kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

গ ল্প

আক্রোশ

আহমাদ মোস্তফা কামাল

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



আক্রোশ

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

হোটেলের এই ভিউটা ভারি সুন্দর। শুধু সুন্দর বললে হয় না, ‘মনোহর’ ‘হৃদয়গ্রাহী’ এসব শব্দ ব্যবহার করতে ইচ্ছা করে। জানালার পর্দা সরিয়ে দিলেই নদী দেখা যায়, শীর্ণ নদী। তার ওপারে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। নরম সোফায় গা ডুবিয়ে সেদিকে অপলক তাকিয়ে আছেন তিনি। একসময়ের তুখোড় বিপ্লবী ছাত্রনেতা, আর বর্তমানে উন্নয়নের একনিষ্ঠ সমর্থক, সাংবাদিক বদরুল করিম। ভ্রু কিছুটা কুঞ্চিত তাঁর। হাতে গ্লাস। বরফ-কুচি দেওয়া, লেবুর সৌরভ ছড়ানো ভদকার গ্লাস। গ্লাসের শরীরে শিশির জমেছে, হেমন্তের সকালে ঘাসের ডগায় জমা থাকা শিশিরের মতো দেখতে। অন্য হাতে সিগারেট, যদিও ইদানীং পাইপ ধরার কথা ভাবছেন তিনি, চে বা বঙ্গবন্ধুর মতো, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক আয়ত্তে আনতে পারছেন না। বিছানায় শুয়ে আছে এক উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী। সুরা আর সাকি ছাড়া ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় নাকি? একসময়ের মফস্বল শহর এখন কত স্মার্ট হয়ে উঠেছে! হোটেলগুলোতে সব আয়োজনই থাকে। রুম সার্ভিসকে বলতেই তারা বরফ, লেবু, সালাদ আর বাদাম পাঠিয়ে দিল। বোতল অবশ্য তিনি নিয়েই এসেছেন ঢাকা থেকে। এসব ব্যাপারে তিনি কারো ওপরে ভরসা করেন না। তিনি বিদেশি অ্যালকোহল ছাড়া কিছু ঠোঁটে তোলেন না, ভদকাই তাঁর প্রিয়—অ্যাবসলুট বা স্মিরনফ। এই হতভাগা দেশে এই দুটি ব্র্যান্ড ছাড়া অবশ্য আর কিছু সহজে পাওয়াও যায় না। 

মাঠের দিকে তাকিয়ে এক মনে কী যেন ভাবছেন তিনি। এই শহর, এই মাঠ তার অনেক দিনের চেনা। বহুবার এসেছেন, এখনো আসেন। অনেক প্রেম, অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই শহরটির সঙ্গে। জানেন তিনি, একেক ঋতুতে এই মাঠের রূপ একেক রকম। কখনো কেবল সবুজের পর সবুজ, ধানগাছগুলো তখন হাওয়ায় লুটোপুটি করে খেলে, ঠিক যেন দুরন্ত কিশোরের দল। আবার সেই ধানই পেকে গেলে সোনার রং ধারণ করে, ফসলের ভারে নুইয়ে পড়ে তারা, ঠিক যেন গর্ভবতী নারী। একই সঙ্গে ভারে অবনত এবং গর্বিত। পাকা ধান বা গম ক্ষেতের রূপ এক রকম, আবার যখন শর্ষে ফুলে ছেয়ে থাকে মাঠ তখন আরেক রকম। তিনি সেসব রূপ দেখেছেন বছরের পর বছর ধরে। যেমন দেখেছেন বিবিধ নারীর রূপ।

মাঠের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে এবার শুয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকালেন বদরুল করিম। একটা স্তন এখনো উন্মুক্ত হয়ে আছে, অন্যটি আঁচলে ঢাকা। এও এক ধ্রুপদি দৃশ্য। কিন্তু তাঁর মনটা খচখচ করছে। একটু আগে এক আগ্রাসী সঙ্গম-চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। অবশ্য এই অসময়ে সঙ্গমের কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না, মেয়েটিই আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, পারবেন। কিন্তু তাঁর বয়সী শরীর জেগে ওঠেনি। আজকাল এত সহজে নিজেকে জাগাতে পারেন না তিনি, ওষুধপত্রের সহায়তা নিতে হয়। কিন্তু মেয়েটির হঠাৎ আগ্রাসনে ওষুধ সেবনের সময় পাননি, জাগতেও পারেননি। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও, মেয়েটির স্তন অনেকক্ষণ ধরে দলিত-মথিত করার পরও তিনি নিজেকে উত্থানহীনই দেখতে পেলেন। বিরক্ত হয়ে উঠে এসে বোতল খুলে বসেছেন, আর মেয়েটি খানিকটা শ্রান্ত হয়ে শুয়ে আছে, হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছে। বোতল খোলার আগে ট্যাবলেট খেতে ভোলেননি তিনি, অপেক্ষা করছেন উত্থানের, হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন, একটা শিক্ষা দিয়ে ছাড়বেন মেয়েটিকে। না দিয়েই বা উপায় কী? কী দরকার ছিল এই সকাল বেলায় অমন আগ্রাসী হয়ে ওঠার? তাঁর তো ইচ্ছা ছিল না। বাইরে বেরিয়েছিলেন নৌকায় চড়ে নদীতে বেড়াবেন বলে। তীব্র রোদের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে এসেছেন। বিরক্ত লাগছিল। বিরক্ত না হয়ে উপায় কী? কিন্তু মেয়েটির বিরক্তি নেই। হোটেলে ফিরতে পেরে সে খুশি, টেনে নিয়ে গেল তাঁকে বিছানায়। তারপর অনেকক্ষণ ধরে কসরত করল তাঁকে জাগিয়ে তুলতে। জাগাতে না পেরে লজ্জায় বিমূঢ় হননি বদরুল করিম, কারণ কাল রাতেই মেয়েটিকে দারুণ তৃপ্তিদায়ক এক সঙ্গম উপহার দিয়েছেন তিনি। যথাযথ প্রস্তুতি ছিল কি না! সে কথা মনে পড়ায় মুচকি একটু হাসলেন। এই মেয়েটির পেছনে তিনি দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন। কোনোভাবেই ধরা দিচ্ছিল না। মঞ্চে মাত্র দুটি নাটকে অভিনয় করেছে সে, তাতেই এত অহংকার, যে বদরুল করিমের মতো তুখোড় সাংবাদিককেও পাত্তা দিচ্ছিল না। অবশ্য এ রকম সুন্দরী মেয়েদের অহংকার থাকা ভালো, নইলে তো যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়ত! এ দেশের বহু পুরুষ তো সারাক্ষণই লকলকে জিহ্বা বের করে ছুটে চলেছে শিকারের খোঁজে। একবার যদি কোনো মেয়ে সে রকম পুরুষের ডাকে সাড়া দেয় তাহলে আর রেহাই নেই। তো, মেয়েটিকে পটাতে পেরে এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকার বাইরের এই প্রাক্তন মফস্বল এবং সদ্য বিভাগীয় শহরে নিয়ে আসতে পেরে তিনি এমনিতেই আনন্দে ছিলেন। তার ওপর ও রকম একটা সঙ্গম! মেয়েটি যে হার মেনেছিল, এ যে কত বড় বিজয়, তা পুরুষ মানুষ ছাড়া কেউ বুঝবেই না।

পরাজয়ের কথা ভাবতে চান না, তাই ল্যাপটপটা খুললেন বদরুল করিম, ঢুকলেন ফেসবুকে। আগে তিনি ফেসবুক ব্যাপারটা খুব একটা বুঝতেন না, এখন উপভোগ করেন। কী দারুণ শক্তিশালী একটা মাধ্যম! সারা জীবন সাংবাদিকতা করে যতটা না খ্যাতি পেয়েছেন, তারচেয়ে বেশি পেয়েছেন ফেসবুকে দুবার তাঁর বক্তব্য ভাইরাল হওয়ার ফলে। জীবনভর তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন। বছর কয়েক হলো বুঝে গিয়েছেন, ওতে কিছু হয় না। নিজের ধরন পাল্টে শুরু করেছেন আক্রমণাত্মক ও বিতর্কিত সাংবাদিকতা। বিশেষ করে উন্নয়নবিরোধী ব্যক্তি ও দলগুলোর প্রতি তাঁর ভঙ্গি মারাত্মক আক্রমণাত্মক। সে রকমই দুটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। টক শোতে ওই সব কথা বলেছিলেন, সেগুলোই চলে এসেছিল ফেসবুকে। আর দুদিনেই সুপারস্টার হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এত আলোচনা-সমালোচনা-তর্ক-বিতর্ক আর কখনো হয়নি তাঁকে নিয়ে। সেই থেকে ফেসবুক ব্যাপারটা উপভোগ্য হয়ে উঠেছে তাঁর কাছে। অবশ্য বিরক্তও যে লাগে না, তা নয়। হাজারটা মানুষের হাজারটা মতামত, কোনো বিষয়েই একমত হতে পারে না এই জাতি। বিরক্তিকর নয় ব্যাপারটা? কোনো কোনো ব্যাপারে তো একমত হতে হবে! যেমন উন্নয়ন। অথচ এটা নিয়েও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-কটাক্ষ-সমালোচনা করার লোকের অভাব নেই। এসব ভাবতে ভাবতেই আর স্ক্রল করে স্ট্যাটাসগুলো দেখতে দেখতেই চোখে পড়ল বন্ধু আহাদুজ্জামানের পোস্টটা। না, শুধু ফেসবুকের বন্ধু নয় জামান, বাস্তবের বন্ধুও। দীর্ঘকালের বন্ধু। সে লিখেছে:

 ‘বৈশাখের এমন অদ্ভুত রূপ আর দেখিনি কখনো। প্রায় প্রতিদিন এমন রুদ্র ঝড়, তুমুল বৃষ্টি, প্রচুর বজ্রপাত...। বৃষ্টির পর হেমন্তের শেষ বেলার মতো শীত-শীত বাতাস, হুহু করে বয়েই চলেছে। বৃষ্টিস্নাত দিনগুলো হয়ে উঠছে ভারি আরামদায়ক, মায়াময়। এ রকম কখনো দেখিনি। নাকি দেখেছি? সেই আম-কুড়ানো ছোটবেলায়? না, তখনো দেখিনি বোধ হয়। অন্তত প্রতিদিন ঝড় দেখিনি। প্রকৃতির এমন রুদ্র রূপ দেখলে অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয়, কোথাও কোনো অমঙ্গল ঘনিয়ে আসছে। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়—এ রকম কিছু। কোনো যৌক্তিক কারণ নেই এ রকম মনে হওয়ার, তবু হয়। কিন্তু এই শঙ্কার ভেতরেই স্বস্তি এনে দেয় বৃষ্টির পর ওই হিমেল হাওয়াটুকু। আমি গরমকে ভয় পাই, সইতেও পারি না। প্রতিবছর নিয়ম করে গ্রীষ্মকালে অসুস্থ হয়ে পড়ি আমি, গরমের চাপে। নানা রকম অসুখ-বিসুখ এসে ভিড় করে। এ বছর সে রকম কিছু হয়নি এখনো, হয়তো এই শীত-শীত আবহাওয়ার কারণেই। আমার জানালা দিয়ে হুহু করে বাতাস এসে ঘরের কাগজপত্র এলোমেলো করে দেয়, শরীর-মন জুড়িয়ে যায়, কখনো মৃদু শীতে কেঁপেও উঠি। মনে হয় যেন দাঁড়িয়ে আছি বিশাল কোনো নদীর পারে। কত কথা মনে পড়ে, কত স্মৃতি। স্মৃতির ভেতরেই গুনগুনিয়ে ওঠে কেউ—তোমায় গান শোনাবো, তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখো...। এমন মায়াবী রাতে আমার ঘুমাতে ইচ্ছে করে না।’

পড়তে পড়তে মাথা গরম হয়ে গেল বদরুল করিমের। কিন্তু কারণটা বুঝতে পারলেন না। মাথা গরম হওয়ার মতো তো তেমন কিছু লেখেনি জামান। কিন্তু তিনি জানেন, জামান আরেক শক্ত উন্নয়নবিরোধী। প্রায়ই উন্নয়ন নিয়ে বিদ্রুপ আর কটাক্ষ করে সে, কখনো কখনো গালিও দেয় বিশ্রীভাবে। এসব নিয়ে তর্ক হয়েছে অনেক, কিন্তু মানানো যায়নি ওকে। ওর একটাই কথা—উন্নয়ন বলতে কেবল ফ্লাইওভার, মেট্রো রেল, মহাসড়ক বা পদ্মা সেতুই বোঝায় না। উন্নয়ন মানে মানবিক উন্নয়ন, মানুষের উন্নয়ন। মানুষকে গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়ে এসব অবকাঠামোর উন্নয়ন করে কী হবে?

বদরুল করিম বুঝতেই পারেন না জামানের এই বিপরীতমুখী পরিবর্তন ঘটল কিভাবে? ছাত্রজীবনে তাঁরা দুজনেই বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক ও কর্মী ছিলেন বটে, কিন্তু জামান অনেক আগেই সেখান থেকে সরে এসেছিল। এ দেশে বিপ্লব হবে না, লিবারেল ডেমোক্রেসি আর কল্যাণ রাষ্ট্রের নির্মাণই এ জাতির মুক্তির উপায়—এই কথা সে বলতে থাকে সামরিক শাসন-পরবর্তী সময় থেকেই। তখনো ওর সঙ্গে তর্ক হতো খুব। কারণ বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি বদরুল করিমের আস্থা এবং বিশ্বাস তখনো বহাল ছিল, বিপ্লবের স্বপ্নও অটুট ছিল। কাল-পরিক্রমায় তিন-চারটে নির্বাচনের পরও যখন দেশে একটা নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলা গেল না, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে ফের সামরিক শাসন শুরু হলো, তখন বদরুল করিম খুব খেপিয়েছেন জামানকে—‘দেখলি তো তোর ডেমোক্রেসির অবস্থা! যে লাউ সেই কদু। তোর প্রিয় দল সামরিক শাসনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এই সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল!’

জামান তখনো আশাবাদী—‘এই দিন থাকবে না। গণতন্ত্রকে আসতেই হবে। দলগুলো তাদের ভুল বুঝতে পারবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তো এক দিনে গড়ে ওঠে না। তাকে সময় দিতে হয়। কিছু ভুলভ্রান্তি হচ্ছে, এসব ঠিক হয়ে যাবে।’

দুই বছর পর যখন নির্বাচনের ঢাকঢোল বেজে উঠল, তখন সে তার প্রিয় দলের পক্ষে নেমে পড়ল ব্যাপক প্রচারণায়। বদরুল করিম তখনো নির্বাচনী ব্যবস্থা ও ‘তথাকথিত’ গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাহীন। কথার তীরে বন্ধুকে বিদ্ধ করাই ছিল তাঁর প্রধান কাজ। বুর্জোয়া, ধনিক শ্রেণির দালাল ইত্যাদি বলে গালাগাল করে খুব আরাম পেতেন। তাতে অবশ্য কোনো ভাবান্তর হতো না জামানের।

তো, নির্বাচন হয়ে গেল, ক্ষমতায় এলো জামানের প্রিয় দল। এর পরপরই খুব গোপন একটা ঘটনা ঘটল। বদরুল করিমসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এক গোপন বৈঠকে ডাক পেলেন। স্বয়ং রাজপ্রতিনিধি এলেন সেই বৈঠকে। তাঁদের বলা হলো—আমি জানি, আপনারা সবাই আমাদের দলের সমালোচক। তাতে অসুবিধা নেই। আপনারা সমালোচনা চালিয়ে যান। গঠনমূলক সমালোচনা আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। কিন্তু একটাই অনুরোধ, দলের দুঃসময়ে আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন, পক্ষে থাকবেন। আপনাদের যার যা প্রয়োজন সব আমরা দেব।

ঘটনাটা এসে জামানকে বলেছিলেন বদরুল করিম। জামান অবাক হয়ে বলেছিল, তোকে ডাকল কেন? তুই তো সরকারবিরোধী লোক!

সে জন্যই তো ডেকেছে। আমরা সব সরকারের সমালোচনা করি বলে জনগণের একটা আস্থা আছে আমাদের ওপর। তারা ভাবে, আমরা সরকারবিরোধী। সরকার যদি বিপদে পড়ে, জনপ্রিয়তা কমতে থাকে, তখন আর সরকারপন্থীদের কথা জনগণ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু যদি আমরা তাদের পক্ষ নিই, জনগণ ভাববে সরকার ঠিক পথেই আছে।

হুম, বেশ ভালো একটা বুদ্ধি। তা, তুই এই ভূমিকা পালন করতে রাজি হয়েছিস?

পাগল নাকি! কোনো লুটেরা বুর্জোয়া দলকে সমর্থন করা আমার জন্য আত্মহত্যার শামিল।

 গোপন এই কথাটা জামানকে বলা আসলে ভুল ছিল। ও এখন প্রায়ই খোটা দেয় সরকারের দালাল বলে। জামানের এই পক্ষ পরিবর্তন ঘটে পরবর্তী নির্বাচন দেখে। সে ওটাকে নির্বাচন বলতেই রাজি নয়। বলে, ওটা ইলেকশন নয়, সিলেকশন। নইলে ১৫৩ জন কিভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়? সামরিক সরকার এই ধরনের নির্বাচন করে। করারই কথা। ওরা তো জনবিচ্ছিন্ন, গণবিরোধী। কিন্তু বড় দুটি রাজনৈতিক দলই একই রকম কাজ করল। ১৫ ফেব্রুয়ারি আর ৫ জানুয়ারি, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে দুটি কালো দিন হয়ে থাকবে।

ওদিকে বদরুল করিমের পক্ষ পরিবর্তনও ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই। বামপন্থীদের নির্বাচন বর্জনের ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ করেননি তিনি। এবার নির্বাচন বর্জন না করলে তারাই হতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল এবং এই অবস্থান তাদের বহুদূর সামনে এগিয়ে দিত। এই সহজ সমীকরণটা দলগুলো বুঝল না! বদরুল করিম বুঝে গিয়েছেন, এদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সে ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে সরকারি দলকে সমর্থন না করার কোনো কারণ খুঁজে পাননি তিনি। এবং যখন অবস্থান পাল্টেছেন, তখন কাপড়চোপড় খুলেই পাল্টেছেন। মুখোশ ধরে রাখার তো কারণ নেই!

এ জন্য তাঁকে সবচেয়ে বেশি কথা শুনতে হয়েছে জামানের কাছ থেকে। দেখা হলেই মিষ্টি হেসে ছুরির ফলার মতো তীক্ষ এক শব্দ উচ্চারণ করে সে—‘দালাল’! হয়তো সে জন্যই কিংবা সঙ্গমে সদ্য-ব্যর্থতার জন্যও হতে পারে, জামানের ওই ঝড়-বৃষ্টির পোস্টটা তাঁকে তাতিয়ে তুলল। মন্তব্য করলেন তিনি :

‘গত তিন দিন ধরে তীব্র ঝড়কে মাথায় করে ঘুরছি কংস, নেতাই, সোমেশ্বরী আর ব্রহ্মপুত্রের কোল ঘেঁষে। দেখছি মাঠের সোনালি ধান তুলতে না পারা কৃষকের হাহাকার। আর একটু ভাটি এলাকায়, ধান এবারও যাবে আধেকেরও বেশি পানির নিচে। প্রকৃতি মাও কেন জানি ঘন ঘন অভিমান করছে! নাগরিক জীবন ঘন কালো মেঘ দেখলেই ফেবু স্ট্যাটাস দেয়! আর আমার কৃষক বাবা-ভাই-বন্ধু, কিষাণী মা-বোন-ভাবি কিংবা প্রেমিকা দীর্ঘশ্বাসকে উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠের ফসল ঘরে তুলতে যায়। ন্যায্য দাম পাক বা না পাক, আমাদের শহুরে নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবেই কি তবে ওরা হিমেল হাওয়ায় ধান মাড়াই করে? জানা হয়নি!’

মন্তব্যটা দেখে আহাদুজ্জামানেরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। শালা ভণ্ড, দালাল। কোন মাগি নিয়ে কোথায় ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে, আর ফেসবুকে এসে কিষাণ-কিষাণীর জন্য উথলে ওঠা দরদ দেখাচ্ছে! বদরুল করিমের মন্তব্যের কোনো উত্তর দিল না জামান। লাইকও না। কিন্তু ইনবক্সে লিখল—ওই দালাল, আমার ওয়ালে এসে বিপ্লব চোদাচ্ছিস কেন? নিজের ওয়াল কি সরকারের কাছে ভাড়া দিয়েছিস?

 কোনো উত্তর দিলেন না বদরুল করিম, কিন্তু নিজের ওয়ালে একটা স্ট্যাটাস দিলেন প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে। উন্নয়নবিরোধীদের এক হাত দেখে নেওয়ারও হুমকি দিলেন। লিখতে লিখতে তিনি টের পেলেন, উত্তেজনা ফিরে এসেছে, উত্থিত হচ্ছেন তিনি। স্ট্যাটাসটা পোস্ট করেই মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন বদরুল করিম, আধঘণ্টা ধরে দুমড়েমুচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেললেন তৃপ্তির শ্বাস।

আহ! বিপ্লব সম্পন্ন হলো!

মন্তব্য