kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

উ প ন্যা স

নবম সন্ধ্যা

মোস্তফা মামুন

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮৬ মিনিটে



নবম সন্ধ্যা

অঙ্কন : চিন্ময় দেবর্ষি

বড়লোকের কোটগুলো সাধারণত শরীরের তুলনায় বড় হয়। দেখে মনে হবে গায়ের সঙ্গে ঠিক মাপ দিয়ে বানানো নয়। কে জানে, বড় কোট পরাও বড়লোকির একটা অংশ কি না!

আরো আছে। ওদের কোটের কাপড়গুলোও কেমন যেন। নীলক্ষেত মার্কা বলে ধারণা হয়। বিসিএস ভাইভার আগে এক রাতের মধ্যে স্যুট বানানোর একটা প্রচলন আছে। নীলক্ষেতেই কাজটা খুব সুচারু হয় বলে এর নাম নীলক্ষেত মার্কা। আর এই একটা জায়গায় বড়লোকরা গরিবের সঙ্গে মিশে যায়। দুই পক্ষের স্যুট দেখেই হাসি পায়। যদিও শমসের জানে, দামে-মানে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এক পক্ষেরটা হয়তো সুইজারল্যান্ডে কাপড় কিনে ব্যাংককের পছন্দের টেইলার শপে বানানো। হয়তো কাপড়ের দাম কয়েক হাজার ডলার। সেলাই করাতে বাংলাদেশের হিসাবে লাখের মতো। আরেকটা মাত্র হাজার-দেড় হাজার টাকার প্যাকেজ। তবু দাম আর মানগত পার্থক্য ঘুচে কেমন দৃশ্যত সব একাকার।

বড়লোক আর ছোটলোকের মধ্যে আরো কিছু মিল সে আবিষ্কার করেছে। দুই পক্ষের পকেটেই ক্যাশ টাকা থাকে না। গরিবের না থাকার কারণ অনুমিত। বড়লোকের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এ জন্যই যে তাঁরা সব কার্ড ব্যবহার করেন। খুচরা টাকা পকেটে রাখা এই বাজারে তাঁদের হিসাবে এক রকমের ছোটলোকি।

সেদিন ওদের অফিসের বড় সাহেব নিজের গ্রাম থেকে আসা এক আত্মীয়কে সাহায্য করতে গিয়ে এমন বিপদে পড়লেন! অ্যাকাউন্টস বন্ধ হয়ে গেছে বলে অফিসের ক্যাশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ওদিকে মানুষটি এমন যে ওকে চেক দেওয়া যায় না। বড় সাহেব অসহায় ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন।

শমসের বুঝতে পেরে বলল, ‘বস, আমি দেখছি।’

বড় সাহেব হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

শমসের মানুষটিকে নিজের টেবিলে এনে চা খাওয়াল। বড় সাহেবের সঙ্গে ওর সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করল। ঘনিষ্ঠতার মাত্রা অনুযায়ী সাহায্য করা হবে।

খুব কিছু বের করা গেল না। বড় মানুষদের গরিব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও যে এমন ভাব থাকতে পারে সেটা ওর ধারণায়ই ছিল না। দেখা গেল, জেরা-জিজ্ঞাসায় শমসেরের ওপর খানিকটা বিরক্ত। বারবার ঘড়ি দেখে বললেন, ‘লঞ্চটা ধরতে হলে এখনই বেরোতে হবে।’

‘অসুবিধা নেই। অফিসের গাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’

তাতেও কাজ হয় না। মানুষটি সরু চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কুটুকে বললে গাড়ির অভাব হবে না। কিন্তু আমি নিজের পায়ে সারা জীবন চলি।’

বোঝা গেল বড় সাহেবের ডাকনাম কুটু। এটাও একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। বড় মানুষদের ডাকনামগুলোও খুব ছোটলোকি ধরনের হয়। কুটু-পুটু-বটু জাতীয়। এজাতীয় নাম ঢাকার জন্যও ওদের নানা চেষ্টা করতে হয়।

শমসেরের আগের অফিসের বসের ডাকনাম ছিল কালু। এক পত্রিকায় তাঁর সম্পর্কে একবার খুব খারাপ একটা রিপোর্ট বের হয়। জনশক্তির ব্যবসা বলে মাঝেমধ্যেই এ রকম রিপোর্ট বের হতো। ‘আফজাল রিক্রুটিং এজেন্সির পুকুরচুরি’। আফজাল খানের খুঁটির জোর কোথায়? তেমন কোনো হৈচৈ কোনো দিন শোনা যায়নি। কেউ ফিসফাসও করেনি।

অফিসে গিয়ে দেখল হুলুস্থুল কারবার। জরুরি মিটিং বসেছে। পত্রিকার সম্পাদক কোন কোন মন্ত্রীর কথা শোনেন তার তালিকা করা হয়ে গেছে। তাদের মাধ্যমে চাপ তৈরির চেষ্টা হবে। মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে অন্য চেষ্টা চলছে। ওই পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগকে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রস্তাবও রেডি। ডিজিটাল ডিপার্টমেন্ট আবার প্রয়োজনে ফেসবুক পেজ খুলে সম্পাদকের নামে যা-তা লেখানোর আইডিয়াও করে ফেলেছে।

বড় সাহেবের কাছে প্ল্যান ‘এ’ ‘বি’ ‘সি’ ইত্যাদি নিয়ে যাওয়ার পর হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেখো, একটা বাজে নামের জন্য সারা জীবন কী যন্ত্রণা বহন করতে হয়।’

এখন সবার মনে পড়ে, রিপোর্টে তাঁর নামে আফজাল খান ওরফে কালু কথাটা কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে। বোঝা গেল, এই কালু নামোল্লেখেই যত সমস্যা।

আফজাল খান ছিলেন রসিক ধরনের মানুষ। ঠিক রসিক বলা যাবে না, রসিকতা ঠিকঠাক করতে পারলেই না রসিক, বড় মানুষদের এটাও সুবিধা যে তাঁদের কর্মীরা যেকোনো কৌতুকে হেসে গড়িয়ে পড়তে তৈরি। তিনি নামের কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই এমন হাসতে শুরু করল যে মনে হয় কেউ লাফিং গ্যাস ছিটিয়ে দিয়েছে। অ্যাকাউন্টসের সদর সাহেব হিসাব মেলাতে না পেরে খুব চাপে আছেন। তিনি হাসলেন সবার চেয়ে বেশি।

আফজাল খান বললেন, ‘আমার ডাকনাম কেন কালু কেউ বলতে পারবেন? যে পারবেন হাত তোলেন।’

কেউ ঠিক হাত তোলে না। ভুলভাল বললে পয়েন্ট বাড়ার বদলে কাটা যেতে পারে।

কিন্তু আবার চুপ করে থাকাও যায় না। সবাই এমন ভাব করল যেন এর পেছনে বিস্ময়কর এক কারণ লুকিয়ে আছে, যেটা তাদের বড় সাহেবকেই ঠিক মানায়।

আফজাল খান বললেন, ‘আমি ছিলাম খুব কালো।’

একটা কৃত্রিম বিস্ময়ের ভঙ্গি ফুটে ওঠে। যতটা সম্ভব অবিশ্বাস মিশিয়ে দেয় সবাই। যেন হতেই পারে না।

ইডি জাফর সাহেব তেলতেলে গলায় বলেন, ‘কী যে বলেন, স্যার। আপনি কালো হতে যাবেন কোন দুঃখে?’

সবাই বড় সাহেবকে দেখে। তাঁর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী নিজেদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে।

বড় সাহেব পাত্তা না দিয়ে বলেন, ‘কালো বলতে একেবারে আলকাতরার রং। আর তখনকার গ্রাম দেশে নিয়ম ছিল এটাই, জন্মগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নাম ঠিক হতো। তাতে শনাক্ত করতে সুবিধা।’

এমন আলাপের পর তো মনে হয় কালু নামটা নিয়ে তিনি বেশ খুশি। হয়তো একসময় আপত্তি ছিল না। কিন্তু এখন, এত টাকার মালিক হয়ে যাওয়ার পর আপত্তি আছে। টাকার মালিকদের যে কাজটা সবচেয়ে বেশি করতে হয় সেটা হলো অতীত লুকিয়ে রাখা। বর্তমানটা টাকা দিয়ে ঢাকা যায় বলে সেখানে শুধু প্রাপ্তি—সম্মান, বিলাস, আরাম। কিন্তু অতীত টাকার পাহাড় গলে মাঝেমধ্যে বেয়াড়ার মতো উঁকি দেয়। তখন খুব সমস্যা।

সেবার লাখ দশেক টাকা খরচ হলো কালু নামটা লুকাতে। দুই দিনের মধ্যে সেই পত্রিকার প্রথম পাতায় ওদের বিজ্ঞাপন যেতে শুরু করল। এক সপ্তাহের মধ্যে একান্ত সাক্ষাৎকার ছাপা হলো। বিরাট বড় ছবির নিচে হেডিং, ‘বিদেশে শ্রমবাজার দিয়ে অর্থনীতির চাকা বদলে দেওয়াই আমার স্বপ্ন’।

বেশ কিছু চাকরি করে, বড় মানুষদের দেখে দেখে ওদের সম্পর্কে অনেক জ্ঞান হয়ে গেছে শমসেরের। এই মানুষগুলোর টাকার পর্দা সরানো চেহারাটা দেখতে ওর খুব ভালো লাগে। সেখানে ছোটলোকি আছে। অবিশ্বাস্য হিংস্রতা। আবার আছে প্রেমে ব্যর্থতা। খেয়ালি মানবিকতা। পাশবিক যৌন কামনা।

বড় সাহেব চোখ তুলে বলেন, ‘শমসের, হঠাৎ তুমি খুব ভাবুক হয়ে গেলে মনে হয়।’

শমসের মাথা তোলে। তাইতো! বড় কোট থেকে কোথায় চলে গিয়েছিল!

বড় সাহেবের মাথাটা একটু ছোট। স্যুট-কোট পরে থাকলে মনে হয় পোশাকের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট বল বেরিয়ে আছে। চোখ দুটিও একটু ভেতরের দিকে। সে জন্যই কি না মাঝেমধ্যেই চোখ বড় করে তিনি নিজের শক্তি প্রকাশের চেষ্টা করেন।

চোখ একবার বড় করে বললেন, ‘তোমার কাজগুলোর অগ্রগতি কী?’

‘অগ্রগতি ভালো। পরশু নাগাদ রিপোর্ট দিতে পারব।’

‘হুঁ।’

হঠাৎ শমসের জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার, আপনার কোটটা কোথা থেকে বানিয়েছেন?’

বড় সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘কোনো সমস্যা?’

‘জি স্যার। বিরাট সমস্যা।’

বড় সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে চলে যান। লম্বাটে আয়নাটা ইতালি না রুমানিয়া কোথা থেকে আনা। সাজসজ্জা পরীক্ষার জন্যই।

দাঁড়িয়ে ঘুরেফিরে বলেন, ‘কী সমস্যা বলো তো?’

‘সাইজে একটু বড় হয়ে গেছে।’

বড় সাহেব আয়নার আরো কাছে যান। আরো নিবিড়ভাবে দেখেন।

‘বড় হয়ে গেছে? নেকটা ঠিকমতো বসেনি, না?’

শমসের কথা বলে না। উদ্বেগটুকু সে উপভোগ করে।

বড় সাহেব এই নিয়ে চিন্তায় সময় কাটাবেন। একটু পরের জরুরি মিটিংয়ে অমনোযোগী হয়ে যাবেন। উঠে গিয়ে বাথরুমের আয়নায় নিজেকে দেখবেন।

আর আগামী কয়েক দিন বারবার শমসেরের দিকে করুণ চোখে তাকাবেন। শমসের যখন বলবে, ‘স্যার আজকেরটা ঠিক আছে, তাহলেই তাঁর শান্তি।

বড়লোকদের সঙ্গে মিশে মিশে শমসের শিখেছে, বড় সমস্যা দিয়ে ওদের বিপদে ফেলা যায় না। ফেলতে হয় তুচ্ছ সমস্যা দিয়ে। এভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা যায়। এভাবেই নির্ভরযোগ্য।

 

 

দুই

সংসারটা সোহানের কাছে একটা লুকোচুরি খেলা। তাতে জয় আছে। উত্তেজনা আছে। আছে হেরে যাওয়ার শঙ্কা।

বাকি দুনিয়ার মানুষদের কাছে, অন্তত সোহান যাদের সঙ্গে মেশে, তাদের সংসার নিয়ে রাজ্যের অভিযোগ। প্রায় প্রত্যেকের চাপা দীর্ঘশ্বাস, সংসার নিয়ে ডুবে যাওয়াতেই এই অনেক কিছু করা হলো না। কিন্তু সোহানের সেই সমস্যা নেই। একটু ভেবে দেখলে সোহানও যে সংসারের চক্রে কিছু ক্ষতির শিকার হয় না এমন নয়, কিন্তু লাভ-ক্ষতির অঙ্কে না ফেলে সে দেখে খেলার চোখে। লাভ-ক্ষতি-ওঠা-অগ্রগতি এসবের সঙ্গে সংসারকে মেলায় না বলে সে বেশ আছে।

মিলির ক্ষেত্রে বিষয়টা কী রকম? সোহানের খুব জানতে ইচ্ছা করে। পারে না এবং এখানেও সে এক রকম খেলাগত শিহরণ বোধ করে। যে মানুষটা তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী, তাঁকেও নিয়মিত আবিষ্কারের চেষ্টা করে যেতে হয়। আবার যার কাছে নিজে পুরোপুরি প্রকাশিত, তার কাছেও নিজেকে কিছু রহস্যময় করে রাখার একটা চেষ্টা আছে। এখানেও খেলা। খেলা আর খেলা।

শুনে মনে হতে পারে, সোহানের খেলাধুলায় ব্যাপক উৎসাহ। সোহানের ক্রীড়াসংশ্লিষ্টতার সর্বোচ্চ উদাহরণ অনেক আগে একবার ঢাকা স্টেডিয়ামে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ দেখতে ঢুকেছিল। স্রেফ আগ্রহ থেকে যে এই খেলাটা নিয়ে মানুষ কী করে এত পাগল হতে পারে! কোন গ্যালারিতে বসবে এই নিয়ে ওদের বন্ধুদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। পাঁচজনের দুজন আবাহনী, দুজন মোহামেডান। সোহান তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে যার পক্ষ নেবে সেই গ্যালারিতে যাবে ওরা। সোহানের কোনো সমর্থন ছিল না। সে হাসতে হাসতে বলে, ‘মনে কর আমি নেই। এখন তোরা ঠিক কর। আমার তো কোনোটাতেই বসতে কোনো আপত্তি নেই।’

তখন আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে বন্ধুমহলের এই সমস্যা ছিল অবধারিত। প্রত্যেক বন্ধু সার্কেলেই তীব্র পক্ষ-বিপক্ষ। একসঙ্গে খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব। বাকিরা সোহানকে চাপাচাপি করতে থাকে নিজের দলে টানার, কিন্তু সোহান কোনো মত দেয় না এবং সেদিন সে নিজের এই গুণটা আবিষ্কার করে চমত্কৃত হয়ে যায়। এত চাপের মুখে এই যে নিরপেক্ষ থাকার ক্ষমতা, এটাও তো একটা ব্যাপার। এ রকম যখন নিজের মধ্যে যে ক্ষমতার প্রকাশ সে দেখতে পায় এটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। আর সত্যি বললে, সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সোহান আজ অনেক দূর উঠে গেছে। ব্যবসা করে শতকোটি টাকা কামিয়ে ফেলেছে। আরো কিছু বড় ধান্দায় আছে। লেগে গেলে হাজার কোটির মালিক হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

যা হোক, সেদিন শেষে ঠিক হয় লটারির মাধ্যমেই ঠিক হবে ওরা কোথায় বসবে। লটারিতে মোহামেডান গ্যালারিতে বসা ঠিক হলো। দুই আবাহনী সমর্থক বন্ধু ইবরার ও সৌমেনকে যে কষ্ট করতে দেখেছিল, সেটাও সে শিক্ষা হিসেবে পরের জীবনে কাজে লাগিয়েছে। সেদিন সে বুঝেছে, মানুষ বাধ্য হলে সব পারে। যে ওরা মোহামেডানের নাম শুনলে গায়ে কাঁটা ফোটার মতো করে লাফিয়ে ওঠে, তারা সেদিন মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিল। মোহামেডান একটা গোল দেওয়ার পর চুপ করে বসে ছিল। শুভ্র ইঙ্গিত করে একটু উল্লাসে শামিল হতে। নইলে মোহামেডান সমর্থকরা বুঝে যাবে, অ্যান্টি পার্টি। ঢোকার মুখে একটা ছেলেকে বেদম প্রহূত হতে দেখেছে। পরে জেনেছে সে অ্যান্টি পার্টি। হাটুরে মার খাওয়ার ভয়ে মোহামেডানের গোলে দু-একটা লাফও দিল। আবাহনী গোল করার পর মুখ ভার করে থাকল।

মিলি এসে বলল, ‘আজ ফেরার সময় একটু ক্লাব হয়ে এসো তো।’

সোহান একটু অবাক হয়। ক্লাবে যাওয়ার বিষয়ে মিলি আপত্তি করে সাধারণত। দুই পেগ মেরে আসে বলে মাঝেমধ্যে ঝগড়াও বাধায়।

মিলি বুঝতে পেরে বলে, ‘একটু ওই আইটেমটা নিয়ে এসো। ওই যে বিফ কারিটা। কালকে দুপুরে অ্যাপার্টমেন্টের নতুন একজন ভাবিকে দাওয়াত দিয়েছি।’

সোহান হাসে, যার অর্থ, হবে।

মিলি আর ওর বিয়েটা প্রেমের। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক পরিবার খুব বেঁকে বসে। ঘোষণা করে, ওরা আমাদের যোগ্যই নয়। কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে দুই পরিবারই একেবারে ধনুকের মতো বাঁকা। সোজা করার কোনো উপায়ই নেই। এক পক্ষ গররাজি থাকলে বুঝিয়ে-শুনিয়ে কাজ আদায়ের একটা ব্যাপার থাকে। এখানে দুই পক্ষের ঝামেলা কে নেবে? তাই ঠিক হয়ে গেল, ওরা নিজেরাই বিয়ে করে ফেলবে। পরেরটা পরে দেখা যাবে। সোহান আরেকটা শিক্ষাও পেল এখানে। বড় ঝামেলাই বরং কখনো কখনো ভালো। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে সুবিধা হয়।

কিন্তু বিয়ের পর ওদের বিস্মিত করে বরফ গলে গেল। মিলির মা তৃতীয় দিনের মাথায় ফোন করলেন। সোহানের বাবা এলেন এক মাস পর। দুই পরিবার মিলে শেষে একটা আনুষ্ঠানিক আয়োজনও করতে হলো। মিলি বউ সাজল। সোহান পাগড়ি পরল। দুই পরিবার এমন ভাব করল যে ওরাই সব ঘটিয়েছে।

ঝামেলা মিটে যাওয়ায় খুশিই হলো সোহান। নইলে মান-অভিমান ভাঙানোর জন্য বিস্তর কায়দা করতে হতো। বন্ধু-বান্ধব পরামর্শ দিত—‘মিটিয়ে নে।’     ‘মা-বাবা আর কত দিন।’ প্রত্যেকের নিজের অভিজ্ঞতারও কিছু গল্প শুনতে হতো। তার চেয়ে এই তো বেশ ভালো।

ভালো ব্যাপারগুলোর সমস্যা হলো, অচিরেই এর ভেতরেও কিছু খারাপ বেরিয়ে পড়ে। এখানে যেমন দেখা গেল, খবরদারি আসতে শুরু করেছে। বাচ্চা এখন নিয়ে নাও। কিছু টাকা জমিয়ে ফ্ল্যাট বুকিংয়ের চেষ্টা করো। মিলির বাবাকে মনে হলো, ফ্ল্যাট ছাড়া জগতের আর কোনো বিষয়েই কোনো আগ্রহ নেই। দ্বিতীয় দিনই বললেন, ‘বাবা, ভাড়া বাসায় থাকা মানে কী জানো?’

‘জি, ভাড়া দিতে হয় মাস শেষে।’

‘নিজেকে সব সময় বন্ধকী মনে হয়। মনে হয় আমি পুরো আমি হয়ে উঠিনি।’

এক ধরনের দার্শনিকতা আছে। সোহান দার্শনিকতা পেরিয়ে এসেছে বহুকাল আগে। এখন হাসি পায়।

হাসি চেপে বলল, ‘ফ্ল্যাট কেনার টাকা কোথায় পাব?’

‘টাকা জোগাবে ভূতে।’

‘ভূতে?’

‘হ্যাঁ। সাহস করে নেমে পড়ো। হয়ে যাবে।’

সোহান একটু রাগ দেখিয়ে বলে, ‘আপনি দেবেন?’

‘তা দিতে পারি, কিন্তু সেটা ভালো দেখাবে না। লোকে বলবে, শ্বশুরের টাকায় গরম দেখাচ্ছে। একবার এই লেবেল লেগে গেলে আর মুছবে না।’

সোহান বলল, ‘টাকাও দেবেন না, আবার তাগাদা দেবেন; দুটি তো একসঙ্গে হবে না।’

শ্বশুর কী বুঝলেন কে জানে। কথা বাড়ালেন না।

সোহান ধরে নিয়েছিল আলোচনা এখানেই শেষ। স্বস্তিও পেয়েছিল। কিন্তু পরের দিন আবার যখন দেখা, তখনো ওই কথা, ‘কী ভাবলে?’

‘কোন বিষয়ে?’

‘ফ্ল্যাট।’

‘অনেক ভেবে দেখেছি, ফ্ল্যাটটা একটা বাজে বিনিয়োগ। ধরুন আমি যে বাসায় থাকি সেটার ভাড়া বিশ হাজার টাকা, কিন্তু এই ফ্ল্যাটের দাম এক কোটি টাকা। আমার এক কোটি টাকা যদি হয় এবং সেটা আমি ব্যাংকে রেখে দিই তাহলে পাব এক লাখ টাকা। এ রকম পাঁচটা ফ্ল্যাটে থাকতে পারব।’

শ্বশুর হাসতে হাসতে বললেন, ‘ফ্ল্যাট করতে এক কোটি টাকা লাগে তোমাকে কে বলল?’

‘তাহলে কত টাকা লাগে?’

‘যত টাকা তোমার আছে।’

‘এর মানে কী?’

‘কত ম্যানেজ করতে পারবে?’

‘এই লাখখানেক।’

আলোচনা এখানেই থেমে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ভদ্রলোক এরপর যেদিন এলেন সেদিন সঙ্গে আরেকজন মধ্যবয়সী মানুষ। দেখেই মনে হয়, অভিজ্ঞতার ঝুলি সঙ্গে নিয়ে বেড়ান। সব কিছুতে গভীর আগ্রহ। এক জায়গায় চোখ স্থির না হয়ে ঘুরে বেড়ায়  ফড়িংয়ের মতো।

জানা গেল, তিনি জমি-ফ্ল্যাট এসব কেনাবেচায় মধ্যস্থতা করেন। খুব সহজে ঋণ পাইয়ে দিতে পারেন।

শ্বশুর সগর্বে বললেন, ‘ইমাম ভাইয়ের কারো বাড়ি যাওয়া মানে সেই মানুষের বাড়ি হয়ে যাওয়া। ধরো, তোমারটা হয়ে গেছে।’

সোহানের ফ্ল্যাট হয়েছে। ঢাকা শহরে ৪৫০০ স্কয়ার ফিটের একটা ফ্ল্যাটে থাকে সে। আরো কয়েকটা আছে নানা দিকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, শ্বশুর দেখে যেতে পারেননি। মৃত্যুশয্যায় সোহানকে বললেন, ‘তোমাকে নিয়ে চিন্তাটা থেকেই গেল। ফ্ল্যাট হলো না।’

সোহান সেদিন হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জীবনকে যেন নতুনভাবে দেখল। মারা যাচ্ছেন যে মানুষ, সেই মানুষের এমন চিন্তা ক্ষুদ্রতার পরিচয়। কিন্তু এর মধ্যে জীবনও তো আছে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবন শেষ—এই চিন্তা করলে পৃথিবী শেষ হয়ে যেত। তথাকথিত স্বার্থপর মানুষরা এটা মনে করে না বলেই পৃথিবীতে অর্জনের লড়াইয়ে লেগে থাকে। এই অর্জন, রোজগার—এর মধ্যেই তো আসলে জীবন জেগে থাকে।

সোহানের ফ্ল্যাটগুলোর বাইরে পূর্বাচলে-সাভারে জমি আছে। একটা প্রাডো গাড়ি চালায় সে। মিলির জন্য টয়োটা বরাদ্দ। একমাত্র ছেলে জয় পড়ে সানবীমে।

প্রাচুর্য উপচে পড়ছে। যাতে হাত দেয়, তা-ই সোনা হয়ে যায়। নিজের টাকা রোজগারের এই ক্ষমতায় সে অবাক হয়ে যায়। আর এই ক্ষমতাই তাঁকে আরো ঠেলে। মনে হয়, আমার এই ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। তারপর...তারপর...

একটা স্বপ্ন দেখে সে। খুবই হাস্যকর ধরনের স্বপ্ন। এখন বললে কেউ বিশ্বাস করবে না বলে কাউকে বলেনি, কিন্তু সোহান আশা করে, অনেক টাকা রোজগারের পর একদিন সে সবাইকে চমকে দেবে।

আজ অফিসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। শেষ করে বেরিয়ে সন্ধ্যায় আরেকটা পার্টির সঙ্গে বসতে হবে। হংকংয়ের একটা কম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে স্টিলের ব্যবসার কাজ অনেক দূর এগিয়েছে।

মিটিংটাতে একটু দেরি হতে পারে ভেবে সে একটু চিন্তায় ছিল। মিলির সঙ্গে একটু লুকোচুরি খেলতে হবে। মিলি কিছু না বললে চোখে একটা ভাষা ফুটিয়ে রাখবে, যার অর্থ সত্যিই মিটিং ছিল তো?

ক্লাবে যাওয়ার ফরমায়েশ দেওয়ায় সেটুকু আর নেই। আজ আর লুকোচুরি নেই। তাতে সুবিধা আছে একটা। আরেকটা মিটিং সে কালকে করবে ভেবেছিল। এখন ওদের ক্লাবে ডাকলেই হবে।

তৈরি হয়ে বেরোবে, এই সময়ই ফোন। অপরিচিত নাম্বার। ধরে না সাধারণত। টাকা করার অসুবিধা হলো, বেশির ভাগ ফোনই আসে ফোনকর্তার চাহিদাসংক্রান্ত—এটা করে দাও। অমুককে ধরিয়ে দাও। তমুককে বলে দাও।

আজ মনটা ভালো বলেই ফোনটা ধরে ফেলল। আরে কে কথা বলে! কে? মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো নাকি?

গলাটা এত বছর পরও চিনতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু অনেক কথা জমে আছে বলে একটু অসংলগ্ন শোনাতে থাকে ওর গলা—তুই কোথায়—দেশেই আছিস—তুই চাকরি করিস—মাই গড!

সেই গলার অসংলগ্নতাটা এমনই পর্যায়ের ছিল যে মিলি ডাইনিংরুমে এসে ওর পাশে দাঁড়ায়। ইঙ্গিতে জানতে চায়, কে?

সোহান ইঙ্গিতে ওকে বসতে বলে কথা চালাতে থাকে।

অনেকক্ষণ পর কথা শেষ হলে মিলিকে কোনো প্রশ্ন করতে হয় না।

‘আমার বন্ধু।’

‘তোমার আবার বন্ধু আছে?’

‘আমার বন্ধু থাকতে পারে না!’

‘কোনো দিন তো শুনিনি। তোমার যারা আছে সব তো অফিসের লোক, কলিগ বা ব্যবসার পার্টনার।’

ঠিকই তো, জীবনের ওই অধ্যায়টুকু মিলির কাছে গোপনই রেখেছে। লুকোচুরি খেলা এখানেও চলেছে।

মিলি কৌতূহলে জানতে চায়, ‘নাম কী ভদ্রলোকের?’

‘শমসের।’

 

তিন

অফিস থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটে শমসের। কিছুদূর গিয়ে রিকশা নেবে। তারপর বাস।

আজ দুপুরে একবার বেরিয়েছিল। তখন বড় সাহেবের কাজ ছিল বলে ওর দামি পাজেরো গাড়িটা দেওয়া হয়েছিল। ফেরার সময় গাড়ি ছেড়ে ফিরেছে সিএনজিতে।

এক দিনে যত রকম গাড়ি চড়া সম্ভব তার সবকটিতেই চাপে সে। কী দেখে সে! মানুষ। কিন্তু মানুষকে তো এই জীবনে কম চেনা হলো না। তবু আজও প্রতিদিন সে মানুষকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে।

শাপলা চত্বর থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত হাঁটাপথে দৈনিক বাংলার মোড়ে দাঁড়ায় সে। অফিসফেরত মানুষের ভিড়। এই লড়াইয়ে জেতার জন্য মানুষের মরিয়া ভাবটা দেখলে মনে হবে, বাসের একটা সিটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের মানে। দৌড়ে কেউ কেউ উঠে যায়। হালকা-পলকারা পেছনে পড়ে। দাঁড়িয়ে সরকার-সিস্টেমকে গালাগাল দেয়। একটু পরে আবার লড়াইয়ে নামে। এবার হারা দলের কেউ কেউ জেতে। মানুষ এভাবেই হারে এবং জেতে। এগোয় এবং দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝতে পারে, আসলে কোনো মানুষের চরিত্র বা শ্রেণিই আসলে স্থির নয়। একটু আগে ডাবল ডেকারে উঠতে না পেরে যে মানুষটি ছিল হারা দলের, পরের বাসে উঠে সে জয়ী। মানুষের এই চরিত্র বদলের প্রতীকী চিহ্নও তাঁর কাছে খুব নতুন নয়। সে কি দেখেনি, সমাজ বদলে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল যে মানুষ,   সে-ই আজ কিভাবে বিলীন হয়ে গেছে সময়ের স্রোতে।

এর মধ্যে ছোটখাটো একটু দুর্ঘটনাও ঘটে যায়। একটা রিকশার ধাক্কায় এক বৃদ্ধ ছিটকে পড়েছিলেন। খুব বেশি মানুষ ধরাধরিতে এলো না। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। চলতে শুরু করলেন। একবার পেছনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলেন।

শমসেরের হঠাৎ মনে হয়, এই মানুষটির সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। কোনো তাত্ত্বিকতা নয়, এমনি গল্প।

এই বয়সে একা ব্যাগ হাতে ছুটতে হচ্ছে মানে জীবনসংগ্রামে পর্যুদস্ত একজন মানুষ। আর পরাজিতরা সবার ওপর খেপে থাকে। তাদের কাছে অপরিচিত মানুষ মানেই ঠগ, প্রতারক, জোচ্চোর।

শমসের বলে, ‘চাচা, খুব গরম পড়েছে।’

চাচা চেয়ে থাকেন। উত্তর দেওয়ার দরকার মনে করেন না।

শমসের আবার বলে, ‘বৃষ্টি হবে মনে হয়। হলে আমার অবস্থা কেরোসিন। ছাদ দিয়ে পানি পড়ে।’

তাঁর ছাদ দিয়ে পানি পড়ার সঙ্গে বুড়োকে জড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে কেন? পেছনে কী ষড়যন্ত্র—মানুষটি এই ভঙ্গিতে চেয়ে থাকেন।

শমসের এবার একটু হাসে। বলে, ‘চাচা, চলেন আমি একটু এগিয়ে দিই।’

না। এবার শমসেরের অপরাধী চেহারা সম্পর্কে মানুষটার কোনো সন্দেহ থাকে না।

তিনি একটু সরে গিয়ে আরো কয়েকজন মানুষের মাঝখানে দাঁড়ান। অচেনা ভিড় হোক, তবু দলবদ্ধ থাকাটাকে আজও মানুষ শক্তি মনে করে। হয়তো এরা কেউ ওর বিপদে এগিয়ে আসবে না, তবু ভরসা রাখে। ভুল ভরসা হয়তো। তবু এই ভরসাই মানুষকে টিকিয়ে রেখেছে। নইলে এই প্রজাতি এত দিনে নাই হয়ে যেত।

শমসের একটা ইঙ্গিত করে চোখ টেপে মানুষটার দিকে। বুড়ো লোকটির আরো ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু ভয় না পেয়ে তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝতে চান, এত মানুষ থাকতে তাকেই টার্গেট করা কেন?

কিছু মানুষ সারা জীবন এই দুঃখটা বয়ে বেড়ায়, সব দুর্ভাগ্য কেন তাঁর ক্ষেত্রেই ঘটে। এই মানুষটিরও এখন রূপবদল ঘটে গেল। এতক্ষণ শমসেরের ওপর রাগ হচ্ছিল। এখন নিজের ভাগ্যের ওপর। আমি কেন? কেন অন্যরা নয়!

কাহিনিটাকে এখানেই শেষ করে দেয় সে। অসম্পূর্ণ গল্পে উত্তেজনা বেশি থাকে। শেষটা দেখা গেল না বলে মানুষটার মনে একটা চমক টিকে থাকবে। শমসের ভালো না খারাপ এই দ্বিধায় কাটবে। বাড়িতে গল্প করতে গেলে কেউ বলবে, ফটকা একটা। কেউ বলবে, আরে তুমি আরেকটু দেখতে।

বাসে বসে উন্নয়নের জোয়ারটা নিয়ে খুব ভাবে সে। দেশ এগোচ্ছে। শাহবাগের দিক থেকে শুরু করে ফার্মগেট পর্যন্ত রাস্তা কাটা। মেট্রো রেলের মহাযজ্ঞ। তার কারণে আবার যানজট। নানা বিশ্রী কথা শোনা যায়। উন্নয়নবিরোধিতা। তবে সবাই খুব সতর্ক, যেন এর মধ্য দিয়ে আবার সে যে বিপক্ষ দলের লোক এটা প্রমাণিত না হয়। শুরু হয়, কাজ তো...ভালোই হচ্ছে কিন্তু...। এভাবে না করে ওভাবে করা যেত।

পাশে কয়েকটা তরুণ ছেলে বসে ছিল। অবধারিতভাবেই ওদের হাতে মোবাইল। টেপাটেপি চলছে। অদূরে দুটি মেয়ে বাসের সব পুরুষ মানুষকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে। এদের মধ্যে সম্ভাব্য কোনো দুষ্কৃতকারী নেই তো!

শমসেরের পাশের লোকটি নাক ডাকতে থাকেন। বাস অনেকক্ষণ পর আবার চলতে শুরু করেছে। কন্ডাক্টর হাঁক ছাড়ে। বাংলামটর। বাংলামটর। বাম পা সামনে দিয়ে...। অনেকে নামে। অনেকে ওঠে। ঝুঁকি নিয়ে মোড় পার হয় কেউ কেউ। পুলিশ ছুটে এসে থামানোর চেষ্টা করে। পুলিশকে হারিয়ে দেয় বেশির ভাগ। আবার নিয়ম মেনে কেউ কেউ সিগন্যালের জন্য দাঁড়ায়। যারা দাঁড়াল তাদের কাছে ওভাবে রাস্তা পার হতে যাওয়ারাই এই দেশের সব সমস্যার মূলে। যারা পার হতে পারল তাঁরা আবার মনে করে, দেশের সমস্যা সিস্টেম ঠিক নেই। তা থাকলে তাঁকে এভাবে জান নিয়ে রাস্তা পার হতে হয় না।

মেসের গেটে বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা। হাসতে হাসতে বললেন, ‘শমসের সাহেব, খবর তো মনে হচ্ছে ভালো।’

‘কী খবর?’

‘সরকার তো শেষ।’

‘তাই নাকি?’

‘কেরোসিন অবস্থা। ইন্ডিয়া মনে হয় সরে যাচ্ছে।’

‘কোথায় সরে যাচ্ছে?’

‘আর সরকারের সঙ্গে নেই। বুঝলেন, চীনকে বেশি প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে যাচ্ছে। ইন্ডিয়ানরা তো আর দুধ খায় না। ওরা চাল বুঝে ফেলেছে।’

‘হুঁ। কিন্তু আপনার কাছে খবরটা এলো কী করে?’

‘আপনার কাছেও আসবে। চোখ-কান খোলা রাখেন। টাকা-পয়সা কোনো ইনভেস্টমেন্টে থাকলে সরিয়ে ফেলেন। দেশের অবস্থা ভালো না।’

বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের কাছে সরকারের অবস্থা কখনোই ভালো থাকে না। আর সব সময়ই চীন-ভারত আর আমেরিকার সমীকরণ। রাজনীতি সম্পর্কে সামান্যই জ্ঞান, কিন্তু জ্ঞানটাকে আন্তর্জাতিকতার পর্যায়ে নিয়ে ঠেকিয়েছেন। কোনো দিন তাঁকে বলতে শোনেনি, সরকারের অবস্থা খারাপ, কারণ মানুষ পছন্দ করে না। সব সময়ই চীন-ভারত।

শমসের খুব মনোযোগী শ্রোতা। তাঁর রাজনৈতিক মতামতকে খুব গুরুত্ব দেয় বা দেওয়ার ভঙ্গি করে। বোঝায়, চীন-ভারতের জটিলতা তাঁর মতো করে কেউ বোঝে না।

কিন্তু এ জন্য নয়, শমসেরকে তাঁর পছন্দের কারণ শমসের ভাড়াটা সময়মতো দেয়। মেসে নিজের রুমে ছোটখাটো কোনো সমস্যা হলে সারিয়ে নেয়। বাথরুমের কল নষ্ট হলে হৈচৈ করে না।

সত্যি বললে, টাকা খরচের বিষয়ে হিসাব করে না বলেই মেসের সবার কাছে সে খুব প্রিয়। সবাই ওর খুব প্রশংসা করে বলে, শমসের সদালাপী। পরোপকারী। কিন্তু আসলে ওসব কিচ্ছু না। যদি সে ওকে-তাকে ধার না দিত, বাজারের পাই-পাই হিসাব করত অন্যদের মতো, তাহলে ওর দোষ বেরোত।

টাকার চাকাই সব ঘোরায়। আর তাই দেখে কৌতুক বোধ করে মানুষের প্রতি। আবার আত্মোপলব্ধিও হয়। এ জন্যই ওদের রাজনীতিটা সফল হয়নি। ওরা ভেবেছিল, মানুষ ধীরে ধীরে লোভের ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আরো উন্নত মানুষ হবে এবং তখন সবাই হয়ে উঠবে সবার জন্য। ওরা শুরুর দিকে কাজটা করছে বলে ওদের পরিশ্রমটা বেশি যাচ্ছে।

দরজা খোলার শব্দ পেয়েই নিজাম সাহেব এগিয়ে আসেন। বলেন, ‘আজও কিন্তু ঘটনা ঘটেছে।’

শমসের একনিমেষে পাশের ঘরটা দেখে নেয়। এখানে ইমরান বলে ভার্সিটি পড়ুয়া একটা ছেলে থাকে। এবং তার কাছে মাঝেমধ্যে একটা মেয়ে আসে। সেই নিয়ে চিন্তায় কারো ঘুম নেই। সবচেয়ে নির্ঘুম সময় কাটে মধ্যবয়সী নিজাম সাহেবের।

বলেন, ‘এখনো আছে। সেই এগারোটায় এসেছে। কোনো কথা হলো? এটা তো বেশ্যাখানা না, কী বলেন?’

‘অবশ্যই বেশ্যাখানা না।’

নিজাম সাহেবের গলা উঁচু হয়। ‘আপনারা তো সব বলেই খালাস। কিছু তো করছেন না।’

‘করব, করব’ শমসের বলে, ‘একদিন এমন কাজ করব যে আপনি লাফাবেন।’

‘হাতেনাতে ধরবেন নাকি মশাই?’

‘হতে পারে।’

‘তবে এই সমস্ত ছেলেরা কিন্তু ভায়োলেন্ট হয়। আর মেয়েগুলোও হয়...বাজারি মেয়ে তো...দেখা গেল আমার-আপনার চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিল। বলল, আমরা ওকে...’ কথাগুলো বলার সময় এত উজ্জ্বল দেখায় নিজাম সাহেবের মুখ!

‘সত্যি এ রকম কিছু হলে তো কেলেঙ্কারি হবে। ভাবতে হবে। আরো ভাবতে হবে।’

বলে আর দাঁড়ায় না। ঘরে ঢুকে পড়ে।

নিজাম সাহেবের পায়ের শব্দ শোনা যায়। বেচারা সেই বিকেল থেকে এ রকম পায়চারি করে মরছেন।

দেখে মনে হচ্ছে খুব ক্ষুব্ধ। কিন্তু শমসের জানে, আসলে কল্পনায় দেখতে পাচ্ছেন ভেতরে কী হচ্ছে। কল্পনার সেই দৃশ্যটুকুর আনন্দই তাঁকে উদ্দীপ্ত রাখে।

শমসেরের পোশাক-চাকরি এসবের আড়ালে একটা অপরাধী মন আছে। সেই মন দিয়ে সে এমন কিছু দেখতে পায়, যা অন্যদের চোখ এড়িয়ে যায়। আর এই অপরাধী মনটাই তাঁর পাথেয়। সে যেকোনো অফিসের বড়কর্তার প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠে, তার কারণ এই অপরাধী সত্তা।

প্রত্যেকটা বড়লোকের কাজকর্মের জন্য অনেক লোক থাকে। সঙ্গে থাকে অপকর্ম করার অল্প কিছু লোকও। শমসের তাদেরই একজন।

আজকে অফিস থেকে বেরোনোর আগে ওর সঙ্গে ইসমত সাহেবের কথোপকথনটা শুনুন।

বস একটা ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘এই যে মেয়েটা, ওর সঙ্গে সময় কাটাতে চাই।’

শমসেরকে এমন ছবি প্রায়ই দেখতে হয়। চমক নেই। উত্তেজনা নেই। তবে ছবিটা দেখে একটু হাসি ফোটে।

পকেটে রেখে জানতে চাইল, ‘কত দিন সময়?’

‘সর্বোচ্চ তিন দিন।’

কাজে নেমে গেছে। তিন দিন লাগবে না মনে হয়।

আচ্ছা, এমন হলে কেমন হয়, কোনো একদিন যদি নিজাম সাহেবকে একটা উলঙ্গ মেয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়!

নিজাম সাহেবের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘুরছেন।

শমসের কাজে নামে। কয়েকটা ফোন করে কিছু যোগাযোগ এগিয়ে রাখতে হবে।

সব নাম্বার ফোনে সেভ রাখা যায় না। কিছু নাম্বার আছে গোপন ডায়েরিতে। সেই গোপন ডায়েরিতে আছে কিছু নিজের পুরনো মানুষের নাম্বারও। বছরখানেক আগে জোগাড় করে রেখে দিয়েছে—সময় হলে যোগাযোগ করবে। আজ সময় হয়েছে কি!

মেয়েটার ছবিটা দেখে। তারপর মনে হয়, বোধ হয় সময় হয়েছে।

একটা নাম্বার ডায়াল করে। দুটি রিং হওয়ার পর কেটে দেয়।

আবার ভাবে। আবার ছবিটা দেখে। আবার ফোন।

ওপাশ থেকে খুব গোছানো গলায়, ‘হ্যালো।’

‘আমি শমসের।’

‘শমসের...এত বছর পর...তুই দেশে...কোথায় মরেছিলি...’       

চলন্ত ট্রেনের মতো ছুটতে থাকে সোহানের গলা। একসময় ট্রেনটা থামে বটে, কিন্তু শমসেরের ভেতর থেকে বেরোনো এত দিনের চেপে থাকা পাগলা ঘোড়া আজ আর থামতে চায় না।

ফোন করতে থাকে একের পর এক। সবার আগে আফসার ভাইকে। আফসার আনোয়ার। বাহারি নাম। এখনো কাজ করছেন বাহারি।

ফোন ধরেন না অবশ্য। বেজে চলে অক্লান্তে। ব্যস্ত মানুষ। সব ফোন ধরার সময় আজ তাঁর কোথায়।

 

চার

আফসার আনোয়ার খুব ভোরে উঠে মর্নিং ওয়াক করেন। খুব যে ভালো লাগে এমন নয়। বা খুব যে কাজ হয়, এমনও মনে করেন না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গেলে গুরুত্ব বোঝানোর জন্য কিছু জিনিস করতে হয়। মর্নিং ওয়াক তারই একটা। ট্রাউজার-কেডস পরে তিনি হেঁটে চলেন। কিছুক্ষণ দৌড়ান। আবার হাঁটেন।

আর খেয়াল করেন পেছনে একটা দল তাঁর সূচি অনুযায়ী হাঁটে। দৌড়ায়। আবার হাঁটে।

মানুষকে নিজের মতো করে এভাবে চালানোর একটা মজাও আছে।

এই লোকগুলো তাঁর সাহায্যপ্রার্থী। এরা খবরাখবর রাখে। কোনো মাধ্যমে জেনে যায়, তিনি খুব ভোরে মর্নিং ওয়াক করেন। এই সময় ওকে ধরতে পারলে...

তিনি মর্নিং ওয়াকের সময় হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমধ্যে থেমে যান। পেছনের জটলাও থামে। তিনি ফিরে চান কোনো কোনো দিন। কেউ কেউ দৌড়ে কাছে চলে আসে, ‘সালাম ভাই’ ‘শরীরটা ভালো তো।’ ‘কী যে চমৎকার করে দৌড়ান’ ‘পারবে আর কোনো এমপি।’

তিনি বেশির ভাগ দিনই উত্তর দেন না। কিন্তু কোনো কোনো দিন দেন। উত্তর দেন নির্দিষ্ট একজনকে ধরে, জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন? কোনো সমস্যা?’

সঙ্গে সঙ্গেই মানুষটির চোখে হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে ওঠে। অবিলম্বে নিভিয়েও ফেলে। নইলে যে সমস্যার গভীরতাটা চেহারায় ফুটিয়ে তোলা যাবে না।

অভিনেতা বনে যায় মানুষটি। জানায়, একটা তদবির আছে শ্রম মন্ত্রণালয়ে। কয়েক কোটি টাকার কাজ।

আফসার সাহেব তাকে অবাক করে দিয়ে পিএসের কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে শ্রমমন্ত্রীকে ধরে ফেলেন। তারপর দাবি, ‘আমার নিজের লোক। আজই দুপুরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

দ্রুতগতিতে কাজ সেরে দিয়ে মর্নিং ওয়াকের দাম বাড়ান। পেছনে ভিড়টা পরদিন থেকে আরো বড় হয়। কিন্তু তখন আফসার সাহেব আর ওদিকে মনোযোগ দেন না। দিনের পর দিন লোকজন অকারণে ওর সঙ্গে দৌড়ে ক্লান্ত হয়। কাজ আর হয় না।

তারপর আবার একদিন তিনি কারো একজনের ছেলেকে এক ফোনে চাকরি পাইয়ে দেন। আবার নাম ছড়ায়। আবার তিনি উদাসীন হন।

রাজনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় মন্ত্র হলো নিজের সম্পর্কে উদাসীনতার চাদর তৈরি করে রাখা। কাজ সব সময় হয়ে গেলে তিনি হয়ে যাবেন ভেড়া। আবার কখনো না করে দিতে পারলে পরিত্যাজ্য। দুটির কোনোটাই হওয়া যাবে না। পুরো উন্মুক্ত হওয়া যাবে না। আবার পুরো দূরে থাকলেও হবে না।

মর্নিং ওয়াক সেরে এসে কিছুক্ষণ ব্যায়াম করেন। লম্বা গোসলের সময় খুব বেসুরো গলায় গান গান।

একেক দিন ইচ্ছা হয় এই বেসুরো গলার গানটা উপস্থিত মানুষগুলোকে শুনিয়ে দিতে। কেমন হবে? কয়েকজন হয়তো দৌড়ই দেবে।

এমপি হওয়ার পর কত বদল হয়েছে তাঁর! সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরেন। সব সময় ইস্ত্রি করা। এত ফিনফিনে যে ভেতরের গেঞ্জিটা পর্যন্ত দেখা যায়। নিজের বাহিনীকে বলে তিনি একটা গল্প তৈরি করেছেন, এই পোশাকও তাঁর স্বচ্ছতার প্রকাশ।

মর্নিং ওয়াক তো করছেনই, ক্রমাগত চেষ্টায় বদল করেছেন আরো বহু অভ্যাস। কিন্তু বাইরের এত বদলেও ভেতরটা এখনো সেই আগের মতো। ছোটলোকিতে ভরা। ফাজলামিতে টইটম্বুর।

সেই ছাত্রজীবন থেকেই যা ইচ্ছা করত, এখনো   তা-ই করে। বেসুরো গান গাইতে ইচ্ছা করে। মাঝেমধ্যে মঞ্চে বসে ইচ্ছা করে, কেউ একজনকে চেয়ার ঠেলে উল্টে ফেলে দেন। ধান্দা নিয়ে আসা কোনো মানুষের সঙ্গে একপাক নেচে নিতে ইচ্ছা করে।

কিছুই বদলাল না। ভেতরে তিনি সেই ফাজিল। ফিচকে। হালকা।

বাইরে ভারী। ব্যক্তিত্ববান।

আজ বসেছেন একটা পার্টি মিটিংয়ে। আনুষ্ঠানিক কোনো মিটিং নয়। কোর কমিটির মিটিং। নিজের অনুগত ক্যাডাররা বসে এলাকার হাওয়া পর্যালোচনা করে। কোনো দিক দিয়ে কেউ মাথাচাড়া দিচ্ছে কি না। হালটা হালকা হয়ে যাচ্ছে না তো।

ফজলু তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সব সময় ওর ঠাণ্ডা লেগে থাকে বলে ওর নাম সর্দি ফজলু। সে একটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, ‘লিডার, আপনার একটু মনোযোগ দেওয়া দরকার।’

‘মনোযোগ সব সময়ই আছে। তুই বল।’

‘বস্তি না সরালে হচ্ছে না।’

‘কেন? বস্তি থাকলে কী সমস্যা। ওরা তো ভোট আমাদেরই দেয়। কিছু টাকা দিলেই চলে।’

‘ওখানে ইয়াবা ঢুকে পড়েছে।’

‘তাতে তোর কী সমস্যা? ইয়াবা ঢুকলে ওরা ইয়াবা খাবে। গরিব মানুষ, বিনোদন নেই, একটু-আধটু নেশা করুক না।’

‘কিন্তু ব্যবসার ভাগটা তো আমিন ভাইয়ের ছেলেরা নিয়ে যাচ্ছে।’

‘তুইও ভাগ চাস?’

‘তা চাই না। কিন্তু টাকা আছে বলে ওদের দিকে ছেলেরা সব ঝুঁকে পড়ছে। বস্তির ছেলেরা ঢুকলে সমস্যা নেই, কিন্তু পাশের কলেজের ছাত্ররাও ওদিকে ভিড়ছে।’

‘কী করতে চাস?’

‘পূর্তমন্ত্রীকে বলে বেআইনি স্থাপনা উচ্ছেদের একটা উদ্যোগ নিন না।’

‘কিন্তু বস্তিতে সব নিজেদের লোক। আমাদের ভোট দিয়েছে।’

অজিত বাবুর নিয়ম হচ্ছে তিনি কথা বলেন অনেকক্ষণ পর। যখন কোনো বিষয় নিয়ে ফজলু আর লিডারের মতটা ঠিক মেলে না, তখন বুঝদারের মতো একটা মত দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

বললেন, ‘ফজলু খারাপ বলেনি, লিডার। ভোট আরো চার বছর পর। অত আগে ভোট নিয়ে ভাবলে হয় না। ভোট নিয়ে ভাবতে হয় ভোটের তিন মাস আগে থেকে। এখন যত ভালো কাজ করেন, ভোট আসতে আসতে ভুলে যাবে। আবার যত খারাপ কাজ করব, সেটাও ভুলে যাবে। খারাপ কাজের সময় এটাই।’

এমন না যে বিষয়টা তিনি বোঝেন না, কিন্তু সারাক্ষণ অবুঝের মতো কথা বলেন। বলে বলে ওদের একটু পরখ করে নেন। এরা বিশ্বস্ত-পরীক্ষিত, তবু ওদের চিন্তায় মরচে ধরছে কি না সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়। না, ধার ঠিকই আছে।

ভোটের পরের এক-দুই বছর সময় বড় ভালো সময়। যেকোনো কিছু করে ফেলা যায়। পত্রিকারা একটু হৈচৈ করে, কিন্তু আজকাল পত্রিকা-টিভি কোনো সমস্যা না। ফেসবুকে পয়সা দিয়ে কিছু লোক বসিয়ে পাল্টা একটা জনমত তৈরি করে ফেলা যায়।

তাঁর এমন একটা বাহিনী আছে। ভার্সিটি পড়ুয়া একদল ছাত্র। ‘আফসার আনোয়ার এমপি’ পেজে প্রতিদিন কয়েক হাজার লাইক পড়ে। ফেসবুকের জন্য তিনি কিছু কাজ করেন। এখানে-ওখানে গিয়ে পোজ দেন। কেউ খুব অসুখ শুনলে রাতে ওষুধ-পথ্য নিয়ে চলে যান। পরদিন দেখে মানুষ ধন্য ধন্য করে।

বস্তি উচ্ছেদ! ইয়াবা। তরুণদের টাকার দিকে চলে যাওয়া। তিনটা সমস্যার সমাধান করতে হবে।

তিনি সরল অঙ্কটা করতে শুরু করেন। পূর্তমন্ত্রীকে বললে কাজটা হয়ে যাবে। বস্তি উচ্ছেদ হয়ে যাবে। মিডিয়া খুব সাপোর্ট দেবে। কিন্তু পরদিন আবার সেখানেই গরিব মানুষের কান্নার ছবি দেখাবে। এরা দুই দিকেই আছে।

সরকারি জমি উদ্ধার করতে গেলে চাকুরে মধ্যবিত্তরা সমর্থন করবে। এদের খুশি রেখে খুব লাভ নেই। এদের ভোট ঠিক করা। যে দলের সমর্থক, সেই দলকেই ভোট দেবে। তা ছাড়া এরা পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো দিকেই রাস্তায় নামবে না। কাজেই খুব গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই।

খুশি হবে ব্যবসায়ী-বিল্ডার কম্পানিগুলো। ওখানে কোনো প্রজেক্ট হওয়ার সম্ভাবনায় উত্তেজিত হয়ে উঠবে। ধরাধরি শুরু করবে। কিন্তু সমস্যা হলো, অবৈধ বস্তি ভাঙার সঙ্গে এদের নড়েচড়ে বসার ইতিহাসের কারণে মানুষ খুব সতর্ক থাকে। ওদের নিয়ে এখনই কোনো হিসাব করা যাবে না।

কিন্তু একটা সম্ভাবনায় তাঁর চেহারায় ঝলকানি আসে। তিনি হাসেন।

বস্তি ভেঙে গেল। একটা বড় প্রজেক্ট তৈরি হলো। ব্যবসায়ীরা খুশি থাকল। তিনি ভাগের টাকা পেলেন।

আবার বস্তি ভাঙার কারণে সমস্যায় পড়া গরিব মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। ওদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দিলেন। গরিবের বন্ধু হিসেবে পাকাপোক্ত হলো তাঁর জায়গা।

বস্তিতে ব্যবসা করা প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া গেল, তোমরা পাতা ধরে নাড়াচাড়া করতে গেলে আমি ডাল ভেঙে দিই। দলে ভেড়ো। না হলে দৌড়ে ভাগো।

আফসার সাহেবের এক ঢিলে একটা পাখি মারায় রুচি নেই। দুটি হলেও ঠিক জমে না। তিন-চারটা হলে তবে উত্তেজনা পান।

তিনি ফজলুকে বলেন, ‘ডিসি সাহেবকে ফোন লাগা?’

‘পুলিশ!’

‘হ্যাঁ। রাতেই সোনাতলা বস্তিতে অভিযান হবে। ইয়াবাবিরোধী অভিযান।’

ফজলু কোনো কথা না বলে ফোন ঘোরানো শুরু করে। সে জানে, তাদের মতো ছোট করে লিডার চিন্তা করেন না। পুলিশি অভিযান দিয়ে শুরু করে শেষ পর্যন্ত নিয়ে ঠেকাবেন বস্তি ভাঙায়। অনেক পেছন থেকে শুরু করেন বলে লিডারকে কেউ ছুঁতে পারে না। তিনি সব কিছুতেই থাকেন, আবার কোথাও থাকেন না।

ফজলু রিং করতে গেছে। তখনই ফোনটা বেজে ওঠে।

ফজলু বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোন ধরে বলে, ‘কে বলছেন?’

উত্তর শুনে বলে, ‘এখন মিটিংয়ে ব্যস্ত। কিছু বলার থাকলে বলেন।’

‘আমার কিছু বলার নেই’—ওদিকের উত্তর।

‘তাইলে ফোন করলেন কেন? ফাজিল কোথাকার?’

‘আপনার লিডারকে বলবেন, একজন ফাজিল তাঁকে ফোন করেছিল।’

‘শালা নাম বল। নইলে কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই খালাস হয়ে যাবি। নাম্বার আছে, কোথায় আছিস ট্র্যাক করে ফেলব।’

ওপাশ থেকে হাসি। ‘আমি আছি। আপনার লিডারকে বলবেন, শমসের আছে।’

‘কী নাম বললি?’

‘শমসের।’

ফজলু একটু বোঝার চেষ্টা করে, এই নামের ক্ষমতাধর কেউ আছে নাকি? কোনো মন্ত্রীর শালা। কোনো বড় ব্যবসায়ী।

মনে পড়ে না। সে চিৎকার করে বলে, ‘শালা শমসেরের বাচ্চা...তোরে আজকে আমি...’

আফসার সাহেব একটু কৌতূহলী হয়ে বলেন, ‘কী নাম বললি?’

‘নাম নাকি শমসের শালার।’

আফসার সাহেব ফোনটা কেড়ে নেন।

‘শমসের। কোন শমসের?’

ওপাশের উত্তর, ‘সেই শমসের।’

আফসার সাহেব স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। পুলিশ-বস্তি-পূর্তমন্ত্রী সবাই একযোগে মাথা থেকে বেরিয়ে যান।

ফজলু কী একটা প্রশ্ন করতে গিয়ে এমন ধমক খেল।

 

পাঁচ

মিলি আজ ফেসবুকে বসেছে। বসেছে বলতে সাধারণত সে শুয়ে শুয়ে ফেসবুকিং করে, কখনো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে; কিন্তু আজ একেবারে ল্যাপটপ বের করে চেয়ার-টেবিল পেতে। সে চায় না আজ ফেসবুকে কথা বলার সময় কোনো ফোন আসুক। আজ চাই অখণ্ড মনোযোগ। ফোন বা মেসেজ এসে কোনো বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করুক চায় না বলে ফোনটা বন্ধ করে এখন ল্যাপটপে পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ।

ফেসবুককে মিলি খুব ভালোবাসে, কিন্তু ফেসবুক করার সময় ওর চেহারায় দুঃখের ছাপটাই বেশি ফুটে ওঠে। প্রতিমুহূর্তে মনে হয়, ইস্, যদি আমাদের কলেজজীবনে ফেসবুক থাকত! কত প্রেম করা যেত! কত ছেলেকে নাকে দড়ি দেওয়া যেত!

মিলির প্রেমে পড়ে দাড়ি রেখেছে বহু ছেলে। কবি হয়ে গেছে কতজন। নিজের দখল নিয়ে এত হানাহানি দেখার পরও ফেসবুকের যুগের সুযোগ দেখে মিলির আফসোস হয়, হতে পারত আরো কত কিছু। তাদের সময়ে সামান্য একটু দেখা-সাক্ষাতের বেশি কিছুর সুযোগ ছিল না। ক্রুদ্ধ হয়ে থাকা বাবা, সন্দেহগ্রস্ত মা, সব সময় শকুনের চোখ নিয়ে অনুসরণ করা বড় ভাই এবং হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে থাকা প্রতিবেশী গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে দেখা-সাক্ষাৎও ছিল বড় কঠিন। সেই ল্যান্ডফোনের আমলে মিলিদের বাসায় ফোনও ছিল না। চিঠি লিখত। সেগুলো পৌঁছাতেও জীবন বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা।

তা সময় পেরিয়ে গেলেও কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে মিলি। তার বয়স এবং অবস্থান অনুযায়ী করা উচিত নয়, এমন অনেক কিছুই করে সে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিজের অদ্ভুত এক দুনিয়া রচনা করে বসে আছে সে। মন্দ নয় অভিজ্ঞতা।

আজ এই মুহূর্তে সে ফেসবুকে বসেছে একজনের ওপর গোয়েন্দাগিরি করতে। মানুষটার নাম সোহান। ওর স্বামী।

সব ঠিক ছিল। মিলির হাওয়াই দুনিয়ায় নিজের স্বপ্নের জগৎ। সোহানের টাকা রোজগারের দুর্নিবার নেশা। খানিকটা ছন্দ কেটে গেল ফোনে। একটা মাত্র ফোন।

দিন চারেক আগে হঠাৎ করেই ফোনটা আসে। ইনকামিং ফোন নিয়ে সোহানকে উত্তেজিত দেখা যায় না; বলে—ওসব ফোন হচ্ছে সমস্যার, মানুষ সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার জন্য টাকাওয়ালাদের ফোন করে।

সেদিনও ইনকামিং কল বলে মিলি খেয়ালও করেনি আলাদা। সোহানও ফোনটা ধরল খুব এলেবেলে ভঙ্গিতে, যেমন করে আর দশটা ফোন ধরে। কিন্তু ওপাশের কণ্ঠ শোনার পর ওর চেহারায় যে পরিবর্তন, সত্যি বললে, তিন বছরের প্রেমের জীবন এবং সাত বছরের দাম্পত্য জীবনে এমন শিহরিত মুখ দেখেনি। কী যে উত্তেজনা...একটানা এত কথা বলে ফোন রেখে দম ধরে বসে থাকল।

মিলির প্রশ্নের উত্তরে বেঠিক জবাব দিতে থাকল একের পর এক।

মিলি ভেবেছিল তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা, কিন্তু এর পর থেকে খেয়াল করে, সোহানের সব কিছুতে কেমন যেন একটা অমনোযোগিতা। কেমন যেন নিজের কাছে নিজে দাঁড়াচ্ছে নতুন করে।

মিলি প্রশ্ন করে, ‘ব্যাপার কী বলো তো?’

‘কোন ব্যাপার?’

‘তুমি কেমন যেন সব কিছুতে একটু অমনোযোগী।’

‘কই, না তো?’

‘তোমার বন্ধু কী বলল?’

‘এইতো।’

‘দেখা হবে না?’

‘হবে।’

‘এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু...এত দিন পর যোগাযোগ...সঙ্গে সঙ্গেই তো দেখা হওয়ার কথা।’

‘বললাম তো হবে’—একটু বিরক্তির ভাব দেখায়।

এটাও মিলির অভিজ্ঞতায় নতুন। সোহানকে ওর প্রতি বিরক্ত হতে তো দেখেনি কখনো।

মিলি এরপর গোয়েন্দাগিরিতে নামে এবং ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে সোহানের লকারের তালা খুলে পুরনো কাগজপত্র খুঁজে দেখে। অতীতকে বের করার চেষ্টায়।

কিছু বেরোয় না। ওর পরীক্ষার কিছু সার্টিফিকেট। ব্যবসার বিস্তর কাগজ। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস পার্টনারদের সঙ্গে চালাচালি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ই-মেইলের প্রিন্ট কপি।

প্রাথমিক তদন্ত শেষ হওয়ার পর মিলির নিজেরই লজ্জা হতে থাকে। আচ্ছা, এমন যদি হয় যে উল্টা সোহান তদন্তে নামে, তাহলে কত কিছু বেরিয়ে যাবে। তুলনায় সোহানের গোপন কিছু নেই। নেই যে সেটা ওকে আরো ক্ষুব্ধ করে তোলে। না-ই যদি থাকবে লুকানোর কিছু তাহলে পুরনো বন্ধুর আবির্ভাবে এত চিন্তিত কেন?

মিলির সঙ্গে ওর প্রেমের সম্পর্ক তিন বছরের। সত্যি বললে, সোহান নয়, ওর প্রেমে পড়েছিল মিলি। এর আগ পর্যন্ত প্রেম সম্পর্কে মিলির ধারণায় কিছু ধোঁয়াশা ছিল। তার প্রতি ছেলেদের পাগলামি দেখে সে অবাক হয়ে ভাবত, এই ছাগলামি মানুষ করে কেন? কই, তার তো কখনো এমন হয় না। সে তাই ছেলেদের নাচাত। উপভোগ করত।

সেই পুরো উদাসীনতা উল্টো হয়ে ফিরে এলো তার দিকে, যেদিন সে প্রথম সোহানকে দেখে। ক্লাসে একটা প্রশ্নে খুব চটপট উত্তর দিয়েছিল সোহান। এরপর একটা অসাধারণ রসিকতা করল ক্লাসে। এসবও কোনো বিষয় নয়। কত ছেলেই তো এমন হয়। কিন্তু মিলির এমন হচ্ছে কেন? কেন মনে হচ্ছে, ছেলেটা যদি ওর সঙ্গে এসে কথা বলতে চাইত তাহলে মন্দ হতো না। আর মিলির স্থির বিশ্বাস ছিল, কোনো এক ফাঁকে ছেলেটা ভাব করতে আসবে। প্রেমময় জীবনে মিলি তো এটাই দেখে এসেছে সারা জীবন।

অন্যথা হলো। ছেলেটা মিলিকে একবার দেখল। চোখে কোনো ভাষা নেই। যেন মিলি আর দশটা মেয়েদের একটা।

হঠাৎ মাথায় রক্ত চড়ে যায় মিলির। ছেলেটা কী পেয়েছে? এখানেও পুরনো অভিজ্ঞতা ফিরে আসে। ও যেসব ছেলেকে পাত্তা দিত না, সেসব ছেলে যখন আরো এলিয়ে পড়ত, তখন মিলির মনে হতো, আচ্ছা বেহায়া তো। লজ্জাও নেই। ব্যক্তিত্বহীনতার অজুহাতে ওরা খারিজ হয়ে যেত।

আজ মিলি প্রথম বুঝতে পারে, কেউ কেউ অবজ্ঞা করলেও তার প্রতি রাগ হয় না। বদলে হয় অনুরাগ।

জেদ বাড়ে মিলির। সেই জেদে দূরে সরে না গিয়ে আরো কাছে আসার ইচ্ছা করে।

বিকেলে বাসায় ফিরে মিলি একবারের জন্যও ছেলেটার মুখটা সরাতে পারে না। টিভিতে একটা নাটক দেখানো হচ্ছিল সন্ধ্যায়। নায়কের জায়গায় ছেলেটাকেই বসিয়ে দেয়। নিজে হয়ে যায় নায়িকা।

না, মিলি আর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না। আর সেদিন হঠাৎ তার ব্যর্থ প্রেমিকদের প্রতি ওর মায়া হয়। আহা, বেচারাদেরও মিলির প্রতি এমন শিহরণ হয়েছিল। মিলি বুঝতে পারেনি। নিজের নিষ্ঠুরতার জন্য আফসোস হয়।

তার চেনা জগতের ছেলেরা সাধারণত মিলিমুখী ছিল। শেষ পর্যন্ত মিলিবিমুখ ছেলেটারই জয় হলো।

মিলিকে খাটতে হলো খুব। নিচে নামতে হলো অনেক। চিঠি লিখতে হলো প্রথমে বেনামে।

একেকটা কাজ করত আর নিজের দুই রকম অনুভূতি হতো। প্রথমত, লজ্জা। আর দ্বিতীয়ত, পুরনো প্রেমিকদের প্রতি সহানুভূতি। আহ্, বেচারারা! সুযোগ থাকলে ওদের জন্য কিছু করতে খুব ইচ্ছা করে।

যা-ই হোক হয়ে গেল। প্রেম। বিয়ে। যতই উদাসীনতা দেখাক, মিলির মতো একটা মেয়ে প্রেমে পড়লে যেকোনো পুরুষই সাড়া দিতে বাধ্য।

প্রেমে পড়লে প্রেমিকের বাড়ির চাকরকেও সমাদর করতে ইচ্ছা করে। সে কে খুব জানতে ইচ্ছা করে না। তার বাবা কী, মা কে—না, কিছুই জানতে চায়নি মিলি। বরং তেমন কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই দেখে স্বস্তি বোধ করেছে। সোহানকে দখলের ক্ষেত্রে তো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ওদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিলিমিনারিতে ভর্তি হয়েছিল, আগে কোথায় পড়ে এসেছে সেটাও খুব ভালো জানে না। জানে না, অতীতে সে ভালো ছেলে ছিল, না খারাপ ছেলে ছিল। গুণ্ডামি-পাণ্ডামি করে এসেছে কি না।

এতকাল জানার দরকারও হয়নি। সফল মানুষের অতীত ফিরে দেখার দরকার পড়ে না। ঝকমকে বর্তমান এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পুরনো দিন অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা।

কিন্তু এখন দরকার পড়ছে। কী সেই রহস্য! কোথা থেকে উঠে আসা এই শমসের।

ফেসবুকে পাওয়া যাবে বিশ্বাস নেই। কিন্তু মিলি ফেসবুকিংয়ে খুব দক্ষ বলে ওর বিশ্বাস, সেখানে একটা সূত্র মিলতে পারে। গোপন কোনো কারবার থাকলে ছদ্মনামে সেই বন্ধুটি থাকতে পারে লিস্টে। কিংবা পরিচিত কোনো বন্ধুর সূত্র ধরে চলে যাওয়া যেতে পারে শমসেরমুখী কোনো পথে।

চেষ্টায় কোনো ফল হয় না। ওর বন্ধুতালিকা খুব সংক্ষিপ্ত। নিজে কোনো স্ট্যাটাস দেয় না। কারোরটা শেয়ার করে না। সবই বরং ব্যাবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট। মেসেঞ্জার ইনবক্সে গিয়ে দেখে চায়নিজ বো কোয়াং, ইতালিয়ান সিলভাস্তিনি এই জাতীয় মানুষের কোনো মেসেজ। সেখানে মার্কেট, ইকোনমি—সেসব জটিল কথাবার্তা লেখা।

সন্দেহ করার মতো কিছু না পাওয়াতে বরং সন্দেহ আরো বাড়ে। যে মানুষটা যন্ত্রের মতো, টাকা বানানোর মেশিন বানানো ছাড়া যার জীবনে আর কোনো লক্ষ্য আছে বলে মনে হয় না, সে কেন বন্ধুত্বের মতো আবেগী বিষয়ে বিপর্যস্ত হয়ে যাবে।

মিলি আরো ভাবে। এবং সিদ্ধান্ত নেয়, এখন থেকে সে গভীরভাবে অনুসরণ করবে সোহানকে। ওর কললিস্ট চেক করবে। দরকারে ওর পেছনে প্রাইভেট গোয়েন্দা লাগাবে। কোথায় যায়? কী করে?

আপাতত সে নিজের কাজে নামে। নিজের অন্য একটা ফেসবুক আইডি আছে, যেখানে তার নাম অঞ্জনা অরণ্য। সেই পরিচয়ে সে কিছু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে ব্যাটে-বলে মিলে যাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা।

মিলি অঞ্জনা অরণ্য হিসেবে নিজেকে অস্তিত্বের জানান দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই একটা তরঙ্গ তৈরি হয় পুরুষ মহলে। কেউ বলে, হাই। কেউ, হ্যালো।

পুরুষ মানুষগুলো ফেসবুকে বসেই বোধ হয় মেয়েদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে রিসোর্ট-হোটেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

মিলি কাজে মন দেয়। লেখে, ‘আমার মন খারাপ।’

আবার তরঙ্গ। কী হলো? হোয়াট হ্যাপেন্ড? বলেন কী?

মনে হয় একেকজনের হৃদয় ফেটে যাচ্ছে। ওর মন খারাপ এটা যেন তৃতীয় মহাযুদ্ধ বেধে যাওয়ার মতো ব্যাপার।

মিলির একবার মনে হয় লিখে ফেলে, ‘বদমাশের দল, আমার মন খারাপে তোদের এত জ্বলে কেন? বউয়ের কাছে যা।’

বলে না। লেখে, ‘মন খারাপ হলে আমার কী করতে ইচ্ছা হয় জানেন?’

আবার ওই পক্ষে শিহরণ। ওরা জানতে চায়, কী করতে ইচ্ছা করে, যা করতে ইচ্ছা করে তা করার ক্ষেত্রে জীবন দিতে তৈরি ওরা।

মিলি খেলতে থাকে। খেলাতে থাকে।

সে এই জগতের একজন পাকা খেলোয়াড়।

 

ছয়

ক্লাবে বসে দুই পেগ ভদকার অর্ডার দেয় সোহান। একা হলে দুই পেগেই শেষ। লম্বা সময় নিয়ে খায়। আর এই সময় ফোন চলতে থাকে।

আজ ফোন করছে না। শুধু বারবার ঘড়ি দেখছে।

তিন দিন ধরে সোহান একা এসে বসে। একজনের আসার কথা থাকে। সে আর আসে না। আসি আসি করে একসময় ফোন বন্ধ করে দেয়।

শমসেরের ফোনটা পেল সেদিন হঠাৎ। সে কল্পনাই করেনি কোনো দিন আবার ওর সঙ্গে দেখা হবে। একসঙ্গে জেলে ছিল ওরা, অনেক দিন একসঙ্গে থাকার পর জেল বদলানো হয়, সে যায় কুমিল্লা জেলে, শমসের খুলনায়। বছর দেড়েক পর যখন ছাড়া পেল, তখন দুনিয়া অন্য রকম হয়ে গেছে। সঙ্গীরা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। খোঁজখবর করে জানা গেল, যারা জেল এড়াতে পেরেছিল তাদের বেশির ভাগ ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ দিব্যি ওই জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। বেশির ভাগের বক্তব্য, উপায় তো নেই। স্বপ্ন শেষ। এখন বেঁচে থাকার জন্য যা করা দরকার তা-ই তো করতে হবে।

খোঁজ নিতে গেল শমসেরের। কিন্তু শমসের কোথাও নেই। খুলনা জেলের পুরনো রেজিস্টার দেখে জানা গেল, কয়েক মাস পর ওকে চট্টগ্রামে পাঠানোর আদেশ আসে। চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনাও করানো হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম কারাগারের তালিকায় খুলনা থেকে আগত কোনো শমসের আলমের রেকর্ড নেই। নেই কোথাও।

 

খোঁজাখুঁজির জন্য পরিবেশটাও খুব অনুকূল ছিল না। একে নিজের রেকর্ড, তখনো গোয়েন্দা বাহিনী নিশ্চিতভাবে তাকে অনুসরণ করছে। মোবাইল-ইন্টারনেটের আমল নয়, যা যোগাযোগ করতে হয় শারীরিকভাবে। অনেক দৌড়াদৌড়ি করল তবু। নেতাদের কাছে গেল। তাদের বেশির ভাগই জেলে। কেউ আত্মরক্ষার্থে বিদেশে। শুধু ভালো আছেন একজন। আফসার ভাই।

প্রথমে এমন রাগ হলো সোহানের যে এই মানুষটাকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছা হলো। তিনিই একমাত্র জেল এড়িয়েছেন। জেলে থাকতেই শুনেছে, নতুন সরকারের সঙ্গে আঁতাতের বিনিময়ে এই তাঁর প্রাপ্তি। সে বিশ্বাস করেনি। আফসার ভাই, যাঁর দুই প্রধান কর্মী ছিল ওরা দুজন, যিনি বিপ্লবের রঙে ওদের চোখ এমন রঙিন করে দিয়েছিলেন যে শরীরে একটা বিদ্যুৎ সঞ্চালন ঘটে যেত তাঁর কথা শুনলে। সাদা পাঞ্জাবি পরতেন তিনি। একহারা গড়নের ছয় ফুটের ওপর লম্বা মানুষ। বার্মিজ চুরুট খেতেন। মার্ক্স-লেনিন যখন পড়ে শোনাতেন তখন মনে হতো, দৈববাণী ভেসে আসছে অচেনা কোনো জগৎ থেকে। জীবন তো কোন ছাড়, দরকারে এর জন্য সব দিতে হবে।

কত তরুণ তখন সাম্য প্রতিষ্ঠার নেশায় জীবনকে বাজি রেখেছে। স্লোগান উঠত আকাশ-বাতাস এক করে। সোহানের ভেতর যেন রিনঝিন করে বাজত এক অদৃশ্য নাচিয়ের নাচ। পেশি ফুলে উঠত। আরো বেশি করে শুনত নিজের ভেতরের স্লোগানের আওয়াজ। কে যেন ওর ভেতর থেকে বলে চলত—সোহান, যারা মানুষের জন্য তৈরি পৃথিবীতে মানুষকে না খাইয়ে রাখছে তাদের শেষ করে দাও।

সেই শেষ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে দলের মধ্যে মতভেদ ছিল কিছু। শেষ করা বলতে ওরা বুঝত রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে শেষ করে দেওয়া। কিন্তু দলেরই কিছু অংশ শারীরিকভাবে শেষ করার পক্ষপাতী ছিল। আফসার ভাই ঠিক কোন পক্ষে ছিলেন বোঝা যেত না। কখনো বলতেন, ‘রাজনৈতিকভাবে শেষ করা দরকার। কিন্তু তার জন্য মানুষের যে সচেতনতা দরকার, সেটা তো হয়ে ওঠেনি। আরো সময় লাগবে।’

আবার বলতেন, ‘দু-চারটি মানুষকে খুন করলে তো তুমি খুনি হয়ে গেলে না। বিপ্লবী আর খুনি তো এক নয়।’

আফসার ভাই যা বলতেন সোহান আর শমসেরদের মনে হতো এটাই ওদের কথা। দরকারে যে ওরা খুনের দিকে যায়নি এমন নয়। আর তাই সরকার যখন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করল, তখন দেখা গেল ওদের বিপক্ষেই সাধারণ অনুভূতি। সরকার ধরতে শুরু করল। গুলি করে মারল। তাড়িয়ে দিল।

যা হোক, খোঁজাখুঁজি করে কোনো মানুষকে না পেলেও তার সম্পর্কে কিছু সম্ভাবনা বা শঙ্কার কথা শোনা যায়। শোনা গেল যে জেল বদলের নাম করে আসলে শমসেরকে গুলি করে মারা হয়েছে। মাঝ রাস্তায় নিয়ে গিয়ে...

কোনো রেকর্ড নেই অবশ্য। কোনো প্রমাণ নেই। বিপ্লবের সেই সময়ে আত্মীয়-পরিজনদের কাছে ভেড়াকে দূষণীয় মনে করা হতো। ওরা তাই পারিবারিকভাবে সংযুক্ত ছিল না। সে জানত না কে শমসেরের বাবা। কে মা। ভাই-বোন আছে কি না!

পার্টির পুরনো কেউ কেউ পরামর্শ দিল, একমাত্র আফসার ভাই কিছু করতে পারেন। সরকারের সঙ্গে ভালো খাতির।

প্রচণ্ড ঘৃণা মানুষটার প্রতি। ওর সামনে গিয়ে এমন কিছু করে বসতে পারে, যা সে নিজেও ঠিক কল্পনা করতে পারছে না।

বিপ্লবের দিন শেষ, কিন্তু বিপ্লবীর রক্তের নাচন তখনো মাঝেমধ্যে জেগে উঠত। যদি হাতের কাছে থাকে অস্ত্র...হয়তো সেটাই ব্যবহৃত হয়ে যাবে আফসার ভাইয়ের বিরুদ্ধে।

তবু ভেবেচিন্তে মাথা ঠাণ্ডা রাখল। শমসেরকে পেতে হবে। জানতে হবে। একটা মানুষ তো আর হাওয়া হয়ে যেতে পারে না।

সব রাগ-ঘৃণাকে পকেটবন্দি করে এক সন্ধ্যায় হাজির হলো আফসার ভাইয়ের কাছে।

আফসার ভাইয়ের জগৎ নতুন। কর্মী নতুন।

শমসেরকে দেখে মুখ উজ্জ্বল হলো না। আবার ঠিক বিরক্তও নয়।

শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘এসেছিস।’

সবাইকে সরিয়ে ওকে নিয়ে বসলেন নিজের ভেতরের ঘরে। হ্যাঁ, আজ আফসার ভাইয়ের অনেকগুলো ঘর। ভেতরের ঘর। বসার ঘর। শোয়ার ঘর। তখন কিছু ছিল না। একটা লম্বা ঘর। একটা খাট পাতা। তাতে সবার প্রায় সমান অধিকার। কোনো কোনো দিন এমনও গেছে, ক্লান্ত হয়ে ওদের কেউ ঘুমিয়ে গেছে সেই খাটে। ঘুম ভেঙে আবিষ্কার করেছে, আফসার ভাই নিচে শুয়ে। সে উঠতে গেলে আফসার ভাই বাধা দিয়েছেন, ‘এটা কমিউন। সব কিছু সবার। আবার কারো নয়।’

‘তবু ভাই, আপনি বড় মানুষ।’

‘কেউ একা বড় নয় রে। সবাই বড়।’

আফসার ভাইয়ের শুধু চুরুটটা আজকের জীবনেও অক্ষুণ্ন। ধরিয়ে বললেন, ‘ছাড়া পেলি কবে?’

‘এইতো কিছুদিন।’

‘হুঁ। ভালো করেছিস এসেছিস।’

‘আপনার কি মনে হয় আমি আপনার সঙ্গে যোগ দিতে এসেছি?’

আফসার ভাইয়ের কোনো ভাবান্তর নেই। ‘উপায় কী? নইলে বিদেশে চলে যাবি। গ্রামে গিয়ে লড়াই থেকে ছুটি নিবি। এর চেয়ে অন্তত একটা প্রক্রিয়ায় থাকা ভালো না। কিছু কাজ তো করা যায়।’

‘এটাকে কাজ বলছেন আপনি?’

‘ঠিক আছে, আমি তোকে জোরাজুরি করব না। কাউকেই আমি জোরাজুরি করি না। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি আসতে চায় তাকে স্বাগত জানাই।’

কী সহজে রূপবদলকে যৌক্তিকতা দিয়ে দিচ্ছেন আফসার ভাই!

সোহান আর কথা বাড়ানোর দরকার দেখে না। সরাসরি জিজ্ঞেস করে, ‘শমসের কই?’

‘খুঁজে পাসনি?’

‘কোথায়?’

‘আমি জানি না রে।’

‘জেনে দেন।’ হুমকির একটা স্বর যোগ করে দিল সোহান।

আফসার ভাই একটু ভেবে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি তোকে বলি। ও নেই।’

‘পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে।’

‘ঠিক নিশ্চিত না। তবে বলাবলি আছে এ রকম।’

সোহান আফসার ভাইয়ের মুখটা দেখে। কী সহজে মানুষটা নিজের ছায়া হয়ে ওঠা মানুষকে উড়িয়ে দিচ্ছেন। মনে পড়ে, একটা অপারেশনে পালানোর সময় আফসার ভাইকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল শমসের। আফসার ভাই না না করায় বলছিল, ‘লিডার আমরা একজন-দুজন মরে গেলে এমন কিছু যাবে আসবে না, কিন্তু আপনাকে টিকতে হবে। বিপ্লবের স্বার্থে আপনার অমর হওয়া দরকার।’

আফসার ভাই অমর হবেন না। অমানুষ হয়ে গেছেন।

ঠাণ্ডা গলায় বলেন, ‘সময় বদলে গেছে রে। আমাদেরও কিছু ভুল ছিল।’

গর্জে ওঠে সোহান, ‘আমাদের নয়, বলুন আমার।’

আফসার ভাই মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলেন, ‘হ্যাঁ। আমার। নেতৃত্বের। হয়তো আমরা বেশি তাড়াহুড়া করে ফেলেছিলাম। মানুষ সঙ্গে ছিল না রে। তুই জানিস, আমাদের ছেলেদের যখন খুন করে তখন মানুষ হাততালি দিয়েছে। সেই মানুষ, যাদের জন্য জীবনটা শেষ করলাম।’

সোহানের মনে পড়ে, বিপ্লবীদের প্রতি মানুষের এই উদাসীনতার কথা তুললে আফসার ভাই বলতেন, কখনোই মানুষকে দোষ দেওয়া যাবে না। বোঝাতে হবে। যখন বুঝবে যে আমাদের লড়াইটা ওদের জন্য, তখন দেখবি। সোভিয়েত ইউনিয়নে হয়নি! চীনে হয়নি। ওদের ওখানকার মানুষ হলে আমাদের মানুষেরা কি ওদের চেয়ে কম। সাময়িক ভ্রান্তি কেটে গেলে দেখবি এই মানুষের জোয়ারেই একদিন ভেসে যাবি।

মানুষের জোয়ার তাদের কোথায় নিয়ে এসেছে সোহান আজ দেখছে।

হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি নাকি মন্ত্রী হচ্ছেন?’

আফসার ভাই কী যেন ভেবে বলেন, ‘খেয়েছিস?’

সোহান উঠে দাঁড়ায়। একবার ইচ্ছা হলো বলে, ‘আমি আবার আসব। তত দিনে শমসেরের খোঁজটা বের করতে না পারলে...’

বলে না। বিপ্লবই যখন শেষ, তখন বিপ্লবী চরিত্র দেখিয়ে আর কী লাভ।

একটু অদ্ভুত শোনালেও সত্য, ওর বিপ্লবী চরিত্রের কবর আফসার ভাইয়ের বাসাতেই হয়ে গেল।

শমসেরকে খোঁজাও বাদ দিল। বাদ দিল পুরনো সবার সঙ্গে সব সম্পর্ক।

নতুন মানুষ হয়ে গেল। এমন বদলে যাওয়া যে মাঝেমধ্যে মনেও থাকে না। মনে ছিলও না।

শমসের এসে সব বিস্মৃতির দেয়াল চুরমার করে দিল!

কোথায় সে? আজও আসার কথা। তিন দিন ধরেই আসবে আসবে করছে।

সোহান ওর বাসায় যেতে চাইলে ঠিকানা বলে না। শুধু বলে, ‘আজ আসব। কোথায় আসব বল। তারপর ফোন বন্ধ করে দেয় একসময়।’

এখনো ফোনটা খোলা আছে। রিং বাজছে। বলে, ‘এই তো কাছাকাছি।’

সোহান আরো দুই পেগের অর্ডার দেয়। বেয়ারারা খুব অবাক। সোহান স্যার তো কোনো দিন একা দুই পেগের বেশি খায় না।

 

 

সাত

আফসার আনোয়ার শুরু করলেন বস্তিতে পুলিশি অভিযান দিয়ে। রাতেই পুলিশ ঢুকল। কয়েক হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হলো। সঙ্গে কিছু বিদেশি অস্ত্র, দেশি মদ, নগদ টাকার বান্ডেল। সম্ভাব্য কয়েকজনকে ধরে পরদিন সংবাদ সম্মেলন করা হলো। উপস্থিত সাংবাদিকরা অবশ্য কঠিন কঠিন প্রশ্ন করল। যেন এদের ধরার মধ্য দিয়ে বিরাট কোনো অন্যায় করা হয়েছে। মানবিকতা-পুনর্বাসন এই শব্দগুলো বারবার ঘুরেফিরে এলো। এই এক জাত, এদের কখনো তুষ্ট করা যায় না। অভিযান না চালালে প্রশ্ন, প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে নেশার মহোৎসব। ধরতে গেলে তখন ওদের বক্তব্য, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ। দরিদ্রের প্রতি দরদ এমন উথলে ওঠে যে আফসার সাহেবের মনে চায় কষে কয়েকটা চড় লাগাতে। এটাও আফসার সাহেবীয় একটা অদ্ভুত চিন্তা। একপাক নাচার সঙ্গে ওর যাকে-তাকে চড় লাগাতেও খুব ইচ্ছা করে। গত দিন পার্টি মিটিংয়ে এক নেতাকে চড় মারার এমন ইচ্ছা হয়েছিল যে তিনি বাথরুম পর্যন্ত ওর সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলেন। একবার মনে হলো, দেই একটা। চোখাচুখি হতে ইচ্ছাটা চলে গেল। মানুষের চোখের দিকে তাকালে অনেক কিছু করা যায় না।

যা হোক, আফসার সাহেবের ব্লু প্রিন্টটা সাধারণত নিখুঁত থাকে। এমনিতে বস্তি ভাঙতে গেলে হৈচৈ হতো অনেক, কিন্তু যখন ওখানে অত নেশাদ্রব্য এবং অস্ত্রশস্ত্র মিলল, জনতার দাবি, এই অবৈধ বস্তি এখানে আছে কী করে। জনমতের কারণে পত্রিকায় বেরোতে থাকল অনুসন্ধানী সব প্রতিবেদন। আফসার সাহেবের কাজ হয়ে গেল। এখন বস্তি ভাঙা গণদাবি। দুই দিন পরই পূর্ত মন্ত্রণালয় কাজে নামল। ভেঙে দেওয়া হলো বস্তি।

বস্তি ভাঙার পরদিন আবার তিনি হাজির হয়ে গেলেন উচ্ছেদকৃতদের একটা মিটিংয়ে। আবেগঘন ভাষায় বক্তৃতা দিলেন। জানিয়ে দিলেন, ‘ওদের জন্য এমন কিছু তিনি করবেন, যেটা হবে স্থায়ী সমাধান। আর বস্তিবাসী কেন শুধু বস্তিতেই থাকবে।’ বলতে বলতে তাঁর হেঁচকিমতো একটা ওঠে। তিনি খেয়াল করেছেন, বক্তব্য সাম্যের দিকে গেলেই তিনি কেমন যেন একটু অপ্রস্তুত বোধ করেন। কেউ যেন তাঁর গলা চেপে ধরে। এক অর্ধনগ্ন পাগলি হা হা করে হাসে আর হাততালি দিয়ে বলে, ‘দেখ, দেখ। আফসার সাম্যের কথা বলে।

 

তোরা দেখ...’ কথাগুলো এমনভাবে শুনতে থাকেন যে কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি চুপ। জনতা ভাবল, ওদের দুঃখের স্পর্শেই বাকহারা। ফজলু সুযোগটা কাজে লাগায়। স্লোগান ওঠায়, ‘আফসার ভাই যেখানে, ভয় নাই সেখানে। ’তিনি যা আশা করেছিলেন, মিলে গেল এর চেয়ে বেশি। প্ল্যান ‘বি’টা আর ব্যবহার করা লাগল না। আশঙ্কা ছিল বস্তিবাসী তাঁকে দেখে খেপে যেতে পারে এবং লাঞ্ছনা করার চেষ্টা চলতে পারে। সে জন্য প্রস্তুতি ছিল। অস্ত্রপাতি হাতে ভিড়ের মধ্যে ওর লোক লুকানো ছিল। ওরা তখন আত্মপ্রকাশ করত। অবস্থা বেশি বেগতিক দেখলে এক-আধটা ফাঁকা গুলি করে ‘তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা’ বলে চালানো হতো। তখন সম্ভাব্য হামলাকারী হিসেবে কাদের নাম দেওয়া হবে সেই তালিকাও প্রস্তুত আছে অজয়বাবুর পকেটে। এসব লাগল না। তিনি গরিবের বন্ধুর উপাধি পেয়ে বেরিয়ে এলেন।

এখন পরের কাজ। কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ীদের ইঙ্গিত দেওয়া। প্রজেক্ট তৈরি করো। বড় বড় বিল্ডিং হবে বস্তিবাসীদের জন্য। তাই দেখে ওরা তৃপ্ত থাকবে।

পুলিশদেরও ব্যবসা হয়েছে। বেনামি অনেককে ইয়াবার মামলায় ঢুকিয়ে দিয়ে বাণিজ্য করে ওরাও খুশি।

পূর্তমন্ত্রীর সহায়তা লাগবে। সরকারি জমিতে নতুন স্থাপনা। পেতে অসুবিধা হবে না। অভিযান চালানোয় সবাই পূর্তমন্ত্রীর নামে ধন্য ধন্য করছে। ফজলু বলল, ‘পুরো মাস্টারস্ট্রোক হয়ে গেল, লিডার। সবই তো হচ্ছে।’

অজয়বাবু পকেট থেকে কাগজ বের করে দেখান, এরপর কী কী করতে হবে।

ফজলু বলে, ‘লিডার, আমি আসলে প্রথম পুলিশি অভিযানের ব্যাপারটা ধরতে পারিনি। পানি যে এভাবে আপনি খাল থেকে পুকুর-নদী করে সাগরে ফেলবেন, বুঝতেই পারিনি।’

আফসার সাহেব শুধু হাসেন। কৃতিত্ব শোনার সময় ব্যক্তিত্ব ধরে রাখাই নেতৃত্বের দক্ষতা। গদগদ হয়ে গেলেন তো গেল।

কিন্তু একটাই শুধু কাঁটা—শমসের।

কোথা থেকে এলো? হঠাৎ কোথা থেকে বেরোল এত বছর পর? কেনই বা!

তার অতীত অনেকেই জানে। পুরনো কর্মীদের অনেকেই কাছেপিঠে আছে। তার সঙ্গে আছে কেউ কেউ, কেউ কেউ অন্য জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

সবার ধারণা, আফসার সাহেব প্রথাগত রাজনীতিতে ঢোকার সময় পুরনো কর্মীদের ভুলে গেছেন। তা-ই হয় সাধারণত। কিন্তু কেউ জানে না, ওদের সবার খবর তিনি রেখেছেন। ২৭ জন মারা গেছে পুলিশের গুলিতে। দুজন আত্মহত্যা করেছে। ইউরোপে গেছে শ তিনেক। নিজের গ্রামে ফিরে গেছে ২১ জন। একেবারে নিখোঁজ তিনজন। এই তিনজনকে নিয়েই ওর ভয় ছিল। কোনো দিন যদি ফিরে আসে। শমসেরের শেষ হওয়াটাই বেশি জরুরি ছিল। পার্টি করার সময়ও তিনি খেয়াল করতেন, কোন ছেলেটা একদিন তাঁর জায়গা নড়িয়ে দিতে পারে। জীবনে একটা ছেলেকেই দেখেছিলেন। ভূতের মতো খাটতে পারত। কুকুরের মতো বিশ্বস্ত। বাঘের মতো সাহস। শ্যুটারের মতো নিশানা। পার্টিতে এ রকম ছেলে অবশ্য অনেকেই ছিল। এর পরও শমসের আলাদা, কারণ ওর কোনো কিছুতে প্রতিক্রিয়া হতো না। গুলি করে একজনকে মেরে ফেলার পর ওর পকেট থেকে নিয়ে সিগারেট ধরাতে পারত। ঘটনাটা ওর সামনেই ঘটা। তিনি ভাবলেন, হিরোইজমের জন্য কাজটা করছে। তরুণ বয়সে নিজের সম্পর্কে গল্প স্থায়ী করার জন্য অনেক কিছু করে ওরা।

তিনি তাকালেন ওর দিকে। এক জোড়া স্থির চোখ দেখলেন। সেদিনই ভয় পেলেন। এই ছেলেই...

সত্যি বললে, একটু আনন্দও হয় তাঁর। এমন ছেলে তাঁর পার্টিতে চলে এসেছে যে তাঁকে নড়িয়ে দিতে পারে। তখন তাঁর কাছে পার্টিই জীবন। দেশ আর মানুষই সব। তাঁকে সরিয়ে দিতে পারে ছেলেটি, কিন্তু এই ছেলেটি তো দেশ আর মানুষের খুব কাজে লাগবে। সমাজ বদলের নির্ভরযোগ্য সৈনিক পেলে মনটা নেচে উঠত। যোগ্য শিষ্য তৈরির যে আনন্দ, সেটা সন্তান জন্ম দেওয়ার মতোই আনন্দের।

সেই দিন গেছে। পরিবর্তিত জীবনে ঢোকার সময় যারা সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, তাদের নিয়েছেন। যারা আসেনি, ওদেরও লোভের ফাঁদে ঠেলে দিয়েছেন। তাঁকে অবশ্য কিছু করতে হয়নি। সমাজই এখন লোভীদের। ওরা বলে, যোগ্যদের। বাজারের। তিনি জানেন, এ আসলে সামনের পর্দা। বাজারের নামে কিছু লোক করে খাবে। টিকবে। বাকিরা ধুঁকবে। মরবে। এবং বুঝতেও পারবে না। এক শ দুই শ মিটার দৌড়ে নামলে যেমন দৌড়বিদরা শুধু ফিনিশিং মার্কটাই দেখে, এখন দুনিয়ার মানুষের চোখ সেই মার্কের দিকে। ডানে-বামে-সামনে-পেছনে কোথাও তাঁর চোখ যায় না।

শমসের ফোন করার পর একটু থমকে গিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ স্তব্ধ। শেষে একটা আনন্দও হলো। বড় নিস্তরঙ্গ হয়ে গিয়েছিল জীবন। শুধু জয়। সাফল্য। লোককে ঠকানো। আবার না হয় হোক খেলা।

শমসেরের আর কোনো খোঁজ নেই। পরের কয়েক দিন অপরিচিত ফোন দেখলেই লাফিয়ে গিয়ে ধরেছেন। মিস করা ফোনে রিং ব্যাক করেছেন। তাতে তিনি কিছু মোবাইল কম্পানির নতুন প্যাকেজের প্রস্তাব শুনলেন। জানলেন ব্যাংক থেকে এবার কোরবানি ঈদে বেশ কিছু ভালো অফার আছে। একজন জানতে চাইল—ভাই, এইটা কোন জায়গা? আপনে আফরোজার চাচা না!

কিন্তু শমসের আর ফোনের ওপাশে নেই। হতে পারে অন্য কেউ। শমসেরের নাম করে ওকে একটু খেলায় নামিয়ে দিল।

তিনি অবশ্য থেমে নেই। খোঁজ লাগিয়েছেন।

কিন্তু সমস্যা হলো, যেকোনো জায়গায় গেলেই শমসেরকে দেখতে পান। কাল নিচে অফিস ঘরে নেমে ভিড়ের মধ্যে দেখেন, গুটিসুটি মেরে শমসের বসে আছে। তিনি চমকে গিয়ে তাকান। উফ্! কী ভুল। একটা বুড়ো মানুষ ক্লান্তিতে ঝিমাচ্ছে। আচ্ছা, শমসের কি এখন বুড়ো হয়ে গেছে! চুলে পাক।

ফজলু এসে তাড়া দিল, ‘পূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং আছে।’

অজয়বাবু একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘সব পয়েন্ট লেখা আছে। মন্ত্রী কিন্তু বাজারি রাজনীতির লোক। ঘোরেল মাল।’

কাগজটা নিয়ে পড়ার ভান করেন। অজয়বাবুকে খুশি রাখা। এই কাগজের তাঁর আসলে দরকারই নেই।

মন্ত্রণালয়ে ঢুকে দেখলেন খুব খাতির। তিনি সাবেক মন্ত্রী, এখন পার্টির পলিসি মেকার, যেকোনো দিন মন্ত্রী হতে পারেন আবার, কদর স্বাভাবিক। তবে আজকেরটা যেন একটু বেশি। সবাই যেন বলছে, ধন্যবাদ। আমাদের রোজগার করার নতুন একটা দিগন্ত খুলে দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে...’

অন্তরের অন্তস্তল কথাটা মনে হতে ওটা ঠিক কোন জায়গা বোঝার চেষ্টা করেন। বাম দিকে হাত দেন।

ফজলু বলল, ‘ভাই, কোনো সমস্যা?’

‘অন্তরের অন্তস্তল জায়গাটা কোনটা রে?’

‘জি ভাই?’

‘আচ্ছা বাদ দে। তুই বুঝবি না।’

পূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময়ও অন্তরের অন্তস্তল কথাটা মাথায় থাকল। তিনি মন্ত্রীর শরীর দেখে বোঝার চেষ্টা করলেন ওটা কোন জায়গা। এমন বিশ্রীভাবে ওর বুকের বাম দিকে চেয়ে থাকলেন যে মন্ত্রী একসময় বললেন, ‘লিডার, চলুন তাহলে কাজের কথায় আসি।’

‘কাজ! হ্যাঁ হ্যাঁ কাজ...বলো।’

পূর্তমন্ত্রী তাঁকে অমনোযোগী দেখে ভারি খুশি। এর গার্ড নড়বড়ে। উইকেট ফেলে দেওয়ার ভালো সুযোগ।

‘লিডার, আপনার তো অনেক কাজ হয়ে গেল। জনদরদি সাজলেন। পুলিশ বিপক্ষের ছেলেদের ধরে নিল। এখন ব্যবসার ভাগটা না হয় আমি দেখি।’

‘দেখবে। অবশ্যই দেখবে।’

পূর্তমন্ত্রী প্রথম বলটা ঠিক জায়গায় ফেলাতে খুশি। আরো দু-একটা এমন বল করলেই স্টাম্প উড়ে যাবে।

‘তাহলে এভাবেই আগাই। দরকারমতো পরামর্শ করব। আপনার জানার বাইরে কিছু হবে না।’

মন্ত্রী কফির কাপটা এগিয়ে দেন।

আফসার সাহেব কাপটা নিয়ে চুমুক দেন। চূড়ান্ত বিস্বাদ। মন্ত্রীরা কি এ রকম কফি মানুষজনকে এ জন্য খাওয়ায় যে ওরা যেন কফির ভয়েই ওদের কাছে আসে না। আইডিয়াটা তো খারাপ না।

আফসার সাহেব নিজের ভেতরে অনেকটাই ছেলেমানুষ, কিন্তু বাইরের দুনিয়ার কাছে এত বিন্যস্ত যে নিজের কাছেই অবাক লাগে। এমন অনেকবার হয়েছে যে তিনি হয়তো দুষ্ট চিন্তা করছেন, প্রতিপক্ষ সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে, তখন মাথা থেকে এমন সব পয়েন্ট বেরিয়ে আসে যে আগে ভাবেনইনি।

আজও চিন্তা রকেট গতি নিল। আফসার সাহেব হেসে ব্যাটিং ওপেন করলেন, ‘শোনো, তোমার অবস্থান নড়বড়ে ছিল। ইন ফ্যাক্ট তোমাকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন সরকার চাইলেও পারবে না। কারণটা কি জানো? তুমি মিডিয়া আর মানুষের কাছে হিরো। যে বস্তি কেউ কোনো দিন উচ্ছেদ করার চিন্তা করেনি, তুমি সেটা করেছ।’

‘সবই আপনার দোয়া।’

‘হ্যাঁ। আমার দোয়া না, দয়া। মনে রেখো।’

‘মনে রাখব।’

‘অবশ্যই রাখবে। আরো মনে রাখবে, যে প্রজেক্টগুলো নেওয়া হবে গরিবদের বস্তি বানানোর জন্য সেটার ডিজাইন আগেই তৈরি করে রেখেছে গাফফার কনসোর্টিয়াম। তোমার সঙ্গে ওদের মিটিং হয়েছে। বস্তিতে নেশার জিনিস উদ্ধারের আগেই হয়েছে। ডিজাইনটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

পূর্তমন্ত্রীর মুখ একটু ফ্যাকাসে দেখায়।

বলেন, ‘লিডার, বাদ দেন। আপনি তো সবই জানেন।’

‘আমি আরো জানি যে গাফফার কনসোর্টিয়ামের পার্টনার হচ্ছে তোমার মেয়ের জামাই। সে থাকে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে। সেখানকার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনেক টাকা জমা হয়। গত মাসে হয়েছিল...’

পূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘লিডার, আরেক কাপ কফি খান।’

‘ভালো পয়েন্ট মনে করেছ। কফি কোথা থেকে আনাও। আমাকে দিয়ো। মানুষ তাড়ানোর জন্য খুব ভালো।’

পূর্তমন্ত্রী হাসতে হাসতে বললেন, ‘লিডার, কাজটা কাকে দেব?’

‘তোমাকে জানিয়ে দেওয়া হবে। ঠকবে না। ফিফটি পার্সেন্ট থাকবে।’

‘তাতেই চলবে।’

ঠিক সেই সময়ই একটা ছেলে ঢোকে। প্রথমে মনে হয়েছিল পূর্তমন্ত্রীর পক্ষ নিয়ে মাস্তানি করতে এসেছে।

একি! শমসের। এখানে কী করতে এলো।

ছেলেটি এসে তাঁর সামনে দাঁড়ায়। এখন কী বলবে শমসের। বলবে, ছয়টা খুনের অর্ডার আপনি দিয়েছিলেন। পাঁচটা আমি পেরেছিলাম, একটা পারিনি। অল্পের জন্য ফসকে যায়। খুব রাগ করেছিলেন।

কিন্তু শমসেরের পরনে টাই কেন? হাতে কিসের কাগজ? কী লেখাচ্ছে মন্ত্রীকে দিয়ে?

পূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘আমার এই পিএসটা বেশ কাজের। স্মার্ট ছেলে।’

আফসার সাহেবের হাঁফ ছাড়া উচিত। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। ছেলেটির সালাম অগ্রাহ্য করেন।

তাঁর মনে হয় এই ছেলে শমসের হলে বেশ হতো। শমসেরও জীবনে ঢুকে গেছে জানলে কোনো চিন্তা ছিল না।

যারা জীবনে ঢুকে যায়, ওরা নিরাপদ। যেমন ঢুকে গেছে তাঁর আরেক অনুগত কর্মী সোহান। তিনিই আলো জ্বেলে ওকে লোভের পথে ঠেলেছেন।

কিন্তু যারা জীবনে ঢোকে না, ওরা ভীতিকর।

না, শমসেরের খোঁজটা নিতে হবে বেশি করে। সব বাদ, আগে শমসের। শেষ কথাটা মনে না থেকে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। পূর্তমন্ত্রী বললেন, ‘কী বললেন, লিডার। শমসেরটা আবার কে?’

‘শমসের কেউ না। শমসের কেউ না।’

পূর্তমন্ত্রী হাসেন। ‘তাহলে ভূত। ভূতরাই আমাদের জন্য যত সমস্যা।’

আফসার সাহেবের অদ্ভুতভাবে একটা ভূতের গল্প মনে পড়ে। এক দেশে ছিল এক ভূত—জাতীয় গল্প।

 

আট

‘একজন মানুষ তোর বউকে ন্যাংটা দেখতে চেয়েছে। আসলে বলেছে, সময় কাটাতে চায়, কিন্তু তুইও তো এর মানে আছিস।’

শমসের এমনভাবে বলে, যেন এটা একটা তথ্য মাত্র। সোহানও এমনভাবে শোনে, যেন, ও আচ্ছা। এই ব্যাপার।

শমসের ভদকার গ্লাসে ছোট্ট করে চুমুক দেয়। সিগারেট ধরায়। লাইটার জ্বালানোর মধ্যে একটা কায়দা ছিল। এখন নেই।

সোহান ওর চোখ দুটি দেখে। অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না। আজও ওর চোখে আগুন আছে!

আফসার ভাই বলতেন, ‘শমসেরের চোখ দেখবে, চোখ। চোখেই ওর সব শক্তি।’

শুভ্র একদিন খেপে গিয়ে বলেছিল, ‘চোখ দিয়ে লড়াই হয় না। বিপ্লব হয় মন দিয়ে। মাথা দিয়ে। শরীর দিয়ে।’

আফসার ভাই হাসলেন। জবাব দেননি। কারো কথা নিচু স্তরের হলে তিনি জবাব দিতেন না।

শুভ্ররা বুঝত না। সোহান বুঝত। তবে চোখ নয়, ও পেত আগুনের আঁচ। ওর কাছে গেলে যেন একটা প্রবল অগ্নিতাপ এসে লাগত গায়ে। সেটা জ্বালিয়ে দিত। জাগিয়ে দিত। বুকের ভেতর থেকে উঠে আসত অনুচ্চার স্লোগান, এই সমাজ ভাঙতে হবে। নতুন সমাজ গড়তে হবে।

যৌবন বিসর্জন দিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর সেই দিনগুলোতে কি কল্পনা করা যেত, মহিমা হারিয়ে অনেক বছর পর এক অভিজাত ক্লাবে যখন ওরা বসবে, তখন কথা শুরু হবে এভাবে, ‘তোর বউকে...’

শমসের এমন ভাব করে, যেন কয়েক দিন পর দেখা হয়েছে। মাঝখানে দেখা না হলেও যোগাযোগ ছিল। স্মৃতিকাতরতার কোনো ব্যাপারই নেই এখানে।

সোহানও যে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে, তার কারণ সে বুঝতে চায়, এই শমসের আসলে কোন শমসের। সময়ের ধুলো কতটা ওর গায়ে লেগেছে! সেও কি আজকের ব্যবস্থার উপযুক্ত করে হাত মোছার মতো করে মুছে ফেলেছে পুরনো দিন।

শমসের আরেকটা সিগারেট ধরায়। বারের ভিড়টাকে খুব নিরাসক্ত ভঙ্গিতে দেখে।

তারপর বলে, ‘তোকে এমন একটা তথ্য দিলাম, তুই কেঁপে উঠলি না যে...। কেন আমার কলার চেপে ধরলি না?’

সোহান হাসে। ‘তুই-ই বল।’

‘হুঁ। তুই ডুবে গেছিস।’

‘ডুবেছি তো সেই কবেই।’

‘তোর খারাপ লাগে না। তোর রাগ হয় না? ঘৃণা হয় না? খুন করে ফেলতে ইচ্ছা করে না?’

‘না। সত্যি বললে, আমি ভাবছি এর মধ্য দিয়ে আমার লাভ হবে কি না। এটা দিয়ে কোনো বিজনেস ডিল হয় কি না।’

শমসের হাসে। হাসতে হাসতে বলে, ‘ধর আমি তোকে একটা বিজনেস ডিলের ব্যবস্থা করে দিলাম।’

‘তুই কি দালালির কাজ করছিস নাকি?’

‘বামরা পচলে সব পারে।’

হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে সোহান, ‘তুই ও কি পচে গেছিস নাকি?’

উত্তর দেয় না শমসের।

সোহান আরো জোরে চিৎকার করে। এই চিৎকার এমন ভদ্র পরিবেশের সঙ্গে এত বেমানান যে প্রায় টেবিলগুলোরই টুংটাং থেমে যায়। অনেকগুলো কান উৎকর্ণ। এই সমাজে এটাও একটা অদ্ভুত ব্যাপার। মনে হবে, কেউ কারো কিছু শুনতে চায় না। উচ্চাঙ্গের নাগরিক ভদ্রতা। কিন্তু আবার পারলে আরেকজন বউয়ের সঙ্গে কী কথা বলে সেটা রেকর্ড করার জন্যও লোক লাগায়।

শমসের কিছু হয়নি এমন ভাবে ভদকার গ্লাসটা লম্বা চুমুকে শেষ করে। বলে, ‘আমি যে মরিনি সেটা দেখে তুই খুশি, না হতাশ?’

সোহান ধাতস্থ হতে সময় নেয়। লম্বা চুমুক দেয়। তারপর মাথা নেড়ে বলে, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না।’

‘আমিও ঠিক বুঝতে পারি না। মাঝেমধ্যে মনে হয়, মরে গেলে বেশ হতো। স্বপ্ন নিয়ে মরতাম। দুঃস্বপ্নগুলো দেখতে হতো না।’

‘মরলি না কেন?’

‘কারণ তখন যে কিছু মানুষ আমাদের ঠিকই ভালোবাসত।’

‘ব্যাখ্যা করে বল। আগের মতো আমার মাথা আর খেলে না। টাকা রোজগার ছাড়া আর কিছুতেই এগোতে পারি না। অন্য কোনো চিন্তা করতে গেলে মনে হয়, সময় নষ্ট। কেউ তো আর এ জন্য টাকা দেবে না।’

‘আমাকে মারতেই নিয়ে গিয়েছিল। অর্ডার সে রকমই ছিল। কসবা সীমান্তের কাছে গুলি করার কথা। আমি তৈরি ছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে দেখি সেই পিস্তলধারী বলে, তোমাদের পথ হয়তো ঠিক ছিল না, কিন্তু তোমরা তো মানুষকে ভালোবেসেই জীবন উৎসর্গ করেছিলে। সুযোগ দিই একটা। যাও। পালাও।’

‘তুই পালালি?’

‘সারা জীবন এত পালিয়েছি আর পালাতে ইচ্ছা করছিল না। পালিয়ে যাব কোথায়? পালায় কারা? পালিয়ে গিয়ে নতুন শুরুর সুযোগ থাকে যাদের। আমি তো জেনেছিলাম সব শেষ।’

‘তবু তো পালালি।’

‘না, পালালাম না। হাঁটতে থাকলাম। পেছনে তাকালাম না। কাউকে দেখলাম না। চলতেই থাকলাম।’

‘আমি শুনেছিলাম, তোকে গুলি করেছে।’

‘সবাই তা-ই জানে।’

‘আমি শুরুতে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। পরে অবশ্য ভালো লাগতে শুরু করে একসময়। মনে হলো, তুই বেশ বেঁচে গেছিস।’

‘আবার হয়তো তোরাও বেঁচে গিয়েছিলি। আমি একজন একটা কাঁটা হয়ে থাকতাম।’

‘হ্যাঁ। এভাবেও ভাবা যায়। সত্যি বললে, কয়েক বছর পর থেকে মনে হতো, ভালোই হয়েছে। কাউকে কাউকে তো এই কুকুরের জীবন সহ্য করতে হলো না।’

‘এটা কুকুরের জীবন?’

‘ইয়েস, বন্ধু। কুকুরের জীবন। অবশ্য কুকুরও এই জীবনটাকে পছন্দ করবে কি না জানি না। মানুষকে ঠকাও। মিথ্যা বলো। লোভের ছিপ ফেলো।’

‘কিন্তু এই যে প্রেম-সংসার-ভোগ-আনন্দ।’

‘সব আছে। দিনের শেষে সবাই অভিনেতা। সবার মুখে মুখোশ। আমার এখন মানুষকে দেখলে কী মনে হয় জানিস, মনে হয় মুখের চামড়াটা টান দিয়ে খুলে ফেলে দেখি আসলে এর নিচের চেহারাটা কেমন।’

‘কিন্তু তুই তো সেই জীবন নিয়ে বেশ আছিস বলেই মনে হয়।’

‘দেখ, আফসার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম। জানলাম, আফসার ভাই নতুন সময়ের স্রোতে চলতে চায়। বিশ্বাসঘাতকতার বদলা নিতে ইচ্ছা করল।’

‘নিলি না কেন?’

‘জানি না। হয়তো আমার সেই সাহস নেই। আসলে তখন আমাদের সাহস ছিল দলবদ্ধতার সাহস। আমার কাছে কি মনে হয় জানিস, সাম্য, কমিউন—এগুলো করতে গিয়ে ব্যক্তির শক্তির প্রতি বিশ্বাসটা কমে গিয়েছিল। একা কিছু করার বোধটাই চলে গিয়েছিল। নইলে সত্যিকারের ক্যাডার তো কম ছিল না। কত সাহসী সব ছেলেপুলে। কই, এই যে লিডাররা স্রোতে গা ভাসাল, প্রতিরোধ এলো কোথাও? কেউ খুন হলো?’

‘তুইও তাই স্রোতে মিশে গেলি।’

‘না। প্রথম বিচ্যুতি ঘটল প্রেমে পড়ে। তুই বিশ্বাস করবি কি না জানি না, প্রেমের দিনগুলোতে আমার কাছে প্রথম মনে হলো, খামাখাই আমরা সময় নষ্ট করেছি। কী সুন্দর। আমার মনে হয়, যেকোনো বিপ্লব আর বিপ্লবীর প্রথম সমস্যা নারীপ্রেম।’

‘কিন্তু প্রেমের মোহ তো কেটে যায়।’

‘আমারও কাটল। কিন্তু তত দিনে আমি সময় আর সমাজের দাস হয়ে গেছি। এই সময় দেখাল, টাকা রোজগার করতে পারলেই গুরুত্ব। প্রেমে-পরিবারে-বন্ধুত্বে সব জায়গাতেই রোজগারের ক্ষমতাই বড় ক্ষমতা। আর ব্যাপার কী জানিস, টাকা রোজগার করতে গিয়ে দেখলাম, আমার মধ্যে এই কাজটা করার দারুণ ক্ষমতা। যাতে হাত দিই, কিভাবে কিভাবে যেন হয়ে যায়। ব্যস, লেগে গেলাম।’

‘বাহ্! নিজের পক্ষে তো বেশ যুক্তি দাঁড় করাতে শিখেছিস।’

‘সেটাও তো আমাদের রাজনীতির শিক্ষা। মানুষ কোনো জিনিস চায় কি না, কিভাবে চায় সেটা তো আমরা মানুষের মতো না বুঝে নিজেদের মতো করে বুঝেছি। রাতের পর রাত বিদেশি বই পড়ে আর ওই দেশের বিপ্লবের উদাহরণ থেকে নিজেদের জগৎ তৈরি করেছি। নিজেদের ভুল কাজকেও ঠিক যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন নেতারা। তুই দেখবি, আমাদের যে বা যারা এখনকার সময়ে সফল হচ্ছে, সবার পক্ষে দারুণ সব যুক্তি আছে।’

‘কিন্তু তোর যুক্তিগুলো তো এলোমেলো। পক্ষেও আছিস, বিপক্ষেও আছিস।’

সোহান হাসে। ‘হয়তো তোকে দেখে, তোর কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছি বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করছি। হয়তো আমি এখন বিপক্ষেরই লোক।’

একটু থামে সোহান। আবার শুরু করে, ‘তবে একটা জিনিস আমার মনে হয়, আমরা যারা সাম্য, বিপ্লব—এসব করার চেষ্টা করেছি, সুযোগে আমাদের ভোগবাদী চরিত্রটা আরো বেশি করে বেরিয়ে এসেছে। কারণ, ওই যে মানুষের ভেতরে ভোগের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, একটা সময় এটা থেকে নিজেদের বঞ্চিত রাখায় ওটা জমাট বেঁধে ছিল। এখন বকেয়াটাও সময়ের কাছ থেকে বুঝে নিতে ইচ্ছা করে।’

‘তাই?’

‘হ্যাঁ বামপন্থী যারা পুঁজিপতি হয়েছে, তুই দেখবি তারাই বেশি লোভী। তারাই বেশি নীতিভ্রষ্ট। তাদের ভোগের নেশাটা আরো তীব্র।’

‘তোর ক্ষেত্রেও বিষয়টা তা-ই?’

‘এক শ ভাগ। কিন্তু...’

থেমে যায় সোহান। আর ঠিক তখনই প্রথমবারের মতো ওর চেহারায় একটা বিষণ্নতা দেখতে পায় শমসের। কিন্তু ওটা তো বিষণ্নতা নয়। ওটা যেন আগের সোহানের মতো। চিন্তাশীল। মানুষ। দরদি।

ওর কি ভুল হচ্ছে? শমসের বুঝতে চেষ্টা করে।

সোহান ধরা গলায় বলে, ‘কিন্তু একটা পরিকল্পনা আছে আমার। একটা কিছু আমি একদিন করব।’

‘কী করবি?’

‘চমকে দেব সবাইকে।’

‘আফসার ভাইকে গুলি করবি?’

সোহান থেমে যায়। সাময়িক এবং বাস্তববাদী মানুষটা আবার ফিরে আসে।

‘তোর খবর বল। জানি সঠিক খবর বলবি না, তবু জানতে চাই।’

‘আমি আছি আমার মতো।’

‘কোথা থেকে এলি?’

‘ঘুরতে ঘুরতে।’

‘এখন কী করছিস?’

‘ঘুরছি। দেখছি।’

‘আমাদের লজ্জা দিতেই আসা?’

‘তোদের কি আর লজ্জা আছে?’

‘নাই। একদম নাই। যুগের নিয়ম হচ্ছে তোমার সব থাকবে, শুধু লজ্জা ছাড়া। সত্যি বললে, এটুকু বাদ দিলেই সাকসেস।’

‘সব যুগের সৈনিক হয়ে গেলি?’

‘তুই কি করিস? মানে খাস কী? বিয়ে করেছিস?’

‘আমিও চাকরি করি।’

‘চাকরি!’

‘হ্যাঁ। চাকরি করি, বসদের তেল দিই, ওদের খুব কাছের মানুষ হয়ে যাই, তারপর ওদের গোপন চক্রে ঢুকে পড়ি। তুই যা জানিস, এর সবই আমি জানি।’

‘বারবার চাকরি বদলাস। নতুন নতুন বড়লোকদের দেখিস।’

শমসের একটু অবাক হয়। ওকে নিয়ে সোহানের বোঝাটা কত স্পষ্ট।

সোহান বলে, ‘আমারও একবার তোর মতো হয়ে যেতে ইচ্ছা করেছিল। নতুন সিস্টেমের ভেতর ঢুকে এই সিস্টেমকে একটু নাড়াচাড়া দিলাম।’

‘আমি নাড়াচাড়া দেব কে বলল?’

‘দিবি না?’ সোহানকে যেন নিরাশ দেখায়। আজও সে বিশ্বাস করে, নিজে বিপথগামী হলেও একজন শমসের অবিচল আছে।

আর সেই মুহূর্তেই ও সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, সোহান নষ্টামির অভিনয় করছে মাত্র। নষ্ট হতে পারেনি।

বলে, ‘সোহান শেষ একটা অ্যাকশন হবে নাকি?’

‘আমি মরে গেছি।’

‘চল, আবার বাঁচি।’

‘বড় ক্লান্তিকর এই বেঁচে থাকা। বড় অরুচিকর।’

‘তোর সামনে আমি দুটি সুযোগ রেখে গেলাম। তুই তোর বউকে যে ন্যাংটা দেখতে চায় তাকে ন্যাংটা করে দিতে পারিস। আবার চাইলে এটা কাজে লাগিয়ে আমার বসের পাওয়ার প্লান্টের প্রজেক্টে পার্টনার হয়ে আরো কয়েক ধাপ ওপরে ওঠার সুযোগ আছে। তোর পছন্দ, সোহান। আমি চলি।’

উঠে দাঁড়ায় শমসের। হাঁটে। তারপর রিকশা। তারপর বাস। তারপর ট্যাক্সি।

বাড়িওয়ালা দরজায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘শমসের সাহেব, আপনি কে বলুন তো?’

‘আমাকে আপনি চেনেন না?’

‘চিনতাম তো! কিন্তু পুলিশ এলো দুপুরে। আপনি নাকি অনেকগুলো খুন করেছেন।’

‘আপনার ভয় লাগেনি?’

‘বিকেলে আবার বিরাট গাড়ি নিয়ে কয়েকজন যুবক। আপনাকে নাকি ওদের খুব দরকার। আপনি আসলে কে?’

‘আমি একজন মরা মানুষ।’

‘রসিকতা বাদ দেন, ভাই।’

‘রসিকতা না, পুলিশ রেকর্ড ঘেঁটে দেখেন। আমি মারা গেছি ১৩ বছর আগে। কসবা সীমান্তে পুলিশের গুলিতে।’

বাড়িওয়ালা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

নিজাম সাহেবকে দেখা যায় খুবই উত্তেজনা নিয়ে পায়চারি করছেন। দেখেই পাশের ঘরের ইমরানের বন্ধ দরজার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আজকেও চলছে। আজ আর ছাড়াছাড়ি নেই। বাইরে থেকে তালা লাগাব। তারপর পুলিশ এনে ধরিয়ে দেব। বাসাটাকে বেশ্যাখানা বানিয়ে বসেছে।’

শমসের হাসিমুখে বলে, ‘ভেতরে ওরা কী করে বলে আপনার ধারণা।’

নিজাম সাহেব চোখ-মুখ কুঁচকে বলেন, ‘সব করে। নইলে সারা দিন দরজা লাগানো কেন? না হলে তো সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারত। বলতে পারত, নিজাম ভাই, এই যে আপনাদের বউমা। পারত না?

শমসের হাসি অক্ষুণ্ন রেখে বলে, ‘ভেতরে কী করে দেখবেন নাকি? দরজা ভেঙে দেখি চলেন।’

‘কী বলেন। ওস্তাগফিরুল্লাহ।’

‘তাহলে থাক।’

শমসের ঘরে ঢোকে। বুঝতে পারে, নিজাম সাহেব এখন প্রস্তাবটা নিয়ে ভাবছেন। মনে হচ্ছে, উফ্ তাহলে কী দারুণ ব্যাপার হতো।

তাঁর দরজায় ধাক্কা পড়বে। কিছুক্ষণ পরই।

১৫ মিনিট পর সময়টা এলো। নিজাম সাহেবের ফিসফিস গলা, ‘ভাই, একটু শুনবেন।’

‘বলেন’—শমসের দরজা খোলে না।

‘আপনার আইডিয়াটা কিন্তু খারাপ না।’

‘জি, আমি ভালো আইডিয়ায় দিই।’

‘শুধু আইডিয়া দিয়ে বসে থাকলে হবে না। আসুন।’

শমসের দরজা খোলে। নিজাম সাহেবের অপ্রস্তুত চেহারা। তাতে ধুন্ধুমার উত্তেজনা।

শমসের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, এই মানুষটাকে সে এমন একটা জিনিস দেখাবে যে নিজাম সাহেব এরপর পাগলটাগল হয়ে যেতে পারেন।

 

নয়

শমসেরের খোঁজ পাওয়া গেছে। মিলিও পেয়েছে। আফসার সাহেবও পেয়েছেন।

মিলি ফেসবুকে অঞ্জনা অরণ্য পেজে প্রশ্ন রাখে, সে একজন শমসেরকে খুঁজছে।

সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঝাঁপায়। প্রায় সবারই দেখা যায় একজন করে শমসেরকে চেনা আছে। যেকোনো মুহূর্তে সেই শমসেরকে মিলির হাতে তুলে দিতে ওরা রাজি।

কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করল, এই শমসেরের সঙ্গে ওর কোনো পুরনো সম্পর্ক আছে কি না?

মিলি রহস্য রেখে দেয়। ওরা নিজের চেনা শমসেরই সঠিক শমসের প্রমাণে নানা তৎপরতা দেখায়।

মিলি এই ফেসবুকের জগেক চেনে। আরো চেনে লোভাতুর পুরুষদের। কেউ হয়তো কোনো শমসেরকে চেনে না, তবু একজনকে শমসের সাজাবে। তাকে ব্যবহার করে ভুলিয়েভালিয়ে দেখা করবে ওর সঙ্গে।

ওরা নানা শমসেরের খোঁজ দেয়। মিলি কোনো জবাব দেয় না।

পরদিন সন্ধ্যায় একজন ইনবক্সে যোগাযোগ করে। জানতে চায়, যে শমসেরকে মিলি খুঁজছে, তার সম্পর্কে একটু ডিটেইল জানালে সুবিধা হয়।

মিলি জানে এও ফাঁদ, তবু মাঝেমধ্যে ফাঁদের শক্তিটাও দেখতে ইচ্ছা করে।

সে জানায়, এই শমসেরের একজন পুরনো বন্ধুর নাম সোহান।

সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর, ‘বোধ হয় এই সেই শমসের।’

ছবিও পাঠানো হয়। এই ছবি আগে দেখেনি মিলি। কিন্তু মনে হয়, চেনা। খুব চেনা।

মিলি এরপর ছবিটা দেখতেই থাকে, দেখতেই থাকে। মানুষটার চেহারায় এমন কিছু বিশেষত্ব নেই। অন্তত তার অঙ্ক করে চলা শুদ্ধ স্বামীকে প্রভাবিত করার কোনো ক্ষমতা আছে বলে মনেই হয় না।

তবু একটা ক্লু তো পাওয়া গেল।

গভীর রাতে নিজের আরেকটা পেজ থেকে সোহানের মোবাইলে ছবিটা পাঠায় সে।

সোহান বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছিল। ছবিটা দেখে এমন একটা কম্পন যে সঙ্গে সঙ্গেই মিলি জানিয়ে দেয়, এই শমসেরই তার কাঙ্ক্ষিত শমসের। দেখা হোক অচিরেই। শমসেরসহ।

মুখোমুখি সাক্ষাতেও বিশেষত্বহীন মানুষ। চাহনিতে কোনো চুম্বক নেই, শরীরে কোনো আলোড়ন নেই, উপস্থিতিতে তীব্রতা নেই। নেই-নেই মিলিয়ে একটা মানুষ।

সামাজিক অবস্থানও চামচাগোছের। যে ভদ্রলোক সন্ধান দিয়েছেন তাঁর অফিসেই চাকরি করে এবং তাঁর হয়ে আরো অনেক কিছু করে। ‘বস-বস’ বলে এমন গলে পড়ছে যে মিলির সোহানের ওপর মেজাজ খারাপ হয়। এই মানুষের জন্য এত অপেক্ষা! সোহান তো দেখা যাচ্ছে একসময় খুব নিচু স্তরের মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করত।

ভদ্রলোক কথা রেখেছেন। শমসেরকে আলাদা করে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন ওকে।

এখন সেই কথা বলার জন্য ওরা দুজন মুখোমুখি বসে।

মিলির মাথায় এত প্রশ্ন যে কোনটা আগে করবে ঠিক বুঝতে পারে না। মাথা নিচু করে থাকে কিছুক্ষণ।

যখন মাথা তোলে তখন কী যেন একটা বিদ্যুচ্চমকে কেঁপে ওঠে। আরে, মানুষটার চোখ এ রকম কেন? এই চোখে তো খুন। জীবনে বহু ছেলের সঙ্গে মিশে, বহু প্রেম করে মিলির পুরুষ সম্পর্কীয় জ্ঞান অনেক উঁচু স্তরের। ভাষাহীন চোখ সে অনেক দেখেছে। তবে এই ভাষাহীনতার মধ্যে একটা নিষ্ঠুরতা আছে। অবাক করা ব্যাপার, এই নিষ্ঠুরতার মধ্যে কী ভীষণ সম্মোহন।

মানুষটার স্থির চোখ। ওর দিকে তাকিয়েই থাকে, তাকিয়েই থাকে।

কত কথা ছিল! অনন্ত জিজ্ঞাসা। মিলি কিচ্ছু বলতে পারে না। শুধু বলে, ‘আপনি...আপনি...’

মানুষটা কথা বলে না। তাকায় শুধু।

মিলি চিৎকার করে, ‘আপনি কথা বলুন। কথা না বললে চোখ থেকে আমি চোখ সরাতে পারছি না। আমার চোখ জ্বলে যাবে।’

শমসের স্থির চেয়ে থাকে। যেন তার বলার কিছু নেই। শোনার কিছু নেই।

অনন্তকালের শূন্যতা নিয়ে ভেসে থাকা চোখ দুটি। বয়ে চলে যেন আরো শূন্যতার দিকে।

মিলি বলে, ‘আপনি কিছু বলবেন না?’

মানুষটা শেষে চোখ নেভায়। এখন মানুষের চোখ মনে হয়। এখন সে কথাও বলে।

‘আপনি জানেন এই মানুষটার উদ্দেশ্য কী?’

‘জানব না কেন?’

‘তবু এলেন।’

‘এলে ক্ষতি কী?’

‘ফাঁদে পড়বেন।’

‘আমি ফাঁদে পড়ি না। ফাঁদে ফেলি।’

‘সোহান জানে?’

‘শুধু আপনার পরিচয়টুকু ছাড়া আমাদের মধ্যে কোনো লুকোচুরি নেই। প্রথম লুকানোটা শুরু হয়েছিল আপনাকে দিয়ে। তাই আপনাকে নিয়ে এত আগ্রহ।’

‘আপনি সোহানকে জানিয়ে এসেছেন?’

‘বললাম তো আপনার অংশটুকু ছাড়া আর কোনো কিছুতে আমাদের লুকোচুরি নেই।’

‘সোহান কী বলল?’

‘বিরাট একটা বিজনেস ডিল হয়ে যাবে। গিভ অ্যান্ড টেক।’

ইসমত চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমি যে শালা এত গুরুত্বপূর্ণ লোক বুঝতেই পারিনি। তোমাকে দেখার জন্য...। যা হোক তোমাদের কোনো রিলেশন থাকলে সেটাও চলতে থাকুক। আই ডোন্ট মাইন্ড।’

‘বস, আপনি আমাকে টেক্কা দিয়ে দিলেন।’

‘ইয়েস, তোমার কাজটা আমি নিজেই করে নিলাম। যা-ই হোক তবু তোমার একটা ভূমিকা আছে। তোমাকে আমি বার্গেইন টুল বানিয়ে ফেললাম। বিরাট ভূমিকা তোমার। লেটস টেক এ ড্রিংক।’

ড্রিংকটা নেয় সোহান। বড় বিজনেস ডিল হলে আর পছন্দের মেয়েমানুষকে পেলে বস খুব উদার হয়ে যান। এই সময় অফিসের কর্মীদের কল্যাণে বড় কিছু করা, ওদের সন্তান-সন্ততির ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নিয়ে ওকে খুব চিন্তিত দেখায়। ঘোষণা করেন, ‘বড় কিছু করব ওদের জন্য। বুঝলে, খুব বড় কিছু।’

শমসের কয়েক চুমুক দিয়ে বলে, ‘বস, একটা ছোট্ট কাজ করতে হবে।’

‘কী কাজ?’

‘আপনারা যা করবেন, একজন মানুষকে সেটা দেখতে দিতে হবে।’

‘দেখতে দিতে হবে কেন?’

‘বিজনেস আছে।’

‘তাই নাকি?’

‘ভিডিওফিডিও করে যদি...’

‘আরে না। ভিডিও করতে চাইছি না বলেই তো...। আপনি তো ভিডিও করান সব সময়, কিন্তু এখানে ভিডিও করতে গেলে ঝামেলা আছে। কার হাত থেকে কার হাতে চলে যায়। একটা সাক্ষী থাকা দরকার। পরে কাজে লাগবে। নইলে তো আপনার জন্য শুধু গিভিং হবে। টেকিংয়ের একটা সুযোগ থাকা উচিত।’

‘সব দিক ভেবে বলছ?’

‘জি।’

‘ওকে। রেসপনসিবিলিটি পুরোটা তোমার।’

বেরোয় শমসের। নিজাম সাহেবকে ফোন করে। নিজাম সাহেব কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যান।

শমসের ওর হাতে চাবিটা দেয়। দিয়ে বলে, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকবে। মিনিট দশেক পর আপনি ঢুকে যাবেন। বস আপনাকে ‘রাসকেল’ বলে বের করে দেবে। কিন্তু যা দেখার তা তো দেখে ফেললেন।

নিজাম সাহেব স্তম্ভিত হয়ে বলেন, ‘এসব কী বলছেন, ভাই? এগুলো আমি দেখতে যাব কেন?’

‘আপনি না বাসায় ইমরানের ঘরের দরজা ভেঙে ওর বান্ধবীর সঙ্গে ওকে ঘনিষ্ঠ দেখতে চান। জানালা দিয়ে উঁকি মারতেও দেখেছি।’

‘না মশাই। কে না কে জেনে যাবে।’

‘আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না।’

‘না রে ভাই। আমি দেখব না।’

‘দেখতে পেলে মন্দ হতো না।’

‘না রে ভাই। কে না কে দেখবে। আমার একটা ইজ্জত আছে না।’

নিজাম সাহেব দাঁড়ান না। ছুটে বেরিয়ে যান বুলেটের বেগে।

শমসের একটা সিগারেট ধরায়। মধ্যবিত্ত আজও সেই রকমই রয়ে গেছে। সব ইচ্ছা আছে, কিন্তু সাহস নেই। কেউ দেখে ফেলল, কেউ জেনে ফেলল—এই ভয়ে আজকের দিনেও কাবু।

আর উচ্চবিত্তরা আছে ওদের মতোই, যা ইচ্ছা তাই করো। ভোগে ডুবে থাকো।

আর্থিক-রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা নিয়ে সবাই চেঁচিয়ে মরে, কিন্তু শমসেরের কাছে এই শারীরিক বৈষম্যটাকেও কম বড় মনে হয় না।

সব শরীরেরই তো সমান চাহিদা।

 

দশ

আফসার ভাই এমনভাবে বললেন, ‘এসেছিস’, যেন তিনি অপেক্ষাই করে ছিলেন।

কোনো অবাক হওয়ার ব্যাপার নেই। শিহরণ নেই। ভীতি নেই।

সামনে কয়েকজন বসে তাঁর নেতৃত্বগুণের খুব প্রশংসা করছিল, ওদের ইঙ্গিতে বের করে দেন। ফজলু থেকে যেতে চাইছিল। চোখের ইশারায় ওকেও যেতে বললে ফজলু অবাক। একান্তই পারিবারিক আলোচনা ছাড়া লিডার তো কোনো দিন তাকে বের করে দেন না। পরিবারের ঘনিষ্ঠদের সে ভালো চেনে। এই মানুষটা কে?

ফজলু তবু যায় না। দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে।

লিডার দরজা বন্ধ করে দিলেন। কেন? ফজলু স্তম্ভিত। ভুল হচ্ছে না তো কোনো! নিরাপত্তার প্রশ্নও আছে।

আফসার ভাই নিজ হাতে কফি বানান। ‘তুই যে আজ আসবি আমি জানতাম।’

‘কিভাবে জানতেন?’ একটা কৌতুক ফুটিয়ে শমসের প্রশ্ন করে।

‘আজ যে নবম সন্ধ্যা।’

লিডারের আজও নবম সন্ধ্যার কথা মনে আছে দেখে খানিকটা বিস্মিত। ওরা যেকোনো কাজ করত নবম সন্ধ্যায়। পরিকল্পনার পর থেকে পরের আট দিন এই নিয়ে ভাবনা, যোগ-বিয়োগ। তারপর নবম সন্ধ্যায় চূড়ান্ত অ্যাকশন।

সে ফোন করার দিন থেকে হিসাব করলে আজ নবম সন্ধ্যা।

শমসের হেসে বলে, ‘তাহলে লিডার, পুলিশ পাঠালেন কেন?’

‘আমার তোকে জানান দিতে হবে না যে আজও লিডার আছি। চাইলে শমসেরকে খুঁজে বের করতে সমস্যা হয় না।’

‘কিন্তু লিডার, সেই সময় আপনি সব করতেন প্রশাসনকে হারিয়ে। এখন প্রশাসন আর পুলিশ দিয়ে। আপনার তো আর জয় নেই। এখন আপনার শুরুই পরাজয় দিয়ে।’

আফসার ভাই এই প্রথম ওকে ভালো করে দেখেন। কিছুক্ষণ উদাসী দৃষ্টি। জানালার দিকে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললেন, ‘বৃষ্টিটা বেশ হচ্ছে। আমাদের সেই সময়ের নবম সন্ধ্যার মতো।’

শমসের বুঝতে পারে না স্মৃতিতে ডোবানোর চেষ্টার মানে কী! আফসার ভাই কি আবেগ দিয়ে হারিয়ে দিতে চান। সে দুর্বল হয়ে যাক।

আফসার ভাই আচমকা জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই আমাকে মারতেটারতে আসিসনি তো?’

‘আপনাকে মেরে কী হবে? আপনি তো মরেই গেছেন।’

‘কে বলল আমি মরেছি।’

‘বেঁচে আছেন?’

‘অবশ্যই বেঁচে আছি। আমি কত মানুষকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাই। আমি গরিবকে ভরসা দিই, ধনীদের নতুন স্বপ্নের সুযোগ করে দিই, অসহায়দের সহায় হয়ে দাঁড়াই, সক্ষমদের সক্ষমতা আরো বাড়ানোর পথ দেখাই। কত মানুষের জীবন আমি প্রভাবিত করি।’

‘কিন্তু সমাজের কী লাভ হয় তাতে? আপনিই না বলতেন, সমাজের উপকার যে মানুষ করতে পারে না সে আসলে মৃত।’

‘আমি সমাজের উপকার করছি না?’

‘সেটা তো সেই সময়ের বিত্তশালীরাও করত। ব্যবসা করত, কর্মসংস্থান হতো, মানুষ চাকরি পেত।’

আফসার ভাই একটু থামেন। চুরুট ধরান। এই প্রথম একটু চমকায় শমসের। সেই অবিকল ভঙ্গি। সিগারেট ধরিয়ে বাম হাত থেকে ডান হাতে নেওয়ার অনুপম কায়দা। ওরা নকলের চেষ্টা করত। সৌমেনেরটা যা একটু কাছাকাছি হতো। তাই নিয়ে ওর গর্বের শেষ ছিল না।

আফসার ভাই বলেন, ‘কর্মসংস্থান কি এখন আরো বেশি হচ্ছে না? মানুষের গায়ে দেখবি দামি জামা-কাপড়। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। মধ্যবিত্তও এখন ঘুরতে বিদেশে যায়।’

‘সরকারি দলের নেতার মতো বক্তৃতা হচ্ছে।’

‘আমি তো সরকারি দলের নেতাই।’

‘কিন্তু না খাওয়া মানুষ এখনো কম নেই। এখনো খাবারের অভাবে মানুষ আত্মহত্যা করে। আমি এ দুই বছর অনেক ঘুরলাম, দেখলাম। সব খাতে শুনি ভাটার টান। তবু আপনাদের হিসাবে সবাই এগোচ্ছে। হয়তো ঠিক। সব এগোচ্ছে। শুধু মানুষ পেছাচ্ছে।’

আফসার ভাই হাসেন, ‘এটা তো বিরোধী দলের মতো কথা হলো।’

‘এও এক সমস্যা। সব বিরোধিতাই বিরোধী দলের কথা। হ্যাঁ, আপনারা ঢোল বাজিয়ে এখন সব বিপক্ষ যুক্তিকে দমিয়ে দিতে পারেন। আমাদের সময় পারা যেত না। মিডিয়া তখন পুঁজিপতিদের দাস ছিল না। আর আমরা ছিলাম বলে চাপ ছিল। এখন আমরা নেই। আপনারা দল বদলে নতুন ঢোল বাজাচ্ছেন।’

‘ঢোলটা আমি না বাজালে কি থেমে থাকত? সিস্টেম যখন বদলানো যায় না, তখন এই সিস্টেমের ভেতর ঢুকেই কাজ করতে হয়। আর চেষ্টা করতে হয়...’

আফসার ভাই থেমে যান। তাঁর যুক্তি দুর্বল বলে নয়, শমসের হো হো করে হেসে দিয়েছে।

‘তুই হাসছিস যে...’

‘আপনার দক্ষতা দেখে, লিডার। আপনি গরিবের বন্ধু, বড়লোকের বন্ধু, পুলিশের বন্ধু, প্রশাসনের বন্ধু।’

‘সবার বন্ধু হতে পারা কি খারাপ ব্যাপার?’

‘না লিডার, ভালো ব্যাপার। সবার বন্ধু হয়ে গেলে সবাই খুশি থাকে, যেমন আপনারা খুশি রেখেছেন।’

‘শোন, ধর আমি বা আমাদের কেউ কেউ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত না হলে কী হতো। পালিয়ে থাকতাম। একসময় নাই হয়ে যেতাম। তাতেই বা বিপ্লবের এমন কী লাভ হতো। বরং উল্টোটা হলে হয়তো ভালো হতো। আমরা সবাই যদি এই প্রক্রিয়ায় ঢুকে যেতাম, আমাদের প্রভাব তৈরি হতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের চিন্তা প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকত।’

‘হয়তো। কিন্তু আপনাদের মতো দু-একজনের যে চেহারা তাতে বিশ্বাস হয় না। সবাই মিলে আরো পচত। আরো পচাত।’

‘তা-ও হতে পারত। অস্বীকার করছি না। কিন্তু এক-দুজন পচাদের মধ্যে ঢুকলে পচে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বেশি হলে...সবাই হলে...’

‘অযৌক্তিক আত্মপক্ষ সমর্থন।’

আফসার ভাই একটু ভেবে বলেন, ‘মানুষকে চিনতে আমরা ভুল করেছিলাম। মানুষের অন্তর্গত প্রবণতাই হলো লোভ ও ভোগমুখী। প্রকৃতিগত এই ক্ষমতাকে আমরা অস্বীকার করেছিলাম।’

‘তাতে কাজ হচ্ছিলও তো। সেই প্রবণতাকে নিবৃত্ত করেই কি লাতিনে বিপ্লব হয়নি? পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিকভাবে ভোটে জিতেই তো বামরা ক্ষমতায় এসেছিল। আমরাও তো এককভাবে খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম একবার। আর সময়ের কথা বলছেন, এখনকার ইউরোপেও কি সোশ্যালিস্টরা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে না।’

‘কিন্তু সংশোধিত হয়ে। পরিবর্ধিত হয়ে। নিজের চিন্তা সমাজে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হয়। না হলে সমাজ যে রকম চায় এর সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ হয়। অনেকে সেটাই বুঝতে রাজি ছিল না। বিপ্লব করে মানুষের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল। একদিকে আমরা, অন্যদিকে আমাদের শত্রু হিসেবে প্রশাসন। মানুষ দুই পক্ষের চাপে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। আর মানুষের অভ্যাসই হলো সে নিরাপত্তা চায়। জীবন উন্নত হোক—এই চাওয়াটা আছে, তবে তার চেয়েও বেশি আছে জীবন অক্ষুণ্ন রাখা।’

‘আপনি এই ভুলটা কি বুঝলেন পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর?’

আফসার ভাই উত্তর দেন না। চুপ করে কী যেন ভাবেন।

অনেক বছর পর আজ আবার তর্ক করছেন, শমসের করতে চায়নি। কিন্তু এখন শুরুর পর জমে থাকা কথাগুলো এমন উগরে বেরোচ্ছে যে ভালোই লাগছে। আরো ভালোই লাগছে, আফসার ভাইকেও মাঝেমধ্যে ঘায়েল করা যাচ্ছে। এও একটা জয়। আগে কোনো দিন পারা যায়নি।

আফসার ভাই বলেন, ‘আমাদের দেশের বাস্তবতা তো আলাদা না, বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। সোভিয়েত পতনের পর নতুন পুঁজি এসেছে। বহুজাতিক কম্পানি। বিশ্বায়নে তরুণদের জন্য অবারিত সুযোগ। মধ্যবিত্তই নাই হয়ে গেছে। ওদের চোখে প্রাচুর্যের আলোটা এমন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে যে আজ আর নীতিকথা শোনার লোক নেই। মধ্যবিত্তের লক্ষ্য হলো উচ্চবিত্ত হওয়ার চেষ্টা করা। একটা বাড়ির একটা ছেলে মাল্টিন্যাশনালে চাকরি পাওয়া মানে সেই পরিবারের পরের অর্থনৈতিক স্তরে উন্নীত হওয়া। এই উন্নতিটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এর সঙ্গে লড়া যাবে না। বড়জোর সমন্বয় করা যেতে পারে।’

‘তাহলে আপনি বলছেন, সব শেষ। আমাদের দিন এই দুনিয়ায় ফুরিয়ে গেছে।’

‘আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়। আর্থিক কাঠামো বদলানো হয়তো সম্ভব নয়, তবে আন্দোলন জোরালো থাকলে তরুণ প্রজন্মের নীতি আর মানবিকতা বোধটা থাকত। আরেকটা জিনিস হয়তো হতো।’

‘কী জিনিস?’

‘এখন যে তরুণ সমাজে ইসলামী আন্দোলনের প্রভাব তা হয়তো তৈরি হতো না।’

‘কিভাবে?’

‘তরুণরা সব সময় বদলানোর পক্ষে। অ্যাডভেঞ্চারের পক্ষে। আমরা সত্তরের দশকে সেই অ্যাডভেঞ্চারটা ওদের দিয়েছিলাম। এখনো মনে কর কেউ সমাজ বদলাতে চায়। সেই চাওয়াকে পূরণ করতে পারে কে? প্রথাগত রাজনৈতিক শক্তিগুলো তো আর অ্যাডভেঞ্চার ধারণ করে না, এখন ইসলামী আন্দোলন ওদের সে রকম একটা সুযোগ দিচ্ছে। তখন যে রকম আমাদের দলে এলে অস্ত্র পেত, শক্তি পেত, সাহস পেত; ইসলামী আন্দোলনে সেটা পাওয়া যায়। আমাদের শূন্যস্থান এভাবেই ওরা নিয়েছে।’

সমাজ নিয়ে এখন আর গভীরভাবে ভাবে না শমসের। নতুন তাত্ত্বিকতায় আর যেতে ইচ্ছা করে না।

উদাস গলায় বলে, ‘থাক আর চাপ নিতে চাই না। উঠি বরং।’

‘তুই কী করিস না করিস সব জানি। এটাই করে যাবি?’

‘জানি না। আমি যাই।’

‘আমি যে তোকে যেতে দিতে চাই না।’

‘দাস বানিয়ে রাখতে চান?’

আফসারের গলায় এই প্রথম একটা আন্তরিকতার ছোঁয়া শমসের টের পায়। বলেন, ‘বহুদিন পর আজ কোনো আলোচনায় আমার মাথায় পাগলামি আসেনি।’

শমসের ঠিক বুঝতে পারে না। চেয়ে থাকে প্রশ্ন নিয়ে।

‘শোন, আমার বাইরে সব ঠিক আছে। এই রাজনীতি আমি এত ভালো শিখেছি যে অচিরেই দলের দ্বিতীয় ক্ষমতাবান লোক হয়ে যাব। কিন্তু সমস্যাটা কী জানিস, মাঝেমধ্যে এর-ওর সঙ্গে নাচতে ইচ্ছা করে। ভূতের গল্প মনে পড়ে জরুরি রাজনৈতিক সভার সময়।’

‘ঠিক বুঝলাম না।’

‘আমিও তো বুঝি না তোকে বোঝাব কী। কিন্তু একটা ব্যাপার হলো, আজ একবারও সেসব মাথায় আসেনি। একবারও মনে হয়নি বাইরে একটা লোক বসে আছে, ওর মাথায় আমাকে বোকা বানানোর ইচ্ছা, ওকে কষে একটা ধমক দিতে হবে। আজ ভূতের গল্প মাথায় আসেনি। আজ কোনো পাগলামি নেই।’

তারপর হঠাৎ ওর হাত ধরে বলেন, ‘তুই থেকে যা। যেভাবে চাস সেভাবেই থাকবি। শুধু আমার সঙ্গে থাকবি। আমার সঙ্গে তর্ক করবি।’

শমসের আফসার ভাইকে দেখে। সেই ব্যক্তিত্ববান মানুষটা এখন কী সুন্দর কিছু চেয়ে ফেলতে পারেন। নিমেষেই চলে যেতে পারেন ভিক্ষাকারীর কাতারে।

শমসের উঠে দাঁড়ায়।

আফসার ভাই ঠাণ্ডা গলায় পেছন থেকে বলেন, ‘পুলিশের লোক পেছন থেকে তোকে বলেছিল না, পালিয়ে যান। পালান।’

শমসের ভ্রু কোঁচকায়। ‘আপনি জানলেন কী করে?’

‘ওরে তোকে কি এমনি এমনি ছেড়ে দিল?’

‘মানে এটাও সমঝোতার ফল?’

আফসার ভাই চুপ করে থাকেন।

‘আমার এই বাড়তি জীবনটাও তাহলে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাওয়া।’

‘সমন্বয় করে পাওয়া।’

‘তাহলে সোহানদের মতো করে আমাকে ছাড়িয়ে আনলেন না কেন?’

‘তোর যে আগুন ছিল, সেটা কেউ সামাল দিতে পারত না। আমিও পারতাম না।’

‘সেই আগুন আজ আর নেই, তাই না?’ শমসেরকে একটু যেন বিষাদগ্রস্ত শোনায়।

আফসার ভাই আবার চুপ।

‘আপনি খেললেন, লিডার। আমার জীবন আপনার উপহার জানিয়ে ইমোশনাল বার্গেইনিং।’

‘প্রায় সবার জীবনই আপসের ফল। আর সবাইকে বাঁচাতে গিয়ে আমাকে মরতে হয়েছে।’

‘মরেই যখন গেছেন, তখন কী আর করা।’

শমসের হাঁটে। আজ শুধু হাঁটে। বাসে চড়ে না। গাড়িতে চাপে না। দেখাদেখি শেষ।

এই জীবনটা সমঝোতার ফসল জেনে লজ্জা লাগে খুব। আফসার ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হবে, নাকি ক্ষুব্ধ হবে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

বহু বছর ধরেই জীবনটাকে বোঝার মতো বহন করে চলছে। তবে আজ খুব ভারী লাগে।

 

এগার

বেশিদিন ওকে বহন করতে হলো না। তিন দিন পর বুড়িগঙ্গার পারে ওর লাশ পাওয়া যায়।

কোনো একটা পত্রিকা একটু ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করে। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে প্রভাবশালী নেতা আফসার আনোয়ারের সঙ্গে সে দেখা করতে গেছে, এমন একটা খবর ছাপে ওরা।

পরে আফসার আনোয়ার এক বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেন, ‘আমার পুরনো আমলের কর্মী। হতাশায় ভুগছিল। আমি কাজ দিয়ে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। পারলাম না। খুবই দুঃখের কথা।’

তিনি সদলবলে তাঁর কবর জিয়ারত করেন এবং বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

মন্তব্য