kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

গ ল্প

দেশভাগের আগের ভাগ

সুদীপ্ত সালাম

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দেশভাগের আগের ভাগ

অঙ্কন দেওয়ান আতিকুর রহমান

বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাঁচা সড়কে উঠলেন বিনয়বাবু। সাপের মতো সড়কটি চলে গেছে কালীর বাজারের দিকে। তিনি সেখানেই যাবেন। যেতে হবে। ঘরে তেল-নুন কিছুই নেই। পাকুড়গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি দ্বিধায় পড়লেন। সড়ক ধরে যাবেন, নাকি ধানক্ষেতের আইল ধরে আড়াআড়িভাবে? ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে গেলে সময় ও পরিশ্রম দুই-ই কমে। সড়ক থেকে মাঠে নামতে গিয়েও তিনি নামলেন না। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল ক্ষেতের ওপর পড়ে থাকা সদানন্দের বউয়ের উলঙ্গ লাশের বীভৎস ছবি। পরশুর কথা। ওই তো ওখানটায় আবেদ মোল্লার ধানক্ষেতেই পড়ে ছিল। আহা ছোট্ট মেয়েটি! মাস কয়েক আগে কত ধুমধাম করেই না বিয়ে হলো। গোটা নরোত্তমপুরে সাজ সাজ রব। কে আসেনি সে বিয়েতে! আবেদ মোল্লা, খালেক হক, হাজি মোসলেম, রসুল মিয়া, তাঁরাও সপরিবারে এসেছিলেন। বর-কনেকে দোয়া করে গেছেন। শত শত বছর ধরে তাই-ই তো হয়ে আসছে। নরোত্তমপুর কেন, গোটা নোয়াখালীতেই হিন্দু-মুসলমান আত্মীয়র মতো একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। কলকাতার দাঙ্গার পর সব রাতারাতি ওলটপালট। কারো মুখে আর হাসি নেই। কারো মুখে ভয়, কারো মুখে ঘৃণা। সদানন্দের বউটিকে শেষ দেখা দেখতেও কেউ এলো না। কে বা কারা নৃশংস নির্যাতনের পর মেয়েটিকে মেরে ফেলল। তারাই তো, যারা এখন হিন্দুবাড়ির উঠান মাড়ায় না। যারা এখন হিন্দুদের দেবদেবীকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ছড়া ও গান প্রচার করে বেড়ায়। যারা এখন হিন্দুদের সঙ্গে দেখা হলে ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আকার-ইঙ্গিতে হুমকি দেয়। এরা কি বিনয়বাবুদের অচেনা? কিছুদিন আগেও এরাই বিপদে-আপদে ছুটে আসত। এরাই তো ছিল স্বজন। নষ্ট রাজনীতি এদের মগজে দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজ পুঁতে দিয়েছে। হিন্দুরা এখন তাদের চোখের বালি। কলকাতায় যেমন মুসলমানরা শত্রু। সেখানেও একই চিত্র। দাবার কোট এক, ঘুঁটিও একই—কেবল দাবার কোটটি ঘুরিয়ে দেওয়া। আড়ালে বসে খেলে যাচ্ছে খেলারামরা। এখন আড়ালে-আবডালে হিন্দু নিধন শুরু হয়েছে। প্রকাশ্যে শুরু হতে পারে যখন-তখন। বিনয়বাবু সড়ক ধরেই বাজারের দিকে হাঁটা শুরু করেন।

কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা ফজলুর মুদি দোকানে ঢোকেন তিনি। বলেন, ‘বাবা ফজলু, পাঁচ সের চাল, আধ সের লবণ...’, ফজলু কথা শেষ করতে দেয় না, ঝাঁজের সঙ্গে বলে, ‘আন্নেগোরে হদাই দ্যান যাইতো ন! আরেক দোয়ানে যান মাস্টার সাব!’ বিনয়বাবু হতবাক। কী বলবেন? কী জিজ্ঞেস করবেন? তিনি তো জানেন, কেন এমন ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি অবাক ও ব্যথিত হয়েছেন ফজলুর আচরণে। এই ফজলু না তাঁর ছাত্র ছিল! ফজলু যখন আরো ছোট তখন তাকে কোলে বসিয়ে ক্লাস নিতেন বিনয়বাবু। সেই ফজলু আজ অবলীলায় তাঁকে অবজ্ঞা করছে!

নিধিরাম সাহার ডাকে বিনয়বাবু সংবিৎ ফিরে পান, ‘বিনয় দা! ও বিনয় দা!’ ফজলুর উল্টোদিকের ছোট্ট দোকানটি নিধিরামের। তিনি মূলত কেরোসিন বিক্রি করেন, চাহিদা থাকায় কিছু মুদি পণ্যও রাখেন। বয়স বিনয়বাবুর চেয়ে কিছু কম, ৫৫ কি ৫৬ হবে। ফজলুকে কোনো জবাব না দিয়ে বিনয়বাবু নিধিরামের দোকানের দিকে পা বাড়ালেন। কয়েক দিন ধরে মন এমনিতেই বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, তার ওপর ফজলুর অপমান! শরীর আর নড়তে চাইছে না, যেন এখনই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। বুকের বাঁ পাশটায় চিনচিন ব্যথাও কি করছে? নিধিরামের দোকানের সামনের বেঞ্চটিতে বসে পড়লেন তিনি। নিধিরাম এগিয়ে এসে বললেন, ‘ফজলু হোলাহাইন মানুষ, হিজার কতায় কিচু মনে করিয়েন না। হিজায় কি আর এগিন বুজি ক’নি, দশজনের তুন যেগিন শিকে হেগিনই কয়।’ বিনয়বাবু মাথা নিচু করে বসে আছেন, কোনো কথা শুনছেন কি না তা-ও বোঝা গেল না। নিধিরাম আবার বললেন, ‘সময় বালা ন দাদা, হেগুনের লগে কতা যত কম কন যায় তত বালা।’ তারপর বিনয়বাবুর পাশে বসে তাঁর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিনয় দা, শরিল খারাপ লাগেন্নি?’ বিনয়বাবু মাথা তুললেন, ‘না না! একটু ক্লান্তি লাগছিল।’ নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বললেন, ‘শুনলাম, তোমার বাড়ির সবাই ত্রিপুরা চলে গেছে?’ নিধিরাম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলেন, ‘এ্যাঁ বিনয়দা। আন্নের বৌদি, লক্ষ্মী, সুশীল আর সুশীলের বো—বেকেরে হিয়ানে থুই আইচি।’ বিনয়বাবু জানতে চাইলেন, ‘তা তুমি চলে আসলে কেন?’ নিধিরাম জানালেন, দোকান ও ভিটে বিক্রি করার জন্যই তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছে। দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব। নিধিরামই নীরবতা ভাঙলেন, জানালেন কতটা ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা ফেনী হয়ে ত্রিপুরা পৌঁছেছিলেন। নিধিরামের পরিবারসহ কয়েকটি পরিবার যখন ত্রিপুরার কাছাকাছি তখন একদল লোক ‘আল্লাহু আকবর!’ ‘আল্লাহু আকবর!’ বলে তাদের তাড়া করল। প্রাণ বাঁচাতে তারা যে যেদিকে পারল পালাল। নিধিরামরা একটি কবরস্থানে লুকালেন। পরদিন ভোর হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা সেখানেই কবরের সঙ্গে অনড় পড়ে ছিলেন। পরে সাবধানে ত্রিপুরায় ঢুকলেন। অন্যদের কপালে কী জুটেছিল তাঁরা জানেন না। আবারও নীরবতা। বিনয়বাবুর শরীর খারাপ লাগছে। চোখ ছলছল। দুই শ বছরের ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত হতে যাচ্ছে দেশ। স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার আগে মানুষের জিভে রক্তের স্বাদ লেগে গেল! আল্লাহ ও ভগবানের নামে ভাই ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙাচ্ছে! তারা জানে না, জানতে চায় না—এই রক্তের খেলায় আল্লাহ বা ভগবানের কোনো হাত নেই, পেছন থকে খেলছে তারা যাদের হাতে আল্লাহ-ভগবানও যেন মোহরা। নিধিরাম বললেন, ‘আইচ্ছা, এসুব কতা থাক, বাইর ব্যাকে ভালা আচেনি?’ বিনয়বাবু ধুতির কোনা দিয়ে চোখ মুছে নিতে নিতে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ নিধি, সবাই ভালো, তবে তোমার বউদি মেয়ে আর আমার জন্য দিন-রাত ভয়ে মরছে।’ নিধিরাম বললেন, ‘ডর ত হওনেরই কতা দাদা। দ্যাশের যে অবস্থা!’ বিনয়বাবু কিছু বললেন না। নিধিরাম বলে গেলেন, ‘দাদা, যত তাতাই সম্ভব ইয়ানতুন চলি যান উচিত। বউদি আর জয়শ্রীর মুকের দি চাই অইলেও আন্নেরে বুকে ফাতর রাইকতো অইবো।’ বিনয়বাবুও জানেন, এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়। কিন্তু কিভাবে যাবেন! এই গ্রাম তাঁর চৌদ্দ পুরুষের জন্মভূমি। এই গ্রামের মাঠেঘাটে তাঁর পূর্বপুরুষের পায়ের চিহ্ন রয়েছে। এই মাটি ছেড়ে তাঁকে কেন যেতে হবে! উপায় নেই, যেতেই হবে। না গেলে একদিন হয়তো জয়শ্রীর অবস্থাও সদানন্দের বউয়ের...বিনয়বাবু কল্পনাও করতে পারেন না। ঠিক এমন সময় হরিহরণের ছেলে পলান চিৎকার করতে করতে দোকানের দিকে ছুটে আসতে লাগল, ‘ও নিধিরাম কাকা! আগুন লাইগজে, আগুন!’ বিনয়বাবুর বুকটা ধক করে ওঠে! নিধিরাম উন্মাদের মতো পলানের দিকে ছুটে যান এবং জানতে চান কোথায় আগুন লেগেছে। পলান হাঁপাতে হাঁপাতে জানায়, আগুন লেগেছে নিধিরামের বাড়িতে! নিধিরাম দিগিবদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিলেন। বিনয়বাবুও তাঁকে অনুসরণ করলেন।

দুজনেই ছুটছেন। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী তাল ও নারকেলগাছের মাথার ওপর তাণ্ডব করছে। কাছে গিয়ে দেখা গেল দাউদাউ করে জ্বলছে পুরো বাড়ি, ভেতরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ভাগ্য ভালো, বাড়িতে কেউ নেই। অনেকেই ভিড় করেছে, দেখছে—হিন্দুরা কাছ থেকে, মুসলমানরা দূর থেকে। নিধিরাম হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। বিনয়বাবু তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কাঁদতে কাঁদতে নিধিরাম মাটিতে বসে পড়লেন। বিনয়বাবুর হঠাৎ নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ল। নিধিরামের বাড়িতে কেউ নেই, কিন্তু তাঁর বাড়িতে তো অন্নপূর্ণা ও জয়শ্রী রয়েছে! নিধিরামকে সোমেশ্বরের দেখভালে রেখে বিনয়বাবু ছুটলেন নিজের বাড়ির দিকে। কোথায় গেল তাঁর অসুস্থতা! কোথায় গেল কিছুক্ষণ আগেও বুকে টোকা দিতে থাকা ব্যথাটা! ভয়ে যে ফসলের মাঠ ধরে তিনি বাজারে যাননি, সেই মাঠ ধরেই তিনি ফিরছেন। তিনি দৌড়াচ্ছেন, কখনো জমির আইল দিয়ে, কখনো ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে। যতই বাড়ি আর তার মাঝখানের দূরত্ব কমছে ততই বাড়ছে তাঁর উদ্বেগ। ‘জয়াআআ! অনুউউউ! জয়াআ! অনুউউ...’ চিৎকার করতে করতে তিনি নিজের বাড়ির উঠানে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। ডাক শুনে দৌড়ে এলেন অন্নপূর্ণা দেবী ও জয়শ্রী। জয়শ্রী বাবার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। অন্নপূর্ণা পানি আনতে ছুটলেন। বিনয়বাবু বিড়বিড় করছেন, ‘জয়া...অনু...জ-য়া...অ-নু...জঅঅ-য়া...।’ মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। জয়শ্রী ভয়ে কাঁদতে শুরু করল, ‘এইত্তো বাবা আঁই, আঁই আচি ত!’ বিনয়বাবু তাঁর ডান হাত দিয়ে মেয়ের গালটা ছুঁয়ে দিলেন। ততক্ষণে অন্নপূর্ণা পানি নিয়ে ফিরেছেন। বিনয়বাবুর মুখে পানি দিতে চাইলেন, কিন্তু বিনয়বাবু মুখ খুললেন না।

মন্তব্য