার শিরোনাম ছিল ‘৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল ও অন্যান্য বাহিনীর কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা জেলায় সশস্ত্র প্রতিরোধ’ (নবম খণ্ডে) এবং ‘২ নং সেক্টর ও ‘কে’ ফোর্সের যুদ্ধ বিবরণ’ (দশম খণ্ডে)। রচনার শুরু হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চে, মেজর খালেদের কুমিল্লা সেনানিবাসে যোগদানের ঘটনা দিয়ে। প্রথমে তিনি ২৭ মার্চে বিদ্রোহ ঘোষণা ও হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন। তারপর তিনি তাঁর সেক্টর ও ফোর্সের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের খতিয়ান দিয়েছেন।

১৯৮৬-৮৭ সালে রচনা দুইটি সাপ্তাহিক ‘সন্ধানী’ পত্রিকায় ‘আমরা তখন যুদ্ধে’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এম আর আখতার মুকুল ১৯৯০ সালে মেজর খালেদের রচনার প্রথম অংশ সম্পাদনা করে ‘আমিই খালেদ মোশাররাফ’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সম্পাদক বইয়ের শুরুতে মেজর খালেদের জবানিতে উল্লেখ করেন, ‘আমার জবানবন্দী কিন্তু অসম্পূর্ণ। ১৯৭১ সালের ১৯শে মার্চ থেকে ২৮শে জুন পর্যন্ত মাত্র ১০০ দিনের সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের জবানবন্দী। এর পরেই প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ। আসলে কিন্তু রণক্ষেত্রের বিজয়ের ইতিহাস তো বোলতেই পারলাম না। সে ইতিহাস হচ্ছে ১৯৭১ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের একটার পর একটা বিজয়ের ইতিহাস। পুরো বক্তব্য লিপিবদ্ধ করার আর সময় পেলাম কই?’ [এম আর আখতার মুকুল। পৃ. ১৮]। ২০০৮ সালে মেজর কামরুল হাসান ভুইয়ার সম্পাদনায় ‘২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্স কমান্ডার খালেদের কথা’ শিরোনামে রচনা দুইটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বইটি গ্রন্থনার যুক্তি হিসেবে বইটির সম্পাদক উল্লেখ করেন, ‘মেজর খালেদের সে দুটি সাক্ষাৎকার এত বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যে পড়ে অবাক হতে হয়। ... ... এই যুদ্ধ কাহিনী বহুল পঠিত হওয়া উচিত। কিন্তু এই পনের খণ্ড বই একসাথে কেনার কোন বিকল্প নেই। বইগুলি দুষ্প্রাপ্য ও দামী। পাঠকের সুবিধার্থে ৯ম ও ১০ম খণ্ড-এ মেজর খালেদ মোশাররফের লেখা দুইটি একসাথে করে বই আকারে মুদ্রিত করেছি। ’ [মেজর কামরুল হাসান ভুঁইয়া। সম্পাদকের কথা]। ২০১৩ সালে প্রথমা প্রকাশন ‘মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টর ও কে ফোর্স’ নামে মেজর খালেদের রচনাগুলো নিয়ে অন্য একটি বই প্রকাশ করে। প্রথমা প্রকাশন-এর সংস্করণে স্মৃতিকথা সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু দুর্লভ ছবি ও দলিল যুক্ত করায় বইটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রন্থের ভূমিকায় এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার উল্লেখ করেন ‘বর্তমান গ্রন্থে মেজর খালেদ মোশাররফ তাঁর অধীন ২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্সের সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবর্ণনা দিয়েছেন। এ গ্রন্থ থেকে পাঠক তাঁর সেক্টর এবং ফোর্স এলাকায় ঘটে যাওয়া প্রায় প্রতিটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা জানতে পারবেন। আমার জানা মতে, এত সুন্দরভাবে আর কোনো সেক্টর কমান্ডার যুদ্ধ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেননি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে নিয়োজিত থাকার সুবাদে মেজর খালেদ মোশাররফ এবং তাঁর সেক্টর ও কে ফোর্সকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সব সেক্টরেই সার্বক্ষণিক অভিযানের মধ্যে তাদের সময় অতিবাহিত করলেও ২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্সের অভিযানের সংখ্যা ও ব্যাপকতা অধিক ছিল। এই সেক্টরের এলাকা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাও অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল। আমি মেজর খালেদ মোশাররফকে খুব তৎপর ও সক্রিয় কমান্ডার হিসেবে পেয়েছিলাম। ’ [খালেদ মোশাররফ। পৃ. ৫]।

মেজর খালেদ স্মৃতিকথাটি কী প্রক্রিয়ায় রচনা করেছিলেন সে সম্পর্কে বইটির সম্পাদক মুহাম্মদ লুত্ফুল হক উল্লেখ করেন, ‘মেজর খালেদ মোশাররফ যুদ্ধের শুরু থেকে যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রশাসন যা সামরিক পরিভাষায় অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইন দি ফিল্ড গড়ে তোলেন। যুদ্ধ প্রশাসনের অন্যতম অংশ হচ্ছে যুদ্ধসংক্রান্ত দলিলপত্র সংরক্ষণ করা। স্বাধীনতাযুদ্ধকালে খালেদ মোশাররফ তাঁর সেক্টর ও ফোর্স থেকে পাঠানো চিঠিপত্র এবং তাঁর সেক্টর ও ফোর্স যে সব চিঠিপত্র পেয়েছে সেগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তিনি এসব দলিলপত্রের সাহায্যে ১৯৭৪-৭৫ সালে ২ নম্বর সেক্টর ও কে ফোর্সের যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস পরিষদে (বাংলা একাডেমীর প্রকল্প) উপস্থাপন করেন। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে মূল ঘটনাবলি উপস্থাপনের এ কাজে তাঁকে সহায়তা করেন বাংলা একাডেমীর তৎকালীন গবেষক সুকুমার বিশ্বাস। রচনাটি দুই ভাগে ছাপা হয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র-এর নবম ও দশম খণ্ডে। ’ [খালেদ মোশাররফ। পৃ. ১০]।

ক্যাপ্টেন (পরে মেজর) রফিকুল ইসলাম, বীর-উত্তম এক নম্বর সেক্টরের দ্বিতীয় অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে চট্টগ্রামে ইপিআরে কর্মরত অবস্থায় হালিশহর থেকে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি জুন মাসে ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ বইয়ের দশম খণ্ডে জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ের যুদ্ধস্মৃতি বর্ণনা করেছেন। একই খণ্ডে তিনি তার সেক্টরের বেশ কয়েকটি যুদ্ধের বর্ণনা ইংরেজিতে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই খণ্ডে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী’ শিরোনামে তার আর একটি নাতিদীর্ঘ রচনা যুক্ত আছে। ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের একাদশ খণ্ডে ক্যাপ্টেন রফিকের যুদ্ধকালীন ডাইরি সংযোজন করা হয়েছে। সেখানে ১৯৭১ সালের ২৭ মে থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো ইংরেজিতে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত আছে।

১৯৭৪ সালে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধ বিষয়ে ইংরেজিতে ‘এ টেল অব মিলিয়ন’ নামে একটি বই রচনা করেন। বইটি প্রকাশের আগে ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইংরেজি পত্রিকা দি পিপলস ভিউ’তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৮১ সালে বইটির বাংলা সংস্করণ ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ প্রকাশ পায়। বাংলা সংস্করণটি পরে প্রকাশিত হওয়ায় লেখক সেটির কলেবর বৃদ্ধি করে প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে বাংলা ও ইংরেজি উভয় সংস্করণেরই অনেক পুনর্মুদ্রণ ও সংস্করণ প্রকাশ পেয়েছে।

লেখক বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে উল্লেখ করেন, ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে গ্রন্থটির মূল অংশে সামরিক ও গেরিলা তৎপরতার বিবরণ এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। সশস্ত্র তৎপরতার অধিকতর বর্ণনা যেন জনগণের রাজনৈতিক বোধ ও মুখ্য ভূমিকা থেকে আমাদের দৃষ্টিকে সরিয়ে না নেয়। কেবলমাত্র সামরিক ও গেরিলা তৎপরতার আলোকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্মকথা অনুধাবন সম্ভব নয়। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সুদীর্ঘ কালব্যাপী রাজনৈতিক সংগ্রামই হলো স্বাধীনতাযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ’ মেজর রফিকুল ইসলাম। পৃৃ. ৯]। স্বাধীনতাযুদ্ধের অংশীদার হওয়ার কারণে বইটি শতভাগ নিরপেক্ষ হয়নি বা আত্মজীবনীর ছাপ থেকে গেছে বলে লেখক স্বীকার করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আমি গভীরভাবে সম্পৃক্ত ও একাত্ম থাকার কারণে ইতিহাস রচনার নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে বইটি লেখা হয়ে ওঠেনি। তাই বইটির কোনো কোনো অংশে জীবনচরিত বা আত্মকথার ছোঁয়া অনুভূত হতে পারে। ’ [মেজর রফিকুল ইসলাম। পৃৃ. ১৯]।

লেখক বইয়ের শুরুতে ২৬ মার্চে হানাদার বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগেই চট্টগ্রামে অবস্থিত অন্যান্য বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাকিস্তান বাহিনীকে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই বইয়ে বিষয়টি তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি তাঁর পরবর্তী যুদ্ধ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। লেখক তাঁর যুদ্ধ অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্ব দিলেও, অন্যান্য সেক্টরের যুদ্ধের বর্ণনাও যুক্ত করেছেন। বইয়ে তিনি যুদ্ধ বর্ণনার সঙ্গে নকশা ব্যবহার করেছেন।

বইটি রচনার প্রক্রিয়া ও প্রকাশনা নিয়ে লেখক উল্লেখ করেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে আমি নিজে যা জানি অথবা অন্য সব যোদ্ধাদের সাথে আলোচনা করে নতুন যা কিছু জানতে পেরেছি তার ওপর ভিত্তি করেই A Tale of Milions (লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে) রচনা করেছি। আমার নিজস্ব ডাইরি, আমার সেক্টরের যুদ্ধসংক্রান্ত ডাইরি, যুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন গেরিলা দলের রিপোর্ট—এসব কিছুই এই গ্রন্থের তথ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রায় সব সেক্টর কমান্ডার এবং অন্যান্য সামরিক অফিসারদের সাথে আলোচনা করেই সে সব সেক্টরের যুদ্ধের তথ্যসংগ্রহ করেছি। তাছাড়াও বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং অনেক মুক্তিযোদ্ধা এ ব্যাপারে আমাকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে দিয়েছেন। ’ [রফিকুল ইসলাম। পৃ. ৮]।

মেজর রফিক ২০০১ সালে ‘মুক্তির সোপানতলে’ নামে মুক্তিযুদ্ধের আর একটি বই রচনা করেন।

মেজর খালেদ মোশাররফ যুদ্ধে আহত হলে অক্টোবর মাসে ক্যাপ্টেন (পরে লে. কর্নেল) এ টি এম হায়দার, বীরউত্তম ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্যাপ্টেন হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ক্যাপ্টেন হায়দার কোনো বই রচনা করেননি।

মেজর কে এম সফিউল্লাহ, বীর-উত্তম অক্টোবর মাসে ‘এস’ ফোর্সের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করায় মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) এ এন এম নুরুজ্জামান, বীর-উত্তম ৩ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় সংশ্লিষ্ট থাকায় ১৯৬৯ সালে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি মার্চ মাসে ঢাকা থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মেজর নুরুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কোনো বই রচনা করেননি।

মেজর পরে (মেজর জেনারেল) চিত্তরঞ্জন দত্ত, বীর-উত্তম  ৪ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ছুটিতে থাকা অবস্থায় হবিগঞ্জ এলাকায় বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের নবম খণ্ডে ‘সিলেটের প্রতিরোধ যুদ্ধ’ শিরোনামে তাঁর একটি রচনা এবং দশম খণ্ডে ১৯৭৪ সালের ২৪ মার্চে গৃহীত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে যুদ্ধস্মৃতি প্রকাশিত হয়। এ দুটি রচনার ভিত্তিতে ২০০০ সালে তপন কুমার দে ‘মুক্তিযুদ্ধে ৪ নং সেক্টর ও মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত, বীর-উত্তম’ নামে একটি বই রচনা করেন। লেখক তাঁর বইয়ে মেজর দত্তের রচনা দুটি কিছুটা সম্প্রসারিত করে তার সঙ্গে স্বাধীনতাপূর্ব ইতিহাস জুড়ে দিয়েছেন। বইয়ে ৪ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত যুদ্ধের বর্ণনা আছে। বইয়ের শেষে তপন কুমার ৪ নম্বর সেক্টরের শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি যুক্ত করেছেন। তপন কুমার বইটি রচনায় মেজর দত্তের একাধিক সাক্ষাৎকার ও মেজর দত্তের কাছে সংরক্ষিত নথিপত্রের সাহায্য নিয়েছেন বলে মেজর দত্ত ও তাঁর পরিবার নিশ্চিত করেছেন। যদিও বিষয়টি তপন কুমার তাঁর বইয়ের কোথাও উল্লেখ করেননি এবং বইটি মেজর দত্তের জবানিতে রচনা না করে লেখক তাঁর নিজস্ব ঢঙ্গে বর্ণনামূলকভাবে রচনা করেছেন। বইটি রচনার কারণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেন, ‘বিগত প্রায় আড়াই যুগে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশ হয়েছে অসংখ্য লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। তবু আমার মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আরো অনেক লেখার এবং প্রকাশের প্রয়োজন আছে। মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে লেখা কোনো দিনই শেষ হবে না। তাই আমি ‘মুক্তিযুদ্ধে ৪ নং সেক্টর ও মেজর জেনারেল (অব.) সি. আর. দত্ত, বীর উত্তম গ্রন্থটি লেখা এবং প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি। ’ [তপন কুমার দে। দুটি কথা]। বইটি বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য।

মেজর (পরে লে. জেনারেল) মীর শওকত আলী, বীর-উত্তম ৫ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের নবম খণ্ডে তাঁর রচিত ‘চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ’ এবং দশম খণ্ডে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসহ সামরিক জীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তিন খণ্ডে ‘দি এভিডেন্স’ নামে একটি বই রচনা করেন। বইয়ের নামকরণের যথার্থতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘I am not a writer, yet I am publishing eye witness accounts of important events in the name of “The Evidence” and evidence it is, as it contains the truth, the whole truth and nothing but the truth, without personal preference or prejudice.’ [মীর শওকত আলী। পৃ. ১৩]।

প্রথম খণ্ডে লেখক প্রতিরোধ যুদ্ধের শুরু থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়কালে যেসব অভিযান বা ঘটনা ঘটেছে তার বর্ণনা দিয়েছেন। দ্বিতীয় খণ্ডে জুলাই মাস থেকে বিজয় অর্জন পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত তাঁর সেক্টরের বড় সামরিক অভিযান ও ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে লেখক যুদ্ধ এলাকার রঙিন নকশা ব্যবহার করেছেন। বইয়ে বেশ কিছু নথিও সংযুক্ত করেছেন। এভিডেন্সের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকা এবং প্রিসিপিটাস প্রিলুড (Precipitous Prelude) একই এবং উভয় খণ্ডেই লেখক জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত সেক্টর অধিনায়কদের সভার বিস্তারিত বর্ণনার পুনরাবৃত্তি করেছেন।

উইং কমান্ডার (পরে এয়ার ভাইস মার্শাল) এম কে বাশার, বীর-উত্তম ৬ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ১২ মে ঢাকা থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ বইয়ের নবম খণ্ডে ‘ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরের কথা’ শিরোনামে একটি রচনা প্রকাশ করেন। রচনায় তিনি ২৫ মার্চ থেকে ১২ মে পর্যন্ত ঢাকা সেনানিবাসের ঘটনা অত্যন্ত সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তীতে পত্র-পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি কিছু রচনা প্রকাশ করেছিলেন। যেমন ১৯৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস নিয়ে একটি রচনা প্রকাশ করেন। উইং কমান্ডার বাশার তাঁর যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে কোনো বই রচনা করেননি।

মেজর নাজমুল হক যুদ্ধের শুরু থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ৭ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি মার্চ মাসের শেষের দিকে নওগাঁয় ইপিআরে কর্মরত অবস্থায় বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। স্বভাবত তিনি তাঁর যুদ্ধ অভিজ্ঞতা লিখার সুযোগ পাননি।

মেজর কাজী নুর-উজ্জামান, বীর-উত্তম  ৭ নম্বর সেক্টরের দ্বিতীয় অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৬৯ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। ২৬ মার্চে তিনি ঢাকা থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। অবসরপ্রাপ্ত ও জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা হওয়ায়, যুদ্ধের প্রথম দিকে তাঁকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। জুলাই মাসে তিনি ৭ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পান। তিনি তাঁর যুদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৯ সালে ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা’ বইটি প্রকাশ করেন। বইটি রচনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, ‘এই যুদ্ধ ছিল সমস্ত বাঙালি জাতির পক্ষে একটি মহান ঘটনা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যুদ্ধের জন্য কোনো প্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও ২৫ মার্চের রাতের ভয়াবহ গণহত্যার পর দেশের মানুষ স্বেচ্ছায় যুদ্ধে নেমে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক নেতাদের কার্যকলাপ ও আচরণ এতই জনবিমুখী ছিল এবং এসব ঘটনার আমি যে প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম এগুলো না লিখলে মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এসব ঘটনা কি প্রকাশ করা উচিত? এসব ঘটনাবলি কি মুক্তিযুদ্ধকে মলিন করে দেবে না? আমি কি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল একটি দৃষ্টিকোণ থেকে লিখব? আমি কি সত্য গোপন করব? আর এই সত্য প্রকাশ করাটা কি জাতি ও নতুন প্রজন্মের জন্য শুভ হবে? এই দ্বন্দ্ব নিয়েই এতদিন ভুগে আসছি। আজ আর সেই দ্বিধায় ভুগছি না। ঠিক করেছি যে, স্বাধীনতাযুদ্ধের আমি সেই ইতিহাসটুকুই লিখব, যা আমি দেখেছি ও শুনেছি। এই লেখা যদি শেষ করতে পারি তা হলে যারা এই বইটি পড়ার সুযোগ পাবে তারাই সিদ্ধান্ত নেবে আমার বিষয়াদি, প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে। ’ [কাজী নুর-উজ্জামান। পৃ. ১১ ও ১২]।

কর্নেল নুর-উজ্জামান নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতেন। তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি’ এবং ‘সমাজ ও সংস্কৃতি’ নামে আরো দুইটি বই রচনা করেন। এ ছাড়া তিনি ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কোথায়’ এবং ‘জেনোসাইড ’৭১’ (ইংরেজিতে) নামে দুইটি বই যৌথভাবে সম্পাদনা করেন। ২০১৪ সালে তাঁর নির্বাচিত রচনার একটি সংকলন প্রকাশিত হয়।

মেজর (পরে লে. কর্নেল) আবু ওসমান চৌধুরী যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ৮ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ইপিআরে কর্মরত থাকা অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সেক্টর অধিনায়কের দায়িত্ব শেষে তিনি বাংলাদেশ বাহিনীর সদর দপ্তরে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের নবম খণ্ডে তাঁর রচিত ‘চুয়াডাঙ্গা-কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ যুদ্ধের বিবরণ’ এবং দশম খণ্ডে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক রচনা প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ১৯৯১ সালে একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির শিরোনাম—‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।   

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বইটি সম্পর্কে উল্লেখ করেন, ‘“এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” গ্রন্থে কর্নেল ওসমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রামাণ্য ইতিহাস রচনার চেষ্টা করেছেন। গ্রন্থটি তিনটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকা-স্বরূপ ১৯৪৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এ-অঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক ঘটনা ও ধারার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণ, আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ ও পশ্চাদপসারণের বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে এবং তৃতীয় অংশে মুক্তিবাহিনীর পুনর্গঠন, প্রশিক্ষণ, সংগ্রাম ও বিজয় লাভের কথা বলা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যাবে যে, বইটি কর্নেল ওসমানের স্মৃতিকথা নয়; বস্তুত তিনি নিজের কথাও বলেছেন প্রথম পুরুষে। এ বইতে ১৯৭১ সালের সম্মুখ সমরের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আছে। ’ [আবু ওসমান চৌধুরী। পৃ-৬ ও ৭]।

বইটি রচনার পদ্ধতি সম্পর্কে লেখক বলেছেন, ‘আমি লেখক নই, ঐতিহাসিকও নই। তাছাড়া যুদ্ধকালীন সারাদেশের ১১টি সেক্টরের মধ্যে আমি মাত্র একটি সেক্টরে (৮ নং সেক্টর) যুদ্ধ করেছি। স্বাভাবিকভাবেই আর ১০টি সেক্টরের যুদ্ধ-বর্ণনা সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাকে বহু বেগ পেতে হয়েছে, বহু সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। তার পরও এমন বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংঘর্ষ ঘটেছে যে গুলোর বর্ণনা পাওয়া যায়নি বা বর্ণনা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবু ১৯৪৬ থেকে ১৯৭১ সনের স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত নিজে যতটুকু দেখেছি ও করেছি এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও গ্রন্থাদির পর্যালোচনা ও উদ্ধৃতির মাধ্যমে যথাসম্ভব সংগ্রহিত তথ্যকে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি যা হয়তো কোনদিন জাতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার অনুকুল সহায়ক হবে।

এটা লক্ষণীয় যে এই গ্রন্থ সংকলনে পারতপক্ষে বিশেষ কোন নামীদামী মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিনি। পরিবর্ত্তে নামীদামীদের অধীনস্থ সাধারণদের বক্তব্য থেকে তাঁদের কার্যকলাপকে যথাসম্ভব অবিকৃতাকারে মূল্যায়ণ করার চেষ্টা করেছি। ’ [আবু ওসমান চৌধুরী। পৃ. ৩]।

মেজর ওসমান ১৯৯৬ সালে ‘সোনালী ভোরের প্রত্যাশায়’ নামে অপর একটি বই রচনা করেন। এই বইয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত কয়েকটি প্রবন্ধ সংযুক্ত করেন, যেমন ‘সেদিন কেন অস্ত্র ধরেছিলাম’, ‘স্মৃতির পাতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সপ্তাহ’ ইত্যাদি।

মেজর (পরে মেজর জেনারেল) এম এ মঞ্জুর, বীর উত্তম আট নম্বর সেক্টরের দ্বিতীয় অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের দশম খণ্ডে তাঁর সাক্ষাৎকারভিত্তিক একটি সংক্ষিপ্ত রচনা পাওয়া যায়। সেখানে অতিসংক্ষেপে ২৬ জুলাই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে ১১ আগস্ট ৮ নম্বর সেক্টরে যোগদান এবং যুদ্ধকালে গৃহীত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তিনি কোনো বই রচনা করেননি।

মেজর এম এ জলিল মুক্তিযুদ্ধকালে ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটিতে বাংলাদেশে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি বরিশাল এলাকায় মুক্তিবাহিনীকে সংগঠিত করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন এবং বরিশাল-খুলনা এলাকায় যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। তিনি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি নিয়ে ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে ‘সীমাহীন সমর’ বইটি প্রকাশ করেন। বইয়ের পটভূমিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি এখানে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য বা তত্ত্ববহুল ইতিহাস রচনা করার ধৃষ্টতা দেখাইনি, চেষ্টা করিনি নিজেকে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসেবে প্রতিপন্ন করতে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, এটা আমার দীর্ঘ ন’মাস মুক্তিযুদ্ধের নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—যা আমি বন্দীদশায় লিপিবদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিলাম। ’ [আতিক হেলাল। পৃ. ২৬৩]।

বইয়ের প্রথম দিকে লেখক তাঁর সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়াসহ পাকিস্তানিদের শোষণ-শাসন নিয়ে কিছু আলোচনা করেন। এরপর তিনি ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে বরিশালে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

বইয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত ও পরিচালনা এবং বৃহত্তর বরিশাল, খুলনা ও সুন্দরবন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। বইয়ে ভারতের সহযোগিতা, মুজিব বাহিনী সংগঠনের ফলে স্থানীয়ভাবে উদ্ভূত সমস্যা, নৌ-কমান্ডোদের সাহসিকতাপূর্ণ অভিযান ইত্যাদির বর্ণনা আছে। লেখক কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। মেজর জলিল বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে বিশেষ কিছু উল্লেখ করেননি। বইটি বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য।

জুলাই মাসে সেক্টর অধিনায়কদের সম্মেলনে সেক্টর এলাকা নির্ধারণ করার সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) সংলগ্ন এলাকাকে ১০ নম্বর সেক্টরের আওতায় রাখা হয়। কিন্তু বার্মার সঙ্গে কূটনৈতিক জটিলতার কারণে এই সেক্টরটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা-পরবর্তীতে এই সেক্টরকে বিশেষ সেক্টর বা নৌ-কমান্ডোদের সেক্টর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। যুদ্ধকালে এই সেক্টরে কোনো অধিনায়ক ছিলেন না। মেজর (পরে লে. কর্নেল) আবু তাহের, বীর-উত্তম ১১ নম্বর সেক্টরের দ্বিতীয় অধিনায়ক ছিলেন। তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে আগস্ট মাসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে তিনি যুদ্ধে আহত হয়ে সেক্টর ত্যাগ করেন।

 ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ বইয়ের দশম খণ্ডে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তাঁর একটি রচনা যুক্ত আছে। সেখানে তার সেক্টরের কয়েকটি অভিযানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীতে কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার বর্ণনা ও মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর কয়েকটি রচনা প্রকাশ পায়। এসব রচনা একত্রে পাঠ করলে মুক্তিযুদ্ধে মেজর তাহেরের অবদান সম্পর্কে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা নিয়ে কোনো বই রচনা করেননি।

মেজর তাহের, বীর-উত্তম নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি আহত হওয়ার পর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (পরে উইং কমান্ডার) এম হামিদুল্লাহ খান, বীরপ্রতীক ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এপ্রিল মাসে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ঢাকা ঘাঁটি থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। আগস্ট মাসে তাঁকে ১১ নম্বর সেক্টরে বদলি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বেশ কয়েকটি বই রচনা করেন। এর মধ্যে ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘একাত্তরে উত্তর রণাঙ্গন’ অন্যতম।

এই বইয়ে লেখক মুক্তিযুদ্ধে যোগদান থেকে শুরু করে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়কালে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ও কর্মকাণ্ডের স্মৃতিচারণা করেছেন। এ ছাড়া বইয়ে তিনি ১১ নম্বর সেক্টরের উল্লেখযোগ্য অভিযানগুলো বর্ণনা করেছেন। বইয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী দু-একটি বিষয়ও লেখক যুক্ত করেছেন। বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, ‘একাত্তরে উত্তর রণাঙ্গন গ্রন্থটি দেশের উত্তরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা। গেরিলা যুদ্ধের বিবরণ নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করার দায়বদ্ধতা এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে যেটুকু না বললেই নয়, সেখানেই কেবল প্রসঙ্গের সীমা যিকঞ্চিত অতিক্রম করা হয়ে থাকতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনার স্বার্থে মিত্রবাহিনী ও পাকবাহিনীর তৎপরতাও প্রয়োজনে উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এত ব্যাপক ও বিশাল, যা এই বইয়ের ক্ষুদ্র পরিসরে লেখার অবকাশই নেই। প্রবাসী সরকারের রণাঙ্গনের যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ের জন্য যা প্রয়োজন ততখানিই লেখা হয়েছে। বক্তব্যের যৌক্তিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে সংক্ষিপ্তাকারে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর অবতারণা করা হয়েছে। ’ [এম হামিদুল্লাহ খান। লেখকের কথা]।

‘একাত্তরে উত্তর রণাঙ্গন’ বইটি রচনার যুক্তি হিসেবে লেখক উল্লেখ করেন, ‘মুক্তিভিত্তিক বিস্তর রচনা মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে, কদাচিৎ বিভ্রান্ত করেছে। ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার হিসাবে প্রকৃত যুদ্ধের কিছু কিছু বর্ণনায় যে স্খলন ও বিভ্রান্তি লক্ষ করেছি সে বিষয়ে সঠিক তথ্য নির্ভর ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করার তাগিদ অনুভব করছি। এমনিতেই মুক্তিযুদ্ধের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে অবমূল্যায়নের উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র জিঘাংসাপরায়ণ গোষ্ঠী আকারে ইঙ্গিতে এমন একটা ভাব দেখাতে চায় যে, এ দেশে প্রকৃতপক্ষে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ দখল করে পাক সেনাদের বন্দি করে ভারতে নিয়ে চলে গেছে। পরে ওরা চলে যাওয়ার পর আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। সঠিক তথ্য অগোচরে থেকে গেলে এই ধরনের রটনা আরও শক্তিশালী হবে সন্দেহ নাই। ’ [এম হামিদুল্লাহ খান (একাত্তরে উত্তর রণাঙ্গন)। পৃ. ২৫৫]।

২০১২ সালে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হামিদুল্লাহ, বীরপ্রতীক ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ শিরোনামে অন্য একটি বই প্রকাশ করেন। লেখক বইটি সম্পর্কে উল্লেখ করেন, ‘এই বইটি মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকারের তত্ত্বাবধানে সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে রণাঙ্গনে নিয়মিত বাহিনী, এফএফ, এমএফ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরের সহায়ক বাহিনীর যুদ্ধ এবং যুদ্ধ ময়দানে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব, বিভিন্ন সেক্টরে ও জেডফোর্সের লড়াই নিয়ে লেখা। ’ [এম হামিদুল্লাহ খান (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস)। পৃ. ৫]। এই বইয়ে লেখক মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসের সাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন। বইটি রচনায় লেখক বিভিন্ন গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছেন, তবে সূত্রে তা উল্লেখ করেননি।

স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ তের/চৌদ্দ দিন মিত্র শক্তি হিসেবে ভারতীয় বাহিনী অংশ নিয়েছিল। যুদ্ধে অংশ নেওয়া বেশ কিছু ভারতীয় অধিনায়ক যুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা বা অবদান সম্পর্কে বই রচনা করেছেন। তাঁদের এই বইগুলোর মধ্যে অনেকগুলো বাংলাদেশে সুলভ এবং কিছু কিছু বইয়ের বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসে ভারতীয়দের রচিত বইগুলো বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পাঠ করা হয়। বিবিধ কারণে আমাদের অধিনায়কদের লিখা সামরিক ইতিহাস সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। ভারতীয় অধিনায়করা মাত্র তের-চৌদ্দ দিন যুদ্ধকে কাছ থেকে দেখেছেন, অথচ আমাদের অধিনায়করা জড়িত ছিলেন পুরো ৯ মাস। আমাদের অধিনায়কদের লিখা যে পনের-বিশটি বই সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো তার অনেকগুলোই এখন দুষ্প্রাপ্য। উপরন্তু দু-একটি ছাড়া বেশির ভাগেরই কোনো প্রচার নাই।

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস রচনার জন্য স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেওয়া সব পক্ষের লিখা বইয়ের প্রয়োজন আছে, এমনকি হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়কদের বইগুলোরও প্রয়োজন আছে। তাই স্বাধীনতাযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপনের জন্য স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেওয়া অধিনায়কদের বইগুলোকে সরকারি উদ্যোগে নতুন করে সম্পাদনা করে, নথি ও ছবিসহ প্রকাশ করা উচিত এবং বাংলাদেশের সব পাঠাগারে সংরক্ষণ করা উচিত।