kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্রবন্ধ

শুধু আপনার ছেলে নই, সমাজেরও

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



শুধু আপনার ছেলে নই, সমাজেরও

শহীদ সাবের (জন্ম : ১৮ ডিসেম্বর ১৯৩০। মৃত্যু : ৩১ মার্চ ১৯৭১)

‘শুধু আপনার ছেলে নই, সমাজেরও’ কথাটা একজন তরুণ ছাত্রের, রাজবন্দি হয়ে যাঁকে বিনা বিচারে একটানা চার বছর জেলে কাটাতে হয়েছে। ছাত্রটির নাম শহীদ সাবের, যাঁর কথা ভাবলে একই সঙ্গে দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ হতে হয়। দুঃখ ও ক্ষোভ রাষ্ট্রের নিপীড়নকারী চরিত্রটি দেখে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কেমন নিষ্ঠুর ছিল তার অসংখ্য নিদর্শন আমাদের চতুর্দিকে ছড়ানো রয়েছে; সেগুলোর একটি হলো শহীদ সাবেরের জীবন ও মৃত্যু।

বিজ্ঞাপন

সে ঘটনা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী।

শহীদ সাবের জেলে যান ১৯৫০ সালে, যখন তিনি সদ্য ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছেন, চট্টগ্রামে। সেকালের অসংখ্য রাজবন্দির মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। তারপর বিনা বিচারে চার বছর আটক ছিলেন কারাগারে। বন্দি অবস্থায় থেকে আইএ পাস করেছেন, প্রস্তুতি নিয়েছেন প্রাইভেট প্রার্থী হিসেবে বিএ পরীক্ষা দেওয়ার। মুক্তি পেয়েছেন ১৯৫৪-তে। কিন্তু আক্রান্ত হয়েছেন অর্থনৈতিক সংকটে, যে সংকট রাষ্ট্র তৈরি করেছে সাধারণ মানুষের জন্য। এ প্রসঙ্গে আবার আসা যাবে, আপাতত আমরা বন্দি ছাত্রটির বক্তব্যের কাছে ফিরে যাই।

ছাত্রটি চিঠি পেয়েছেন তাঁর পিতার কাছ থেকে। পিতা লিখেছেন, ‘পরিবার ভেঙে গেল। তোমার জন্য তোমার মা পাগল হয়ে গেছেন। তোমার ছোট ভাই-বোনদের যন্ত্রণাদায়ক প্রাণান্ত জিজ্ঞাসা আমারও জীবনীশক্তির মূলে আঘাত করছে। তুমি যদি ইচ্ছে করো তবে মুক্তি লাভ করতে পারো অনায়াসে। সরকারের কাছে জানাও যে তুমি আর রাজনীতি করবে না। এটা আমাদেরই জাতীয় সরকার। আশা করি তুমি তা-ই করবে। ’ ভয় দেখিয়ে বাবা এও লিখেছেন যে কবরের এপারে ছেলের সঙ্গে তাঁর হয়তো আর দেখা হবে না।

চিঠি পড়ে ছাত্রটি বিষণ্ন হয়ে পড়েন, স্তব্ধ হয়ে থেকেছেন কিছুক্ষণ, তারপর ভেবেচিন্তে লিখেছেন, পরিবারের ধ্বংসের যে চিত্র পিতা তাঁকে দিয়েছেন তাতে বেদনার্ত হয়েছেন, কিন্তু তিনি তো নিজেকে কেবল পরিবারের সন্তান বলে মনে করেন না, সন্তান তিনি সমাজেরও; এবং সমাজের প্রতি রয়েছে তাঁর আরো বড় কর্তব্য। পিতা যা বোঝেন না, বিশ বছরের যুবক সেটি বোঝেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বাইরে এসে সমস্যার সমাধান করতে পারব না। বাইরে হাজার হাজার বেকার যুবক ঘুরে বেড়াচ্ছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় তারা সম্পূর্ণ ভবিষ্যত্হীন। এই সমাজকে ভেঙে নতুন দুনিয়া গড়তে হবে। আপনি অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও বেতন পাননি চার মাসের। ভেবে দেখুন, কতটা অমানুষিক এই ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী, তার কাছে আমাকে আত্মসমর্পণ করতে আশা করি আপনি আর বলবেন না। ’

অল্পবয়সী ছেলেটি কী পরিষ্কারভাবে সমাজব্যবস্থাটাকে বুঝে নিয়েছেন। পিতা বলেছেন জাতীয় সরকার দেশ শাসন করছে, উল্টো সন্তান বলছেন, ‘এটা আমাদের জাতীয় সরকার নয়, এ সরকার ইস্পাহানী-হারুনদের, পীরদের, মীরদের, বড় বড় ধনীদের। তারা জাতি নয়, তার বাইরে রয়েছে মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক প্রভৃতি বুদ্ধিজীবী শোষিত শ্রেণি। বর্তমান সরকার তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। ’ শ্রেণি ও জাতি যে এক নয়, এবং পাকিস্তানি শাসকরা যে শ্রেণিশোষণকে আড়াল করার জন্যই জাতিগঠনের হট্টগোল বাধিয়েছিল, সেই সত্যটি ছাত্রটির কাছে মোটেই অস্পষ্ট ছিল না। অথচ তিনি তখন কলেজে পড়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত, এবং সময়টা হচ্ছে বায়ান্নর আগে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তখনো হয়নি, স্বাধীনতা এনে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র।

আমরা উদ্ধৃতি দিচ্ছি শহীদ সাবেরের সর্বাধিক পরিচিত, ছোট কিন্তু চাঞ্চল্যকর ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ নামের রচনাটি থেকে। এটি তিনি চট্টগ্রাম জেলে বন্দি অবস্থায় লিখেছেন। এবং তাঁর কারামুক্ত হওয়ার আগেই তা তখনকার দিনে কলকাতার সবচেয়ে প্রগতিশীল বলে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মাসিক পত্রিকা নতুন সাহিত্যে প্রকাশিত হয়। কারারক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে এটি বাইরে পাঠানো হয়েছিল, বাংলা ১৩৫৭ অর্থাৎ ইংরেজি ১৯৫১ সালে, আর বলাই বাহুল্য শহীদ সাবেরের নিজের নামে তা প্রকাশিত হয়নি, লেখক হিসেবে নাম ছাপা হয়েছিল জনৈক জামিল হোসেনের। রচনাটি রাজবন্দির রোজনামচা ধরনের লেখা। উভয় বাংলার পাঠকরা লেখকের পরিচয় জানতে কৌতূহলী হয়েছিলেন; সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখাটির প্রশংসা করে এবং ওই নতুন লেখককে স্বাগত জানিয়ে পত্রিকার সম্পাদককে চিঠি লিখেছিলেন।

‘আরেক দুনিয়া থেকে’র এই ছাত্রটি কেবল যে আত্মসমর্পণে অসম্মত হয়েছেন তা-ই নয়, তিনি তাঁর প্রচণ্ড আশাবাদের কথাও জানিয়েছেন। রাতের বেলা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাঁর ঘুম আসে না। ছাত্রটি একটি কবিতা লিখে শেষ করেন, যে কবিতায় আছে—

‘আগামী দিনকে জানাই অভিনন্দন/যখন,/আমার মত বিশ বছরের তরুণ প্রাণ/উদ্ধত যৌবন নিয়ে/গাইবে জীবনের জয়গান/তাদের শক্ত বাহুল শক্তিতে/খামারে ও ক্ষেতে/ট্রাক্টর পাবে গতি। ’

শহীদ সাবের ১৯৫৪-তে কারাগার থেকে মুক্ত হন। তখন তাঁর হাতে অনেক কাজ। সেই ব্যস্ত সময়ে আমি তাঁকে দেখেছি। থাকতেন আমাদের পাড়ায়ই। ঢাকার পশ্চিম প্রান্তের আজিমপুরে সরকারি কর্মচারীদের আবাসিক এই এলাকায় শহীদ সাবেরের পিতার বাসা আমাদের বাসার কাছেই ছিল। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি স্বভাবতই পিতার বাসায় উঠেছিলেন। খুব যে ব্যস্ত সেটা বোঝা যেত তাঁকে কম দেখার ব্যাপারটা থেকেই। পরে জেনেছি, তিনি একসঙ্গে অনেক কাজ করছিলেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করলেন; কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন একটি স্কুলে; এবং লিখছিলেন ছোটগল্প, কিশোরদের জন্য রচনা, কবিতা, অনুবাদ। অল্প সময়ে অনেক কাজ করেছেন তিনি। ১৯৫৫-তেই তাঁর ছোটগল্পের চমৎকার একটি সংকলন বের হয়েছে ‘এক টুকরো মেঘ’ নামে; ‘ক্ষুদে গোয়েন্দার অভিযান’ নাম দিয়ে কিশোরদের জন্য একটি সুখপাঠ্য গল্পসংগ্রহ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮-তে। তিনটি বিদেশি রচনার অনুবাদও সম্পন্ন করেছিলেন অল্প সময়ে; এবং বেশ কিছুসংখ্যক কবিতা লিখেছেন। গানও আছে তাঁর।

কারাবন্দি জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পিতার ভেতর মতামতের আদান-প্রদান কেবল যে ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ নামের লেখাটিতেই পাওয়া যাবে তা নয়, তাঁর একটি গল্পেও এই যোগাযোগটি শান্ত অথচ মর্মস্পর্শী উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গল্পটির নাম ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’। তিন বছর পর জেলগেটে রাজবন্দি পুত্রের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন তাঁর পিতা; সঙ্গে ছোট বোন এবং তার চেয়েও ছোট ভাইটি। পিতার সেই একই বক্তব্য, ‘দেখো, তুমি হচ্ছ আমাদের বড় ছেলে। বাপ-মায়ের বড় ছেলেকে ঘিরে কত আশা-ভরসা থাকে সেটা তোমাকে বলে দেবার দরকার নেই। আজকে আমি শুধু তোমার সাথে দেখা করতেই আসিনি। আমি এসেছি তোমার কাছে শেষ আরজ নিয়ে। ’ আর আরজটা হচ্ছে ছেলে আর রাজনীতি করবেন না বলে একটা বন্ড লিখে দিন। তাহলেই তিনি মুক্ত হয়ে যাবেন। তাঁর যুক্তি, ‘তোমার জন্য তোমার মা পাগলের মতো হয়ে গেছে। ওঁর মুখে দিনরাত কেবল তোমার কথা। তোমার ভাই-বোনদের দিনরাতের জিজ্ঞাসা আমাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আর আমার স্বাস্থ্য তো দেখেছই, এভাবে চললে আর বেশিদিন বাঁচবার ভরসা নেই। ’ যুক্তি আরো আছে। ‘যাদের সংস্থান আছে তাদের জন্যই রাজনীতি। আমার সম্বল চাকরি। আমাদের ওসব পোষায় না। তোমার মা-বোনের দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। ’

ছেলেটি শোনেন। বাবার কথাগুলো তাঁর বুকে তুফান তোলে। বাবার একেকটি শব্দ হাতুড়ির একেকটি ঘা হয়ে এসে পড়ে তাঁর বুকে। বাবার দিকে তাকিয়ে মায়া হয়। বাবার জীবনটা কষ্টেই কেটেছে। অশেষ দুঃখ ও বেদনার মধ্যেও তিনি মিথ্যে বলেননি। অনেক লোভ ও প্রলোভনের ভেতর থেকেও তিনি সাত্ত্বিকের জীবন যাপন করেছেন। কিন্তু ছাত্রটির পক্ষে তো সম্ভব নয় অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হওয়া। বাবা বলে গেলেন, সামনের বার যখন আসবেন ছেলের মাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন।

ছাত্রটির জন্য এরা প্রাণের চেয়েও প্রিয়। বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর বোনটি কাঁদে। ভাইটিকে বলে, সে যাবে না। ভাইয়ার সঙ্গে থাকবে। বাবা চলে যান, ওদের নিয়ে। ছেলেটি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। কারাজীবন কেমন দুঃসহ, ছেলেটি তা জানে। তার চেয়ে বয়সে যাঁরা বড়, দীর্ঘদিন ধরে রাজবন্দি হয়ে আছেন তাঁদের দেখে নিজের পরিণতির কথা সে ভাবতে পারে। বইপত্র নেই পড়বার। ব্যবস্থা নেই সুচিকিৎসার। দিনের পর দিন যায়, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। শরীরের ওজন কমে। মুখটা বিবর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু বন্দিরা দমেন না। তাঁদের জীবনে অগ্নিপরীক্ষা আসে ছয় মাস পর পর সরকার যখন গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার পাঠান। তখন ওরা বলে, ‘আত্মসমর্পণ করুন, ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ’ ক্রোধে উদ্দীপ্ত হন বন্দিরা; ফিরে যায় অফিসাররা।

ছাত্রটি দেখছেন যে জেলের বাইরে যারা আছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন ঘটে। তাঁর দূরসম্পর্কের এক বড় আপা, ছাত্রটির রাজনৈতিক জীবনের যিনি ছিলেন নির্মম সমালোচক, তিনি জানিয়েছেন, ‘তোমাদের মতো ছেলেদের বেঁচে থাকার দাম আছে। ’ আর জেলের ভেতর তিনি যা পেয়েছেন তা অন্য কয়েদিদের দেওয়া সম্মান শুধু নয়, রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে যাপন করা যৌথ জীবনের অভিজ্ঞতাও; সে সম্পর্কে ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ নামের রচনাটিতে তিনি লিখেছে—‘এখানকার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য জিনিস সামগ্রিক চেতনাবোধ। কর্তৃপক্ষ বন্দীদের থেকে একেকজনকে আলাদা করে। তা সত্ত্বেও বন্দীদের মধ্যে গড়ে উঠেছে একটা বিরাট সমষ্টিগত জীবন। কারণ তারা রাজনীতি দিয়ে সহজেই বুঝতে পারে এ জীবনের তাৎপর্য, টাকা-পয়সা থেকে খাওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত সবই যৌথ ব্যবস্থার অন্তর্গত। ’

যৌথ জীবনের প্রতি এই টান, তাকে মূল্যবান জ্ঞান করবার এই যে মনোভঙ্গি এটাই তাঁকে আইএ ক্লাসের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই উদ্বুদ্ধ করেছিল কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রসংগঠন ছাত্র ফেডারশনে যোগ দিতে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে। জেলের ভেতরে রাষ্ট্রের চেষ্টাটা হলো মানুষকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা, জেলের বাইরেও সেই একই চেষ্টা চলছিল। অথচ ছেলেটি বিচ্ছিন্ন হতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন সংঘবদ্ধ হবেন, আন্দোলন করবেন, যোগ দেবেন সমাজবদলের প্রচেষ্টায়। তাঁকে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্র নিজের কর্তব্য করেছে, তাঁকে আটক করেছে জেলখানায়, যাতে তিনি বিচ্ছিন্ন থাকেন সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে।

জেলখানায় যে তরুণ নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেননি, জেলের বাইরে এসে তিনি কিন্তু দেখেন ভিন্ন অবস্থা। যোগ দেবেন যে এমন রাজনৈতিক আন্দোলন তখন দেশে নেই। হ্যাঁ, ১৯৫৪-র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয় হয়তো তাঁর মুক্তি সম্ভব করেছে, কিন্তু সেই যুক্তফ্রন্ট তো টেকেনি, খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে; দেশে সামরিক শাসন চলে এসেছে, আবার আত্মগোপনে চলে গেছেন কমিউনিস্টরা, রাষ্ট্র যাঁদের এক নম্বরের দুশমন হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে একেবারে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। অন্যদিকে তাঁর ওপর দায়িত্ব এসে পড়েছে পিতাকে  সাহায্য করার। এককথায় প্রয়োজন দেখা দিয়েছে উপার্জনের। সমাজের জন্য কাজ করবেন কি, নিজের জন্যই কাজ করা জরুরি কর্তব্য হয়ে পড়েছে। কারাবন্দি অবস্থায় উপার্জনের প্রয়োজন ছিল না, এখন উপার্জন ছাড়া চলবে না। অন্যদের থেকে তো বটেই, নিজের পরিবার থেকে তাঁর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার উপক্রম। তিনি তখন কলেজে ভর্তি না হয়েই বিএ পাস করেছেন, চাকরি নিয়েছেন স্কুলে। কেন্দ্রীয় সরকারের সুপিরিয়র সার্ভিসের (সিএসএস) জন্য পরীক্ষা দেবেন বলে ঠিক করেছিলেন, কিন্তু চোখের রোগের দরুন অযোগ্য বিবেচিত হবেন মনে করে পরীক্ষা দিলেন না। শহীদ সাবেরের যে মেধা তাঁর রচনাগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে তা পাঠ করলে কোনো সন্দেহ থাকে না যে পরীক্ষা দিলে তিনি অকৃতকার্য হতেন না। চোখের চিকিৎসা অসম্ভব ছিল বলে অনুমান করি না, কিন্তু সে জন্য ব্যয় করার মতো অর্থসংগতি তাঁর নিশ্চয়ই ছিল না। কেন্দ্রীয় ইনফরমেশন সার্ভিসের জন্য পরীক্ষা দিলেন; সে বছরের কৃতকার্যদের ভেতর তাঁর অবস্থান ছিল শীর্ষে; কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দরুন তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হলো না। যে সংশ্লিষ্টতা থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য শহীদ সাবেরকে বিনা বিচারে চার বছর আটক করে রাখা হয়েছিল, সেই একই অপরাধে এবার সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের সুযোগ থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হলো। বন্দি অবস্থায় তিনি দেশের যুবকদের জন্য বেকারত্বের সমস্যার কথা লিখেছিলেন, সেই সমস্যাটা যে সত্যি সত্যি কেমন ভয়াবহ, ‘মুক্ত’ অবস্থায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সেটা তাঁকে বুঝে নিতে হয়েছিল।

তদুপরি রাষ্ট্র তাঁকে শাস্তি দিচ্ছিল। জেলে পাঠিয়ে শাস্তি দিয়েছে; শাস্তি দিয়েছে বেকার রেখে, এবং শেষ পর্যন্ত শাস্তি দিল তাঁকে হত্যা করে। একাত্তরের ৩১ মার্চ তারিখে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দৈনিক সংবাদ অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়; শহীদ সাবের তখন ওই অফিসে ছিলেন; অগ্নিদগ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। সংসারী হওয়া তো পরের কথা, তাঁর জন্য কোনো আশ্রয়ই ছিল না।

অথচ মেরুদণ্ড শক্ত ছিল, আশাবাদ ছিল প্রচণ্ড। ভাঙবেন তবু মচকাবে না—এমনই ছিল মনোভাব। কারারুদ্ধ অবস্থায় কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন, সেগুলোর প্রতিটিতে তাঁর আশাবাদ দেখা যায়। বিপ্লবী ইলা মিত্রর জবানবন্দি পড়ে তিনি লিখেছিলেন—‘খোদার আরস কাঁপানো কী ভীষণ তোমার জবানবন্দী মাগো!/মাগো, তুমি সেই অলগা মাতা/ইলা মাতা পূর্ব বাংলার/বৃটিশ রাজার বানানো ফাঁড়িতে/লীগসরকারের নাত্সী সান্ত্রীরা/তোমাকে আনলো ধরে এক শীতের দিনে/নতুন ভের্নের বড় দারোগা পশু/আবার জিজ্ঞাসা শুরু/বিদেশী রাজের গোলামী পীড়িত উত্তরবঙ্গ/ডলার রাজের গোলামী পীড়িত পাকিস্তান/নূরুল লিয়াকত খড়্গ ঝোলে’

ওই কবিতায় শহীদ সাবের লিখেছিলেন যে ইলা মিত্রের ওপর যারা অত্যাচার করেছে তাঁর সন্তানরা তাদের চিনে রাখবে। আশা ছিল, আন্দোলন বেগবান হবে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম তীব্রতা পাবে। কিন্তু জেল থেকে বের হয়ে সাবের দেখলেন, আন্দোলন নেই। ওদিকে অভাব, দারিদ্র্য ও কর্তব্যবোধ দুই দিক থেকে তাঁকে তাড়া করছে। সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছিলেন। সেকালে সাংবাদিকতায় আয় ছিল সীমিত এবং বেশির ভাগ সময় অনিয়মিত। তত দিনে তাঁর পিতা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে চট্টগ্রামে চলে গেছেন। কর্তব্যপরায়ণ জ্যেষ্ঠ পুত্র দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয়েছিলেন, বাসা ভাড়া করে মা-বাবা, ভাই-বোনদের ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন; কিন্তু আয়ের স্বল্পতার দরুন সঙ্গে রাখতে পারেননি, তাঁরা আবার চট্টগ্রামে ফিরে গেছেন। চাপ ও হতাশার ভেতর তাঁকে দিনপাত করতে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটা হয়েছিলেন; তিনিও তেমনি উদভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। একাত্তরে তাঁর জন্য থাকার কোনো জায়গা ছিল না, যে জন্য সংবাদ অফিসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আশ্রয়স্থলটি যে মোটেই বিপদমুক্ত ছিল না, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে; তিনি শহীদ হয়েছেন।

বুকের ভেতর আগুন ছিল, ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। অপচয় ঘটল উভয়েরই। তাঁর নিজের কারণে নয়, রাষ্ট্রের দৌরাত্ম্যে। তাঁর লেখাগুলো পড়লে অত্যন্ত গভীর বেদনা জাগে; যার একটা কারণ ওই অপচয়, লেখার সময় পেলেন না, কিন্তু যা লিখেছেন তা হারিয়ে যাবে না ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ তো অবশ্যই। ছোটগল্পগুলোও অসাধারণ। কিশোরদের জন্য যে কয়টি গল্প রেখে গেছেন, সেগুলো কিশোরদের তো অবশ্যই, সব বয়সের মানুষকেই আনন্দ দেবে। গল্পগুলোতে শহীদ সাবের একজন কিশোরের দৃষ্টি দিয়ে জগৎ দেখছেন এবং নানা রকমে অভিজ্ঞতার খবর দিচ্ছেন। চমৎকার কৌতুক আছে বেশ কয়েকটি গল্পে।

যে একটিমাত্র ছোটগল্পের বই তিনি রেখে যেতে পেরেছেন, তার প্রথম গল্পটিতে ২২ বছর বয়সের নিম্নমধ্যবিত্ত এক তরুণ যুবক সংসারের দৈন্যদশা দেখে হতাশ হয়ে একা একা কাঁদে। একসময় হঠাৎ খবর আসে যে তার চাকরি হয়েছে। খবরটি পেয়ে সংসারের মানুষগুলো যেন জেগে ওঠে। আর যুবকটি টের পায় তার বুকটা দুলে উঠছে। তার মনে হয়, ‘আসলে দুনিয়াটা তো তেমন খারাপ নয়, যেমনটা সে দুপুর বেলাতে ভেবেছে। আকাশ তো নীলই, মাঝে মাঝে অল্পক্ষণের জন্য একটু মেঘ করে। ’ আশাবাদের এই অনুভূতি শহীদ সাবেরেরও নিশ্চয়ই হয়েছিল, যখন তিনি কারামুক্ত হয়েছেন। কেননা কারাগারে রাজবন্দিদের মনোবল তো তিনি দেখেছেনই, লক্ষ করেছেন যে কারারক্ষীরাও সচেতন হয়ে উঠেছে। ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ লেখাটিতে আছে—

“সিরাজ সান্ত্রী বলে মিটিংয়ের খবর। বলে উজীরে আজম তো আমাদের কথা কইল না। আলাপ হয় এ নিয়ে-‘বুঝলেন সেপাই সাহেব’, ওসমান বলে, ‘এবার আমাদের এক হয়ে দাঁড়াতে হবে। ’ সান্ত্রী বন্ধুটি বলে, ‘আমাদের মধ্যে একতা নেই। ’ নেই? না থাকতে পারে, গড়তে হবে একতা, সেপাইও তা জানে। সমাজতন্ত্রের আদর্শ নিয়ে সান্ত্রীরাও ভাবতে শুরু করেছে। পুরোপুরি ধারণা নেই কারো। পেয়েছে কেবল আবছা আবছা একটা ধারণা। তার মধ্যে তারা বুঝতে পারে সমাজতন্ত্র হচ্ছে গরীবের যুক্তিতর্ক করার ভাষা। ”

অতটা আশা কিন্তু জেলে যাওয়ার আগে ছিল বলে মনে হয় না। তাঁর প্রথম ছোটগল্পটি ছাপা হয় চট্টগ্রামের সীমান্ত পত্রিকায়, ১৯৪৮ সালে, যখন তিনি স্কুলের ছাত্র। গল্পটি একজন যুবককে নিয়ে, যার স্ত্রী, সন্তান ও মা আছে; অল্প উপার্জনে সংসার চলে না, ভাড়া মেটাতে না পারার দায়ে বাড়িওয়ালা তাগাদা দেয় বাসা ছেড়ে দিতে। যুবকটি অবসন্ন বোধ করে। পাাশের বাড়ির রেডিও থেকে ঘোষণা শোনা যায়, ‘পাকিস্তান হবে পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দেবার যোগ্য। ’

হঠাৎ তার মনে হয়, ‘আমিও মানুষ। আমারও বাঁচার দাবী রয়েছে। ’ সেই অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই যেন তার শরীরের সমস্ত পেশি উন্মুখ হয়ে ওঠে। পাশের বালিশটাকে সে দুমড়ে ফেলতে চায়। সে দেখে, ‘সর্ব ইন্দ্রিয় আমার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। বহ্নি যেন জেগে উঠেছে আমার মাঝে। একসময়ে তা-ও শান্ত হয়ে আসে, ঝিমিয়ে আসে, নেতিয়ে পড়ে। ...বালিশের তুলো সমস্ত বিছানাময় তলিয়ে গেলো। ’

কারাগারে গিয়ে শহীদ সাবের আশা পেয়েছিলেন, মনে করেছিলেন সমাজটা বদলাবে। সে জন্য করণীয় কী তা-ও জানা হয়ে গিয়েছিল। সংঘবদ্ধ হতে হবে, লেখার মধ্য দিয়ে তো বটেই, রাজনৈতিক কাজের মধ্য দিয়েও। জেলখানায় থাকাকালে তাঁর খাতায় কয়েকটি উদ্ধৃতি লিখে রেখেছিলেন। উদ্ধৃতিগুলোর মধ্যে একটি ছিল, ‘কর্মই হচ্ছে চিন্তার উদ্দেশ্য। যে চিন্তাকে কর্মের দিকে প্রেরণা দেয় না, সে পণ্ডশ্রম। প্রবঞ্চনা মাত্র। অতএব চিন্তার সেবক যদি আমরা হয়ে থাকি, তবে কর্মেরও সেবক আমাদের হতেই হবে। ’ উদ্ধৃতিটি লেনিনের লেখা থেকে নেওয়া। বোঝা যায়, শহীদ সাবেরের চিন্তাধারাটা কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছিল; তিনি শুধু চিন্তা নয়, কর্মের সঙ্গেও যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। কারণ রাষ্ট্র ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং সমাজবিপ্লবীরা ছিলেন বিচ্ছিন্ন ও বিভ্রান্ত।

লেনিনের আরেকটি উক্তিও তাঁর খাতায় তোলা ছিল। সেটি এই রকমের : ‘কোনো জাতিই স্বাধীন হতে পারে না, যতক্ষণ তার জনসংখ্যার অর্ধেক লোক রান্নাঘরে দাসীবৃত্তি করতে বাধ্য থাকে। ’ নারীর বিশেষ দুর্দশার কথা তাঁর গল্পগুলোতে রয়েছে; তিনি নারীমুক্তির কথা খুব করে ভাবতেন।

‘আরেক দুনিয়া থেকে’ লেখাটি শেষ হয়েছে এভাবে : ‘ভেতর বাইরে সারা দুনিয়ায় আজ দ্বন্দ্ব। জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবার পালা এসেছে। একদিন এ তিমির-তপস্যার অবসান হবে—এ আশাটি ধুকধুক করে জ্বলছে সবার হৃদয়ে। বন্দীরা বেঁচে আছে। ’ তা আছে বৈকি। বন্দিরা বেঁচে আছে, কিন্তু মুক্ত হতে পারেনি। সেই সত্যটিই শহীদ সাবেরের জীবন ও রচনাবলি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ হই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নিষ্পেষণ দেখে।

নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাংলা একাডেমি তাঁকে ছোটগল্পের জন্য মরণোত্তর পুরস্কার প্রদান করে। সে কাজটি খুবই যথার্থ হয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি বেঁচে থাকলে রাষ্ট্র কী পারত আগের রাষ্ট্রের কৃতকর্মের চিহ্নগুলো মুছে ফেলে শহীদ সাবেরের জন্য চিকিৎসার বন্দোবস্তকরণসহ তাঁকে পুনর্বাসন করতে? মনে হয় না যে পারত, কেননা রাষ্ট্র ততটা বদলায়নি, যতটা বদলাবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। বদলানোর দায়িত্বটা অবশ্য সেই ছেলে-মেয়েদেরই, যারা শুধু নিজ নিজ পরিবারেরই সদস্য নয়, সদস্য সমাজেরও।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়