kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

গ ল্প

শহরে কাকের মৃত্যু সংক্রান্ত কিছু ব্যথা

অজিত দাশ

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



শহরে কাকের মৃত্যু সংক্রান্ত কিছু ব্যথা

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

আজকাল নিজেকে নিজের কাছে অপরিচিত করে তোলার শৌখিন পদ্ধতি আমার চারপাশে খাঁ খাঁ করে। মস্ত বড় দালান উঠে গেলে উচ্চতার দখলে আয়তনকে যেমন চোখে পড়ে না, আমারও ঠিক তেমন দশা। একটা অস্পষ্ট তাড়না, শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকার—এত উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার আয়তন ঠিক জানা নেই। না হয় কেন মাহবুব আজিজের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারিনি। অথচ মাহবুব আজিজ আমার চব্বিশ ঘণ্টার বন্ধু, আমাকে ঠিক আমার মতো করে না জানলেও আমাকে জানার পদ্ধতি তার বেশ রপ্ত, তাই কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণে আজ হুট করেই বলল, ‘কিরে, কিসের এত ব্যথা? মিনুর কোনো খোঁজখবর নিয়েছিস?’ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকলেও হঠাৎ নিজেকে কাগজের মতো দলা পাকিয়ে গুটিয়ে নেয়। সারটেইন অ্যাবসারডিটি! মাহবুব আজিজ জানে। আমার কতগুলো বাতিক তার স্পষ্ট করে জানা, তাই উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে কাজের অজুহাত দেখিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। সারা দিন ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই সকাল-সন্ধ্যা। ক্লায়েন্ট-এমপ্লয়ি, এমপ্লয়ি-প্রজেক্ট, প্রজেক্ট-মানি। নিজস্ব ফার্ম। ফিফটি সিক্স এমপ্লয়ি। তিল তিল সৌভাগ্য জোড়াতালি দিয়ে আজ এখানে। মাহবুব বলত, ‘শালা, টাকা ইনকাম কোনো কঠিন কিছু নয় রে, এর বাইরে কোনো কিছু ইনকাম করাই কঠিন।’ এই যেমন ব্যালকনির চারপাশ ঘিরে একটা অস্পষ্ট ব্যথা, মানি প্লান্টের চকচকে পাতায় বছরের কয়েকটি দিনের আর্তনাদ আমি ঠিক ঠিক টের পাই। মানে আমারই কিছু পাওয়া না পাওয়া ব্যালকনির আয়তনজুড়ে রোপণ করে দিই। দৃশ্যত নিজের ভেতর উবু হয়ে থাকি। কয়জন পারে। বড্ড বেশি কঠিন এই ইনকাম। ইনডিফারেন্স! ইটস আ পাওয়ার টু গেট সামথিং এলস। টুং করে মোবাইলে মেসেজ এলো—‘বাবা, তুমি হয়তো ব্যস্ত আছ। তাই কল করিনি। বিকেলে আসব, আজ অফিস থেকে দ্রুত বাসায় ফিরবে।’ আমার কম বয়সী মেয়ে মিনু। মিনু বলতে আমার আরো একজন মিনু আছে—ধর্মপুরের দোতলা বাসায় থাকে। জার্মানপ্রবাসী মা-বাবা। টাকা-পয়সা ঢের, তবু পলেস্তারা খসা বাড়িতেই নাকি তার বেশ ভালো লাগে। জানালার পাশে কাঠগোলাপ, স্বর্ণচাপা, তবু পলেস্তারার নিয়মিত গন্ধই তাকে বেশ আকৃষ্ট করে। নিয়মিত বলতে তার ভাষায়—‘একটা জ্যান্ত শরীর। যত দিন আমরা এই নিয়মিত শব্দটি ব্যবহার করি ঠিক তত দিন একটা জ্যান্ত শরীরী স্বাদ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। আমাদের বাঁচতে শেখায়।’ মিনুকে এখন আর তেমন ভাবতে ইচ্ছা হয় না। অথবা ইচ্ছা করলেও সময়কে ঠিক ধরতে পারি না। সময়ের অনুপস্থিতি খুঁজতে গিয়ে কাগজের কোথাও লিখি ‘হত্যা’, ‘পুড়ে যাওয়া সোনা’, ‘মৌনতা’ ইত্যাদি। খুব যৌবনে যাকে ধ্রুব বলে ধরে নিয়েছি তারও যে তিনটি স্তর আছে, কে জানে। ইশ্ ভালোবাসা! ভার্সিটি পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর জীবনের অনিচ্ছাশক্তি ঢেকে শেখেরটেকের এই বাড়িতে আমার বাকি জীবন। মিনুর গোছানোর প্রয়োজন ছিল, তাই তার মতে সম্পর্ক যতটা দীর্ঘ হলে চলে ঠিক ততটা মানানসই, তার চেয়ে বেশি কিছু মানে একটা অস্পৃশ্য ইমোশন। অবশ্য আমারও কোনো অনুযোগ ছিল না। বস্তুবাদ বুঝি, যথেষ্ট রেশনাল হোমো সেপিয়েন্স। তবু অন্ধকার ঘরে তার শরীরমাখা প্রজাপতি আমাকে দিনের পর দিন এমনভাবে শাসন করে, ইচ্ছা হয় আরো একবার ফিরে যাই তার কাছে। আরো একবার সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরি তার শরীর। আরো একবার চষে বেড়াই নানুয়া দিঘি থেকে ধর্মসাগর, রামঘাটলা...। আমারও ইচ্ছা হয় অফিসফেরত জীবনে নিকট সুখের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে দেখি। মানে নারী-পুুরুষ খেলা। যত্নের একটা সামঞ্জস্য টেনে বুকপকেটে তুলে নিই। শাসনের একটা গণ্ডির কাছে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বিশ্বস্ত হই। এই যেমন মাহবুব আজিজ—অফিসফেরত জীবনে একটা ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে, আর অপেক্ষার খুনসুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী। একটু দেরি হলেই মাহবুব আজিজকে ঠিক কাঠগড়ায় তুলে ফেলে মৃত্তিকা—‘কী ব্যাপার, এতক্ষণ কই ছিলে, অফিসে কোনো নতুন মেয়ে এমপ্লয়ি এসেছি নাকি? মনোজিত দা অনেক আগেই ফিরেছে। তুমি...?’ মাহবুব আজিজের একটু দেরি হলে শাঁইশাঁই করে আমার কাছে ফোন চলে আসে—দাদা, কোথায়? একসাথে, নাকি চলে এসেছেন? মৃত্তিকার একেবারেই সহ্য হয় না অফিস শেষে কোনো আড্ডা, দেরি করে বাড়ি ফেরা। বাড়িতে গেলেই চায়ের ওপর চা। একটা মলিন আগ্রহ নিয়ে সংসারের সব টুকিটাকি একবার নেড়েচেড়ে আমার কাছে দিব্যি বলে যায়। এটা হয়নি, এটা লাগবে, এটা পেয়েছি, আরো গুছিয়ে কিনব ইত্যাদি। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। কি আশ্চর্যভাবে নারীরা তাদের জীবনে বিপরীত লিঙ্গের প্রভাবকে শুদ্ধ করে নেয়, সবচেয়ে জঘন্য পুরুষের সব শুষ্কতা সে ধুয়েমুছে নেয় নিজের শুদ্ধতা দিয়ে। হুট করেই প্রশ্ন করে বসে, ‘দাদা, বিয়েটা করলে না কেন?’ আমি আঁতকে উঠি। তড়িঘড়ি উত্তর দিয়ে বসি, ‘আমাকে যে কেউ বিয়ে করেনি!’ একটু গম্ভীর সুরে মৃত্তিকা আবার জবাব দেয়, ‘তোমার রসিকতা ঠিক বুঝি না...।’ তারপর নিজের মধ্যে উবু হয়ে ভাবতে থাকি। একটা আবহ শূন্যতার সংগীত আমার চারপাশে কামড়াতে থাকে। চিবুতে চিবুতে ঠিক মিনুর কাছে নিয়ে যায়। সেই ধর্মপুরের দোতলা বাসার মিনু। গান্ধর্ব বিবাহ মতে মিনু আমার স্ত্রী। যে বিবাহে পাত্র-পাত্রী পরস্পরের প্রতি অনুরাগবশত দেহ-মিলনে আবদ্ধ হয়, বেদের ভাষ্য অনুযায়ী তাকে গান্ধর্ব বিবাহ বলে। এই বিবাহে পাত্র-পাত্রী গুরুজনের অনুমতির অপেক্ষা না করে মৈথুন ইচ্ছা ঘটায়। অবশ্য মৈথুন ইচ্ছাই সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ পরিণতি নয়। সিক্সথ সেন্স থাকলে আর দশজনের চেয়ে আমরা যেমন বিশেষ ক্ষমতা অনুভব করি, অস্তিত্বের একটা বিশেষত্ব দাঁড় করিয়ে দিই, সম্পর্কেও ঠিক তেমন কিছু লাগে। মিনু বলত নির্যাস। হঠাৎ টুং করে মোবাইলে মেসেজ—‘বাবা, কোথায়? আসছ না যে?’ মাঝেমধ্যে ছোট মিনু এসে কয়েক দিন থেকে যায়। প্রয়োজনীয় ছোটখাটো জিনিসপত্র নিয়ে, সঙ্গে নতুন কারো রিলিজ হওয়া রবীন্দ্রসংগীত। একবিংশ শতাব্দীতে এসে একজন লোক শুধু রবীন্দ্রনাথের গান শোনে, এটা ভাবতেই তার বিস্ময় লাগত। মাঝেমধ্যে আমাকে ঠাট্টা করে বলত, ‘বাবা যতই রবীন্দ্রনাথ শোন না কেন, একনের গান না শুনলে কিন্তু স্বর্গে যাবে না।’ ছোট মিনুকে দেখলে মাঝেমধ্যে খটকা লাগে। ভাবতে অবাক লাগে—এ সেই মিনু যে উল্টেপাল্টে একটা সোঁদা জীবনকে সুগন্ধিময় করে দিচ্ছে। ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরন্তর আঘাত সহধর্মিণীর আদর্শ মর্যাদা দিয়ে সহনীয় করে তুলছে। জিজ্ঞেস করলে যথেষ্ট যুক্তিতর্ক দিয়ে গুছিয়ে বলবে, ‘বুঝবে না বাবা, এ এক অভিনব রূপান্তর।’ আমি বলি :

—থাক না, আর কত, ছেড়ে দে।

—তোমার এই চাপিয়ে দেওয়ার অভ্যাসটা গেল না বাবা। নিজেকে নিয়ে কজন মানুষ থাকতে পারে, বলো। সবাই কি পারে তোমার সেই ‘বি অবজার্ভার, নট অবজার্ভড’ মেথড ফলো করতে। আমার একটা কিছু লাগবে। ধরে নিতে পার সেটা সিম্বলিক।

—হুম...তাই কর। মৃত্যুর পর কোমরে বেঁধে সুখটাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবি, যখন দরকার একটু একটু খরচ করবি। কী বলিস?

একটা আচমকা নিস্তব্ধতা মিনুর চারপাশে। কথাটা না বাড়ানোর আগ্রহ নিয়ে একটু আক্ষেপের সুরে বলল, ‘মার খোঁজখবর নিয়েছ। তোমার বড় মিনুর?’ আমি চুপ করে থাকি। মিনু ঠিক বুঝতে পারে সময় কতটা  বেমানান। তাই দুজন দুজনকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা দিয়ে আটকে দিই, যে যার মতো করে। মিনুর জন্ম হওয়ার ছয় বছর পর তার মা এক সন্ধ্যায় শেখেরটেকের বাসায় এসে হাজির। সঙ্গে ফুটফুটে গোলগাল গড়নের একটি মেয়ে, দেখতে অবিকল সেই আগের মিনু। পাঁচ বছর পর এতটা অস্পষ্ট লাগছিল তাকে, মুখের দিকে তাকাতে না তাকাতে বলে উঠল, ‘তোমার পুরনো মিনুকে ফিরিয়ে দিতে এসেছি। তুমি জানো, তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি। মিথ্যা সম্পর্কের দোহাই দিয়ে ওকে বড় করেছি। আর পারছি না...।’ ঘাপটি মেরে তাকিয়ে ছিলাম তার মুখের দিকে। মুখের একেকটি ভাসমান রেখা যেন আমাকে বলছিল—‘তুমি এখনো বদলাওনি মনোজিত, কেন যে ব্যথাকে ব্যথা বলে জানো। মানুষের যেদিকে স্বাভাবিক বিকাশ, চিরকাল সেদিকেই তার লোভ।’ হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই মুখ তুলে বলছিল—‘আমাকে আর দেখতে যেও না। আমি চলে যাচ্ছি মায়ের কাছে। নিরঙ্কুশ কোনো কিছুর প্রতিই আমার বেশি দিন মোহ থাকে না। বলতে পার খাঁটি জিনিসের প্রতি আমার কোনো লোভ নেই। তোমার কি মনে নেই ইউরো কিং রেস্তোরাঁর সেই বিকেল? চায়নিজ পর্দা আর বিনয়ের স্বচ্ছ ফড়িং, যে একদিন ডানা মেলেছিল গায়ত্রীর বুকে।’ সেই আমাদের শেষ দেখা। তারপর শুরু হলো কত বছরের অজ্ঞাতবাস।

 

২.

যেই পাঁচ বছর বয়সী মিনুকে কাছে পেলাম, বিলম্বিত প্রসব যন্ত্রণার মতো বুকের সব আবিরে ঘোলা হয়ে গেল বাড়ির আশপাশ। বুঝেছি, পিতৃস্নেহের জ্বালা বোঝাতেই মিনুর এই কারবার। ছোট মিনু অবিকল তার মায়ের মতো। চোখের গড়ন, উচ্চতা, স্বভাবের রং। কিন্তু বুদ্ধি আর মেধায় বাবার কাছাকাছি। সহজ কথা ঠিক সহজে বোঝার ক্ষমতা যেমন আমার ছিল না, ছোট মিনুরও ঠিক তেমন দশা। আঙুল কাটার ভয়ে যে মেয়ে বছরের পর বছর ছুরি ধরেনি, জাগতিক অর্থে সে বোকাই। অথচ মায়ের মতোই একদিন আবিষ্কার করে চিরকুটে লিখেছিল—‘বাবা, কাল তোমাকে পেঁয়াজ কেটে দেখিয়ে দেব। আমি এত দিন পর আবিষ্কার করেছি নিজেকে আঘাত করার প্রস্তুতিও মানুষকে ভেতরে ভেতরে অনুশীলন করে নিতে হয়, নইলে আগন্তুক হয়ে তাকে ঠিক আঘাত করা যায় না। তুমি ঠিক বলেছ বাবা, মানুষের খোলস বদলানোর প্রয়োজনীয়তা আছে।’ মানুষ যে খোলস বদলাতে পারে তা সর্বপ্রথম আমাকে বুঝিয়েছে মিনু। সে বলত, “প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে মানুষ খোলস বদলায় না। মানুষ ততটা বিল্ট ইন হতে পারে না। তাকে শিখে নিতে হয়। আমাদের ভেতরটা চিরকাল শিশু থাকার ইচ্ছা পোষণ করে, তাই দুঃখ, ব্যথা, যন্ত্রণা উপশমের ব্যাপারে আমরা শুচিবায়ুগ্রস্ত হয়ে থাকি। যেই আমরা খোলস বদলাতে শিখি, পদার্থের নিয়ম অনুসারে নিজেদের রূপান্তরিত করতে না পারলেও ভাবতে পারি। সেটা সচেতন মনে না হলেও অবচেতন মনে। তাতে কিছুটা স্বস্তি মেলে। এই যেমন ধরো, তুমি সেই কলেজ থেকে আমাকে এত চেয়েও জানাতে পারনি। নিজেকে বিন্দু পরিমাণ বদলাতে শিখনি মনোজিত। আমি না বুঝলে এত দিনে সর্বনাশই হয়ে যেত। কী আশ্চর্য, এত কম বয়সেই—‘পাথ টু হায়ার কনশাসনেস’, ‘চয়েসলেস অ্যাওয়ারনেস’ এসব বই বুঝে গেছ। আলটিমেট কী লাভ বলো? এসকেপ! জীবন থেকে না হয় সময় থেকে।”

মিনুর মুখের ওপর কিছুই বলার সাহস হয়নি তখন। এখনো নেই...মুহূর্তে ব্যালকনির নীলাভ অন্ধকার নেমে আসে আমার শরীরজুড়ে। ব্যথার উৎস অনুসন্ধানে ব্যর্থ হই বলে তাকে অস্বীকার করার কোনো পথ খুঁজে পাই না। মুহূর্তে টুং করে ছোট মিনুর পাঠানো মেসেজের শব্দ সব নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে দেয়। অফিস থেকে বের হওয়ার সময় মাহবুব আজিজ জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে, জানালি না কিন্তু।’ ক্রমশ অন্ধকার ঘোলা করে হঠাৎ নিজের অজান্তেই বলে উঠি, ও হ্যাঁ, কিছু ব্যথা আছে বন্ধু, ‘শহরে কাকের মৃত্যুসংক্রান্ত কিছু ব্যথা।’

মন্তব্য